Monday, 25 July 2011

জনসংখ্যা বনাম জনসম্পদ : প্রেক্ষিত নারীর সনাতনী প্রজনন কর্মভার/ রোকেয়া কবীর

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোকৃত আদমশুমারি ও গৃহগণনা ২০১১-এর প্রাথমিক ফলাফল থেকে জানা যাচ্ছে, বাংলাদেশের বর্তমান জনসংখ্যা ১৪ কোটি ২৩ লাখ ১৯ হাজার। এ বিষয়ক বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত ও আলোচনার সূত্রে ধারণা করা যায়, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান কর্তৃক শুমারি-পরবর্তী যাচাই-বাছাইয়ের পর প্রকৃত গণনায় এ সংখ্যা কিছুটা বেড়ে ১৫ কোটির কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়াতে পারে। যদিও জাতিসংঘভুক্ত সংস্থা ইউএনএফপিএ ২০০৮ সালেই জানিয়েছিল বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৬ কোটি ১৩ লাখ, সে হিসেবে ২০১১-এ মোট জনসংখ্যা ১৭ কোটিকেও ছাড়িয়ে যাবার কথা। যে কারণে দেশের প্রকৃত জনসংখ্যা কত তা নিয়ে নানা তর্কবিতর্কের সূত্রপাত ঘটেছে। এটা ঘটতেই পারে, কারণ প্রকৃত সংখ্যা ১৪ কোটি, ১৬ কোটি বা ১৭ কোটি যাই হোক, এই সংখ্যাটা কেবল একটা জড়সংখ্যাই নয়, এর আড়ালে রয়েছে মানুষ ও তার জীবন, যাদের রয়েছে নানা চাহিদা। জনসংখ্যার ওপরে ভিত্তি করেই দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা করা হয়, হিসেব করা হয় মাথাপিছু আয়ের। আবার এই জনসংখ্যাকে জনসম্পদে রূপান্তরিত করতে হলেও জনসংখ্যার একটা বাস্তব চিত্র জানা থাকা দরকার।

ক্ষুদ্রায়তনের এই দেশে বিদ্যমান সম্পদের তুলনায় উল্লিখিত পরিমাণ জনসংখ্যা বড়ো একটা চাপ সৃষ্টি করছে এতে কোনো সন্দেহ নেই। যে দেশের একটা উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নারী-পুরুষ প্রতিনিয়ত ক্ষুধা, দারিদ্র্য, অপুষ্টি ও রোগব্যাধিতে ভোগে, যার বড়ো অংশই নারী ও শিশু, সে দেশের বিপুল জনসংখ্যা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ মনোযোগ দাবি করে। এই বিপুল পরিমাণ জনসংখ্যার জীবনের ন্যূনতম মান বজায় রেখে জনসংখ্যা সমস্যাকে সম্ভাবনাময় জনশক্তিতে রূপায়িত করে দেশটাকে আরো অগ্রসর করে নিয়ে যেতে হলে খাদ্য ও পানীয় জল, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসার মতো মৌলিক চাহিদাসমূহ মেটানোর পাশপাশি ক্রমবর্ধমান চাহিদার প্রেক্ষিতে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, প্রয়োজনীয় জ্বালানির যোগান, কর্মসংস্থান ইত্যাদি খাতে ব্যাপকায়তন উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন, যা আমাদের সামনে একটা বড়ো চ্যালেঞ্জ।

দেশের সিংহভাগ মানুষ কৃষিনির্ভর হলেও দ্রুত নগরায়ণ, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, বাড়তি জনগোষ্ঠীর বাসস্থানের চাহিদা ইত্যাদি মেটাতে প্রতিবছরই আবাদি জমির পরিমাণ কমে যাচ্ছে, যা দেশের ক্রমবর্ধমান খাদ্য নিরাপত্তাকে বিরাট হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। এই হুমকির সমীকরণটা খুব স্বচ্ছ : জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে বাড়ছে খাদ্যের চাহিদা, আর বিপরীতে আবাদি জমির পরিমাণ কমে যাওয়ায় কমছে খাদ্য উৎপাদন। এই বিপরীতমুখী প্রলম্বন আমাদের এই ইঙ্গিতই দিচ্ছে যে, এক্ষুনি সতর্ক উদ্যোগ গ্রহণ না করলে আমরা ভয়াবহরকম এক সংকটজনক পরিস্থিতির মুখে পড়তে যাচ্ছি। এই বিপুল জনসংখ্যার জন্য খাদ্য ছাড়াও অন্য প্রয়োজনীয় চাহিদা যথা শিক্ষা, স্বাস্থ্য, রাস্তাঘাট ও যানবাহন এবং জ্বালানির যোগান দেওয়া, কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা ইত্যাদির জন্য রাষ্ট্রের ওপরে যে বাড়তি চাপ পড়ছে, সে চাপ মোকাবেলা করবার মতো যথেষ্ট প্রস্তুতি আমাদের এখনো নেই। তাছাড়া অধিক জনসংখ্যা পরিবেশের ওপরেও নানা ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে। ক্রমাগত বনভূমি উজাড়, নদীনালা-জলাশয় ভরাট, পাহাড় কর্তন ইত্যাদির ফলে প্রাকৃতিক ভারসাম্য যেভাবে বিনষ্ট হচ্ছে তা জনজীবনের জন্য হয়ে উঠছে মারাত্মক আরেক হুমকি। এসব বিবেচনায় জনসংখ্যা বৃদ্ধির এই হারকে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আনা খুবই দরকার।

নবপ্রকাশিত পরিসংখ্যান বলছে, দেশে বর্তমানে নারীর সংখ্যা ৭ কোটি ১০ লাখ ৬৪ হাজার, অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫০ ভাগই নারী। এই সংখ্যার গরিষ্ঠভাগ নারীই সনাতনী পরিবার ব্যবস্থা ও প্রজনন কর্মভার, পুরুষতান্ত্রিক সমাজদর্শন ও নানা নির্যাতন-নিষ্পেষণে কাবু। তথ্য-উপাত্ত বলছে, শিক্ষা, প্রশাসন, রাজনীতি ও সংসদ থেকে শুরু করে স্থানীয় সরকার এবং বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠান থেকে নেয়া ক্ষুদ্রঋণ ব্যবহার করে অপ্রাতিষ্ঠানিক অর্থ উপার্জনকারী কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ ক্রমাগত বাড়ছে, যা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও স্বীকৃত। আমরা যখন আমাদের নারীদের প্রচলিত-অপ্রচলিত বিভিন্ন নীতিনির্ধারণমূলক ও উপার্জনমূলক কাজে সাফল্যের সাথে বিচরণ করতে দেখছি, তখনও নারীর প্রতি সমাজের সনাতনী দৃষ্টিভঙ্গির কারণে তাদের প্রতি একের পর এক বিভিন্নমুখী নির্যাতনের ঘটনা ঘটে চলেছে। কী ভয়াবহ মাত্রায় দেশে নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে তা বুঝতে বেশিদূরে যাবার দরকার নেই। গত এক মাসে সংবাদমাধ্যমে যে পরিমাণ নারী নির্যাতনের ঘটনা উঠে এসেছে তা দিয়েই এ কথার সত্যতা উপলব্ধি করা যায়, যদিও যত নির্যাতনের ঘটনা দেশে ঘটে, প্রকাশিত ঘটনাগুলো তার একটি ক্ষুদ্র অংশ মাত্র।

নারীর প্রতি সমাজে বিরাজমান সনাতনী দৃষ্টিভঙ্গি নারীকে দেখতে চায় একজন ভালো মা, ভালো স্ত্রী, ভালো গৃহিণী হিসেবে। নারী যত শিক্ষিতই হোক, যত উপার্জনকারীই হোক, রাজনীতির মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ করুক; আমরা তাকে নারী হিসেবেই দেখি। এমনকি সরকার পরিচালনা, মন্ত্রণালয় পরিচালনা, অফিস পরিচালনার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজে নারী যুক্ত থাকলেও তাকে আমরা সক্রিয় একজন নাগরিক হিসেবে না দেখে নারী হিসেবেই দেখতে চাই। এতকিছুর পরেও আমাদের মনোযোগ থাকে এটা দেখায় যে, তিনি কতটা ভালো মা, কতটা ভালো স্ত্রী, কতটা ভালো গৃহিণী। আমরা দেখতে চাই তারা সন্তান ধারণ, জন্মদান, লালনপালন, পারিবারিক আতিথেয়তা ও ঘরের কাজ করায় কতটা পারদর্শী। অর্থাৎ নারীর প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি আজো সনাতনী প্রজনন কার্যক্রমেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিনিয়ত বদলাচ্ছে, কিন্তু নারীর প্রতি সমাজের এই দৃষ্টিভঙ্গি একই জায়গায় থেকে গেছে। আমাদের চারপাশের সমাজ থেকে এ কথার স্বপক্ষে অজস্র উদাহরণ হাজির করা যায়। সম্প্রতি সংঘটিত রুমানা মনজুরের নির্যাতনের ঘটনা যার একটি হতে পারে। তিনি লেখাপড়া করে বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার মতো কাজে যুক্ত ছিলেন, উপার্জন করতেন, প্রচলিত সংজ্ঞায় তিনি তাঁর সমাজে ক্ষমতায়িত ছিলেন; কিন্তু তাঁর স্বামী ও পরিবারের সনাতনী দৃষ্টিভঙ্গির কারণে তাঁকেও নির্যাতিত হতে হয়েছে, চোখ হারাতে হয়েছে। এতকিছু অর্জন করেও তাঁর অপরাধ ছিল এই যে, স্বামীর দৃষ্টিতে তিনি ভালো স্ত্রী ও তার সন্তানের ভালো মা হতে পারেন নি। যেন ভালো স্ত্রী, ভালো মা হওয়াই নারী জীবনের একমাত্র সাধনা হওয়া উচিত!

নারীর প্রতি সমাজের এই সনাতনী দৃষ্টিভঙ্গির কারণে কেবল শিক্ষিত হওয়া, উপার্জন করা, অংশগ্রহণ করতে পারাকেই আমরা ক্ষমতায়নের উপাদান হিসেবে দেখছি, ফলে নারী আজ দ্বিগুণ-ত্রিগুণ কর্মভারে পীড়িত হচ্ছে। উপার্জনমূলক কাজে পুরোমাত্রায় যুক্ত থাকার পরও তাকে পারিবারিক, সামাজিক ও শারীরিক নানা ঝক্কির মোকাবেলা করতে হচ্ছে। তাতে তার শারীরিক-মানসিক নানারকম চাপ নিতে হচ্ছে। নিতে হচ্ছে সময়ের চাপ। কিন্তু এই অবস্থা অমানবিক। এই অমানবিক অবস্থার পরিবর্তন চাইলে আমাদের অতি অবশ্যই বিদ্যমান সনাতনী দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে, নারীকে মানুষ এবং সক্রিয় নাগরিক হিসেবে দেখায় অভ্যস্ত হতে হবে। সমান মর্যাদা ও অধিকার ভোগের অধিকারী হিসেবে তাকে দেখতে হবে, যে অধিকার নারীকে আমাদের সংবিধানই দিয়েছে।

দেশের একজন নাগরিক হিসেবে তার যা যা প্রাপ্য তা তাকে দিতে হবে। বিপরীতে নাগরিক হিসেবে নারীর যা করণীয় তা তাদের করতে হবে, সক্রিয় নাগরিক হিসেবে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে। আর এটা করতে হলে নারীর ওপর থেকে একের পর এক সন্তান ধারণ ও তার লালনপালনের ভার কমাতে হবে, গার্হস্থ্য কাজের ভার কমাতে হবে। এসব ভার কমলেই তারা রাষ্ট্রের সক্রিয় নাগরিক হিসেবে সামাজিক-রাজনৈতিক দায়িত্ব পালন করবার সুযোগ এবং সময় পাবে। নিজেরা উপার্জনমূলক কাজে যুক্ত হতে পারবে।

একটা ছেলের ক্ষেত্রে আমরা বলি আগে মানুষ হও, নিজের পায়ে দাঁড়াও, তারপরে বিয়ে-সংসার করো ইত্যাদি। একইভাবে একটি মেয়েকেও আগে মানুষ হওয়া ও নিজের পায়ে দাঁড়াবার অবকাশ দিতে হবে। সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি বদলিয়ে এরকম ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে ছোটোবেলা থেকেই একটা মেয়ে মানুষ হিসেবে সমান স্বীকৃতি ও মর্যাদা পায় এবং শিক্ষাগ্রহণ, পেশা নির্বাচন ও নিজের ভালোমন্দ নিজেই ঠিক করবার সুযোগ পায়। একজন মানুষের জীবনে ১৫ থেকে ৫০ বৎসর বয়সসীমা হচ্ছে সবচেয়ে উৎপাদনক্ষম সময়। অথচ সনাতনী চিন্তাভাবনার কারণে আমাদের সমাজের প্রায় প্রতিটি নারীর এ সময়টা সন্তান জন্মদান ও তার লালনপালনে ব্যয় হয়ে যায়। এই সনাতনী দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই সমাজ থেকে আইন করেও বাল্যবিয়ে দূর করা যাচ্ছে না, কমানো যাচ্ছে না মাতৃমৃত্যুর উচ্চহারও। আইনানুযায়ী যেখানে একটি মেয়ের বিয়ের ন্যূনতম বয়স ১৮, সেখানে আমাদের দেশে মেয়েদের গড় বিয়ের বয়স ১৫। এই গড় আমাদের এই ধারণা দেয় যে, দেশে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিয়ে হয় ১২ বছর বয়সের মধ্যে। আর এর ফলে অল্প বয়সেই এই মেয়েদের গর্ভধারণ করে নিজেদের জীবনটা বিপন্ন করবার ঝুঁকি নিতে হয়। এদের একটা অংশের সন্তান জন্মদানের সময় মৃত্যুর আশঙ্কা থাকে, অনেকে মৃত্যুবরণ করে। এই মৃত্যহার এখনো অগ্রহণীয় পর্যায়ে রয়ে গেছে। ২০১০-এ প্রকাশিত হিসেবে এখনো দেশে প্রতি লাখে ১৯৪ জন মা প্রসবকালে মৃত্যুর শিকার হয়। যারা বেঁচে থাকে তাদেরও সন্তান ও সংসারের ঘাঁনি টানা এবং স্বামী-শ্বশুর-শাশুড়ির সেবা করা ছাড়া জীবনে আর কিছুই করা হয়ে ওঠে না। নারীসমাজকে সন্তান ও সংসারের ভারে এভাবে জর্জরিত হওয়ার অবস্থা থেকে মুক্তি দিতে হবে। তাতে মেয়েরা পড়াশোনা করে নিজে উপার্জনক্ষম হতে পারবে, মা ও শিশুমৃত্যুর হার কমবে, পরিবারব্যবস্থাপনা করা হবে অনেক সহজ। সন্তানকে ঠিকমতো লেখাপড়া করানো, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া ও মানুষ করে তুলবার মতো অর্থনৈতিক সামর্থ্যও তাদের করায়ত্ত হবে। পরিবার ছোটো হলে জনব্যবস্থাপনায় সুবিধা হবে রাষ্ট্রেরও। বিপুল পরিমাণ মানুষের জীবনমান নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রের কোষাগারের ওপর চাপ কমবে। অর্থাৎ সকল মানুষের জীবনের মানগত উন্নয়ন ঘটবে, বিদ্যমান দারিদ্র্যাবস্থার বদল ঘটবে।

নারীর ব্যাপারে সমাজের মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গিটা বদলালে নারী নির্যাতনের হার কমবে। মেয়েকে কোনো পরিবারেই ভার হিসেবে দেখা হবে না। আর এরকম অনুকূল অবস্থা তৈরি হলে নারীও মুখ বুজে পড়ে থাকবে না, নিজের জীবন গড়ার পাশাপাশি পরিবার ও সমাজের জন্য, দেশের জন্য নিজে ভূমিকা রাখতে উদ্যোগী হবার অবকাশ পাবে। তারা যদি সামাজিক-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় থাকবার সুযোগ পায়, তাহলে নিশ্চিতভাবে বাল্যবিয়ের হার কমবে, শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার কমবে, উন্নতি হবে প্রজননস্বাস্থ্যের। তার অন্যতম প্রধান ফল হবে ক্রমহ্রাসমান জনসংখ্যার হার।

কাজেই যত দ্রুত সম্ভব নারীর প্রজনন কর্মভার কমানো ও নারীর প্রতি সমাজের সনাতনী দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর জন্য সরকারি ও বেসরকারিভাবে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। সম্ভাব্য উদ্যোগগুলোর মধ্যে একটি হতে পারে, বিভিন্ন নাগরিক সুবিধা গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় মানদণ্ড স্থাপন। তাতে যেসব পরিবার ও সমাজে নারীর প্রতি সনাতনী দৃষ্টিভঙ্গি আছে, রাষ্ট্রীয় ও অন্যান্য সুযোগসুবিধা প্রাপ্তির আগ্রহে ওই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তারা বেরিয়ে আসবে। যেমন যদি বিভিন্ন সরকারি, বেসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে চাকুরি প্রাপ্তি ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে এরকম নিয়ম বেঁধে দেওয়া হয় যে, বাল্যবিয়ে হয় নি বা পরিবারের কারো সন্তানসংখ্যা একটি বা দুটির বেশি নয় এমন পরিবারের সদস্যদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে; তাহলে নিশ্চিতভাবে সমাজে এর একটা ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। এটি একটি উদাহরণমাত্র। এই আলোকে চাকুরি ও পদোন্নতি প্রাপ্তি, ব্যাংক ঋণ প্রাপ্তি, স্বাস্থ্য সেবা প্রাপ্তি, বিনামূল্যে শিক্ষা সুবিধা প্রাপ্তি ইত্যাদি ক্ষেত্রে বিভিন্ন মানদণ্ড স্থাপন (ইনডিকেটর সেট) করার কথা ভাবা যেতে পারে। তাছাড়া স্কুল-কলেজের পাঠ কার্যক্রম ও প্রচার মাধ্যমে এ বিষয়ে ব্যাপক আলোচনা, বিতর্ক ইত্যাদির মাধ্যমে সামগ্রিক সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগও গ্রহণ করা যেতে পারে।

সর্বোপরি বলা যায়, নারীর প্রতি বিদ্যমান সনাতনী সমাজ ব্যবস্থায় নারীসমাজকে যে পরিমাণ অমানবিক অবস্থার ভিতর দিয়ে জীবনধারণ করতে হয়, সে অবস্থার পরিবর্তন করা না গেলে সমাজের বর্তমান অসম ও নির্যাতন-নিষ্পেষণমূলক অবস্থায় কোনো স্থায়ী পরিবর্তন আসবে না। এ অবস্থায় কোনো উন্নয়ন উদ্যোগই পুরোপুরি কার্যকর হবে না, বরং তা হবে মূল কারণ টিকিয়ে রেখে পার্শ্ব কারণসমূহ দূরীভূত করবার জন্য শ্রম ও অর্থ বিনিয়োগ।

Thursday, 14 July 2011

ভিকারুননিসা নূন স্কুলের ধর্ষক-শিক্ষক পরিমল জয়ধর এবং বদরগঞ্জের নির্যাতক সালিশকার ইউপি চেয়ারম্যানসহ সম্প্রতি সংঘটিত সকল নারী নির্যাতন ঘটনার অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনের অবস্থানপত্র

ভিআইপি হল, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি, ঢাকা। ১৪ জুলাই ২০১১

প্রিয় সাংবাদিক বোন ও ভাইয়েরা,
বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘ (বিএনপিএস)-এর পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা জানবেন।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি, সালিশের নামে নির্যাতন, যৌতুকের নামে হত্যা এবং পারিবারিক নির্যাতনসহ নারীর প্রতি সকল প্রকার সহিংসতার বিরুদ্ধে আমাদের প্রতিবাদ জানাতে এবং এ বিষয়ে করণীয় সম্পর্কে আমাদের বক্তব্য ও দাবিসমূহ তুলে ধরার জন্য আজকের এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে।
সংবাদকর্মীদের প্রশ্নের জবাব দিচ্ছেন বিএনপিএস নির্বাহী পরিচালক নারীনেত্রী রোকেয়া কবীর। পাশে উপবিষ্ট (ডানে) বিএনপিএস কার্যনির্বাহী পরিষদ সদস্য বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী কনকচাঁপা চাকমা ও বিএনপিএস পরিচালক ওমর তারেক চৌধুরী এবং (বামে) বিএনপিএস উপপরিচালক শাহনাজ সুমী ও অ্যাডভোকেসি সমন্বয়কারী দিলারা রেখা

প্রিয় বন্ধুগণ,
ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের বসুন্ধরা শাখার শিক্ষক পরিমল জয়ধর কর্তৃক শিক্ষার্থীকে ধর্ষণ ও নিপীড়ন এবং নিপীড়নের ছবি ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেয়ার হুমকি দেয়ার ঘটনায় বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘ তীব্র নিন্দা, ক্ষোভ ও ঘৃণা প্রকাশ করছে। আমরা গভীর উদ্বেগের সাথে লক্ষ করেছি যে, এ ঘটনায় স্কুল কর্তৃপক্ষ নিপীড়িত ছাত্রীকে উপযুক্ত সহায়তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। গণমাধ্যমসূত্রে আমরা আরো অবগত হয়েছি, পরিমল ছাড়াও একই শাখার আরো চার শিক্ষকের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থী নিপীড়নের অভিযোগ রয়েছে। আমরা ধর্ষক পরিমল, এ কাজে প্রশ্রয়দানকারী কর্তৃপক্ষ এবং অভিযুক্ত অন্য চার শিক্ষকসহ সকল অপরাধীকে আইনানুগ বিচারের আওতায় আনার জোর দাবি জানাচ্ছি।

সম্প্রতি ব্রাক্ষণবাড়িয়ার আখাউড়ায় শিক্ষক দ্বারা শিক্ষার্থী নিপীড়নের আরেকটি ঘটনার খবর কাগজে প্রকাশিত হয়েছে। স্কুলের শ্রেণিকক্ষে ঢুকে যৌন নিপীড়নকারী ওই শিক্ষক ইতোমধ্যে গ্রেপ্তারও হয়েছেন। আমরা শিক্ষকের বেশধারী এই নিপীড়কেরও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।

প্রিয় ভাই ও বোনেরা,
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানির ঘটনা নতুন কিছু নয়। ঠিকমতো অনুসন্ধান করলে দেখা যাবে, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অহরহই নানামাত্রায় যৌন নিপীড়নের ঘটনা ঘটে চলেছে। মেয়েশিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্য করে আপত্তিকর ইঙ্গিতপূর্ণ কথা বলা থেকে শুরু করে নানা ছলে তাদের শরীরে হাত দেওয়া পর্যন্ত ঘটনা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে হামেশাই ঘটে বলে অভিযোগ রয়েছে। ছেলেশিক্ষার্থীরাও যৌন নিপীড়নের শিকার হচ্ছে বিভিন্ন মাদ্রাসা ও স্কুলে। নির্যাতন সম্পর্কিত স্পষ্ট ধারণা না-থাকা, নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতনতার অভাব, যুক্তিসংগত অভিযোগ জানাবার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অনুপস্থিতি, অভিযোগ জানাবার পর অভিযোগকারীর নিরাপত্তার অভাব, শিক্ষকগণ কর্তৃক নানামাত্রিক হুমকি, শিক্ষার্থীদের সাথে অভিভাবকদের সহজ সম্পর্ক না-থাকা, সমাজ ও অভিভাবকগণ কর্তৃক মেয়েদের ওপরে দোষ চাপানোর পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা, সমাজে প্রচলিত সনাতনী এবং পুরুষতান্ত্রিক চেতনা উদ্ভূত লজ্জাবোধ, ইত্যাদি কারণে এসব ঘটনা প্রায়ই প্রকাশিত হয় না। আমরা ধারণা করি, প্রাইভেট, কোচিংক্লাস ও বিশেষ তত্ত্বাবধানের নামে শিক্ষার্থীদের একা পাবার সুযোগ নিয়ে সারাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে রক্ষক হয়ে ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ এক শ্রেণির শিক্ষকদের দ্বারা যে পরিমাণ ধর্ষণ/বলাৎকারের ঘটনা ঘটে থাকে, তার বেশিরভাগই অপ্রকাশিত থেকে যায়।

স্থানীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সকল ক্ষেত্রে নারীর ক্ষমতায়ন ও সমানাধিকার কায়েমের লক্ষ্যে মেয়েরা যখন শিক্ষায় ব্যাপকভাবে অগ্রসর হয়ে এসেছে, যখন তারা একের পর এক সাফল্যের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে চলেছে, তখন এই ধরনের ঘটনা আমাদের এই অর্থেও উদ্বিগ্ন করে তুলে যে, এতে অনেক অভিভাবক তাদের মেয়েদের স্কুলে পাঠানো বন্ধ করে দিয়ে বাল্যবিয়েতে আগ্রহী হয়ে উঠতে পারেন। এতে যে শুধু ওই মেয়েদেরই ক্ষতি হবে তা নয়, বরং ক্ষতিগ্রস্ত হবে নারীসমাজসহ গোটা জাতি। এই পরিপ্রেক্ষিতে আমরা মনে করি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি ও নিপীড়ন প্রতিরোধে মহামান্য হাইকোর্ট প্রদত্ত নির্দেশনামূলক নীতিমালা অনুসরণ বাধ্যতামূলক করার ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। এজন্য একইসঙ্গে শিক্ষা, আইন এবং নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে এ বিষয়ে বিশেষ নির্দেশনা জারি করাসহ জারিকৃত আইন ও নির্দেশনা কার্যকর করারও দাবি জানাচ্ছি। আমরা মনে করি, সকল স্তরের শিক্ষালয়ে যৌন হয়রানি বন্ধ করার পরিবেশ তৈরির জন্য অনতিবিলম্বে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জরুরিভাবে পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন।

প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুরা,
আশা করি আপনারা জানেন যে, গত ২৬ জুন ২০১১ রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার রাজারামপুর কাশীগঞ্জে দুই গৃহবধূ সাইদা ও হ্যাপীকে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের নবনির্বাচিত চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে তথাকথিত সালিশের নামে পাশবিক কায়দায় অবর্ণনীয় নির্যাতন করা হয়েছে। দুটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলে নির্যাতনের দৃশ্য সম্বলিত খবর প্রচারের পর চেয়ারম্যানের লোকজন প্রভাব খাটিয়ে একজন নির্যাতিতের মুখ থেকে তার ওপরে কোনো নির্যাতন করা হয় নি বলিয়ে নিয়ে তাদের দুজনকেই গ্রামছাড়া করে দিয়েছে, যারা এখন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। শুধু তাই নয়, ‘একুশের চোখ’-এর অনুসন্ধানী দল এ ঘটনার ফলোআপ খবর সংগ্রহে গেলে চেয়ারম্যানের লোকজন পুরো দলটির ওপর হামলা চালিয়ে চারজনকে মারাত্মকভাবে আহত করে। খবরে প্রকাশ, স্থানীয় পুলিশ তিনজনকে গ্রেফতার করলেও ঘটনার মূল হোতা ইউপি চেয়ারম্যানকে এখনো গ্রেফতার করতে সক্ষম হয় নি।

ঘটনার এই গতিপ্রকৃতিতে নারীসমাজ বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন। নারীনীতিবিরোধী যে অপশক্তিকে আমরা রাজপথে বুকে পবিত্র কোরানশরিফ বেঁধে মিছিল করতে দেখেছি, ওই গোষ্ঠীটি নারীর বিরুদ্ধে যে ধরনের নির্যাতনের সংস্কৃতি দেশে চালু রাখতে চায়, এ ঘটনায় যেন আমরা তারই
বাস্তবায়ন দেখলাম। কিন্তু আমরা ভেবে পাই না, স্থানীয় প্রশাসনের নাকের ডগায় সালিশের নামে নারীর বিরুদ্ধে জঘন্য ফতোয়া কার্যকর করেও ফতোয়াবাজরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে একটি গ্রামে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে চলে কীভাবে? এ ধরনের ঘটনা যেন দেশে আর একটিও না-ঘটে সে ব্যবস্থা করবার জন্য আমরা বিশেষভাবে মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।   

প্রিয় বন্ধুরা,
আমরা আজ শুধু ঢাকার ভিকারুননিসা নূন স্কুল বা রংপুরের বদরগঞ্জের ঘটনার কথাই এখানে বলতে আসি নি। আমরা সামগ্রিকভাবে পরিবার, কর্মস্থল, শিক্ষাঙ্গন, রাস্তাঘাটসহ সর্বত্র নারীর প্রতি সংঘটিত নির্যাতন, নিপীড়ন ও হয়রানির ঘটনার যে বিস্তৃতি, তার প্রশমনে সমাজ ও সরকারের প্রতি কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের কথাই মূলত বলতে এসেছি। আমরা এখানে রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার সিমলা দীঘিপাড়া গ্রামের আদিবাসী নারী মরিয়ম মুর্মুর ধর্ষণ ও হত্যার কথা বলতে পারি, মতিঝিলে স্বামীর পিটুনিতে নিহত স্ত্রীর কথা বলতে পারি, নারায়ণগঞ্জে সিঙ্গাপুর প্রত্যাগত প্রবাসী নারীশ্রমিককে গণধর্ষণের পর আগুন দিয়ে পোড়ানোর কথা বলতে পারি; কিন্তু এরকম পাঁচ-দশটি ঘটনার কথা বলে এই অব্যাহত নির্যাতন ও মৃত্যুমিছিলের পুরো বর্ণনা দেওয়া সম্ভব নয়। এরকম নিপীড়নঘটনা সারাদেশে প্রতি মুহূর্তেই ঘটছে, যার প্রকৃত কোনো হিসেব কারো কাছেই নেই। অথচ এসব নির্যাতন ঘটনার সুষ্ঠু বিচার ও শাস্তি প্রদান কিংবা এ ধরনের সম্ভাব্য ঘটনা প্রতিরোধে রাষ্ট্রীয়-সামাজিক পদক্ষেপ গ্রহণের দৃষ্টান্ত আমরা খুব কমই স্থাপন করতে পেরেছি ও পারছি।

বন্ধুগণ,
সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখানো হয়েছে, নারী নির্যাতনের কারণে প্রতিবছর দেশের জিডিপির ২.০৫ শতাংশ অর্থ অপচয় হয়, যা জাতীয় বাজেটের স্বাস্থ্য ও পুষ্টি খাতের মোট বরাদ্দের সমান। এ পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয় নির্যাতন-সংশ্লিষ্টদের চিকিৎসা, মামলা-মোকদ্দমা, সালিশ, সামাজিকতা রক্ষা এবং সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে নারী নির্যাতনবিরোধী সচেতনতা কর্মসূচি চালাতে। তার মানে হলো, নারীর প্রতি সহিংসতা, নির্যাতন, নিপীড়ন, হয়রানি, ধর্ষণ, অ্যাসিড নিক্ষেপ, ফতোয়া, মৌখিক হয়রানি, মানসিক নির্যাতন চূড়ান্ত বিচারে শুধু নির্যাতন-সংশ্লিষ্টদেরই ক্ষতি করে না, বরং সমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে সমাজের সকল নারী-পুরুষ ও শিশুকে। আমরা নারী-পুরুষ সকলের জন্যই এই ভয়ংকর অমানবিক পরিস্থিতি ও অর্থনৈতিক অপচয় থেকে দেশ ও দেশের মানুষের মুক্তি চাই। এ অবস্থা কোনো সুস্থ সমাজের জন্যই কাম্য হতে পারে না। আমরা দৃঢ়ভাবে এমন অবস্থার অবসান চাই। এই অনাকাক্সিক্ষত অবস্থার পরিবর্তনের জন্য আমরা নিচের দাবি ও আহ্বান আপনাদের মাধ্যমে সরকার ও দেশবাসীর সামনে তুলে ধরছি :

  • ভিকারুননিসা নূন স্কুলের ধর্ষক-শিক্ষক পরিমল জয়ধর এবং তার সহযোগী ও প্রশ্রয়দানকারী, রংপুরের দুই গৃহবধূর ওপর নির্যাতনকারী ইউপি চেয়ারম্যানসহ সকল সালিশকার, ব্রাক্ষণবাড়িয়ার আখাউড়ার যৌন নিপীড়নকারী শিক্ষক, গোদাগাড়ী উপজেলার আদিবাসী নারী মরিয়ম মুর্মুর ধর্ষক ও হত্যাকারী, অধ্যাপক রুমানা মনজুরের নিপীড়ক স্বামীসহ সম্প্রতি ও অদূর অতীতে সংঘটিত সকল নারী নির্যাতন ঘটনার অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
  • সকল স্তরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অনতিবিলম্বে যৌন নিপীড়ন বিরোধী পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা চালু করতে হবে।
  • যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে দেওয়া হাইকোর্টের নির্দেশনা বাস্তবায়ন করবার কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। কর্মস্থল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জেন্ডার-সংবেদনশীল চাকুরিবিধি, আচরণবিধি বা কোড অব কন্ডাক্ট প্রণয়ন করতে হবে, যাতে এসব প্রতিষ্ঠান থেকেই অপরাধীর শাস্তির ব্যবস্থা করা যায়।
  • শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের মধ্যে জরিপ পরিচালনা করে শিক্ষার্থীদের সাথে আপত্তিকর আচরণকারী শিক্ষক-কর্মচারীদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
  • বিশ্ববিদ্যালয়সহ সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি দপ্তর ও নির্দিষ্ট সংখ্যক নারীকর্মী সম্বলিত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত নারীকর্মীদের পারিবারিক নির্যাতনসহ যেকোনো ধরনের হয়রানি, নিপীড়নমূলক সংঘটিত ও সম্ভাব্য ঘটনায় তাদেরকে সহায়তা ও পরামর্শ দেবার মতো প্রাতিষ্ঠানিক পেশাদারি ব্যবস্থা সারাদেশেই প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
  • দেশে প্রচলিত নারী নির্যাতনবিরোধী আইনসমূহ কেন কার্যকর করা যাচ্ছে না তার কারণ চিহ্নিত করার জন্য মনিটরিং করা ও সে অনুযায়ী আইনগুলো কার্যকর করার জন্য বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
  • স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক ও শিক্ষা প্রশাসন এবং বিচারব্যবস্থাকে নারীসংবেদী করে গড়ে তুলতে প্রশিক্ষণের আয়োজন করে সংবিধানোক্ত নারী অধিকার, নারী-পুরুষ সমতা, নারী নির্যাতনবিরোধী আইন ও আন্তর্জাতিক সনদ সম্পর্কে প্রায়োগিক ধারণা দেওয়া ও প্রয়োগে ব্যর্থ হলে তাদের বিচারের আওতায় আনার ব্যবস্থা করতে হবে।
  • সকল নারী নির্যাতন ঘটনার শিকার ও তাদের প্রত্যেকের পরিবারের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
  • নিপীড়নের শিকার নারী ও তার পরিবারের জন্য মনস্তাত্ত্বিক সহায়তা পরিষেবার ব্যবস্থা চালু করতে হবে।
  • নারীর প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির প্রসার ঘটায় এমন ধরনের নাটক-গান-বিজ্ঞাপন-বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান প্রচার থেকে গণমাধ্যমকে (রেডিও-টিভি-সংবাদপত্র) বিরত রাখতে কার্যকর সম্প্রচার নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে।
  • সরকারি-বেসরকারি মালিকানাধীন সকল রেডিও-টিভি চ্যানেল ও সংবাদপত্রের জন্য নারী নির্যাতন প্রতিরোধের লক্ষ্যে নির্দিষ্ট পরিমাণ জনসচেতনতামূলক (নারী-পুরুষ সমতা সম্পর্কিত সাংবিধানিক ধারা, নারী নির্যাতন প্রতিরোধের উপায়, প্রচলিত আইন, আইনে কথিত শাস্তি ইত্যাদি) সরকারি ও বেসরকারি বিজ্ঞাপন বিনা খরচে প্রচার করা বাধ্যতামূলক করতে হবে। আইনি বাধ্যবাধকতা ছাড়াও সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে এ বিষয়ে সহযোগিতা করার জন্য আমরা সংবাদমাধ্যকে স্বতঃপ্রণোদিতভাবে এগিয়ে আসার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করছি।
  • নারী নির্যাতনের সকল ঘটনাকে শহর-গ্রাম-ধনী-গরিব-পেশা ও সামাজিক অবস্থা নির্বিশেষে সমভাবে, সমগুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে।
বন্ধুরা,
আমরা মনে করি, নারী নির্যাতন প্রতিরোধে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে আমরা সবাই ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারি। নারীর প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির ইতিবাচক পরিবর্তন আনার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে এক্ষেত্রে। নারীর ওপর নির্যাতন আসলে চূড়ান্ত বিচারে আমাদের সবার ওপর নির্যাতন। এ অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে দরকার সনাতনী ‘সামাজিক সম্মান’, ‘পারিবারিক মর্যাদা’, ‘দুর্নাম’ ইত্যাদি চিন্তার বাইরে বেরিয়ে নির্যাতন প্রতিরোধে সরব হওয়া, এর প্রতিবাদে মুখ খোলা, সংগঠিত হওয়া এবং অবিলম্বে সরকারি ব্যবস্থাদি ও নিকটজনের সহায়তা চাওয়া। নারীর উপর নিপীড়ন প্রতিরোধে পর্যাপ্ত রাষ্ট্রীয় সহায়তার অভাব এবং নাগরিকদের নিষ্ক্রিয়তা নির্যাতক-নিপীড়কদের বল্গাহীন বেড়ে ওঠাকে উৎসাহিত করে।

শিক্ষার্থী ও নারীর উপর নিপীড়নকারীদের প্রতিহত করার প্রধানতম দায়িত্ব সরকারের। আমরা আশা করি সরকার কার্যকর ব্যবস্থাদি নিশ্চিত করে সর্বস্তরের মানুষকে সকল ধরনের নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলে সরকারি ব্যবস্থাকে স্থায়িত্ব প্রদানের সহায়ক শক্তিতে পরিণত করার ইতিবাচক পরিবেশ রচনা করবে। সাধারণ নাগরিক এবং সরকারের মিলিত শক্তিই কেবল পারে নারীর জন্য একটি গণতান্ত্রিক ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে। নারীর জন্য সেই পরিবেশই আমাদের কাম্য।

আপনাদের সবাইকে ধন্যবাদ।

নারীসমাজের পক্ষে

রোকেয়া কবীর
নির্বাহী পরিচালক
বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘ

এই ইভেন্টের ফটো অ্যালবাম ফেসবুকে

Thursday, 23 June 2011

জাতীয় বাজেট ২০১১-১২ : নারীনীতি বাস্তবায়নের অঙ্গীকারের প্রতিফলন নেই

-->
সরকার এ বছর জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি ঘোষণা করেছেঅথচ তার পরবর্তি বাজেটেই নারী বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ (১,২৩৭ কোটি টাকা) গতবারের তুলনায ৪ কোটি টাকা কমে গেছেনারী নীতি বাস্তবায়নের জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট দিক-নির্দেশনাও বর্তমান বর্তমান বাজেটে নেইনারী বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দকৃত খাতসমূহ বিশ্লেষণ করে দেখা যায় যে বরাবরের মত এবারেও নারীকে কল্যাণ-ভিত্তিক অ্যাপ্রোচ থেকে দেখা হচ্ছেযা নারী উন্নয়ন নীতির মূল দৃষ্টিভঙ্গির সাথে খাপ খায় না। 

একই সাথে বরাদ্দের হিসাবের পাশাপাশি উল্লিখিত বরাদ্দ নারী উন্নয়নে কীভাবে কাজ করছে তার বিশ্লেষণও জরুরিনারীর প্রকৃত ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে হলে শুধুমাত্র প্রকল্পভিত্তিক আর্থিক সুবিধা সংক্রান্ত কর্মসূচিই যথেষ্ট নয়শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর অংশগ্রহণসহ ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনের সব স্তরে নারীর সমমর্যাদা ও অবস্থান নিশ্চিত করতে নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক সব আচার, প্রথা, আইন ও নীতিমালার পরিবর্তন ও সংশোধনে আইনী, প্রশাসনিক ও সামাজিক বিভিন্ন উদ্যোগের সমন্বয় প্রয়োজনসে লক্ষ্যে নারী উন্নয়নে গৃহীত কর্মসূচি নারীর প্রকৃত ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করছে কিনা তার মূল্যায়নপূর্বক গৃহীত বিভিন্ন কর্মসূচির প্রয়োজনীয় পুনর্বিন্যাস করে সঠিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। 

জেন্ডার-বিভাজিত তথ্যউপাত্ত

রাষ্ট্রীয় নীতিসমূহের বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা প্রণয়ন, নীতিসমূহের সুষম বাস্তবায়ন ও সুযোগসুবিধা বণ্টনে বৈষম্য নিরোধের জন্য সকল মন্ত্রণালয়ের জেন্ডার-বিভাজিত তথ্যউপাত্ত প্রস্তুত করবার উদ্যোগ নেওয়া দরকার২০১০-১১ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় মাননীয় অর্থমন্ত্রী জাতীয় সংসদে ১০টি মন্ত্রণালয়ের জেন্ডার বিভাজিত উপাত্ত উপস্থাপন করেছিলেনযা ২০১১-১২ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় ২০টি মন্ত্রণালয়ে উন্নীত হয়েছে। 

শিক্ষা

২০১১-১২ অর্থবছরে শিক্ষা ও প্রযুক্তিখাতে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ২০,৩৩৯ কোটি টাকা যা মোট বাজেটের ১২.৪% এবং মোট জিডিপির ২.২৬%  শিক্ষাক্ষেত্রে এই বাজেট গত বছরের মোট বাজেট বরাদ্দের হার বিবেচনায় ১.৫% কম
গত কয়েক বছর ধরে প্রাথমিক স্তরে নারীর জন্য বাজেটে বরাদ্দ থাকার ফলে ছেলে ও মেয়ে শিক্ষার্থীর মধ্যে সংখ্যাগত বৈষম্য দূর হয়েছেযার ফলে প্রাথমিক শিক্ষাস্তরে এমডিজির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনেও বাংলাদেশ সফল হয়েছে নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যেইকিন্তু ঝরে পড়ার হার এখনো অগ্রহণযোগ্য পর্যায়ে থেকে যাওয়ায় মাধ্যমিক ও উচ্চতর শিক্ষায় এখনো ব্যাপক জেন্ডার বৈষম্য রয়েছেগত ১০ বছরে এই বৈষম্য কমেছে অতি সামান্যইমেয়েদের জন্য উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত শিক্ষাগ্রহণ অবৈতনিক করে ও শিক্ষা উপবৃত্তি বাড়িয়েও এই বৈষম্য কমানো যাচ্ছেনাবাল্যবিবাহ ও যৌণ হয়রানী এর পেছনে অন্যতম প্রধান কারণতাই মেয়েদের শিক্ষার হার বাড়াতে হলে এই সামাজিক সমস্যাগুলো দূর করার প্রতি গুরুত্ব বাড়াতেই হবে

প্রস্তাবিত বাজেট বক্তৃতায় মাদ্রাসা শিক্ষার আধুনিকায়নের জন্য ৩০টি মডেল মাদ্রাসা গড়ে তোলা ও ৩১টি মাদ্রাসায় অনার্স কোর্স চালু করার যে উদ্যোগ গ্রহণ করার কথা বলা হয়েছে তা শিক্ষানীতি অনুযায়ী এক ও অভিন্ন পাঠ্যসূচি ও পাঠ্যক্রম নির্ভর অসাম্প্রদায়িক চেতনামুখি জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এর সাথে সাংঘর্ষিক আর ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক চেতনা বরাবরই নারীর বিরুদ্ধে যায়

স্বাস্থ্য, প্রজনন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা

আগামী ২০১১-১২ অর্থবছরে স্বাস্থ্যখাতে মোট বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ৮ হাজার ৮৮৬ কোটি টাকা যা মোট বাজেটের ৫.৪% এবং মোট জিডিপির মাত্র ০.৯৮% যেখানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, মাঝারি মানের স্বাস্থ্যসেবার জন্যও জিডিপির ৫% বরাদ্দ থাকা দরকারগত ২০১০-১১ অর্থবছরে স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ ছিল মোট বাজেটের ৬.২% কিন্তু এবার দেয়া হয়েছে মোট বাজেটের মাত্র ৫.৪% বরাদ্দ যেখানে শুধুমাত্র প্রজনন স্বাস্থ্য নিশ্চিত করার জন্যই প্রতিবছর ৯% বাজেট বরাদ্দ প্রয়োজনঅর্থমন্ত্রী ঘোষিত বাজেট বক্তৃতায় স্বাস্থ্যসেবায় ইতিবাচক কর্মসূচি হিসেবে চলতি বাজেটে জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে ৯৭টি মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র, ইউনিয়ন পর্যায়ে ৩ হাজার ৯০০টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র এবং ৩০ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে মা, শিশু ও প্রজনন স্বাস্থ্য এবং পরিবার-পরিকল্পনা সেবার পরিধি সম্প্রসারণ করার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। 

মাতৃস্বাস্থ্য উন্নয়নে এমডিজির লক্ষ্য অর্জন করতে হলে সুবিধাবঞ্চিত ও দুর্গম অঞ্চলে যথাযথভাবে মাতৃস্বাস্থ্য ও প্রসূতি সেবা পৌছানো নিশ্চিত করা দরকারএছাড়াও সরকারি-বেসরকারি যৌথ উদ্যোগে ধাত্রী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাটি নতুনভাবে চালু ও আধুনিকীকরণ করা এবং ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ের সকল হাসপাতালে জরুরি ধাত্রীসেবা কার্যক্রম চালু করা অপরিহার্যনারীর সার্বিক স্বাস্থ্য নিশ্চিত করার জন্য প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে নারী ডাক্তারের সেবা নিশ্চিত করা ও নারীর পেশাগত স্বাস্থ্য ঝুঁকিসংক্রান্ত সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন

নারী উন্নয়ন নীতিতে নারীর ক্ষমতায়নের যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, সেখানে পৌঁছতে হলে নারীর প্রজনন কর্মভার কমিয়ে এনে সামাজিক ও উপার্জনমূলক কর্মকাণ্ডে তাদের কার্যকর অংশগ্রহণের লক্ষ্যে স্বাবলম্বী নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নিতে হবেএজন্য জরুরিভিত্তিতে জন্মনিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম জোরদার করবার ব্যবস্থা নিতে হবেপরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম পরিচালিত হয় সরকারের স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও জনসংখ্যা কার্যক্রমএর মাধ্যমেএই কার্যক্রমের আগামী ২০১১-১৬ মেয়াদের জন্য ২৩ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের কথা বলা হয়েছেযা বর্তমান মেয়াদের (২০০৫-১০) বাজেট থেকে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা কমআমরা মনে করি, জনবিস্ফোরণের সংকটকে কার্যকরভাবে মোকাবেলা করার জন্য নারীকে শিক্ষায়, কর্মদক্ষতায় ও অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয়ে ওঠবার সুযোগ বাড়াতে হবে। 

নারী কৃষিশ্রমিকদের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিতকরণে পদক্ষেপ গ্রহণ 

নারীর শ্রমকে দৃশ্যমান করার নীতি গ্রহণ নারীনীতি ২০১১র একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপএকাধিক ধারায় এই নীতির প্রতিফলন ঘটেছেযেমন, ২৩.৯ ধারায় বর্ণনা করা হয়েছে জাতীয় অর্থনীতিতে নারীর অবদান প্রতিফলনের জন্য বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোসহ সকল প্রতিষ্ঠানে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা২৩.১০ ধারায় বলা হয়েছে, সরকারের জাতীয় হিসাবসমূহে, জাতীয় উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে কৃষি ও গার্হস্থ্য শ্রমসহ সকল নারীশ্রমের সঠিক প্রতিফলন ও মূল্যায়ন নিশ্চিত করাপ্রাতিষ্ঠানিকভাবে নারীর শ্রম স্বীকৃত হলে কৃষি উপকরণ, বীজ, সার, কৃষক কার্ড, ঋণ সুবিধা প্রদানের ক্ষেত্রে নারী কৃষিশ্রমিকদের সমান সুযোগ নিশ্চিত করাও সম্ভব হবেএক্ষেত্রে লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য কৃষিক্ষেত্রে গৃহীত প্রকল্পগুলোতে নারীর জন্য কোটা রাখা, কৃষি উপকরণ প্রদানের জন্য কেবল নারীর জন্য প্রকল্প গ্রহণ করা ও কৃষিঋণ প্রদানের জন্য পৃথকভাবে নারীর জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন যারা কোনো প্রতিফলন পেশকৃত বাজেটে নেই। 

নারীউদ্যোক্তা বিকাশ

শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধিতে গত তিন দশকে নানা বাজেটীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে, যার প্রায় প্রতিটি পদক্ষেপই ছিল ক্ষুদ্রঋণভিত্তিককিন্তু ক্ষুদ্রঋণভিত্তিক কর্মের লাভজনকতা ও প্রসারের সম্ভাবনা খুব কম হওয়ায় গত কয়েক বছরে আর কর্মসম্ভাবনা বৃদ্ধি পায় নিতবে গত কয়েক দশকে ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে যে নারীউদ্যোক্তা গোষ্ঠীটি গড়ে উঠেছে, সহায়তা পেলে তারা মধ্যম বা বৃহ উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে উঠতে পারবে

সম্পদে নারীর সীমিত প্রবেশই নারীউদ্যোক্তাদের বিকাশের জন্য সবচাইতে বড়ো প্রতিবন্ধকতাসম্পদে নারীর প্রবেশ বৃদ্ধি এবং সহজ করার জন্য বাজেটে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করার কথা আমরা বলে আসছিযেমন নারীউদ্যোক্তাদের জামানতবিহীন ঋণ প্রদানে উসাহিত করার জন্য বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়াকিন্তু এবারের বাজেটেও তার প্রতিফলন হলোনানারী উদ্যোক্তাদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্যও কোনো বরাদ্দ নেই। 

নারীর দিকে সরাসরিভাবে সম্পদপ্রবাহ বৃদ্ধি করার জন্য নারীদের প্রতি কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করার দাবিও আমরা জানিয়ে আসছিযেমন নারীর উপার্জন, সম্পত্তি এবং পুঁজির ওপর কর মওকুফ করা; স্বামী-স্ত্রী উভয়ের নামে বাড়ি নথিভুক্তকরণ ও উভয়ের নামে সম্পত্তি কর প্রদান করার নিয়ম করা; নারীকে যে সম্পত্তি উপহার হিসেবে দেওয়া হয়, সে সম্পত্তি থেকে গিফট ট্যাক্স মওকুফ করা; নারীর মালিকানা ও পরিচালনাধীন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিভিন্ন ট্যাক্স ব্রেক অথবা ট্যাক্স হলিডে সুবিধা দেওয়া ও নারীউদ্যোক্তারা যাতে সহজেই গ্যাস, বিদ্যু ও টেলিফোন সংযোগ পেতে পারেন, সেজন্য রাজস্ব বাজেটে কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়াএর কোনোটিরই প্রতিফলন আমরা বাজেটে পাইনি। 

সামাজিক নিরাপত্তা

বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বিধবা ও স্বামী পরিত্যক্তা নারীর জন্য দুঃস্থ ভাতাকার্যক্রমের শিরোনাম থেকে পরিত্যক্তা শব্দটি বাদ দেয়ার কথা আমরা বলছিআমাদের কর্ম অভিজ্ঞতা থেকে আমরা জানি যে বিধাব নারীরা দুঃস্থ্ হিসেবে করুণা চাযনাতারা চায় কাজের মাধ্যমে মর্যাদাপূর্ণ জীবনতাই ভাতা না দিয়ে তাদের জন্য কর্মসৃজন প্রকল্প রাখা যেতে পারে। 

বাজেটে মাতৃত্বকালীন ভাতার সুবিধাভোগীর সংখ্যা ৮০ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৯২ হাজার করার কথা বলা হয়েছেঅথচ তার জন্য বরাদ্দ গতবারের ৬৬.৪ কোটি টাকা থেকে কমিয়ে ৪২.৫ কোটি টাকা রাখা হয়েছেএতে ভাতার পরিমাণ অনেক কমে যাবে
--------------
জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি বাস্তবাযন করার প্রধান মাধ্যম হবে জাতীয বাজেটএজন্য প্রথম প্রয়োজন হলো বাজেটে নারীর জন্য বরাদ্দের গতানুগতিক পদ্ধতি ও মানসিকতার উত্তরণ ঘটানোতাই জাতীয় বাজেটে নারী নীতির বাস্তব প্রতিফলনের জন্য আমরা জোর দাবি জানাই। 

আমরা মনে করি, জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি ২০১১ বাস্তবায়নে সরকারকে অবিলম্বে সুনির্দিষ্ট সময়ভিত্তিক আশু, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ-প্রক্রিয়া শুরু করা দরকারকালবিলম্ব না করে সময়সীমা, বাস্তবায়নকারী সংস্থা/বিভাগ, বাজেট ইত্যাদি উল্লেখপূর্বক যথাসম্ভব দ্রুত বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবেতাছাড়া ঘোষিত নারীনীতি বাস্তবায়নের জন্য এর সঙ্গে যুক্ত সরকারের সকল পর্যায়ের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাকে আরো শক্তিশালী করা ছাড়াও মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে অবিলম্বে পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রণালয় হিসেবে গড়ে তোলা প্রয়োজনএ মন্ত্রণালয়ের আওতায় উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত প্রয়োজনীয় সংখ্যক নারীসহায়ক দক্ষ লোকবল নিয়োগ দেওয়ার ব্যবস্থা করা দরকার, যাঁরা নারীনীতির টার্গেট অনুযায়ী কাজ করবেনপাশাপাশি গৃহীত কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক ম্যাকানিজম পূর্ণাঙ্গভাবে প্রতিষ্ঠা করা, তার দক্ষতা ও ক্ষমতার আওতা বাড়ানো দরকারনারীনীতি বাস্তবায়নের সাথে যুক্তদের জেন্ডার সংবেদনশীলতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও করা দরকার

ফয়সাল বিন মজিদ
সমন্বয়কারী, বিএনপিএস


Wednesday, 15 June 2011

বিএনপিএস আয়োজিত নারী নির্যাতনবিরোধী মানববন্ধনের অবস্থানপত্র


পারিবারিক নির্যাতনসহ সকল প্রকার নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হোন 
নির্যাতকদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলুন

জাতীয় প্রেসক্লাব। ১৬ জুন ২০১১

আজ আমরা ভীষণভাবে ক্ষুব্ধ! নারীর প্রতি পারিবারিক নির্যাতন আর সহিংসতার ক্রমবর্ধমান ঘটনায় আজ আমরা তীব্র ঘৃণা ও ক্ষোভ প্রকাশের জন্যে রাজপথে নেমে এসেছি। আজ এখানে আমরা বিচারের দাবি নিয়ে হাজির হয়েছি। নারীর ওপর পারিবারিক নির্যাতনসহ সকল প্রকার সহিংসতার বিরুদ্ধে আমাদের প্রতিবাদ জানাতে এবং সর্বস্তরের মানুষকে এসব বর্বরতা প্রতিরোধে সাহসী, সংঘবদ্ধ আর সোচ্চার হবার আহ্বান জানাতে জমায়েত হয়েছি।
 

গত ৫ জুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রুমানা মনজুরকে তাঁর বর্বর স্বামী হাসান সাইদ সুমন যে অবর্ণনীয় নৃংশসভাবে শারীরিক নিপীড়ন করেছে, সে সংবাদ আমাদের সবার জানা আছে। আমরা অনুমান করি, আমাদের মতো পুরো দেশই আজ সে নিপীড়নের ঘটনায় হতবিহ্বল এবং ক্ষুব্ধ। আমাদের মতোই নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সমগ্র দেশবাসী রুমানা মনজুরের দৃষ্টিশক্তি ফিরে আসাসহ সার্বিক আরোগ্য কামনার পাশাপাশি এই বর্বরতার বিচার দাবি করছে।

আমরা অত্যন্ত আনন্দিত যে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গতকাল এই ঘৃণ্য অপরাধীকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে। এজন্য আমরা সংশ্লিষ্ট বাহিনী এবং সরকারকে অভিনন্দন জানাচ্ছি। আমরা আশা করি, অবিলম্বে এই ঘৃণ্য অপরাধীর বিচার শুরু হবে। কোনো ধরনের রাজনৈতিক-সামাজিক প্রভাব ছাড়া এই অপরাধীকে উপযুক্ত শাস্তি প্রদান করে দেশের জনসংখ্যার অর্ধেক নারীর জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার ব্যাপারে সরকার তার আন্তরিকতা প্রমাণ করবে।


আমাদের দাবি আজ শুধু রুমানা মনজুরকে কেন্দ্র করে নয়। কারণ, রুমানা মনজুরের ঘটনাটি বর্বর নৃশংসতায় অতুলনীয় এবং অবর্ণনীয় হলেও, আমাদের সমাজে নারীর ওপর এমন নির্যাতনের ঘটনা কোনো ব্যতিক্রম নয়। বরং, জানা ও অজানা, সংবাদমাধ্যম ও পুলিশের কাছে আসা ও না-আসা, প্রতিদিন ঘটে যাওয়া অসংখ্য ঘটনার মধ্যে এটি একটিমাত্র নেত্রীস্থানীয় ঘটনা। পরিবার, কর্মস্থল, বিদ্যাঙ্গন, রাস্তাঘাট সর্বত্র নারীর প্রতি নির্যাতন, নিপীড়ন ও হয়রানির ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটে চলেছে। স্বামীর নির্যাতনে দৃষ্টিশক্তিহীন, ক্ষতবিক্ষত শরীরে অসহায় রুমানা মনজুর যখন হাসপাতালে নিরাপত্তাহীন দিনযাপন করছিলেন; তখনই গত ১৩ মে মতিঝিলে এক স্বামী পিটিয়ে তার স্ত্রীকে হত্যা করেছেন। একই দিনে, নারায়ণগঞ্জের বন্দর থানা এলাকায় দুর্বৃত্তরা সিঙ্গাপুর প্রত্যাগত একজন প্রবাসী নারীশ্রমিককে গণধর্ষণের পর তার শরীরে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। এগুলোও কোনো বিরল বা অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। নারী নিপীড়নের এমন ঘটনা সারা দেশে প্রতি মুহূর্তেই ঘটছে, যার প্রকৃত কোনো হিসেব হয়ত কারো জানা নেই। উৎকণ্ঠার বিষয় হলো, এসব ঘটনার সুষ্ঠু বিচার করার, শাস্তি দেবার দৃষ্টান্ত এবং প্রতিরোধ করার জন্য রাষ্ট্রীয়-সামাজিক পদক্ষেপ অত্যন্ত অকিঞ্চিৎকর।


গত মে মাসে ৯ জন নারী ও ১০ জন শিশু আত্মহত্যা করেছেন ও করতে বাধ্য হয়েছেন। নারীদের যৌন নির্যাতনের শিকার হবার ৭৪টি ঘটনা শুধু সংবাদপত্রেই এসেছে। বিভিন্ন স্থানে তিনজন তরুণী আত্মহত্যা করেছেন যৌন হয়রানিতে অতিষ্ঠ হয়ে। একই সময়ে সারা দেশ থেকে ৩৫ জনের ধর্ষিত হবার সংবাদ পাওয়া গেছে, যার মধ্যে ২৪ জন শিশু রয়েছে। গণধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ১২টি এবং ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৫ জনকে। এসব নারী ও শিশু নির্যাতনের ভয়াবহতার আংশিক চিত্র মাত্র, যা কেবল সংবাদমাধ্যম বা পুলিশের হিসেবে এসেছে। আমরা জানি, সামগ্রিক অবস্থা এর চেয়ে অনেক বেশি ভয়াবহ।


আমরা নারী-পুরুষ সকলের জন্যই এই ভয়্কংর অমানবিক পরিস্থিতি থেকে মুক্তি চাই। নারীর প্রতি সহিংসতা, নির্যাতন, নিপীড়ন, যৌন হয়রানি, ধর্ষণ, অ্যাসিড নিক্ষেপ, মৌখিক হয়রানি, মানসিক নির্যাতন চূড়ান্ত বিচারে সমাজের সকল নারী-পুরুষ-শিশুকে সমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এ অবস্থা কোনো সুস্থ সমাজের জন্য কাম্য নয়। আমরা দৃঢ়ভাবে এমন অবস্থার অবসান চাই। এই অনাকাক্সিক্ষত অবস্থার পরিবর্তনের জন্য আমরা নিচের দাবি ও আহ্বান সবার সামনে তুলে ধরছি :

  • অধ্যাপক রুমানা মনজুরের নিপীড়ক বর্বর স্বামীকে অবিলম্বে বিচার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। এছাড়া, এই অপরাধীকে সহায়তাদানকারীদেরও বিচারের আওতায় এনে ‘অপরাধীর সহায়কদেরও সহ্য না-করা’র দৃষ্টিভঙ্গির দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে।
  • অধ্যাপক রুমানা মনজুরের কন্যাসহ তাঁর পুরো পরিবারের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
  • বিশ্ববিদ্যালয়সহ সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরকারি দফতর ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত নারীকর্মীদের পারিবারিক নির্যাতনসহ যেকোনো ধরনের হয়রানি, নিপীড়নমূলক প্রকৃত বা সম্ভাব্য ঘটনায় তাদেরকে সহায়তা ও পরামর্শ দেবার মতো প্রাতিষ্ঠানিক পেশাদারি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
  • আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীবাহিনীসহ বিচারব্যবস্থাকে সত্যিকার অর্থে নারীসংবেদী করে গড়ে তুলতে হবে।
  • আক্রান্ত নারী ও শিশুদের সুরক্ষা প্রদান নিশ্চিত করতে সরকারিভাবে হয়রানিবিহীন আইনি সহায়তা দেবার জন্য পর্যাপ্ত সরকারি তহবিল বরাদ্দ করতে হবে।
  • নারী নির্যাতন প্রতিরোধে আইনি উদ্যোগ ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম হাতে নেবার জন্য দেশে প্রতিষ্ঠিত আইনি সহায়তাদানকারী সংস্থা ও নারী সংগঠনগুলোকে সরকারি কোষাগার থেকে আর্থিক সহায়তা দেবার ব্যবস্থা করতে হবে।
  • নিপীড়নের শিকার ও তার পরিবারের জন্য মনস্তাস্তি¡ক সহায়তা পরিষেবার ব্যবস্থা চালু করতে হবে।
  • নারীর প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির প্রসার ঘটায় এমন ধরনের নাটক-গান-বিজ্ঞাপন-বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান প্রচার থেকে গণমাধ্যমকে (রেডিও-টিভি-সংবাদপত্র) বিরত রাখতে কঠোর সম্প্রচার নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে।
  • সরকারি-বেসরকারি মালিকানাধীন সকল রেডিও-টিভি চ্যানেল ও সংবাদপত্রের জন্য নারী নির্যাতন প্রতিরোধের লক্ষ্যে নির্দিষ্ট পরিমাণ জনসচেতনতামূলক সরকারি বা বেসরকারি বিজ্ঞাপন প্রচার করা বাধ্যতামূলক করতে হবে।
  • নারী নির্যাতনের সকল ঘটনাকে শহর-গ্রাম-ধনী-গরিব-পেশা ও সামাজিক অবস্থা নির্বিশেষে সমভাবে, সমগুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে।
সবশেষে, আমরা মনে করি যে, নারী নির্যাতন প্রতিরোধে আমরা সবাই ব্যক্তিগতভাবে, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারি। নারীর প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির ইতিবাচক পরিবর্তন আনার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে এক্ষেত্রে। নারীর ওপর নির্যাতন আসলে চূড়ান্ত বিচারে আমাদের সবার ওপর নির্যাতন। রুমানা মনজুরের ঘটনা এই সত্যকে আমাদের সামনে স্বচ্ছ করে তুলে ধরেছে। এই অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে দরকার সনাতনী ‘সম্মান’, ‘পারিবারিক মর্যাদা’, ‘দুর্নাম’ ইত্যাদি চিন্তার বাইরে বেরিয়ে নির্যাতন প্রতিরোধে সরব হওয়া, এর প্রতিবাদে মুখ খোলা, সংগঠিত হওয়া এবং অবিলম্বে নিকটজনের সহায়তা চাওয়া। আমাদের নীরবতা নির্যাতক-নিপীড়কদের বল্গাহীন বেড়ে ওঠাকে উৎসাহিত করে। আসুন, আমরা সবাই নীরবতার এই জালকে ছিন্ন করি। কেননা, এক্ষেত্রে সোচ্চার হওয়াই আমাদের অন্যতম রক্ষাকবচ।

Thursday, 26 May 2011

‘জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি ২০১১’ বাস্তবায়নে জাতীয় বাজেটে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ বিষয়ে বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘ-এর বক্তব্য

আগামী জুন মাসেই ২০১১-’১২ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট ঘোষিত হবে। সে বিবেচনা থেকে আমরা নারীসমাজের উন্নয়নে বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে বাজেটে বরাদ্দ নির্ধারণ এবং সরকার-ঘোষিত ‘জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি ২০১১’ বাস্তবায়নের দাবি বিষয়ে আমাদের বক্তব্য তুলে ধরছি।

গত ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবসে বর্তমান সরকার ১৯৯৭-এ প্রণীত নীতি কিছুটা পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করে প্রণীত ‘জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি ২০১১’ চূড়ান্তভাবে ঘোষণা করেছেন। ঘোষিত নারীনীতির প্রধান একটি দুর্বলতা হলো নারীকে উত্তরাধিকারে সমান অধিকার না দেওয়া। এ সত্ত্বেও আমরা মনে করি, ঘোষিত এই নীতিটির বাস্তবায়নই এখন সরকারের অন্যতম লক্ষ্য হওয়া উচিত, কারণ এমডিজি দলিলের জেন্ডার সমতা সম্পর্কিত লক্ষ্যসমূহের সাথেও এটি সঙ্গতিপূর্ণ। বাস্তবায়নের পাশাপাশি আমরা উত্তরাধিকারে সমতা প্রতিষ্ঠার দাবিও পুনর্ব্যক্ত করছি।

সকলের একমত হবেন যে, নারীনীতি বাস্তবায়নের জন্য দরকার হবে জাতীয় বাজেটে সুনির্দিষ্ট ও পর্যাপ্ত বরাদ্দ রাখা। নারীসমাজের সামগ্রিক উন্নয়ন এবং ঘোষিত নারীনীতি বাস্তবায়নে সরকারের কী কৌশল হওয়া উচিত এবং বাজেটে কোন কোন খাতে রাজস্ব ও উন্নয়ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি, সংক্ষেপে সেসব সুপারিশ আমরা তুলে ধরছি। 
সংবাদকর্মীদের প্রশ্নের জবাব দিচ্ছেন বিএনপিএস নির্বাহী পরিচালক রোকেয়া কবীর। তাঁর পাশে উপবিষ্ট কাজী মদিনা ও ওমর তারেক চৌধুরী (ডানে) এবং প্রতিমা পাল-মজুমদার ও সাফিনা লোহানি (বামে)
 ৫০ শতাংশ বঞ্চিতের প্রতি মনোযোগ

আমরা জানি, দেশের ৫০ শতাংশ জনগোষ্ঠীই নারী, যাদের সিংহভাগই সম্পদহীন, ক্ষমতাহীন এবং উপার্জনের সুযোগবঞ্চিত ও পরাধীন। নাগরিকদের এই অর্ধাংশকে পিছনে ফেলে রেখে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব নয়, সম্ভব নয় প্রকৃত গণতন্ত্রের চর্চাও। এজন্য জাতীয় বাজেটের অন্যতম লক্ষ্য হওয়া উচিত সম্পদ ও ক্ষমতাহীন উল্লিখিত ৫০ শতাংশ নারীর দিকে সম্পদপ্রবাহ বৃদ্ধি করা।

সুনির্দিষ্টভাবে আশু, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ

আমরা মনে করি, ‘জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি ২০১১’ বাস্তবায়নে সরকারের পক্ষ থেকে অবিলম্বে সুনির্দিষ্টভাবে আশু, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা দরকার। এজন্য কালবিলম্ব না করে সময়সীমা, বাস্তবায়নকারী সংস্থা/বিভাগ, বাজেট ইত্যাদি উল্লেখপূর্বক যথাসম্ভব দ্রুত বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। তাছাড়া ঘোষিত নারীনীতি বাস্তবায়নের জন্য এর সঙ্গে যুক্ত সরকারের সকল পর্যায়ের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাকে আরো শক্তিশালী করা ছাড়াও মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে অবিলম্বে পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রণালয় হিসেবে গড়ে তোলা প্রয়োজন। এ মন্ত্রণালয়ের আওতায় উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত প্রয়োজনীয় সংখ্যক নারীসহায়ক দক্ষ লোকবল নিয়োগ দেওয়ার ব্যবস্থা করা দরকার, যাঁরা নারীনীতির টার্গেট অনুযায়ী কাজ করবেন। পাশাপাশি গৃহীত কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক ম্যাকানিজম পূর্ণাঙ্গভাবে প্রতিষ্ঠা করা, তার দক্ষতা ও ক্ষমতার আওতাও বাড়ানো দরকার। নারীনীতি বাস্তবায়নের সাথে যুক্তদের জেন্ডার সংবেদনশীলতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করাও এক্ষেত্রে জরুরি।

জেন্ডার-বিভাজিত তথ্যউপাত্ত

রাষ্ট্রীয় নীতিসমূহের বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা প্রণয়ন, নীতিসমূহের সুষম বাস্তবায়ন ও সুযোগসুবিধা বণ্টনে বৈষম্য নিরোধের জন্য সকল মন্ত্রণালয়ের জেন্ডার-বিভাজিত তথ্যউপাত্ত প্রস্তুত করবার উদ্যোগ নেওয়া দরকার। আমরা জানি, ২০১০-’১১ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় মাননীয় অর্থমন্ত্রী জাতীয় সংসদে ১০টি মন্ত্রণালয়ের জেন্ডার বিভাজিত উপাত্ত উপস্থাপন করেছিলেন। এবার এই সংখ্যা আরো বাড়াবার জোর দাবি জানাচ্ছি।

জেন্ডার ফোকাল পয়েন্ট

বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের জেন্ডার ফোকাল পয়েন্টগুলোকে কার্যকর করা এবং প্রত্যেকটি মন্ত্রণালয়ের প্রতিটি প্রকল্পে নারীর জন্য সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ ও তা বাস্তবায়নের জন্য মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করবার উদ্যোগ নেওয়া দরকার।

এছাড়া নারীর জন্য সুনির্দিষ্টভাবে যে প্রকল্প বরাদ্দ দেওয়া হয় তার অধিকাংশেরই সদ্ব্যবহার হয় না। এসব কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের জন্য মনিটরিং ব্যবস্থা শক্তিশালী করা দরকার।

নারীর প্রজনন ভার লাঘবে ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ

নারী উন্নয়ন নীতিতে নারীর ক্ষমতায়নের যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, সেখানে পৌঁছতে হলে নারীর প্রজননভার কমিয়ে এনে সামাজিক ও উপার্জনমূলক কর্মকাণ্ডে তাদের কার্যকর অংশগ্রহণের লক্ষ্যে স্বাবলম্বী নাগরিক হিসেবে বিকাশে নারীর জন্য সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। এজন্য জরুরিভিত্তিতে নারীবান্ধব জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ও সেবা, স্বাস্থ্যসেবা এবং শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্রের মতো কার্যক্রম প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সর্বত্র যাতে মানসম্পন্ন ও নিরাপদ জন্মনিয়ন্ত্রণ সেবা সহজলভ্য হয় সে ব্যাপারেও কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের সময়ের মাত্র সাড়ে সাত কোটি জনগোষ্ঠী ৪০ বছরে ব্যবধানে দ্বিগুণেরও বেশিতে পরিণত হয়েছে। গত দশ বছরে জনসংখ্যার যে বৃদ্ধি ঘটেছে তার ৮৭ শতাংশই দরিদ্র। এর ফলে পরিবেশ, অর্থনীতি, কৃষিজমি, রাস্তাঘাট, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্য, পানীয় জল, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, সরকারি সুযোগসুবিধা প্রাপ্তিসহ সর্বক্ষেত্রেই প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। নারীর জন্য শিক্ষায়, কর্মদক্ষতায় ও অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয়ে ওঠবার সুযোগ সৃষ্টি করার মাধ্যমে জনবিস্ফোরণের সংকটকে কার্যকরভাবে মোকাবেলা করা যাবে।

সাধারণ স্বাস্থ্যসেবা এবং মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুর হার হ্রাসকরণ

এমডিজি দলিলে ২০১৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশে মাতৃমৃত্যুর হার প্রতি লক্ষে ১৪৪ জনে নামিয়ে আনবার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ এই লক্ষ্য অর্জনে অনেকটা পিছিয়ে আছে। ‘নারীনীতি ২০১১’ মাতৃমৃত্যু হার হ্রাসের ওপর যথাযথ গুরুত্ব দিয়েছে। ২০১৫’র মধ্যে মাতৃমৃত্যুর হার হ্রাসের লক্ষ্য অর্জন করতে হলে নারীনীতি ২০১১’র ৩৪.৩ উপধারাটি অতি জরুরি ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করতে হবে। এজন্য নিম্নোক্ত ক্ষেত্রে বাজেট বরাদ্দ রাখতে হবে :
  • কমিউনিটি ক্লিনিক ব্যবস্থার পুনরুদ্ধারের ঘোষণাটি অতি দ্রুত কার্যকর করার ব্যবস্থা নেয়া।
  • দরিদ্র প্রসূতি মায়েদের জন্য মাতৃস্বাস্থ্য ভাউচার স্কিমের আওতা বৃদ্ধি করা।
  • ধাত্রী প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালু করে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ধাত্রীর সংখ্যা বৃদ্ধি করা। সরকারি-বেসরকারি যৌথউদ্যোগে ধাত্রী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাটি নতুনভাবে চালু ও আধুনিকীকরণ করা এবং ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ের সকল হাসপাতালে জরুরি ধাত্রীসেবা কার্যক্রম চালু করা।
  • গ্রামে গ্রামে ভ্রাম্যমাণ ক্লিনিক ব্যবস্থা চালু করা।
  • নারীর জন্য সাধারণ, প্রজনন ও যৌনস্বাস্থ্য সেবা এবং নারীর শরীরের জন্য নিরাপদ জন্মনিয়ন্ত্রণ সেবা প্রদানের জন্য সুনির্দিষ্ট প্রকল্প গ্রহণ করা। একই সাথে পুরুষদের উপযোগী জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী সহজলভ্য ও তা ব্যবহারের প্রসার ঘটানের ব্যবস্থা নেয়া।
  • সুবিধাবঞ্চিত অঞ্চলে যথাযথভাবে মাতৃস্বাস্থ্য ও প্রসূতি সেবা এবং মানম্পন্ন জন্মনিয়ন্ত্রণ সেবা পৌঁছানোর জন্য জেন্ডার পোভার্টি ম্যাপিংয়ের উদ্যোগ নেওয়া।
  • প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে নারী ডাক্তারের সেবা নিশ্চিত করতে তাঁদের বেতন বৃদ্ধি, বাসস্থান এবং চলাফেরার নিরাপত্তা বিধান করা।
  • নারীর পেশাগত স্বাস্থ্য ঝুঁকিসংক্রান্ত সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া।
কর্মসংস্থান ও কর্মস্থলে সমসুযোগ, অংশীদারিত্ব, সমমজুরি এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা

এই বিষয়গুলো এমডিজিরও অন্তর্ভুক্ত। কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজন নারীর দক্ষতা বৃদ্ধি। দক্ষতা এবং সক্ষমতা না থাকলে শ্রমবাজারে সুযোগ দিলেও নারীরা তা গ্রহণ করতে পারবেন না। দক্ষতা এবং সক্ষমতার প্রশ্নে সরকারি চাকুরির ১৫ শতাংশ পদ, যা নারীর জন্য কোটা করে দেওয়া হয়েছিল তা এখনো পূরণ হয় নি। তাই নারীনীতি ২০১১-এর উল্লিখিত ধারাগুলো কার্যকর করার জন্য বাজেটে নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করতে হবে :
  • নারীকে উচ্চ প্রযুক্তির প্রশিক্ষণ প্রদানের জন্য উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা এবং বেসরকারি খাতকে এই ধরনের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনে প্রণোদিত করা। গ্রামাঞ্চলেও এসব সুযোগ প্রসারিত করা।
  • মধ্যপ্রাচ্য ছাড়াও অন্যান্য দেশে নারীকর্মীর যে চাহিদা রয়েছে সে চাহিদা পূরণ করতে অদক্ষ নারীদের প্রেরণ না করে ধাত্রী, নার্স ও অন্যান্য ক্ষেত্রের দক্ষকর্মী প্রেরণের ব্যবস্থা নেওয়া এবং বিদেশে নারীকর্মীদের নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষায় সংশ্লিষ্ট দূতাবাসসমূহে নারীসংবেদী জনবল বৃদ্ধি করা ও কনস্যুলার সার্ভিসকে শক্তিশালী করা।
  • দেশি ও বিদেশি কর্মক্ষেত্রে সুফল দেয়, এমন বিভিন্ন ভাষা শিক্ষার জন্য নারীদের জন্য জেলা পর্যায় পর্যন্ত ভাষা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা। 
  • ‘১০০ দিনের নিশ্চিত কর্মসূচি’র আদলে ‘১০০ দিনের নিশ্চিত প্রশিক্ষণ কর্মসূচি’ গ্রহণ করা। 
  • নারীদের মধ্যে যারা অতিশয় দরিদ্র, তাদের জন্য সেফটি নেট কর্মসূচিগুলোর পরিমাণ ও আওতা বৃদ্ধি করা এবং সকল বার্ধক্যপীড়িত নারীর জন্য বিমার ব্যবস্থা করা দরকার, যাতে সন্তান বা অন্য কারো ওপর তাঁদের নির্ভরশীল থাকতে না হয়।
নারীকর্মীদের জন্য যাতায়াত ব্যবস্থা, বাসস্থান, বিশ্রামাগার, পৃথক টয়লেট স্থাপনসহ বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ

কর্মস্থলের সাথে প্রত্যক্ষভাবে সম্পর্কিত কতগুলো মৌলিক ও অবকাঠামোগত অসুবিধা দূর করা না গেলে কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি সম্ভব হবে না। এসব সমস্যা দূরীকরণে আগামী বাজেটে নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করতে হবে :

  • প্রতিটি কর্মক্ষেত্রে শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র স্থাপনের জন্য প্রকল্প গ্রহণ করা।
  • কর্মক্ষেত্রে যাতায়াতকালে নারী কর্মজীবীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগে থাকেন। তাঁদের নিরাপত্তা বিধানে প্রশাসনকে শক্তিশালী ও কার্যকর করতে উদ্যোগ গ্রহণ করা।
  • পরিবহণ সুবিধা প্রদানের জন্য বিআরটিসি কর্তৃক সরবরাহকৃত বাসে নারী কর্মজীবীদের জন্য হ্রাসকৃত মূল্যে টিকেটের ব্যবস্থা করা।
  • নারী কর্মজীবীদের অগ্রাধিকারভিত্তিতে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের জন্য সরকারি উদ্যোগে বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্র স্থাপন করা।
  • নারীর উপস্থিতি বেশি এরকম কর্মস্থলে নারী কর্মজীবীদের জন্য পৃথক টয়লেটের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে উদ্যোগ গ্রহণ করা।
নারীদের জন্য শিক্ষা ও শিক্ষাক্ষেত্রে নারী-পুরুষ বৈষম্য দূর করা

গত কয়েক বছর ধরে প্রাথমিক স্তরে নারীর জন্য বাজেটে বরাদ্দ থাকার ফলে ছেলে ও মেয়ে শিক্ষার্থীর মধ্যে সংখ্যাগত বৈষম্য দূর হয়েছে। যার ফলে প্রাথমিক শিক্ষাস্তরে এমডিজির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনেও বাংলাদেশ সফল হয়েছে নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যেই। কিন্তু ঝরে পড়ার হার এখনো অগ্রহণযোগ্য পর্যায়ে থেকে যাওয়ায় মাধ্যমিক ও উচ্চতর শিক্ষায় এখনো ব্যাপক জেন্ডার বৈষম্য রয়েছে। গত ১০ বছরে এই বৈষম্য কমেছে অতি সামান্যই। তাই এমডিজির লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ২০১৫ সালের মধ্যে উচ্চতর শিক্ষাস্তরে জেন্ডার সমতা অর্জন করার জন্য নারীনীতির ২১.১ উপধারাটি বাস্তবায়নের জন্য আসন্ন বাজেটে নিম্নোক্ত খাতে বরাদ্দ রাখতে হবে :
  • উচ্চতর শিক্ষা নারীর জন্য অবৈতনিক করা। স্নাতক পর্যন্ত শিক্ষা অবৈতনিক করার সরকারি ঘোষণাটি দ্রুত কার্যকর করা।
  • শিক্ষার উচ্চস্তরে, বিশেষ করে কারিগরি ও প্রকৌশল শিক্ষায় নারীর প্রবেশের পথ সুগম করার জন্য বৃত্তি দেওয়ার ব্যবস্থা করা।
  • শিক্ষাব্যবস্থাকে জেন্ডার সংবেদনশীল করবার জন্য বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ।
  • উচ্চস্তরে শিক্ষারত নারীশিক্ষার্থীর জন্য নিরাপদ আবাসনের ব্যবস্থা করা।
  • কারিগরি শিক্ষায় নারীর প্রবেশ সুগম করতে সব জেলা এবং উপজেলা স্তরে পাবলিক-প্রাইভেট যৌথউদ্যোগে কেবল নারীদের জন্য কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা। 
  • তথ্যপ্রযুক্তি খাতে নারীর প্রবেশ সুগম করতে নারীর জন্য কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও ইংরেজি ভাষা শিক্ষা ইনস্টিটিউট স্থাপনকে উৎসাহিত করা।
  • কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় ও কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি, নারী নির্যাতন, পারিবারিক নির্যাতন ও পাচার রোধে যে আইনগুলো রয়েছে, সেগুলোর যথাযথ বাস্তবায়নে উদ্যোগ গ্রহণ করা।
নারী কৃষিশ্রমিকদের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিতকরণে পদক্ষেপ গ্রহণ

নারীর শ্রমকে দৃশ্যমান করার নীতি গ্রহণ নারীনীতি ২০১১’র একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। একাধিক ধারায় এই নীতির প্রতিফলন ঘটেছে। যেমন, ২৩.৯ ধারায় বর্ণনা করা হয়েছে জাতীয় অর্থনীতিতে নারীর অবদান প্রতিফলনের জন্য বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোসহ সকল প্রতিষ্ঠানে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা। ২৩.১০ ধারায় বলা হয়েছে, সরকারের জাতীয় হিসাবসমূহে, জাতীয় উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে কৃষি ও গার্হস্থ্য শ্রমসহ সকল নারীশ্রমের সঠিক প্রতিফলন ও মূল্যায়ন নিশ্চিত করা। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নারীর শ্রম স্বীকৃত হলে কৃষি উপকরণ, বীজ, সার, কৃষক কার্ড, ঋণ সুবিধা প্রদানের ক্ষেত্রে নারী কৃষিশ্রমিকদের সমান সুযোগ নিশ্চিত করাও সম্ভব হবে। এক্ষেত্রে লক্ষ্যে পৌঁছতে হলে আগামী বাজেটে নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করতে হবে :

  • কৃষিক্ষেত্রে গৃহীত প্রকল্পগুলোতে নারীর জন্য কোটা রাখা।
  • কৃষি উপকরণ, সার, বীজ, কৃষক কার্ড, ইত্যাদি প্রদানের জন্য নারীর জন্য পৃথক প্রকল্প গ্রহণ করা।
  • কৃষির যেসব ক্ষেত্রে নারী ৬০-৮০ শতাংশ শ্রম দান করে, সেসব ক্ষেত্রে গৃহীত বাজেটারি প্রণোদনার সিংহভাগ নারীর জন্য বরাদ্দ করা;
  • গার্হস্থ্য উদ্যান বিকাশের জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
  • কৃষিঋণ প্রদানের জন্য পৃথকভাবে নারীর জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
এই পদক্ষেপগুলো কার্যকর হলে কৃষিক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের মধ্যে সমতা আনয়নে অবদান রাখবে। আর এই অবদানের কারণে সর্বক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের মধ্যে সমতা আনার জন্য এমডিজির লক্ষ্যসমূহও অদূর ভবিষ্যতে অর্জিত হবে।

নারীউদ্যোক্তাদের বিকাশ নিশ্চিত করতে সহায়তা প্রদান

নারীনীতির এই ধারাটি এমডিজির লক্ষ্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এমডিজির লক্ষ্য ছিল ২০১৫ সালের মধ্যে অকৃষিখাতে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করা। শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধিতে গত তিন দশকে নানা বাজেটীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে, যার প্রায় প্রতিটি পদক্ষেপই ছিল ক্ষুদ্রঋণভিত্তিক। কিন্তু ক্ষুদ্রঋণভিত্তিক কর্মের লাভজনকতা ও প্রসারের সম্ভাবনা খুব কম হওয়ায় গত কয়েক বছরে আর কর্মসম্ভাবনা বৃদ্ধি পায় নি। তবে গত কয়েক দশকে ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে যে নারীউদ্যোক্তা গোষ্ঠীটি গড়ে উঠেছে, সহায়তা পেলে তারা মধ্যম বা বৃহৎ উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে উঠতে পারবে।

নারীউদ্যোক্তাদের বিকাশ হলে নারীর কর্মসংস্থান বৃদ্ধির সম্ভাবনাও তুলনামূলকভাবে বেশি হবার সম্ভাবনা আছে। নারীর কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করাও নারীনীতি ২০১১-র আরেকটি লক্ষ্য। অর্থাৎ নারীউদ্যোক্তাদের বিকাশ নিশ্চিত করা গেলে একের অধিক লক্ষ্য অর্জিত হবে। এজন্য আমরা নিম্নলিখিত বাজেটারি পদক্ষেপ গ্রহণের প্রস্তাব করছি।
  • সম্পদে নারীর সীমিত অভিগম্যতাই নারীউদ্যোক্তাদের বিকাশের জন্য সবচাইতে বড়ো প্রতিবন্ধকতা। সম্পদে নারীর অভিগম্যতা বৃদ্ধি এবং সহজ করার জন্য বাজেটে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। যেমন নারীউদ্যোক্তাদের জামানতবিহীন ঋণ প্রদানে উৎসাহিত করার জন্য বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া।
  • নারীর মালিকানা ও পরিচালনাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো যদি নারীবান্ধব সুবিধাদিসহ (টয়লেট, শিশু দিবাযত্ন ব্যবস্থা, যাতায়াত প্রভৃতি) একটি বিশেষ সংখ্যায় নারীকর্মী নিয়োগ দেয়, তবে সে প্রতিষ্ঠানকে নির্দিষ্টমাত্রায় কর রেয়াত দেওয়া।
  • নারী পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে যেগুলোতে শতভাগ কর্মী নারী, সেসব প্রতিষ্ঠানে ব্যবহৃত কাঁচামালের আমদানির ওপর শুল্ক রেয়াত দেওয়া। 
  • নারীউদ্যোক্তাদের দ্বারা উৎপাদিত পণ্য লাভজনকভাবে বাজারজাত করার সুযোগ সৃষ্টিতে নারীদের সমবায়ী উদ্যোগে স্থায়ী বিপণন ব্যবস্থা প্রবর্তন করার জন্য করউৎসাহ প্রদান করা।
  • প্রকৃত নারীউদ্যোক্তারা যাতে সহজেই গ্যাস, বিদ্যুৎ ও টেলিফোন সংযোগ পেতে পারেন, সেজন্য রাজস্ব বাজেটে কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়া। এক্ষেত্রে নারীকে ব্যবহার করে জালিয়াতি যাতে না হয় তেমন পদক্ষেপও রাখতে হবে।
  • সর্বোপরি, সর্বক্ষেত্রে নারীউদ্যোক্তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য প্রশাসন ক্ষেত্রে অতিরিক্ত রাজস্ব বরাদ্দ রাখা।
আমরা মনে করি, দ্রুত নারীনীতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে ২০১৫ সালের মধ্যে এমডিজির নারীবিষয়ক ক্ষেত্রগুলোতে সাফল্য অর্জনে আমাদের প্রস্তাবিত সুপারিশগুলো আগামী বাজেটে বিবেচনায় নেওয়া হলে বিশেষভাবে সুফলপ্রসূ হবে।

[গত ১৮ মে ২০১১ সাংবাদিক সম্মেলনে (ভিআইপি লাউঞ্জ, জাতীয় প্রেসক্লাব) নিম্নোক্ত বক্তব্য উপস্থাপন করা হয়]
সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠানের একটি দৃশ্য
সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠানের খবর

Monday, 9 May 2011

আতঙ্কিত প্রতিক্রিয়াশীলরা নারীর প্রতি সহিংস আচরণ করছে : রোকেয়া কবীর


গত তিন দশক ধরে ক্রমাগতভাবে তৃণমূল পর্যায়ের নারীরা ঘরের বাইরে এসে অর্থনৈতিকসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে যুক্ত হচ্ছেনতারা ইউনিয়ন পরিষদসহ তৃণমূল পর্যায়ের বিভিন্ন নেতৃত্বে বিভিন্নভাবে জায়গা করে নিচ্ছেনসাম্প্রতিক নির্বাচনসমূহে ভোটার হিসেবে নারীর ব্যাপক ও স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতির বিষয়টিও উল্লেখযোগ্যপ্রত্যন্ত অঞ্চলের নারীর এ সাফল্য বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন, নারী সংগঠন ও এনজিওসমূহের দীর্ঘদিনের আন্দোলেনরই ফসলএ সাফল্যের ফলে সরকারও নারীর ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে বিভিন্ন নীতি ও কার্যক্রম গ্রহণ করতে বাধ্য হচ্ছেশুধু তাই নয়, জাতিসংঘসহ বিভিন্ন সংস্থার চাপও সরকারকে নারীর ক্ষমতায়নের জন্য কাজ করতে বাধ্য করছেএরই ফসল হিসেবে নবম জাতীয় সংসদের গুরুত্বপূর্ণ পদে, মন্ত্রিসভায় ও সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নারী স্থান করে নিয়েছেনসংসদ সদস্য হিসেবে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নারী সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হয়ে প্রমাণ করেছেন, সুযোগ পেলে তাঁরাও দক্ষতা দেখাতে পারেনপ্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবার সরকার গঠনের পর থেকেই নারীর ক্ষমতায়নের ব্যাপারে একের পর এক প্রশংসনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করছেনএসব আমাদের মনে আশার সঞ্চার করছেকিন্তু এ আশার আলো ম্লান হয়ে যায়, যখন দেখি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নারী বর্বর সংহিসতার শিকার হচ্ছেসম্প্রতি নারীর ওপর মধ্যযুগীয় কায়দায় দোররা মারার বেশ কিছু খবরও এসেছে মিডিয়ায়ফতোয়াবাজদের হিংস্রতার শিকার হয়ে নারী যখন যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে, নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের সফল নারীরা দরিদ্র অসহায় এসব নারীর সহায়তায় কতটা এগিয়ে আসছেন। 

১৯৯৭ সালে ইউনিয়ন পরিষদের সংরক্ষিত আসনে নারীদের প্রত্যক্ষ নির্বাচনের আইন পাস হওয়ার পর বহু নারী নির্বাচনে অংশ নিয়ে নির্বাচিত হননির্বাচিত হওয়ার পর সমাজের কাছে, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কাছে দেয়া প্রতিশ্রতি পালন করতে গিয়ে তাঁরা বুঝতে পারেন তাঁদের যথেষ্ট ক্ষমতা ও সহযোগিতা দেয়া হচ্ছে নাতারপরও তৃণমূল পর্যায়ের নারীরা তাঁদের ন্যায্য দাবি আদায়ে সাহসী ভূমিকা রেখেছেনএই সমস্ত উদ্যোগে বিভিন্ন সংগঠনও তাদের সহযোগিতা করেছেতৃণমূলের নারীর এ অগ্রগতিকে প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী ভালোভাবে নিতে পারে নিকারণ এতে তাদের কায়েমি স্বার্থে আঘাত লেগেছে২০০১-এর নির্বাচনে সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী গোষ্ঠী ক্ষমতায় আসার পর ইউনিয়ন পর্যায়ে ইতঃপূর্বে নির্বাচিত নারীরা স্বাধীনভাবে কাজ করতে বিভিন্নভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছেনঅনেক ক্ষেত্রেই তাঁদের বোরকা পরে নমনীয় হয়ে চলতে বাধ্য করা হয়েছেএমনকি ওই স্বার্থান্বেষী মহলের কেউ কেউ ইউনিয়ন পরিষদের নারী নেতৃত্বকে চরম অপমানও করেছেকিন্তু নির্যাতিত নারীরা এতে দমে যান নিতাঁরা সংগঠিত হয়ে এই প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিকে প্রত্যাখান করেছেন ২০০৮-এর নির্বাচনে

আশার কথা, ২০০৮-এ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় দেশবাসীও প্রতিক্রিয়াশীলদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়নীতিনির্ধারণী পর্যায়সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীর সরব অংশগ্রহণের সুযোগ পুনরায় কিছুটা হলেও অবারিত হওয়ার ফলে প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি তাদের কায়েমি স্বার্থ বিনষ্ট হওয়ার আতঙ্কে ভুগতে শুরু করেছেএর ফলে সমাজে তাদের ক্ষমতা সংহত করার উদ্দেশ্যে এরা হিংস্র আচরণের মাধ্যমে নারীর অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করার চেষ্টায় লিপ্ত হয়এই প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী নারীকে দোররা মেরে গলায় জুতার মালা পরিয়ে বিভীষিকাময় পরিস্থিতি সৃষ্টি করার চেষ্টা করছেএ পরিস্থিতিতে প্রশাসনের ভূমিকা ন্যাক্কারজনকতারা এই ধরনের নারী নির্যাতনকারীর বিরুদ্ধে প্রায়ই কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করে নাকেবল ওপর থেকে চাপ সৃষ্টি হলে কিছু করার চেষ্টা করে থাকে, যা প্রায়ই যথাযথ হয় না
লক্ষ করা গেছে, দরিদ্র নারীরাই প্রতিক্রিয়াশীল স্বার্থানেষী মহলের নির্যাতনের শিকার হয় বেশিএ বিবেচনায় প্রত্যন্ত অঞ্চলের নারীর দারিদ্র্য দূরীকরণে সরকারকে বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবেশিক্ষাই হতে পারে দারিদ্র্য থেকে মুক্তির বড়ো হাতিয়ারএক্ষেত্রে কর্মমুখী শিক্ষা অধিক ফলপ্রসূ হতে পারেএছাড়া ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী ও সংখ্যালঘু পরিবারের নারীরাও তুলনামূলকভাবে অধিক হারে নির্যাতনের শিকারযশোরে সম্প্রতি এক দলিত কিশোরীকে গণধর্ষণের ঘটনা এসবেরই ধারাবাহিক ফলকাজেই এই নির্যাতিতদের রক্ষায়ও বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে।       

অভিযুক্তরা যত প্রভাবশালীই হোক, তারা যেন পার পেতে না পারে তা নিশ্চিত করতে হবেআইন প্রয়োগকারী সংস্থা তাদের দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করছে কি না সে বিষয়ে মনিটরিংও জোরদার করতে হবেপ্রশাসনকে গতিশীল করতে হবেপ্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিলে কাজ হবে, নইলে নয়; এ সংস্কৃতির অবসান হওয়া আবশ্যকপ্রশাসন অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর না-হলে এরা একসময় বেপরোয়া হয়ে সারা দেশে নৈরাজ্য সৃষ্টি করতে চাইবে

সরকারের পাশাপাশি সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকেও এ বিষয়ে ভূমিকা রাখতে হবেস্বার্থান্বেষী প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা প্রতিটি শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষেরই নৈতিক দায়িত্বএটা মনে করার কোনো সুযোগ নেই যে, নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে কেবল নারীরাই সোচ্চার হবেননারী নির্যাতন মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং এই মানবাধিকার রক্ষায় সক্রিয় হওয়া সকলের নাগরিক দায়িত্বও বটেকারণ মানবাধিকার ক্রমাগত লঙ্ঘিত হলে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয় না

নারীর জন্য সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জন : নয়া উদারবাদী পন্থা নয়, প্রয়োজন পরিষেবা ও নারী অধিকারের প্রসার - ওমর তারেক চৌধুরী

প্রেক্ষাপট : নয়া উদারবাদের হাতে দরিদ্র, নারী ও পরিষেবা খাতের রক্তক্ষরণ

গত শতকের ৮০-র দশক থেকে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ-এর মতো বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মুরুব্বি প্রতিষ্ঠানসমূহ ‘ওয়াশিংটন কনসেনসাস’ নামে পরিচিত একটি রক্ষণশীল মতাদর্শিক কাঠামোর মাধ্যমে বিশ্বের ঘাড়ে মুক্তবাজার অর্থনীতির জোয়াল চাপিয়ে দিয়েছিল। ‘নয়া উদারবাদী’ এই ব্যবস্থায় ‘কাঠামোগত সমন্বয় নীতি’র মাধ্যমে আসলে সামাজিক সেবাখাতে ব্যয় কমাতে এবং জনহিতকর বা কমিউনিটিভিত্তিক কার্যক্রমগুলোর বিলুপ্তি সাধনে বাধ্য করা হয়েছে বহু দেশের সরকারকে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর সাধারণ মানুষ এই ব্যবস্থার সবচেয়ে বড়ো ও প্রত্যক্ষ শিকার হয়েছে নানাভাবে। এর মধ্যে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নারীর ওপর এর অভিঘাত পড়েছে সবচেয়ে নির্মমভাবে। নয়া উদারবাদী পন্থার অন্যতম প্রধান দিক হচ্ছে ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ শিথিল করা বা সরকারি ভূমিকার বিলুপ্তি ঘটানোর শর্ত। নয়া উদারবাদে সরকারসমূহকে বাধ্য করা হয়েছে রাষ্ট্রীয় খাতের বিলোপ ঘটিয়ে জনগণের সম্পত্তি জলের দরে বেসরকারি মালিকানায় ছেড়ে দিতে; রাষ্ট্রের দায়িত্ব হিসেবে নাগরিকদের শিক্ষা, চিকিৎসা নিশ্চিত করার দায়িত্ব থেকে হাত গুটিয়ে নিতে; এবং পানীয় জল, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, গণপরিবহণ, বন্দর, যোগাযোগ ইত্যাদির মতো পাবলিক ইউটিলিটি সার্ভিসগুলোর সেবাদান নিশ্চিত করার বৈশিষ্ট্যের বদলে মুনাফা করার জন্য এই খাতগুলোকে বেসরকারি মালিকানায় ছেড়ে দিতে। এ সবই হচ্ছে এই জনবিরোধী মতাদর্শের আবশ্যিক অঙ্গ। অভ্যন্তরীণ খাদ্য নিরাপত্তা, শিল্প ও কৃষিখাতে আত্মনির্ভরশীলতা নিশ্চিত রাখার বিপরীতে আমদানিনির্ভরতা বৃদ্ধির উপযুক্ত আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য কর ও শুল্কব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে সরকারগুলোর হাত মোচড়ানো ছিল নয়া উদারবাদী পন্থার প্রধান প্রধান দিক।

এই হাত মোচড়ানোর জন্য চালু করা হয় কাঠামোগত সমন্বয় কর্মসূচি বা স্ট্রাকচারাল অ্যাডজাস্টমেন্ট প্রোগ্রাম (স্যাপ)। সকল ধরনের ঋণ, অনুদান বা কর্মসূচির সঙ্গে স্যাপ-এর বাস্তবায়ন একটি অপরিহার্য শর্ত হিসেবে জুড়ে দেয়া হয়। প্রথমত, বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকসহ বিভিন্ন দ্বিপক্ষীয় দাতাসংস্থার চাপে অবাধ বাণিজ্য বা মূলত আমদানি নীতি উদারীকরণ, রাষ্ট্রের ভূমিকা ও দায়িত্ব খর্ব করা, সামাজিক খাতে ব্যয় সংকোচন, রাষ্ট্রায়ত্ত উৎপাদনী প্রতিষ্ঠান খাত বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয়া এবং রাষ্ট্রীয় ভরতুকি প্রত্যাহার করার মতো নয়া উদারবাদী নীতি সংস্কারের শর্ত অত্যাবশ্যকীয় করা হয় স্যাপ বাস্তবায়নের জন্য। ১৯৭৫ সালে সামরিক শাসনের জমানায় বিশ্বব্যাংক ক্রমশ বেশি মাত্রায় এই ধরনের কর্মসূচি নিয়ে স্থান করে নিতে শুরু করে বাংলাদেশে। বাংলাদেশ প্রায় দুই দশক ধরে প্রত্যক্ষভাবে স্যাপের নিগড়ে থেকে শিল্প, কৃষি, আর্থিক খাত, স্বাস্থ্য এবং শিক্ষার মতো পরিষেবা খাতে প্রচুর রক্তক্ষরণের শিকার হয়। সেই নীতি পরিমণ্ডল থেকে আমাদের সরকারের এখনো বের হয়ে আসা সম্ভব হয়নি। আরো পরিষ্কার করে বলা যায়, দেশ পরিচালনাকারীরাও নিজেদের শ্রেণিস্বার্থে এর থেকে বের হয়ে আসতে চায় না। মূলত পিআরএসপি বা দ্রারিদ্র্য বিমোচন কৌশলপত্র ইত্যাদি চটকদার মুখোশের আড়ালে জনবিরোধী নয়া উদারবাদী সেই পন্থা এখনো অনুসৃত হয়ে আসছে সেজন্য।

দেশীয় অর্থনীতি, কৃষি ও শিল্পের ভিত্তি ধ্বংসের উদাহরণ দিয়ে বলা যায় যে, নয়া উদারবাদী পন্থায় স্যাপের কর্মসূচি বাস্তবায়নের ফলে বাংলাদেশে বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় বিগত ৯০-এর দশকে শুধু পাটশিল্প খাতে উৎপাদন হ্রাস পেয়েছিল ৫০ শতাংশ; যা কার্যত এ খাতে নিয়োজিত ঋণের টাকার অপচয় বৈ কিছু নয়। সে সময় বন্ধ করে দেয়া হয় ১৮টি পাটকল এবং ছাঁটাই করা হয় ২০,০০০ শ্রমিককে। নয়া উদারবাদী এই সংস্কার কর্মসূচি পরবর্তী দশকেও অব্যাহত থাকে; যার ফলে বৃহত্তম পাটকল আদমজী বন্ধ হয়ে গেলে ১৩ হাজারের বেশি দক্ষ শ্রমিক এক ধাক্কায় তাদের জীবনজীবিকা থেকে উচ্ছেদের শিকার হয়। স্কুল থেকে ছিটকে পড়ে শ্রমিক পরিবারের সন্তানরা; এই কারখানাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা পুরো একটি জনপদে কার্যত রাতারাতি ধস নামে নানাভাবে। শুধু একটি শিল্পখাতের ৩০ হাজারের বেশি শ্রমিককে জীবিকাচ্যুত করার ফলাফল, এসব শ্রমিকের পরিবার, বিশেষ করে নারী সদস্যদের ওপর এর প্রভাবের মাত্রার তীব্রতা আমরা কেবল অনুমান করে নিতে পারি।

বাংলাদেশের কৃষিমন্ত্রী হিসেবে একাধিকবার দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা থেকে বেগম মতিয়া চৌধুরী বিভিন্ন সময় উল্লেখ করেছেন যে, স্যাপের আওতায় বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনকে বিলুপ্ত করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষকদের সার, বীজ, কীটনাশক, সেচ, ভরতুকি, সম্প্রসারণ সেবার মতো সরকারি সহায়তা থেকে বঞ্চিত করার ফলে কৃষিখাতে উৎপাদনশীলতা থেকে শুরু করে ভেজাল, দুর্নীতি, পরিবেশগত বিপর্যয়ের মতো ক্ষতিকর দিকগুলো এই খাতের সমূহ ক্ষতি সাধন করেছে। খাদ্যের ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও স্বয়ংসম্পূর্ণতাকে উপেক্ষা করে উর্বর আবাদি জমি বিনষ্ট করার মাধ্যমে রফতানির জন্য চিংড়ি চাষের মতো ক্ষতিকর পন্থাকে উৎসাহিত করে ব্যাপক আকারের পরিবেশ ও সামাজিক বিপর্যয়ের সূচনা করা হয়। এসব প্রবণতার অন্যতম শিকার হয় দেশের দরিদ্র ও নারী জনগোষ্ঠী।

শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে স্যাপের কারণে। সর্বসাধারণের জন্য প্রচলিত সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে দুর্বল করার পাশাপাশি বাণিজ্যিক ভিত্তিতে মুনাফার জন্য বেসরকারি স্বাস্থ্যখাত গড়ে তোলার নীতি-পরিবেশ তৈরি করা হয়। শিক্ষাখাতেও অনুরূপ ঘটনা ঘটে। এই পর্যায়ে সরকারিভাবে শিক্ষাখাত যে পরিমাণে উপেক্ষিত হয়, তার ফল এখনো বয়ে যেতে হচ্ছে দেশকে। প্রাথমিক শিক্ষার বিষয়ে একটি পরিসংখ্যানই হয়ত এই উপেক্ষার তীব্রতাকে ফুটিয়ে তোলার জন্য যথেষ্ট। অতি সম্প্রতি বর্তমান সরকার নতুন ১৫০০টি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপনের উদ্যোগ নেবার আগে ১৯৭২ সাল থেকে এ পর্যন্ত দেশে সরকারি উদ্যোগে নতুন কোনো প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়নি। অপরদিকে স্যাপ নীতি-পরামর্শের অধীনে ক্রমাগতভাবে বেসরকারি মালিকানায় পরিকল্পিতভাবে স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষাদানের দায়িত্ব ছেড়ে দেবার সহায়ক পরিবেশ তৈরি করা হলেও এসব ক্ষেত্রে সেবার মান নিশ্চিত করার জন্য সরকারি তদারকি ও নিয়ন্ত্রণকে শিথিল করা হয় নয়া উদারবাদী ভাবধারার সঙ্গে সংগতি রেখে। ভোক্তাদের অধিকার নিশ্চিত না-করে ঢালাওভাবে বেসরকারি খাতকে উৎসাহিত করার মাধ্যমে একদিকে সেবাপ্রাপ্তি যেমন ব্যয়বহুল হয়ে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গিয়েছে, অন্যদিকে তেমনি গড়ে ওঠেনি জবাবদিহিতার কোনো বাধ্যবাধকতা। সর্বোপরি ক্ষুণ্ন হয়েছে মানুষের অধিকার ভোগ করার বিষয়গুলো। ‘সুশাসন’ কথাটি নয়া উদারবাদের অন্যতম একটি প্রিয় বুলি হলেও, এসব ক্ষেত্রে চোখ বন্ধ রাখাই শ্রেয় বলে বিবেচিত হয় বেসরকারি মালিকানার পৃষ্ঠপোষকতার স্বার্থে। ‘সুশাসন’ কথাটি জমা রাখা হয় কেবল রাষ্ট্রীয় খাতকে ‘অদক্ষ’, ‘অপব্যয়ী,’ ‘দুর্নীতিপরায়ণ’ ইত্যাদিতে অভিহিত করে একটি দানবিক চেহারা দেবার জন্য।

বাংলাদেশে জনবিরোধী নয়া উদারবাদী অর্থনীতির নেতিবাচক অভিজ্ঞতাকে অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ সারসংক্ষেপ করে বলেছেন : ‘...জ্বালানি খাতে জাতীয় সক্ষমতার অবক্ষয় ও বিদেশি মালিকানার সম্প্রসারণ,... আমদানি নির্ভরতা বৃদ্ধি, মিল থেকে মলমুখী (শপিং) অর্থনৈতিক তৎপরতার বিস্তার, চট্টগ্রাম স্টিল মিল, মেশিন টুলস ফ্যাক্টরিসহ বহু শিল্পকারখানা বন্ধ, বহু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পানির দামে বিতরণ, রেলওয়ে সংকোচন, দখল ও লুণ্ঠন প্রক্রিয়ায় জনগণের সাধারণ সম্পত্তি ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে রূপান্তর, কৃষিখাতে হাইব্রিড বীজসহ কোম্পানি নির্ভরতা বৃদ্ধি, চোরাই টাকার তৎপরতা বৃদ্ধি, কাজ ও মজুরির নিরাপত্তা সংকোচন, বাণিজ্য ঘাটতির ক্রমান্বয় বৃদ্ধি এবং নতুন ধনিক শ্রেণির জন্ম ও বিকাশ।’ এই সংক্ষিপ্ত বিবরণ থেকে নয়া উদারবাদী অর্থনীতির বিষাক্ত ছোবলে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের রক্তক্ষরণের এবং উন্নয়নের চাকা উলটোদিকে ঘুরিয়ে দেবার মাত্রাটি অনুধাবন করা যেতে পারে।

নয়া উদারবাদের স্থানিক ও বৈশ্বিক চেহারা

উপরের সংক্ষিপ্ত বর্ণনায় নয়া উদারবাদের যে চেহারার সামান্য আভাস আমরা পেলাম, সেটি শুধু বাংলাদেশের একক কোনো ছবি নয়। আশির দশক থেকে শুরু হওয়া এবং বিশেষত একের পর এক সমাজতান্ত্রিক দেশে পটপরিবর্তনের পর নয়া উদারবাদী অর্থনৈতিক মতাদর্শ পরিপূর্ণ শক্তিতে সারা পৃথিবীর ওপরই চেপে বসে নগ্নভাবে। কিন্তু তার আগেই মার্গারেট থ্যাচার ও রোনাল্ড রেগানের জমানায় এর নগ্ন চেহারা দেখা দিতে থাকে ব্রিটেন ও আমেরিকার মতো দেশগুলিতে। সেই জমানায় এর প্রধান আঘাত নেমে আসে সেখানকার শ্রমজীবী মানুষের ওপর। নয়া উদারবাদ শ্রমজীবী নারী-পুরুষের অবদানকে অস্বীকার করে, তাদের মঙ্গল ও উন্নয়নে সকল ধরনের বিনিয়োগ বন্ধ করার জন্য প্রবর্তন করে ‘নো ফ্রি লাঞ্চ’ নামক মন্ত্র। যার প্রকৃত মানে হচ্ছে নাগরিকদের মৌলিক অধিকার রক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রের নয়, শিক্ষা থেকে প্রসূতি সেবা-- সবকিছু ‘মুক্তবাজার’ থেকে কিনে নিতে হবে। নয়া উদারবাদ এই মন্ত্র জপলেও মন্ত্রটি সকলের ক্ষেত্রে সমভাবে কার্যকর করতে খুবই অনিচ্ছুক। তার ভূরিভূরি প্রমাণ পাওয়া যাবে আমাদের দেশে এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে। সাম্প্রতিক বিশ্বমন্দার অজুহাত তুলে দেশের বিভিন্ন শিল্পের জন্য ২০০৯-’১০ অর্থবছরের বাজেটে ৫০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয় প্রণোদনা প্যাকেজ হিসেবে। সমভাবে ‘২০১০-’১১ অর্থবছরের বাজেটে রফতানি বাণিজ্যে বৈরী অর্থনৈতিক প্রভাব মোকাবিলায় ২,০০০ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ প্রস্তাব করা হয়েছে।’ এ ধরনের সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা বিস্তারিত আলোচনা ও বিতর্কের দাবি রাখে অবশ্যই। এর বিপরীতে সংক্ষেপে প্রশ্ন তোলা যায় যে, এসব ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজ সাধারণ মানুষের অর্থে বহন করা হলেও আর্থিক সহায়তা পাওয়া খাতগুলোর সাধারণ শ্রমজীবী নারী-পুরুষরা কি এই ‘ফ্রি লাঞ্চে’র কোনো হিস্যা পাবেন? তা অবশ্যই পাবেন না। এ ধরনের ‘ফ্রি লাঞ্চ’ বিতরণ নিয়ে নয়া উদারবাদের প্রবক্তা প্রতিষ্ঠানগুলো কখনোই চিন্তিত নয়। তারা তখনি উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে, যখন সরকারি খরচে গরিব মানুষের জন্য চিকিৎসা সেবার কথা ওঠে, স্কুলে শিক্ষক নিয়োগের কথা বলা হয় বা নাগরিক সেবার জন্য বিআরটিসির মতো প্রতিষ্ঠান পরিচালনার কথা বিবেচনা করা হয়।

বৈশ্বিক পরিসরেও এমন অবস্থা বিরাজমান। সাম্প্রতিক বিশ্বমন্দায় পাশ্চাত্যের দেশগুলির দুর্নীতিপরায়ণ আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে উদ্ধার করার জন্য সেসব দেশের সাধারণ মানুষের অর্থ বা ‘ফ্রি লাঞ্চ’ একইভাবে ব্যয় করা হয় (গত ডিসেম্বরে শুধু ব্রিটেনের ব্যাংকগুলিকে বাঁচাবার জন্য বরাদ্দ করা হয় ৮৫০০ কোটি পাউন্ড, আমেরিকান কর্মকর্তারা অনুমান করছেন যে
চূড়ান্তভাবে এ খাতে তাদের, প্রকৃতঅর্থে সাধারণ মানুষের, ব্যয় দাঁড়াবে ২৩,০০০,০০০,০০০,০০০ ডলার)। আমেরিকার পাঁচটি মোটরগাড়ি কোম্পানির প্রধানরা ব্যক্তিগত জেট প্লেনে চড়ে (!) মার্কিন কংগ্রেসে হাজির হয়েছিলেন ‘বেইলআউট প্যাকেজ’ নামক ভিক্ষা নেবার জন্য। এ বছরের ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ইরাক ও আফগানিস্তানে যুদ্ধের পেছনে মার্কিন যুক্তরাষ্টের ব্যয় হয়েছে ১,০৭৬,৬৫২,০৭৫,৩২৮ মার্কিন ডলার। বিশেষ করে বিগত তিন দশক ধরে সরকারি ভরতুকির মুণ্ডুপাত করা হলেও সাধারণ মানুষের টাকায় বেসরকারি খাতকে উদ্ধার করার ক্ষেত্রে নয় উদারবাদের প্রবক্তরা ‘ফ্রি লাঞ্চ’-এর প্রবচনটি অবলীলায় ভুলে যেতে কুণ্ঠিত হয় না।

অথচ, ২০০০-এ যখন সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা গৃহীত হবার সময় ঠিক হয়েছিল যে, উন্নত বিশ্বের দেশগুলি এমডিজি বাস্তবায়নের জন্য তাদের জাতীয় আয়ের ০.৭০ শতাংশ বরাদ্দ করবে। এক্ষেত্রে আজ পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে কোনো সুস্পষ্ট প্রতিশ্র“তি পাওয়া যায়নি। ২০০৮-এ শুধু ডেনমার্ক, লুক্সেমবুর্গ, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে ও সুইডেন তাদের প্রতিশ্র“তি রক্ষা করেছে এক্ষেত্রে। বর্তমানে এই প্রতিশ্র“তির ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়েছে ০.৩০ শতাংশ। সহায়তাদানের অন্যান্য খাতেও রয়েছে এমন ঘাটতি। এমন পরিস্থিতিতেও বিশ্বব্যাপী সামাজিক উন্নয়ন, ন্যায়বিচার, নারী ও শিশুর অগ্রগতি, পরিবেশ সুরক্ষার জন্য পর্যাপ্ত কিছু করতে বিশেষ আগ্রহী নয় নয়া উদারবাদী পন্থার অনুসারী দেশগুলি। সম্ভবত, উত্তর ও দক্ষিণের দেশগুলির জনগণের চাপই তাদেরকে বাধ্য করতে পারে উন্নয়ন খাতে সম্পদ নিয়োজিত করতে।

এমডিজির আবির্ভাব ও রক্তক্ষরণ-শুশ্রূষার সম্ভাবনা

নয়া উদারবাদী ‘ওয়াশিংটন কনসেনসাস’ যখন ওয়াশিংটনভিত্তিক বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে বল্গাহীনভাবে উন্নয়নশীল দেশগুলোর উন্নয়নকে কার্যত ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, সেই সময় নতুন সহস্রাব্দের সন্ধিক্ষণে জাতিসংঘ তাদের বিগত কয়েক দশকের বিভিন্ন কার্যক্রমের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ’সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা’র ধারণটি নিয়ে এগিয়ে আসে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৫৫তম সভাটি মিলেনিয়াম অ্যাসেমব্লিতে রূপ নেয়। ২০০০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে জাতিসংঘের সহস্রাব্দ শীর্ষ সম্মেলনে বিশ্বের ১৫৬টি দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানের উপস্থিতিতে ১৮৯টি দেশ সম্মিলিতভাবে গ্রহণ করে ‘সহস্রাব্দ ঘোষণা’ এবং ‘সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা’। পৃথিবী থেকে দারিদ্র্য, ক্ষুধা, অসুস্থতা, অক্ষরজ্ঞানহীনতা, পরিবেশের অবক্ষয় এবং নারীর প্রতি বৈষম্য দূর করার লক্ষ্যে ২০১৫ সালের মধ্যে, সময়-নির্ধারিত ও পরিমাপযোগ্য উপায়ে আটটি লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রণীত হয় ‘সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা’। ইতঃপূর্বে জাতিসংঘ কর্তৃক বিভিন্ন ধরনের অধিকার রক্ষাবিষয়ক সনদের চেতনার সাথে সংগতি রেখে প্রণীত ‘সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা’ কিছুমাত্রায় হলেও নয়া উদারবাদী মডেলের সৃষ্ট ক্ষতকে সারাতে অবদান রাখবে এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর মানুষের সমস্যা মোকাবিলায় সহায়ক হবে বলে আশা করার কারণ রয়েছে। পনের বছরব্যাপী এই লক্ষ্যমাত্রার দুই-তৃতীয়াংশ সময় অতিক্রান্ত হবার সন্ধিক্ষণে অনেক দেশের ক্ষেত্রেই তেমন লক্ষণাবলি পরিলক্ষিত হচ্ছে।

বাংলাদেশের অভিজ্ঞতাও আমাদেরকে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ইতিবাচক অগ্রগতির প্রমাণ উপহার দিচ্ছে। নয়া উদারবাদী মতাদর্শের অভিঘাতে জর্জরিত ও তিক্ত অবস্থার সামনে মানব ও সামাজিক উন্নয়ন ক্ষেত্রে এসব অর্জন কিছুটা হলেও স্বস্তির অবস্থা তৈরি করেছে। আটটি লক্ষ্যের অন্তর্ভুক্ত যে ১৮টি লক্ষ্যমাত্রা বা টার্গেট অর্জনের (৫০টি পরিমাপযোগ্য সূচক বা ইন্ডিকেটর) জন্য বাংলাদেশ অঙ্গীকারাবদ্ধ, তার মধ্যে যেগুলিতে বাংলাদেশ সঠিক পথে রয়েছে বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে সেগুলো হচ্ছে : ১. চরম দারিদ্র্য ও ক্ষুধা নির্মূল (ছয়টি সূচকের মধ্যে তিনটিতে সঠিক পথে ও দুটিতে নেতিবাচক। সকল ক্ষেত্রেই কিছু সূচক সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়নি।), ২. সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা অর্জন (তিনটি সূচকের মধ্যে একটিতে সঠিক পথে ও একটিতে নেতিবাচক), ৩. নারী-পুরুষ সমতা ও নারীর ক্ষমতায়ন (পাঁচটি সূচকের মধ্যে তিনটিতে সঠিক পথে ও দুটিতে নেতিবাচক), ৪. শিশুমৃত্যুহার হ্রাস (তিনটির সূচকের মধ্যে তিনটিতেই সঠিক পথে), ৫. মাতৃস্বাস্থ্যের উন্নয়ন (সাতটি সূচকের তিনটিতে নেতিবাচক, কোনো ইতিবাচক অবস্থা নেই), ৬. এইআইভি/ এইডস, ম্যালেরিয়া ও অন্যান্য রোগের বিস্তার রোধ (দশটি সূচকের মধ্যে আটটিতে সঠিক পথে), ৭. টেকসই পরিবেশ (দশটি সূচকের মধ্যে তিনটিতে সঠিক পথে ও একটিতে নেতিবাচক)। এই দশ বছরে সহস্রাব্দ লক্ষ্য অর্জনের যে দুটি ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অর্জন বিশেষভাবে উল্লেখ করার মতো, তা হচ্ছে : প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে মেয়ে ও ছেলেশিক্ষার্থীদের মধ্যে কেবল স্কুলে ভর্তির ক্ষেত্রে সংখ্যাগত সমতা অর্জন করা সম্ভব হয়েছে এবং ১৯৯০ সালের তুলনায় শিশুমৃত্যুর হার ৫০ শতাংশ হ্রাস করা গিয়েছে। শুধু বাংলাদেশই নয়, বিভিন্ন ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য এমন ইতিবাচক অর্জন সাধিত হয়েছে এশিয়ার ভিয়েতনাম, মঙ্গোলিয়া, ভুটান, লাওস, নেপাল, চীন, কম্বোডিয়া; আফ্রিকার বতসোয়ানা, উগান্ডা, রুয়ান্ডা, মালাউই, জাম্বিয়া, ইরিত্রিয়া, মালি, দক্ষিণ আফ্রিকা, সেনেগাল, ইকুয়েটরিয়াল গিনি, মোজাম্বিক, ইথিওপিয়া, নাইজার, তাঞ্জানিয়া, গায়েনা; উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার মেক্সিকো, নিকারাগুয়া, ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, বলিভিয়া, কোস্টারিকা ও গুয়াতেমালায়।

একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এমডিজি বা সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা আন্তর্জাতিকভাবে নয়া উদারবাদী কাঠামোর মধ্যেই বা সেই কাঠামোর নৈতিক অবস্থানকে চ্যালেঞ্জ না-করেই প্রণীত হয়েছে। শুধু তাই নয়, বিশ্বব্যাংকের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন লক্ষমাত্রার (আইডিজি) সাথে এর যেমন সাজুয্য রয়েছে, তেমনি এর বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও রয়েছে সমন্বয় করার প্রয়াস। এখানে মূল লক্ষণীয় বিষয় হলো এমডিজি মূলত দারিদ্র্য পুনরুৎপাদনকারী, পরিবেশ ধ্বংসকারী, দরিদ্র মানুষের প্রতি বৈরী এবং অন্যায্য নয়া উদারবাদী অর্থনৈতিক কাঠামোর পরিবর্তনের দাবি উত্থাপনের ক্ষেত্রে নীরব থাকলেও তা কিছু পরিমাণে হলেও দরিদ্রবান্ধব অবস্থান নেয়। উপরন্তু, বিশ্ব পর্যায়ে দারিদ্র্য এবং দারিদ্র্য থেকে সৃষ্ট সমস্যাগুলির প্রতি ব্যাপকভাবে নাগরিক ও জাতীয় সচেতনতা সৃষ্টিতে লক্ষণীয় অবদান রাখে। যার ফলে নয়া উদারবাদ সৃষ্ট রক্তক্ষরণের কিছুমাত্রায় শুশ্রূষার সুযোগ তৈরি হয়।

কিন্তু, সীমাবদ্ধতাও আছে

বিশ্ব পর্যায়ে সহমতের মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক (২০০৫ সালে উন্নয়নশীল বিশ্বেই দিনে ৭০ টাকার চেয়ে কম উপর্জানকারী ১৪০ কোটি মানুষ) দরিদ্র মানুষের দারিদ্র্য দূর করে স্বাস্থ্যসেবা, জীবনরক্ষা, শিক্ষার উন্নতিকল্পে কতগুলো সর্বজনস্বীকৃত সূচক ও লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের বৈশ্বিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের জন্য এমডিজি গৃহীত হয়েছিল। এই সদিচ্ছার মধ্যেও বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য সীমাবদ্ধতা যে রয়ে গেছে তা অনস্বীকার্য। দশ বছর অতিক্রান্ত হবার পর, বা এসব লক্ষ্য অর্জনের জন্য যখন আর মাত্র পাঁচ বছর বাকি আছে, কার্যকর সাফল্য অর্জনের জন্য সেসব সীমাদ্ধতার দিকে ফিরে তাকানো ও তা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করাই হবে কাঙ্ক্ষিত। এই চেষ্টা হওয়া উচিত দু’পর্যায়েই-- জাতীয় পর্যায়ে এবং ২০ থেকে ২২ সেপ্টেম্বরের ‘সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জন পর্যালোচনা ২০১০’ শীর্ষ সম্মেলন পর্যায়ে। আরো দীর্ঘমেয়াদিভাবে, এমনকি ২০১৫ সালের পরেও এ নিয়ে ভাবনার অবকাশ রয়েছে।

নারীর অধিকার ও ক্ষমতায়নের প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ

আটটি এমডিজির মধ্যে মূলত দুটি (৩ ও ৫) লক্ষ্যে সুনির্দিষ্টভাবে জেন্ডার সমতা ও নারীর ক্ষমতায়নের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। সবকটি লক্ষ্য কার্যকরভাবে অর্জনের জন্য প্রতিটি লক্ষ্যের ক্ষেত্রেই জেন্ডার সমতা ও নারীর ক্ষমতায়নের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত হওয়া প্রয়োজন ছিল। এমডিজির এই সীমাবদ্ধতার সমালোচনা বৈশ্বিক নারী আন্দোলন থেকেও উত্থাপিত হয়েছে। বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা বলতে পারি যে, সম্পত্তিতে নারীর অধিকার না-থাকা, ক্রমবর্ধিষ্ণু হারে নারীর প্রতি সহিংসতা এবং নারীর যৌন ও প্রজনন অধিকারের অস্বীকৃতি আমাদের নারীসমাজের অগ্রগতির পথে বিরাট বাধা। এই প্রকাশনায় অন্তর্ভুক্ত গবেষক প্রতিমা পাল-মজুমদারের সমীক্ষায়ও সম্পত্তির ওপর বাংলাদেশের নারীর সমঅধিকার না-থাকা থেকে সৃষ্ট বাধাগুলো অপসারণের গুরুত্বের কথা উঠে এসেছে। জাতিসংঘের সহস্রাব্দ ঘোষণাতে মানবাধিকার সংক্রান্ত সকল চুক্তি ও ঘোষণার স্বীকৃতি থাকলেও এমডিজির কোনো সূচকে এগুলোর কোনো প্রতিফলন নেই। এমডিজির কোনো লক্ষ্যেই নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার বিষয়টি লক্ষ্য ও সূচক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। আটটি সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যের (দারিদ্র্য দূরীকরণ, সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা, জেন্ডার সমতা, শিশুমৃত্যু হ্রাস, মাতৃস্বাস্থ্য, ম্যালেরিয়া বা এইচআইভি/এইডস প্রতিরোধ, পরিবেশের স্থায়িত্ব, এবং উন্নয়নের জন্য অর্থায়ন) ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনের জন্যও নারীর অধিকারের প্রশ্নটি নিশ্চিত করা ছাড়া সফলকাম হওয়া সম্ভব নয়। সকল ক্ষেত্রে নারীর অধিকারকে অন্তর্ভুক্ত করেই কেবল স্থায়িত্বশীল সামাজিক অগ্রগতি অর্জন সম্ভব হতে পারে।

নারীর ওপর ধর্মীয় রক্ষণশীলতার আঘাতকে মোকাবিলা করতে হবে

নারীর যৌন ও প্রজননস্বাস্থ্য সংক্রান্ত অধিকারসহ অনেক অধিকারের বিষয়ে এমডিজি যে কোনো নির্দেশনা দেয় না তা ইতোমধ্যেই উল্লেখ করা হয়েছে। তা না-করার কারণ রয়েছে। নয়া উদারবাদী প্রতিক্রিয়াশীল মতাদর্শের সঙ্গে ধর্মীয় রক্ষণশীলতার প্রসারের যোগসূত্র রয়েছে। এই যোগসূত্রের বিষয়টি উন্নতবিশ্বের দেশগুলোতেও অত্যন্ত স্পষ্ট। সে কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক দেশেই নারীর শরীরের ওপর বা তাদের প্রজননস্বাস্থ্য বিষয়ে অধিকারহীনতার বিষয়টি একটি বাস্তব সমস্যা। এসব অনেক দেশেই আজও গর্ভপাত ঘটানোর পর্যাপ্ত সুযোগ ও অধিকার নেই। বাংলাদেশের অভিজ্ঞতায় ফিরে আসলে আমরা দেখতে পাব যে, নারীর প্রতি ধর্মীয় রক্ষণশীলতা থেকে উদ্ভূত আঘাত, যেমন, ফতোয়াবাজি, দোররা মারা, সম্পত্তির ওপর সমঅধিকার স্বীকৃত না-হওয়া ইত্যাদি নারীর সমতা অর্জনের ক্ষেত্রে অন্যতম অন্তরায়। ধর্মীয় রক্ষণশীলতা থেকে আসা আঘাত প্রায়শই এমনকি নারীর প্রতি সহিংসতা ও শারীরিক হুমকি তৈরি করে থাকে। এসব অন্তরায় নিশ্চিতভাবে প্রতিহত করার জন্য এমডিজিতে কোনো লক্ষ্য বা সূচক দৃশ্যমান নয়। এর অবশ্য যৌক্তিক কারণ রয়েছে। জাতিসংঘের বিভিন্ন পদক্ষেপের প্রায় দশকব্যাপী বিভিন্ন অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে যখন এমডিজি গৃহীত হয়, তার মধ্যেই বহু দেশের অভ্যন্তরে উগ্র ধর্মীয় মৌলবাদীদের তৎপরতা এবং এমনকি উন্নত বিশ্বসহ উন্নয়নশীল অনেক দেশের সরকারের ওপর প্রতিক্রিয়াশীল ধর্মীয় গোষ্ঠী ও ডানপন্থী শক্তিগুলোর প্রভাব এবং নয়া উদারবাদী মতাদর্শ অনেক বিষয়ে জাতিসংঘকে পেছনে ঠেলে নিয়ে যায়। নারীর ওপর এসব পশ্চাৎপদ শক্তি বিভিন্ন সময়ে যেসব অপতৎপরতা পরিচালনা করে তা নারীর মানবাধিকারকে ক্ষুণ্ন করার পাশাপাশি তার সমতা অর্জন ও ক্ষমতায়নের অগ্রগতির পথে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। তাই, সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যে নারীর মানবাধিকার রক্ষার বিষয়টিকে নিশ্চিত করা দরকার জরুরিভাবে।

নয়া উদারবাদী অর্থনৈতিক মডেলের অন্তর্ভুক্ত থাকা এবং তাকে বৈধতা দেয়া

এমডিজি যে দেশে বাস্তবায়িত হয়, সেখানকার বিদ্যমান সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক অবস্থার, অর্থাৎ নয়া উদারবাদী ব্যবস্থার পটভূমিতেই তা রূপলাভ করে। তাই সংগত কারণেই নয়া উদারবাদী রাজনৈতিক-অর্থনীতির জনবিরোধী নীতির চাপ এর ওপর পড়ে অনিবার্যভাবে। কিন্তু সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক অর্থনৈতিক কাঠামো অপসারণের কথা অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে বলা প্রয়োজন। তাহলেই কেবল সম্ভব হবে এমডিজির সার্থক বাস্তবায়ন। জাতিসংঘ এবং বাস্তবায়নকারী সদস্য রাষ্ট্রগুলো থেকে জোরালোভাবে তা না করার সুদূরপ্রসারী ফলাফল হচ্ছে এটি বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিলের মতো নয়া উদারবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রধানতম প্রবক্তা প্রতিষ্ঠানগুলিকে এবং তাদের চাপে ও ভাবাদর্শে প্রণীত জনবিরোধী উন্নয়ন নীতিমালাকে জাতিসংঘের মাধ্যমে কর্তৃত্ব ও বৈধতা দান করার সুযোগ পায়।

উত্তরণের জন্য দরকার

কোনো উন্নয়ন প্রচেষ্টাকে টেকসই হতে হলে তাতে নারী ও মেয়েশিশুদের স্বার্থকে সর্বোবিধভাবে রক্ষা করার বিষয়ে দ্বিমতের কোনো অবকাশ নেই। সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমালার কাক্সিক্ষত সাফল্য অর্জনের ক্ষেত্রেও এটি সমভাবে প্রযোজ্য। ‘সহস্রাব্দ ঘোষণা’ গৃহীত হবার সময় সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণা, কায়রো ও বেইজিং সম্মেলন, সিডও এবং সামাজিক-অর্থনৈতিক-সাংস্কৃতিক অধিকারসংক্রান্ত সনদ প্রভৃতির মতো পূর্ববর্তী নানা অভিজ্ঞতা ও আন্দোলনসমূহ থেকে অর্জিত চেতনা ও কর্মপন্থাকে যেভাবে গুরুত্বের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হয়েছিল ‘সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা’য় নারীর অধিকারসংক্রান্ত বিষয়গুলি সেভাবে প্রতিফলিত নয়। দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ী ফলাফল অর্জনের চেয়ে এখানে স্বল্পমেয়াদি লক্ষ্য পূরণ গুরুত্ব পেয়েছে অনেক বেশি।

বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা জানি যে, আমাদের সংবিধানে নারীর জন্য সমানাধিকারের কথা বলা হলেও বাস্তব জীবনে তার প্রতিফলনের বদলে রয়েছে নানা প্রতিবন্ধকতা। উত্তরাধিকারসূত্রে পারিবারিক সম্পত্তিতে নারীর সমানাধিকার বা ক্ষেত্র বিশেষে অধিকার না-থাকা নারীর জন্য একটি বড়ো বাধা। এটি নারীকে এমনকি অনেক সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সম্পদের সুবিধা গ্রহণ থেকেও বঞ্চিত করে এবং নারীর জন্য সামগ্রিকভাবে একটি অবহেলা ও বঞ্চনার আবহ তৈরি করে। এই ধরনের মৌলিক অধিকারগুলি নিশ্চিত না-করে স্বল্পস্থায়ী ইতিবাচক কিছু অর্জিত হতে পারে অবশ্যই। কিন্তু নারীর অবস্থার মৌলিক পরিবর্তনের জন্য সকল ক্ষেত্রে নাগরিক হিসেবে তার অধিকার নিশ্চিত করা একটি জরুরি বিষয়। নাগরিক হিসেবে নারীর অধিকার নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে যা অর্জিত হবে তাই কেবল নারীর স্বাস্থ্যরক্ষা, প্রজননস্বাস্থ্য বিষয়ক অধিকার ও সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতার ভিত রচনা, সহিংসতা দূর করা এবং কর্মক্ষেত্রে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার মতো মৌলিক পরিবর্তনগুলোকে স্থায়ী রূপ দিতে পারে। সেটাই আমাদের কাম্য।

কাজেই, সহস্রাব্দ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য নির্ধারিত অবশিষ্ট সময়ে একটি বড়ো চ্যালেঞ্জ হবে জাতীয়ভাবে নারীর জন্য নাগরিক হিসেবে প্রাপ্য সকল ধরনের অধিকার আদায়ের প্রশ্নটিকে সামনে নিয়ে আসা। এই কাজটি আন্তর্জাতিক পরিসরেও করা প্রয়োজন। আমাদের জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতিমালার পূর্ণ বাস্তবায়ন এক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। একইভাবে সিডও সনদের যে দুটি ধারার ওপর এখনো আমাদের সরকার সংরক্ষণ বজায় রেখেছে, তা তুলে নিয়ে সিডও সনদের পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন সত্যিকার অর্থেই নারীর সমতা অর্জন ও ক্ষমতায়নের প্রশ্নটিকে স্থায়ীভাবে ইতিবাচক রূপ দিতে পারে।

স্থায়িত্বশীল সামাজিক উন্নয়ন, নারীর জন্য সমতাসম্পন্ন পরিবেশ, দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীবান্ধব আর্থ-সামাজিক আবহ এবং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের সহমর্মী মতাদর্শ ও ভূমিকা সবচেয়ে বড়ো অবদান রাখে। কিন্তু আমাদের অভিজ্ঞতা বলে যে, নয়া উদারবাদী মতাদর্শের ভিত্তিতে নির্মিত রাষ্ট্রীয় ও উন্নয়ন নীতিমালা রাষ্ট্রকে সেই ইতিবাচক ভূমিকা পালন থেকে সরিয়ে ক্রমশ তাকে জনবিরোধী ও ব্যক্তি মালিকানাধীন উদ্যোগের সেবকে পরিণত করে। এর ফলে সামাজিক উন্নয়নের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নাগরিক সমাজের উদ্যোগগুলোর জন্য একটি বৈরী পরিবেশ তৈরি হয়। অর্জিত উন্নয়ন সাফল্যগুলো ক্ষয়প্রাপ্ত হতে থাকে।

তাই সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনসহ দীর্ঘস্থায়ী উন্নয়ন সাফল্যগুলোকে ধরে রাখতে হলে নয়া উদারবাদী মতাদর্শের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা সকল নীতি ও কার্যক্রমকে প্রত্যাখান করা ছাড়া কোনো গত্যন্তর নেই। নারীর সমানাধিকার ও ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রেও এই বিষয়টি সমভাবে প্রযোজ্য। সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিসরেও আমাদেরকে রাষ্ট্রের ভূমিকাকে গুরুত্ব দিয়ে এগিয়ে নেবার জন্য সোচ্চার হতে হবে।

নোট

১. এসব শিল্পকারখানার সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে নিবন্ধকারে কাছে কোনো তথ্য নেই।

২. জেনারেল মোটর্স, ফোর্ড ও ক্রাইসলার কোম্পানির তিন নির্বাহী প্রধানই ডেট্রয়েট থেকে ৫২৬ মাইল দূরত্বে অবস্থিত ওয়াশিংটন ডিসিতে তাদের কোম্পানি তিনটির জন্য উদ্ধার-প্যাকেজ সংক্রান্ত মার্কিন কংগ্রেসের শুনানিতে বিলাসবহুল পৃথক জেট প্লেনে করে হাজির হয়ে সারা দুনিয়ায় সংবাদ শিরোনাম হয়ে ওঠেন। জিএম এর নির্বাহীর বিলাসবহুল উড়োজাহাজটির মূল্য ছিল ৩৬ মিলিয়ন ডলার। গাড়িতে এই দূরত্ব যাবার জন্য খরচ হয় ৮০ ডলারের পেট্রোল।

৩. সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যকে সঠিক প্রেক্ষিতে অনুধাবন করতে হলে মনে রাখতে হবে যে, এই উদ্যোগটি দক্ষিণ গোলার্ধের দেশগুলোর কাছ থেকে আসেনি। উদ্যোগটি মূলত সামনে ঠেলে দিয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও জাপান এবং সাথে ছিল বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও অর্থনৈতিক সহায়তা ও উন্নয়নবিষয়ক সংগঠন (ওইসিডি)। এই সংশ্লিষ্টতা থেকে প্রশ্ন ওঠে যে উদ্যোগটি কী মূলত নয়া-উদারবাদী আদর্শিক বিষয়কে ঢাকার উদ্যোগ কিনা। এই নিবন্ধে এ বিষয়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণে না গিয়ে, অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য করে বা প্রাতিষ্ঠানিক দৃষ্টিভঙ্গিতে বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে; যা নিবন্ধটি ও লেখকের সীমাবদ্ধতা। বাস্তবসম্মত পর্যালোচনার জন্য সামির আমিন লিখিত The Millennium Development Goals: A Critique from the South (মান্থলি রিভিউ। মার্চ ২০০৬) শীর্ষক নিবন্ধটি দেখা যেতে পারে।

সহায়ক সূত্র

  1. Bangladesh Experience with Structural Adjustment by Dr. Debapriya Bahttacharya and Rashed Al Tituumir. SAPRI, Bangladesh.
  2. Structural Adjustment: The SAPRI Report. Zed Books, London
  3. ÔDbœqb `k©b I eiv‡Ïi duvwKÕ| Avby gynv¤§`| cÖ_g Av‡jv, 22 Ryb 2010
  4. http://www.radiofeminista.net/julio05/notas/mdg-ing.htm
  5. http://www.awid.org/eng/Issues-and-Analysis/Library/MDG-Goals-Panned-for-Isolating-Women-s-Rights
  6. Millennium Development Goals: At a Glance. UN Department of Public Information. Updated April 2010.
  7. Factsheet: Where are the Gaps. www.un.org/esa/policy/mdggap

ওমর তারেক চৌধুরীর পাতা