Sunday, 25 September 2011

দুটো খণ্ড দৃশ্য : রোকেয়া কবীর


হরতালের পক্ষে বা বিপক্ষে কিছু বলবার জন্য এই লেখা নয়, কথার সূত্রপাত যদিও হরতাল থেকেই
হরতালে অফিসে না-গিয়ে কাজ বন্ধ করে আমি ঘরে বসে থাকতে পারি নাতবে হরতালে গাড়ি নিয়ে পথে বেরোনো ঝুঁকিপূর্ণ বলে এ দিনগুলোতে আমি সাধারণত সিএনজি অটোরিক্সার সেবা নিয়ে থাকি২২ সেপ্টেম্বরের হরতালের দিনও তাই করতে হলোঅটোরিক্সা মিটারে চলবে এরকম আশা এখন সম্পূর্ণই দুরাশাএজন্য জিজ্ঞেস করতে হলো ভাড়ার কথা
ড্রাইভার ১২০ টাকা হাঁকলোবনানী থেকে মোহাম্মদপুর যেতে এই ভাড়া হয়ত খুব বেশি না, যদিও মিটারে গেলে এর চেয়ে কমই লাগবার কথাতবু উঠে বসলাম, যেতে তো হবে
বললাম, ‘আজকে তো রাস্তা ফাঁকা, জ্যাম নেই, সেক্ষেত্রে ভাড়া তো আরো কম হওয়া উচিত
ড্রাইভার বলল, ‘আপা, হরতালের কথা বলে ভাড়া কম দিতে চাইতেছেনকিন্তু আপনি হয়ত জানেন না যে, এই গাড়িটা রাস্তায় নামাইতে সাড়ে নয় লাখ টাকা লাগছেমাত্র চাইর দিন হইল গাড়ির বয়সএত টাকা দিয়া গাড়ি কিনতে হয় বইল্যাই মালিক আমদানিও বেশি নেয়সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টার জন্য আমদানি সাতশ টাকা, রাতের জন্য সাড়ে তিনশ থেকে চারশএর কম ভাড়ায় আমগোর পুষাবো কেমনে?’ অকাট্য যুক্তি তার
কৌতূহল জাগল অটোরিক্সার দাম নিয়েবললাম, ‘এত ছোটো গাড়ি রাস্তায় নামাতে সাড়ে নয় লাখ টাকা লাগবার তো কথা না!
ড্রাইভার জানাল ঘুষের কথাবলল, ‘আপনি তো জানেন, বর্তমানে সিএনজির লাইসেন্স দেওয়া বন্ধসেইজন্য এই লাইসেন্সটা পাইতে অনেক টাকা লাগছেগাড়ির ইঞ্জিন-বড়ি-নেট এইসব লাগাইতে সোয়া পাঁচ লাখের মতো লাগলেও বাকি টাকা গেছে নানা ঘাটে ঘুষ দিতে দিতেএই টাকাটা তো তার উঠানো লাগবোএই জন্যই মালিকরা আমদানি বেশি ধরে
তার কথাবার্তা ঘুরে ফিরে আবার হরতালের দিকে এলে বললাম, ‘হরতালটা কেন হচ্ছে?’
সরাসরি জবাবে না-গিয়ে সে বলল, ‘পথঘাট স্বাভাবিক, গাড়ি-ঘোড়া কম, গণ্ডগোল দেখলাম না কোনোখানেতবে ওইদিন জামাত যে কাজটা করল, সেইটা একদম ঠিক করে নাইপুলিশ চাইলে আগেই ঠেকাইতে পারতকিন্তু তারা সেইটা করে নাইআগে মাইর খাইছে, পরে মাইর দিছেএতে অনেক ক্ষতি হইছেএত গাড়ি পোড়াইলো, কিন্তু এইটা নিয়া মানুষ কথা কয় নাঅবশ্য পুলিশ আগে মারলে বলত, পুলিশই উসকানি দিছে
বললাম, ‘জামায়াত যে ইসলামের কথা বলে, এই ব্যাপারে আপনার মত কী?’
প্রশ্ন শুনে উসকে উঠল সে, ‘আরে রাখেন জামাতএরা সব শয়তানের চ্যালাআমার এলাকার মসজিদের এক জামাতি ইমাম, মুখে মিষ্টি মিষ্টি কথা কয়, মনে হয় ফেরেশতা, কিন্তু মসজিদের লাইট-ফ্যান সব বিক্রি কইরা খাইয়া ফেলেগত আওয়ামী লীগ সরকার মসজিদে কিছু টিন দিছিলোসে ওই টিন বাড়িতে খাটাইয়া মসজিদে লাগাইছে খারাপ টিনএলাকার টাকাপয়সাওয়ালা লোকজন শখ কইরা মানত কইরা মুসল্লিদের সুবিধার জন্য লাইট-ফ্যান-মাইক দেয়, কিন্তু সে বিক্রি কইরা দেয়মাঝে মাঝে লোকজন নামাজের শেষে মসজিদের ব্যাপারে প্রশ্ন তুলবার চেষ্টা করলে ইমাম সাব লাঠিয়াল সাঙ্গপাঙ্গ ডাকেসে আরো যোগ করে, জামাত নামাজ পড়া, ধর্মপালন করা নিয়া বড়ো বড়ো কথা কয়, কিন্তু এরা শয়তানের হাড্ডিঘুষ, চুরি, মেয়েমানুষ খাওয়া থেকে শুরু করে সবটাই করে 
জানতে চাইলাম, ‘বাড়ি কোথায় আপনার?’
ফরিদপুরতারপর সে হেসে ফেলে এবং বলে, ‘ফরিদপুর হইলে কী হইবো, আমার এলাকা কিন্তু বিএনপির ঘাঁটিকামাল সাব খুব ভালা মানুষকিন্তু তার পার্টি বিএনপি ভালা নাসে গরিব লোকদের সাহায্য-সহযোগিতা করে, বর্ষায় জনসাধারণের চলাচলের জন্য ট্রলার দেয়
এ কথায় তার রাজনীতি সম্পর্কে একটু সংশয়ে পড়ে গেলামআরেকটু খোলাসা হতে ইচ্ছে হলোজিজ্ঞেস করলাম, ‘আওয়ামী লীগ দেশ চালাচ্ছে কেমন?’
না, চালাইতে পারতেছে না’, সে বললবিশেষ কইরা পুলিশ প্রশাসন একদমই চালাইতে পারতেছে নাএই মতের সঙ্গে সে ব্যাখ্যাও যুক্ত করলবলল, ‘কেমনে পারবো, সরকার আওয়ামী লীগ হইলেও পুলিশ, সরকারি অফিসার অনেকেই বিএনপি-জামাতেরআমার এলাকার থানায় যত পুলিশ অফিসার একের পর এক বদলি হইয়া আইছে, তারা সবাই বিএনপিরএরা সরকারের কথা মানে নাতার চাইতে সরকারকে ডোবানোর জন্য কাজ করেসে আরো বলল, ‘বিএনপির হাতে অনেক টাকাধরেন আমার এই গাড়ির মালিকের কথাইসে বিএনপির ৩০ জনরে চাকরি দিছেপ্রত্যেকের কাছ থেইকা নিছে ২ লাখ টাকাআওয়ামী লীগ দেশ চালাবো কেমনে? পারবো না
র‌্যাব বিষয়ে আপনার কী মত? সাধারণ মানুষ কি র‌্যাব চায়?’ আমি জানতে চাইলাম
তার স্পষ্ট মত হলো, ‘র‌্যাব দরকার আছের‌্যাব আছে বইলাই চাঁদাবাজগোর উৎপাত কমএখন কম চাঁদা দিতে অয়তবে মুশকিল হইল নকল র‌্যাবএরা ঘুষ নিয়া মানুষ মাইরা দেয়এরাই সরকাররে ডুবাইতাছে
জ্যাম-জটহীন রাস্তায় আলাপে আলাপে অল্পক্ষণেই আমার গন্তব্য বাবর রোডে পৌঁছে গেছি আমরানামবার আগে তার প্রতি আমার সর্বশেষ প্রশ্ন করলাম, ‘আগামীবার কারা নির্বাচিত হবে?’
এইটা আল্লায় জানে’, সে বলল
২.
গত সপ্তাহে একটা অফিসিয়াল ট্যুরে একদিনের জন্য চট্টগ্রাম যেতে হয়েছিলএকটা ভাড়া গাড়িতে করে এয়ারপোর্ট থেকে শহরের দিকে যাচ্ছিসিগন্যালে গাড়ি থেমেছেহঠাৎ চোখ গেল সড়কদ্বীপের দিকেদুটি শিশুবালককে দেখা গেল পালা করে একটা পলিথিনের প্যাকেট ফুলাচ্ছে
কী করে ওরা! খেলছে নাকি!ওদের দিকে তাকিয়ে আমি আনমনেই উচ্চারণ করে ফেললাম
গাড়িতে থাকা কলিগ ফেরদৌস বলল, ‘ওরা ড্রাগ নিচ্ছে
আমি বিস্ময় নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘এরা ড্রাগ নেবার পয়সা পায় কোত্থেকে?’
ফেরদৌস জানায়, ‘এটা করতে খুবই কম পয়সা লাগে আপাজুতার সোল লাগাতে যে সলিউশন ব্যবহার করে, ওটা পুড়ালে যে ধোঁয়া তৈরি হয়, এরা ওটাই ইনহেল করছে
কথায় কথায় জানা গেল, কাঠমিস্ত্রিরা তাদের কাজে যে সস্তা স্পিরিট ব্যবহার করে ওটাও নাকি নেশাদ্রব্য হিসেবে ব্যবহার করা হয় আজকালওই স্পিরিটটা ঝাঁকালে যে গন্ধ বেরোয়, সেটাই নাকি নেশার কাজ করে
আমি ভাবলাম, অন্য কথাআমাদের পত্রপত্রিকাগুলোকে প্রায়ই মাদকবিরোধী ভূমিকায় সক্রিয় দেখিকিন্তু ওরা তো এসব নিয়ে কখনোই প্রায় কিছু লিখে নাওরা বেশি তৎপর ট্রানজিট দেয়া না-দেয়া, দেশ বিক্রি করা না-করা, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হওয়া না-হওয়া ইত্যাদি নিয়েকিংবা বিদেশি হুইস্কি, ভোদকা, ওয়াইন ইত্যাদি নিয়েকার বাসায় কত বোতল বিদেশি মদ পাওয়া গেল সে নিয়ে তাদের প্রচুর কৌতূহলএ অভিযোগে মন্ত্রী, নেতা, ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে আমরা এমনকি মামলা হতেও দেখেছি
হুইস্কি, ভোদকা, ওয়াইন কতটা ক্ষতিকর কতটা নয় সে ব্যাপারে বিতর্ক আছেকিন্তু দরিদ্র জনগোষ্ঠী স্বাস্থ্যের পক্ষে হানিকর দ্রব্য নেশা হিসেবে গ্রহণ করে যেভাবে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, সেসব নিয়ে আমাদের বেশি করে কথা বলা দরকারকিন্তু এ ব্যাপারে মিডিয়াকে প্রায়ই নীরব থাকতে দেখি  
এমন কেন হয়? মিডিয়া কি কেবল বড়োলোকদের স্বাস্থ্যভাবনায় মগ্ন থাকবে? নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করলামদরিদ্র শ্রমজীবী মানুষ বা যারা আগামী সময়ে শ্রম দেবে তারা ক্ষতিকর নেশায় আচ্ছন্ন হয়ে গেলে অর্থনীতির চাকাটাই তো অচল হয়ে যাবেএদের রক্ষার জন্য কার্যকর উদ্যোগ কই?
জবাবটাও নিজেই খুঁজতে চাইলামএদের এই নেশার জগতে আসার বড়ো একটা কারণ বিনোদনহীনতা ও খেলাধুলার সুযোগ না-থাকাএকে তো দারিদ্র্যজনিত হতাশা, তার ওপরে হতাশা কাটাবার জন্য দরকারি বিনোদন ও খেলাধুলার সুযোগের সঙ্কট কাটানো না-গেলে এ অবস্থা পরিবর্তন করা যাবে না
আমরা আমাদের শৈশব-কৈশোরে খেলাধুলায় মগ্ন থাকবার অনেক সুযোগ পেয়েছিকী গ্রাম কী শহর উভয় ক্ষেত্রেই এখন খেলাধুলার সুযোগ অনেক কমে গেছেগ্রামে যেমন এখন আর গোল্লাছুট, দাড়িয়াবান্দা, হাডুডু, বৌচি, ডাংগুলি, কেরামবোর্ড, লুডু, জাম্বুরা দিয়ে ফুটবল খেলা নেই, নেই শহরেওশহরের পাশাপাশি কয়েকটা মহল্লাজুড়ে একটিও খেলার মাঠ নেইযেখানে আছে, তারও নেই ব্যবহারোপযোগিতাএরকম অবস্থায় আমাদের ছেলেমেয়েরা স্কুল থেকে ফিরে করবেটা কী? বাধ্য হয়ে ওরা হয় কম্পিউটার গেমে ডুবে থাকে, নয় বাইরে গিয়ে গাঁজা-ফেনসিডিলের আড্ডায় মেশে
এদের বাইরে শহরে যারা ঘরহীন ছিন্নমূল, তাদের ক্ষেত্রে বিনোদন বা খেলাধুলার সুযোগ প্রায় অসম্ভবখেলার মাঠ থাকলেও ওদের সেখানে কমই প্রবেশাধিকার থাকেএরা প্রায়ই মা-বাবার সন্ধান জানে না, অথবা জানলেও তাদের থেকে আলাদা থাকে বা থাকতে বাধ্য হয়এদের যে ধরনের হতাশাজনক অবস্থার ভিতর দিয়ে যেতে হয়, সেখানে জুতার আঠা দিয়ে ইনহেল করাকে খুব স্বাভাবিকই মনে হয়
ভাবি, এদের রক্ষায় সরকার ও আমাদের অনেক কিছুই করবার আছে 

Monday, 25 July 2011

জনসংখ্যা বনাম জনসম্পদ : প্রেক্ষিত নারীর সনাতনী প্রজনন কর্মভার/ রোকেয়া কবীর

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোকৃত আদমশুমারি ও গৃহগণনা ২০১১-এর প্রাথমিক ফলাফল থেকে জানা যাচ্ছে, বাংলাদেশের বর্তমান জনসংখ্যা ১৪ কোটি ২৩ লাখ ১৯ হাজার। এ বিষয়ক বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত ও আলোচনার সূত্রে ধারণা করা যায়, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান কর্তৃক শুমারি-পরবর্তী যাচাই-বাছাইয়ের পর প্রকৃত গণনায় এ সংখ্যা কিছুটা বেড়ে ১৫ কোটির কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়াতে পারে। যদিও জাতিসংঘভুক্ত সংস্থা ইউএনএফপিএ ২০০৮ সালেই জানিয়েছিল বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৬ কোটি ১৩ লাখ, সে হিসেবে ২০১১-এ মোট জনসংখ্যা ১৭ কোটিকেও ছাড়িয়ে যাবার কথা। যে কারণে দেশের প্রকৃত জনসংখ্যা কত তা নিয়ে নানা তর্কবিতর্কের সূত্রপাত ঘটেছে। এটা ঘটতেই পারে, কারণ প্রকৃত সংখ্যা ১৪ কোটি, ১৬ কোটি বা ১৭ কোটি যাই হোক, এই সংখ্যাটা কেবল একটা জড়সংখ্যাই নয়, এর আড়ালে রয়েছে মানুষ ও তার জীবন, যাদের রয়েছে নানা চাহিদা। জনসংখ্যার ওপরে ভিত্তি করেই দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা করা হয়, হিসেব করা হয় মাথাপিছু আয়ের। আবার এই জনসংখ্যাকে জনসম্পদে রূপান্তরিত করতে হলেও জনসংখ্যার একটা বাস্তব চিত্র জানা থাকা দরকার।

ক্ষুদ্রায়তনের এই দেশে বিদ্যমান সম্পদের তুলনায় উল্লিখিত পরিমাণ জনসংখ্যা বড়ো একটা চাপ সৃষ্টি করছে এতে কোনো সন্দেহ নেই। যে দেশের একটা উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নারী-পুরুষ প্রতিনিয়ত ক্ষুধা, দারিদ্র্য, অপুষ্টি ও রোগব্যাধিতে ভোগে, যার বড়ো অংশই নারী ও শিশু, সে দেশের বিপুল জনসংখ্যা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ মনোযোগ দাবি করে। এই বিপুল পরিমাণ জনসংখ্যার জীবনের ন্যূনতম মান বজায় রেখে জনসংখ্যা সমস্যাকে সম্ভাবনাময় জনশক্তিতে রূপায়িত করে দেশটাকে আরো অগ্রসর করে নিয়ে যেতে হলে খাদ্য ও পানীয় জল, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসার মতো মৌলিক চাহিদাসমূহ মেটানোর পাশপাশি ক্রমবর্ধমান চাহিদার প্রেক্ষিতে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, প্রয়োজনীয় জ্বালানির যোগান, কর্মসংস্থান ইত্যাদি খাতে ব্যাপকায়তন উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন, যা আমাদের সামনে একটা বড়ো চ্যালেঞ্জ।

দেশের সিংহভাগ মানুষ কৃষিনির্ভর হলেও দ্রুত নগরায়ণ, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, বাড়তি জনগোষ্ঠীর বাসস্থানের চাহিদা ইত্যাদি মেটাতে প্রতিবছরই আবাদি জমির পরিমাণ কমে যাচ্ছে, যা দেশের ক্রমবর্ধমান খাদ্য নিরাপত্তাকে বিরাট হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। এই হুমকির সমীকরণটা খুব স্বচ্ছ : জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে বাড়ছে খাদ্যের চাহিদা, আর বিপরীতে আবাদি জমির পরিমাণ কমে যাওয়ায় কমছে খাদ্য উৎপাদন। এই বিপরীতমুখী প্রলম্বন আমাদের এই ইঙ্গিতই দিচ্ছে যে, এক্ষুনি সতর্ক উদ্যোগ গ্রহণ না করলে আমরা ভয়াবহরকম এক সংকটজনক পরিস্থিতির মুখে পড়তে যাচ্ছি। এই বিপুল জনসংখ্যার জন্য খাদ্য ছাড়াও অন্য প্রয়োজনীয় চাহিদা যথা শিক্ষা, স্বাস্থ্য, রাস্তাঘাট ও যানবাহন এবং জ্বালানির যোগান দেওয়া, কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা ইত্যাদির জন্য রাষ্ট্রের ওপরে যে বাড়তি চাপ পড়ছে, সে চাপ মোকাবেলা করবার মতো যথেষ্ট প্রস্তুতি আমাদের এখনো নেই। তাছাড়া অধিক জনসংখ্যা পরিবেশের ওপরেও নানা ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে। ক্রমাগত বনভূমি উজাড়, নদীনালা-জলাশয় ভরাট, পাহাড় কর্তন ইত্যাদির ফলে প্রাকৃতিক ভারসাম্য যেভাবে বিনষ্ট হচ্ছে তা জনজীবনের জন্য হয়ে উঠছে মারাত্মক আরেক হুমকি। এসব বিবেচনায় জনসংখ্যা বৃদ্ধির এই হারকে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আনা খুবই দরকার।

নবপ্রকাশিত পরিসংখ্যান বলছে, দেশে বর্তমানে নারীর সংখ্যা ৭ কোটি ১০ লাখ ৬৪ হাজার, অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫০ ভাগই নারী। এই সংখ্যার গরিষ্ঠভাগ নারীই সনাতনী পরিবার ব্যবস্থা ও প্রজনন কর্মভার, পুরুষতান্ত্রিক সমাজদর্শন ও নানা নির্যাতন-নিষ্পেষণে কাবু। তথ্য-উপাত্ত বলছে, শিক্ষা, প্রশাসন, রাজনীতি ও সংসদ থেকে শুরু করে স্থানীয় সরকার এবং বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠান থেকে নেয়া ক্ষুদ্রঋণ ব্যবহার করে অপ্রাতিষ্ঠানিক অর্থ উপার্জনকারী কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ ক্রমাগত বাড়ছে, যা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও স্বীকৃত। আমরা যখন আমাদের নারীদের প্রচলিত-অপ্রচলিত বিভিন্ন নীতিনির্ধারণমূলক ও উপার্জনমূলক কাজে সাফল্যের সাথে বিচরণ করতে দেখছি, তখনও নারীর প্রতি সমাজের সনাতনী দৃষ্টিভঙ্গির কারণে তাদের প্রতি একের পর এক বিভিন্নমুখী নির্যাতনের ঘটনা ঘটে চলেছে। কী ভয়াবহ মাত্রায় দেশে নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে তা বুঝতে বেশিদূরে যাবার দরকার নেই। গত এক মাসে সংবাদমাধ্যমে যে পরিমাণ নারী নির্যাতনের ঘটনা উঠে এসেছে তা দিয়েই এ কথার সত্যতা উপলব্ধি করা যায়, যদিও যত নির্যাতনের ঘটনা দেশে ঘটে, প্রকাশিত ঘটনাগুলো তার একটি ক্ষুদ্র অংশ মাত্র।

নারীর প্রতি সমাজে বিরাজমান সনাতনী দৃষ্টিভঙ্গি নারীকে দেখতে চায় একজন ভালো মা, ভালো স্ত্রী, ভালো গৃহিণী হিসেবে। নারী যত শিক্ষিতই হোক, যত উপার্জনকারীই হোক, রাজনীতির মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ করুক; আমরা তাকে নারী হিসেবেই দেখি। এমনকি সরকার পরিচালনা, মন্ত্রণালয় পরিচালনা, অফিস পরিচালনার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজে নারী যুক্ত থাকলেও তাকে আমরা সক্রিয় একজন নাগরিক হিসেবে না দেখে নারী হিসেবেই দেখতে চাই। এতকিছুর পরেও আমাদের মনোযোগ থাকে এটা দেখায় যে, তিনি কতটা ভালো মা, কতটা ভালো স্ত্রী, কতটা ভালো গৃহিণী। আমরা দেখতে চাই তারা সন্তান ধারণ, জন্মদান, লালনপালন, পারিবারিক আতিথেয়তা ও ঘরের কাজ করায় কতটা পারদর্শী। অর্থাৎ নারীর প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি আজো সনাতনী প্রজনন কার্যক্রমেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিনিয়ত বদলাচ্ছে, কিন্তু নারীর প্রতি সমাজের এই দৃষ্টিভঙ্গি একই জায়গায় থেকে গেছে। আমাদের চারপাশের সমাজ থেকে এ কথার স্বপক্ষে অজস্র উদাহরণ হাজির করা যায়। সম্প্রতি সংঘটিত রুমানা মনজুরের নির্যাতনের ঘটনা যার একটি হতে পারে। তিনি লেখাপড়া করে বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার মতো কাজে যুক্ত ছিলেন, উপার্জন করতেন, প্রচলিত সংজ্ঞায় তিনি তাঁর সমাজে ক্ষমতায়িত ছিলেন; কিন্তু তাঁর স্বামী ও পরিবারের সনাতনী দৃষ্টিভঙ্গির কারণে তাঁকেও নির্যাতিত হতে হয়েছে, চোখ হারাতে হয়েছে। এতকিছু অর্জন করেও তাঁর অপরাধ ছিল এই যে, স্বামীর দৃষ্টিতে তিনি ভালো স্ত্রী ও তার সন্তানের ভালো মা হতে পারেন নি। যেন ভালো স্ত্রী, ভালো মা হওয়াই নারী জীবনের একমাত্র সাধনা হওয়া উচিত!

নারীর প্রতি সমাজের এই সনাতনী দৃষ্টিভঙ্গির কারণে কেবল শিক্ষিত হওয়া, উপার্জন করা, অংশগ্রহণ করতে পারাকেই আমরা ক্ষমতায়নের উপাদান হিসেবে দেখছি, ফলে নারী আজ দ্বিগুণ-ত্রিগুণ কর্মভারে পীড়িত হচ্ছে। উপার্জনমূলক কাজে পুরোমাত্রায় যুক্ত থাকার পরও তাকে পারিবারিক, সামাজিক ও শারীরিক নানা ঝক্কির মোকাবেলা করতে হচ্ছে। তাতে তার শারীরিক-মানসিক নানারকম চাপ নিতে হচ্ছে। নিতে হচ্ছে সময়ের চাপ। কিন্তু এই অবস্থা অমানবিক। এই অমানবিক অবস্থার পরিবর্তন চাইলে আমাদের অতি অবশ্যই বিদ্যমান সনাতনী দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে, নারীকে মানুষ এবং সক্রিয় নাগরিক হিসেবে দেখায় অভ্যস্ত হতে হবে। সমান মর্যাদা ও অধিকার ভোগের অধিকারী হিসেবে তাকে দেখতে হবে, যে অধিকার নারীকে আমাদের সংবিধানই দিয়েছে।

দেশের একজন নাগরিক হিসেবে তার যা যা প্রাপ্য তা তাকে দিতে হবে। বিপরীতে নাগরিক হিসেবে নারীর যা করণীয় তা তাদের করতে হবে, সক্রিয় নাগরিক হিসেবে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে। আর এটা করতে হলে নারীর ওপর থেকে একের পর এক সন্তান ধারণ ও তার লালনপালনের ভার কমাতে হবে, গার্হস্থ্য কাজের ভার কমাতে হবে। এসব ভার কমলেই তারা রাষ্ট্রের সক্রিয় নাগরিক হিসেবে সামাজিক-রাজনৈতিক দায়িত্ব পালন করবার সুযোগ এবং সময় পাবে। নিজেরা উপার্জনমূলক কাজে যুক্ত হতে পারবে।

একটা ছেলের ক্ষেত্রে আমরা বলি আগে মানুষ হও, নিজের পায়ে দাঁড়াও, তারপরে বিয়ে-সংসার করো ইত্যাদি। একইভাবে একটি মেয়েকেও আগে মানুষ হওয়া ও নিজের পায়ে দাঁড়াবার অবকাশ দিতে হবে। সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি বদলিয়ে এরকম ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে ছোটোবেলা থেকেই একটা মেয়ে মানুষ হিসেবে সমান স্বীকৃতি ও মর্যাদা পায় এবং শিক্ষাগ্রহণ, পেশা নির্বাচন ও নিজের ভালোমন্দ নিজেই ঠিক করবার সুযোগ পায়। একজন মানুষের জীবনে ১৫ থেকে ৫০ বৎসর বয়সসীমা হচ্ছে সবচেয়ে উৎপাদনক্ষম সময়। অথচ সনাতনী চিন্তাভাবনার কারণে আমাদের সমাজের প্রায় প্রতিটি নারীর এ সময়টা সন্তান জন্মদান ও তার লালনপালনে ব্যয় হয়ে যায়। এই সনাতনী দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই সমাজ থেকে আইন করেও বাল্যবিয়ে দূর করা যাচ্ছে না, কমানো যাচ্ছে না মাতৃমৃত্যুর উচ্চহারও। আইনানুযায়ী যেখানে একটি মেয়ের বিয়ের ন্যূনতম বয়স ১৮, সেখানে আমাদের দেশে মেয়েদের গড় বিয়ের বয়স ১৫। এই গড় আমাদের এই ধারণা দেয় যে, দেশে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিয়ে হয় ১২ বছর বয়সের মধ্যে। আর এর ফলে অল্প বয়সেই এই মেয়েদের গর্ভধারণ করে নিজেদের জীবনটা বিপন্ন করবার ঝুঁকি নিতে হয়। এদের একটা অংশের সন্তান জন্মদানের সময় মৃত্যুর আশঙ্কা থাকে, অনেকে মৃত্যুবরণ করে। এই মৃত্যহার এখনো অগ্রহণীয় পর্যায়ে রয়ে গেছে। ২০১০-এ প্রকাশিত হিসেবে এখনো দেশে প্রতি লাখে ১৯৪ জন মা প্রসবকালে মৃত্যুর শিকার হয়। যারা বেঁচে থাকে তাদেরও সন্তান ও সংসারের ঘাঁনি টানা এবং স্বামী-শ্বশুর-শাশুড়ির সেবা করা ছাড়া জীবনে আর কিছুই করা হয়ে ওঠে না। নারীসমাজকে সন্তান ও সংসারের ভারে এভাবে জর্জরিত হওয়ার অবস্থা থেকে মুক্তি দিতে হবে। তাতে মেয়েরা পড়াশোনা করে নিজে উপার্জনক্ষম হতে পারবে, মা ও শিশুমৃত্যুর হার কমবে, পরিবারব্যবস্থাপনা করা হবে অনেক সহজ। সন্তানকে ঠিকমতো লেখাপড়া করানো, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া ও মানুষ করে তুলবার মতো অর্থনৈতিক সামর্থ্যও তাদের করায়ত্ত হবে। পরিবার ছোটো হলে জনব্যবস্থাপনায় সুবিধা হবে রাষ্ট্রেরও। বিপুল পরিমাণ মানুষের জীবনমান নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রের কোষাগারের ওপর চাপ কমবে। অর্থাৎ সকল মানুষের জীবনের মানগত উন্নয়ন ঘটবে, বিদ্যমান দারিদ্র্যাবস্থার বদল ঘটবে।

নারীর ব্যাপারে সমাজের মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গিটা বদলালে নারী নির্যাতনের হার কমবে। মেয়েকে কোনো পরিবারেই ভার হিসেবে দেখা হবে না। আর এরকম অনুকূল অবস্থা তৈরি হলে নারীও মুখ বুজে পড়ে থাকবে না, নিজের জীবন গড়ার পাশাপাশি পরিবার ও সমাজের জন্য, দেশের জন্য নিজে ভূমিকা রাখতে উদ্যোগী হবার অবকাশ পাবে। তারা যদি সামাজিক-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় থাকবার সুযোগ পায়, তাহলে নিশ্চিতভাবে বাল্যবিয়ের হার কমবে, শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার কমবে, উন্নতি হবে প্রজননস্বাস্থ্যের। তার অন্যতম প্রধান ফল হবে ক্রমহ্রাসমান জনসংখ্যার হার।

কাজেই যত দ্রুত সম্ভব নারীর প্রজনন কর্মভার কমানো ও নারীর প্রতি সমাজের সনাতনী দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর জন্য সরকারি ও বেসরকারিভাবে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। সম্ভাব্য উদ্যোগগুলোর মধ্যে একটি হতে পারে, বিভিন্ন নাগরিক সুবিধা গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় মানদণ্ড স্থাপন। তাতে যেসব পরিবার ও সমাজে নারীর প্রতি সনাতনী দৃষ্টিভঙ্গি আছে, রাষ্ট্রীয় ও অন্যান্য সুযোগসুবিধা প্রাপ্তির আগ্রহে ওই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তারা বেরিয়ে আসবে। যেমন যদি বিভিন্ন সরকারি, বেসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে চাকুরি প্রাপ্তি ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে এরকম নিয়ম বেঁধে দেওয়া হয় যে, বাল্যবিয়ে হয় নি বা পরিবারের কারো সন্তানসংখ্যা একটি বা দুটির বেশি নয় এমন পরিবারের সদস্যদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে; তাহলে নিশ্চিতভাবে সমাজে এর একটা ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। এটি একটি উদাহরণমাত্র। এই আলোকে চাকুরি ও পদোন্নতি প্রাপ্তি, ব্যাংক ঋণ প্রাপ্তি, স্বাস্থ্য সেবা প্রাপ্তি, বিনামূল্যে শিক্ষা সুবিধা প্রাপ্তি ইত্যাদি ক্ষেত্রে বিভিন্ন মানদণ্ড স্থাপন (ইনডিকেটর সেট) করার কথা ভাবা যেতে পারে। তাছাড়া স্কুল-কলেজের পাঠ কার্যক্রম ও প্রচার মাধ্যমে এ বিষয়ে ব্যাপক আলোচনা, বিতর্ক ইত্যাদির মাধ্যমে সামগ্রিক সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগও গ্রহণ করা যেতে পারে।

সর্বোপরি বলা যায়, নারীর প্রতি বিদ্যমান সনাতনী সমাজ ব্যবস্থায় নারীসমাজকে যে পরিমাণ অমানবিক অবস্থার ভিতর দিয়ে জীবনধারণ করতে হয়, সে অবস্থার পরিবর্তন করা না গেলে সমাজের বর্তমান অসম ও নির্যাতন-নিষ্পেষণমূলক অবস্থায় কোনো স্থায়ী পরিবর্তন আসবে না। এ অবস্থায় কোনো উন্নয়ন উদ্যোগই পুরোপুরি কার্যকর হবে না, বরং তা হবে মূল কারণ টিকিয়ে রেখে পার্শ্ব কারণসমূহ দূরীভূত করবার জন্য শ্রম ও অর্থ বিনিয়োগ।

Thursday, 14 July 2011

ভিকারুননিসা নূন স্কুলের ধর্ষক-শিক্ষক পরিমল জয়ধর এবং বদরগঞ্জের নির্যাতক সালিশকার ইউপি চেয়ারম্যানসহ সম্প্রতি সংঘটিত সকল নারী নির্যাতন ঘটনার অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনের অবস্থানপত্র

ভিআইপি হল, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি, ঢাকা। ১৪ জুলাই ২০১১

প্রিয় সাংবাদিক বোন ও ভাইয়েরা,
বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘ (বিএনপিএস)-এর পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা জানবেন।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি, সালিশের নামে নির্যাতন, যৌতুকের নামে হত্যা এবং পারিবারিক নির্যাতনসহ নারীর প্রতি সকল প্রকার সহিংসতার বিরুদ্ধে আমাদের প্রতিবাদ জানাতে এবং এ বিষয়ে করণীয় সম্পর্কে আমাদের বক্তব্য ও দাবিসমূহ তুলে ধরার জন্য আজকের এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে।
সংবাদকর্মীদের প্রশ্নের জবাব দিচ্ছেন বিএনপিএস নির্বাহী পরিচালক নারীনেত্রী রোকেয়া কবীর। পাশে উপবিষ্ট (ডানে) বিএনপিএস কার্যনির্বাহী পরিষদ সদস্য বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী কনকচাঁপা চাকমা ও বিএনপিএস পরিচালক ওমর তারেক চৌধুরী এবং (বামে) বিএনপিএস উপপরিচালক শাহনাজ সুমী ও অ্যাডভোকেসি সমন্বয়কারী দিলারা রেখা

প্রিয় বন্ধুগণ,
ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের বসুন্ধরা শাখার শিক্ষক পরিমল জয়ধর কর্তৃক শিক্ষার্থীকে ধর্ষণ ও নিপীড়ন এবং নিপীড়নের ছবি ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেয়ার হুমকি দেয়ার ঘটনায় বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘ তীব্র নিন্দা, ক্ষোভ ও ঘৃণা প্রকাশ করছে। আমরা গভীর উদ্বেগের সাথে লক্ষ করেছি যে, এ ঘটনায় স্কুল কর্তৃপক্ষ নিপীড়িত ছাত্রীকে উপযুক্ত সহায়তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। গণমাধ্যমসূত্রে আমরা আরো অবগত হয়েছি, পরিমল ছাড়াও একই শাখার আরো চার শিক্ষকের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থী নিপীড়নের অভিযোগ রয়েছে। আমরা ধর্ষক পরিমল, এ কাজে প্রশ্রয়দানকারী কর্তৃপক্ষ এবং অভিযুক্ত অন্য চার শিক্ষকসহ সকল অপরাধীকে আইনানুগ বিচারের আওতায় আনার জোর দাবি জানাচ্ছি।

সম্প্রতি ব্রাক্ষণবাড়িয়ার আখাউড়ায় শিক্ষক দ্বারা শিক্ষার্থী নিপীড়নের আরেকটি ঘটনার খবর কাগজে প্রকাশিত হয়েছে। স্কুলের শ্রেণিকক্ষে ঢুকে যৌন নিপীড়নকারী ওই শিক্ষক ইতোমধ্যে গ্রেপ্তারও হয়েছেন। আমরা শিক্ষকের বেশধারী এই নিপীড়কেরও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।

প্রিয় ভাই ও বোনেরা,
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানির ঘটনা নতুন কিছু নয়। ঠিকমতো অনুসন্ধান করলে দেখা যাবে, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অহরহই নানামাত্রায় যৌন নিপীড়নের ঘটনা ঘটে চলেছে। মেয়েশিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্য করে আপত্তিকর ইঙ্গিতপূর্ণ কথা বলা থেকে শুরু করে নানা ছলে তাদের শরীরে হাত দেওয়া পর্যন্ত ঘটনা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে হামেশাই ঘটে বলে অভিযোগ রয়েছে। ছেলেশিক্ষার্থীরাও যৌন নিপীড়নের শিকার হচ্ছে বিভিন্ন মাদ্রাসা ও স্কুলে। নির্যাতন সম্পর্কিত স্পষ্ট ধারণা না-থাকা, নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতনতার অভাব, যুক্তিসংগত অভিযোগ জানাবার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অনুপস্থিতি, অভিযোগ জানাবার পর অভিযোগকারীর নিরাপত্তার অভাব, শিক্ষকগণ কর্তৃক নানামাত্রিক হুমকি, শিক্ষার্থীদের সাথে অভিভাবকদের সহজ সম্পর্ক না-থাকা, সমাজ ও অভিভাবকগণ কর্তৃক মেয়েদের ওপরে দোষ চাপানোর পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা, সমাজে প্রচলিত সনাতনী এবং পুরুষতান্ত্রিক চেতনা উদ্ভূত লজ্জাবোধ, ইত্যাদি কারণে এসব ঘটনা প্রায়ই প্রকাশিত হয় না। আমরা ধারণা করি, প্রাইভেট, কোচিংক্লাস ও বিশেষ তত্ত্বাবধানের নামে শিক্ষার্থীদের একা পাবার সুযোগ নিয়ে সারাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে রক্ষক হয়ে ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ এক শ্রেণির শিক্ষকদের দ্বারা যে পরিমাণ ধর্ষণ/বলাৎকারের ঘটনা ঘটে থাকে, তার বেশিরভাগই অপ্রকাশিত থেকে যায়।

স্থানীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সকল ক্ষেত্রে নারীর ক্ষমতায়ন ও সমানাধিকার কায়েমের লক্ষ্যে মেয়েরা যখন শিক্ষায় ব্যাপকভাবে অগ্রসর হয়ে এসেছে, যখন তারা একের পর এক সাফল্যের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে চলেছে, তখন এই ধরনের ঘটনা আমাদের এই অর্থেও উদ্বিগ্ন করে তুলে যে, এতে অনেক অভিভাবক তাদের মেয়েদের স্কুলে পাঠানো বন্ধ করে দিয়ে বাল্যবিয়েতে আগ্রহী হয়ে উঠতে পারেন। এতে যে শুধু ওই মেয়েদেরই ক্ষতি হবে তা নয়, বরং ক্ষতিগ্রস্ত হবে নারীসমাজসহ গোটা জাতি। এই পরিপ্রেক্ষিতে আমরা মনে করি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি ও নিপীড়ন প্রতিরোধে মহামান্য হাইকোর্ট প্রদত্ত নির্দেশনামূলক নীতিমালা অনুসরণ বাধ্যতামূলক করার ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। এজন্য একইসঙ্গে শিক্ষা, আইন এবং নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে এ বিষয়ে বিশেষ নির্দেশনা জারি করাসহ জারিকৃত আইন ও নির্দেশনা কার্যকর করারও দাবি জানাচ্ছি। আমরা মনে করি, সকল স্তরের শিক্ষালয়ে যৌন হয়রানি বন্ধ করার পরিবেশ তৈরির জন্য অনতিবিলম্বে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জরুরিভাবে পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন।

প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুরা,
আশা করি আপনারা জানেন যে, গত ২৬ জুন ২০১১ রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার রাজারামপুর কাশীগঞ্জে দুই গৃহবধূ সাইদা ও হ্যাপীকে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের নবনির্বাচিত চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে তথাকথিত সালিশের নামে পাশবিক কায়দায় অবর্ণনীয় নির্যাতন করা হয়েছে। দুটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলে নির্যাতনের দৃশ্য সম্বলিত খবর প্রচারের পর চেয়ারম্যানের লোকজন প্রভাব খাটিয়ে একজন নির্যাতিতের মুখ থেকে তার ওপরে কোনো নির্যাতন করা হয় নি বলিয়ে নিয়ে তাদের দুজনকেই গ্রামছাড়া করে দিয়েছে, যারা এখন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। শুধু তাই নয়, ‘একুশের চোখ’-এর অনুসন্ধানী দল এ ঘটনার ফলোআপ খবর সংগ্রহে গেলে চেয়ারম্যানের লোকজন পুরো দলটির ওপর হামলা চালিয়ে চারজনকে মারাত্মকভাবে আহত করে। খবরে প্রকাশ, স্থানীয় পুলিশ তিনজনকে গ্রেফতার করলেও ঘটনার মূল হোতা ইউপি চেয়ারম্যানকে এখনো গ্রেফতার করতে সক্ষম হয় নি।

ঘটনার এই গতিপ্রকৃতিতে নারীসমাজ বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন। নারীনীতিবিরোধী যে অপশক্তিকে আমরা রাজপথে বুকে পবিত্র কোরানশরিফ বেঁধে মিছিল করতে দেখেছি, ওই গোষ্ঠীটি নারীর বিরুদ্ধে যে ধরনের নির্যাতনের সংস্কৃতি দেশে চালু রাখতে চায়, এ ঘটনায় যেন আমরা তারই
বাস্তবায়ন দেখলাম। কিন্তু আমরা ভেবে পাই না, স্থানীয় প্রশাসনের নাকের ডগায় সালিশের নামে নারীর বিরুদ্ধে জঘন্য ফতোয়া কার্যকর করেও ফতোয়াবাজরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে একটি গ্রামে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে চলে কীভাবে? এ ধরনের ঘটনা যেন দেশে আর একটিও না-ঘটে সে ব্যবস্থা করবার জন্য আমরা বিশেষভাবে মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।   

প্রিয় বন্ধুরা,
আমরা আজ শুধু ঢাকার ভিকারুননিসা নূন স্কুল বা রংপুরের বদরগঞ্জের ঘটনার কথাই এখানে বলতে আসি নি। আমরা সামগ্রিকভাবে পরিবার, কর্মস্থল, শিক্ষাঙ্গন, রাস্তাঘাটসহ সর্বত্র নারীর প্রতি সংঘটিত নির্যাতন, নিপীড়ন ও হয়রানির ঘটনার যে বিস্তৃতি, তার প্রশমনে সমাজ ও সরকারের প্রতি কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের কথাই মূলত বলতে এসেছি। আমরা এখানে রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার সিমলা দীঘিপাড়া গ্রামের আদিবাসী নারী মরিয়ম মুর্মুর ধর্ষণ ও হত্যার কথা বলতে পারি, মতিঝিলে স্বামীর পিটুনিতে নিহত স্ত্রীর কথা বলতে পারি, নারায়ণগঞ্জে সিঙ্গাপুর প্রত্যাগত প্রবাসী নারীশ্রমিককে গণধর্ষণের পর আগুন দিয়ে পোড়ানোর কথা বলতে পারি; কিন্তু এরকম পাঁচ-দশটি ঘটনার কথা বলে এই অব্যাহত নির্যাতন ও মৃত্যুমিছিলের পুরো বর্ণনা দেওয়া সম্ভব নয়। এরকম নিপীড়নঘটনা সারাদেশে প্রতি মুহূর্তেই ঘটছে, যার প্রকৃত কোনো হিসেব কারো কাছেই নেই। অথচ এসব নির্যাতন ঘটনার সুষ্ঠু বিচার ও শাস্তি প্রদান কিংবা এ ধরনের সম্ভাব্য ঘটনা প্রতিরোধে রাষ্ট্রীয়-সামাজিক পদক্ষেপ গ্রহণের দৃষ্টান্ত আমরা খুব কমই স্থাপন করতে পেরেছি ও পারছি।

বন্ধুগণ,
সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখানো হয়েছে, নারী নির্যাতনের কারণে প্রতিবছর দেশের জিডিপির ২.০৫ শতাংশ অর্থ অপচয় হয়, যা জাতীয় বাজেটের স্বাস্থ্য ও পুষ্টি খাতের মোট বরাদ্দের সমান। এ পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয় নির্যাতন-সংশ্লিষ্টদের চিকিৎসা, মামলা-মোকদ্দমা, সালিশ, সামাজিকতা রক্ষা এবং সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে নারী নির্যাতনবিরোধী সচেতনতা কর্মসূচি চালাতে। তার মানে হলো, নারীর প্রতি সহিংসতা, নির্যাতন, নিপীড়ন, হয়রানি, ধর্ষণ, অ্যাসিড নিক্ষেপ, ফতোয়া, মৌখিক হয়রানি, মানসিক নির্যাতন চূড়ান্ত বিচারে শুধু নির্যাতন-সংশ্লিষ্টদেরই ক্ষতি করে না, বরং সমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে সমাজের সকল নারী-পুরুষ ও শিশুকে। আমরা নারী-পুরুষ সকলের জন্যই এই ভয়ংকর অমানবিক পরিস্থিতি ও অর্থনৈতিক অপচয় থেকে দেশ ও দেশের মানুষের মুক্তি চাই। এ অবস্থা কোনো সুস্থ সমাজের জন্যই কাম্য হতে পারে না। আমরা দৃঢ়ভাবে এমন অবস্থার অবসান চাই। এই অনাকাক্সিক্ষত অবস্থার পরিবর্তনের জন্য আমরা নিচের দাবি ও আহ্বান আপনাদের মাধ্যমে সরকার ও দেশবাসীর সামনে তুলে ধরছি :

  • ভিকারুননিসা নূন স্কুলের ধর্ষক-শিক্ষক পরিমল জয়ধর এবং তার সহযোগী ও প্রশ্রয়দানকারী, রংপুরের দুই গৃহবধূর ওপর নির্যাতনকারী ইউপি চেয়ারম্যানসহ সকল সালিশকার, ব্রাক্ষণবাড়িয়ার আখাউড়ার যৌন নিপীড়নকারী শিক্ষক, গোদাগাড়ী উপজেলার আদিবাসী নারী মরিয়ম মুর্মুর ধর্ষক ও হত্যাকারী, অধ্যাপক রুমানা মনজুরের নিপীড়ক স্বামীসহ সম্প্রতি ও অদূর অতীতে সংঘটিত সকল নারী নির্যাতন ঘটনার অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
  • সকল স্তরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অনতিবিলম্বে যৌন নিপীড়ন বিরোধী পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা চালু করতে হবে।
  • যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে দেওয়া হাইকোর্টের নির্দেশনা বাস্তবায়ন করবার কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। কর্মস্থল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জেন্ডার-সংবেদনশীল চাকুরিবিধি, আচরণবিধি বা কোড অব কন্ডাক্ট প্রণয়ন করতে হবে, যাতে এসব প্রতিষ্ঠান থেকেই অপরাধীর শাস্তির ব্যবস্থা করা যায়।
  • শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের মধ্যে জরিপ পরিচালনা করে শিক্ষার্থীদের সাথে আপত্তিকর আচরণকারী শিক্ষক-কর্মচারীদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
  • বিশ্ববিদ্যালয়সহ সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি দপ্তর ও নির্দিষ্ট সংখ্যক নারীকর্মী সম্বলিত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত নারীকর্মীদের পারিবারিক নির্যাতনসহ যেকোনো ধরনের হয়রানি, নিপীড়নমূলক সংঘটিত ও সম্ভাব্য ঘটনায় তাদেরকে সহায়তা ও পরামর্শ দেবার মতো প্রাতিষ্ঠানিক পেশাদারি ব্যবস্থা সারাদেশেই প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
  • দেশে প্রচলিত নারী নির্যাতনবিরোধী আইনসমূহ কেন কার্যকর করা যাচ্ছে না তার কারণ চিহ্নিত করার জন্য মনিটরিং করা ও সে অনুযায়ী আইনগুলো কার্যকর করার জন্য বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
  • স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক ও শিক্ষা প্রশাসন এবং বিচারব্যবস্থাকে নারীসংবেদী করে গড়ে তুলতে প্রশিক্ষণের আয়োজন করে সংবিধানোক্ত নারী অধিকার, নারী-পুরুষ সমতা, নারী নির্যাতনবিরোধী আইন ও আন্তর্জাতিক সনদ সম্পর্কে প্রায়োগিক ধারণা দেওয়া ও প্রয়োগে ব্যর্থ হলে তাদের বিচারের আওতায় আনার ব্যবস্থা করতে হবে।
  • সকল নারী নির্যাতন ঘটনার শিকার ও তাদের প্রত্যেকের পরিবারের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
  • নিপীড়নের শিকার নারী ও তার পরিবারের জন্য মনস্তাত্ত্বিক সহায়তা পরিষেবার ব্যবস্থা চালু করতে হবে।
  • নারীর প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির প্রসার ঘটায় এমন ধরনের নাটক-গান-বিজ্ঞাপন-বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান প্রচার থেকে গণমাধ্যমকে (রেডিও-টিভি-সংবাদপত্র) বিরত রাখতে কার্যকর সম্প্রচার নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে।
  • সরকারি-বেসরকারি মালিকানাধীন সকল রেডিও-টিভি চ্যানেল ও সংবাদপত্রের জন্য নারী নির্যাতন প্রতিরোধের লক্ষ্যে নির্দিষ্ট পরিমাণ জনসচেতনতামূলক (নারী-পুরুষ সমতা সম্পর্কিত সাংবিধানিক ধারা, নারী নির্যাতন প্রতিরোধের উপায়, প্রচলিত আইন, আইনে কথিত শাস্তি ইত্যাদি) সরকারি ও বেসরকারি বিজ্ঞাপন বিনা খরচে প্রচার করা বাধ্যতামূলক করতে হবে। আইনি বাধ্যবাধকতা ছাড়াও সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে এ বিষয়ে সহযোগিতা করার জন্য আমরা সংবাদমাধ্যকে স্বতঃপ্রণোদিতভাবে এগিয়ে আসার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করছি।
  • নারী নির্যাতনের সকল ঘটনাকে শহর-গ্রাম-ধনী-গরিব-পেশা ও সামাজিক অবস্থা নির্বিশেষে সমভাবে, সমগুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে।
বন্ধুরা,
আমরা মনে করি, নারী নির্যাতন প্রতিরোধে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে আমরা সবাই ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারি। নারীর প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির ইতিবাচক পরিবর্তন আনার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে এক্ষেত্রে। নারীর ওপর নির্যাতন আসলে চূড়ান্ত বিচারে আমাদের সবার ওপর নির্যাতন। এ অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে দরকার সনাতনী ‘সামাজিক সম্মান’, ‘পারিবারিক মর্যাদা’, ‘দুর্নাম’ ইত্যাদি চিন্তার বাইরে বেরিয়ে নির্যাতন প্রতিরোধে সরব হওয়া, এর প্রতিবাদে মুখ খোলা, সংগঠিত হওয়া এবং অবিলম্বে সরকারি ব্যবস্থাদি ও নিকটজনের সহায়তা চাওয়া। নারীর উপর নিপীড়ন প্রতিরোধে পর্যাপ্ত রাষ্ট্রীয় সহায়তার অভাব এবং নাগরিকদের নিষ্ক্রিয়তা নির্যাতক-নিপীড়কদের বল্গাহীন বেড়ে ওঠাকে উৎসাহিত করে।

শিক্ষার্থী ও নারীর উপর নিপীড়নকারীদের প্রতিহত করার প্রধানতম দায়িত্ব সরকারের। আমরা আশা করি সরকার কার্যকর ব্যবস্থাদি নিশ্চিত করে সর্বস্তরের মানুষকে সকল ধরনের নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলে সরকারি ব্যবস্থাকে স্থায়িত্ব প্রদানের সহায়ক শক্তিতে পরিণত করার ইতিবাচক পরিবেশ রচনা করবে। সাধারণ নাগরিক এবং সরকারের মিলিত শক্তিই কেবল পারে নারীর জন্য একটি গণতান্ত্রিক ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে। নারীর জন্য সেই পরিবেশই আমাদের কাম্য।

আপনাদের সবাইকে ধন্যবাদ।

নারীসমাজের পক্ষে

রোকেয়া কবীর
নির্বাহী পরিচালক
বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘ

এই ইভেন্টের ফটো অ্যালবাম ফেসবুকে

Thursday, 23 June 2011

জাতীয় বাজেট ২০১১-১২ : নারীনীতি বাস্তবায়নের অঙ্গীকারের প্রতিফলন নেই

-->
সরকার এ বছর জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি ঘোষণা করেছেঅথচ তার পরবর্তি বাজেটেই নারী বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ (১,২৩৭ কোটি টাকা) গতবারের তুলনায ৪ কোটি টাকা কমে গেছেনারী নীতি বাস্তবায়নের জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট দিক-নির্দেশনাও বর্তমান বর্তমান বাজেটে নেইনারী বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দকৃত খাতসমূহ বিশ্লেষণ করে দেখা যায় যে বরাবরের মত এবারেও নারীকে কল্যাণ-ভিত্তিক অ্যাপ্রোচ থেকে দেখা হচ্ছেযা নারী উন্নয়ন নীতির মূল দৃষ্টিভঙ্গির সাথে খাপ খায় না। 

একই সাথে বরাদ্দের হিসাবের পাশাপাশি উল্লিখিত বরাদ্দ নারী উন্নয়নে কীভাবে কাজ করছে তার বিশ্লেষণও জরুরিনারীর প্রকৃত ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে হলে শুধুমাত্র প্রকল্পভিত্তিক আর্থিক সুবিধা সংক্রান্ত কর্মসূচিই যথেষ্ট নয়শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর অংশগ্রহণসহ ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনের সব স্তরে নারীর সমমর্যাদা ও অবস্থান নিশ্চিত করতে নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক সব আচার, প্রথা, আইন ও নীতিমালার পরিবর্তন ও সংশোধনে আইনী, প্রশাসনিক ও সামাজিক বিভিন্ন উদ্যোগের সমন্বয় প্রয়োজনসে লক্ষ্যে নারী উন্নয়নে গৃহীত কর্মসূচি নারীর প্রকৃত ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করছে কিনা তার মূল্যায়নপূর্বক গৃহীত বিভিন্ন কর্মসূচির প্রয়োজনীয় পুনর্বিন্যাস করে সঠিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। 

জেন্ডার-বিভাজিত তথ্যউপাত্ত

রাষ্ট্রীয় নীতিসমূহের বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা প্রণয়ন, নীতিসমূহের সুষম বাস্তবায়ন ও সুযোগসুবিধা বণ্টনে বৈষম্য নিরোধের জন্য সকল মন্ত্রণালয়ের জেন্ডার-বিভাজিত তথ্যউপাত্ত প্রস্তুত করবার উদ্যোগ নেওয়া দরকার২০১০-১১ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় মাননীয় অর্থমন্ত্রী জাতীয় সংসদে ১০টি মন্ত্রণালয়ের জেন্ডার বিভাজিত উপাত্ত উপস্থাপন করেছিলেনযা ২০১১-১২ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় ২০টি মন্ত্রণালয়ে উন্নীত হয়েছে। 

শিক্ষা

২০১১-১২ অর্থবছরে শিক্ষা ও প্রযুক্তিখাতে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ২০,৩৩৯ কোটি টাকা যা মোট বাজেটের ১২.৪% এবং মোট জিডিপির ২.২৬%  শিক্ষাক্ষেত্রে এই বাজেট গত বছরের মোট বাজেট বরাদ্দের হার বিবেচনায় ১.৫% কম
গত কয়েক বছর ধরে প্রাথমিক স্তরে নারীর জন্য বাজেটে বরাদ্দ থাকার ফলে ছেলে ও মেয়ে শিক্ষার্থীর মধ্যে সংখ্যাগত বৈষম্য দূর হয়েছেযার ফলে প্রাথমিক শিক্ষাস্তরে এমডিজির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনেও বাংলাদেশ সফল হয়েছে নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যেইকিন্তু ঝরে পড়ার হার এখনো অগ্রহণযোগ্য পর্যায়ে থেকে যাওয়ায় মাধ্যমিক ও উচ্চতর শিক্ষায় এখনো ব্যাপক জেন্ডার বৈষম্য রয়েছেগত ১০ বছরে এই বৈষম্য কমেছে অতি সামান্যইমেয়েদের জন্য উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত শিক্ষাগ্রহণ অবৈতনিক করে ও শিক্ষা উপবৃত্তি বাড়িয়েও এই বৈষম্য কমানো যাচ্ছেনাবাল্যবিবাহ ও যৌণ হয়রানী এর পেছনে অন্যতম প্রধান কারণতাই মেয়েদের শিক্ষার হার বাড়াতে হলে এই সামাজিক সমস্যাগুলো দূর করার প্রতি গুরুত্ব বাড়াতেই হবে

প্রস্তাবিত বাজেট বক্তৃতায় মাদ্রাসা শিক্ষার আধুনিকায়নের জন্য ৩০টি মডেল মাদ্রাসা গড়ে তোলা ও ৩১টি মাদ্রাসায় অনার্স কোর্স চালু করার যে উদ্যোগ গ্রহণ করার কথা বলা হয়েছে তা শিক্ষানীতি অনুযায়ী এক ও অভিন্ন পাঠ্যসূচি ও পাঠ্যক্রম নির্ভর অসাম্প্রদায়িক চেতনামুখি জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এর সাথে সাংঘর্ষিক আর ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক চেতনা বরাবরই নারীর বিরুদ্ধে যায়

স্বাস্থ্য, প্রজনন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা

আগামী ২০১১-১২ অর্থবছরে স্বাস্থ্যখাতে মোট বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ৮ হাজার ৮৮৬ কোটি টাকা যা মোট বাজেটের ৫.৪% এবং মোট জিডিপির মাত্র ০.৯৮% যেখানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, মাঝারি মানের স্বাস্থ্যসেবার জন্যও জিডিপির ৫% বরাদ্দ থাকা দরকারগত ২০১০-১১ অর্থবছরে স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ ছিল মোট বাজেটের ৬.২% কিন্তু এবার দেয়া হয়েছে মোট বাজেটের মাত্র ৫.৪% বরাদ্দ যেখানে শুধুমাত্র প্রজনন স্বাস্থ্য নিশ্চিত করার জন্যই প্রতিবছর ৯% বাজেট বরাদ্দ প্রয়োজনঅর্থমন্ত্রী ঘোষিত বাজেট বক্তৃতায় স্বাস্থ্যসেবায় ইতিবাচক কর্মসূচি হিসেবে চলতি বাজেটে জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে ৯৭টি মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র, ইউনিয়ন পর্যায়ে ৩ হাজার ৯০০টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র এবং ৩০ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে মা, শিশু ও প্রজনন স্বাস্থ্য এবং পরিবার-পরিকল্পনা সেবার পরিধি সম্প্রসারণ করার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। 

মাতৃস্বাস্থ্য উন্নয়নে এমডিজির লক্ষ্য অর্জন করতে হলে সুবিধাবঞ্চিত ও দুর্গম অঞ্চলে যথাযথভাবে মাতৃস্বাস্থ্য ও প্রসূতি সেবা পৌছানো নিশ্চিত করা দরকারএছাড়াও সরকারি-বেসরকারি যৌথ উদ্যোগে ধাত্রী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাটি নতুনভাবে চালু ও আধুনিকীকরণ করা এবং ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ের সকল হাসপাতালে জরুরি ধাত্রীসেবা কার্যক্রম চালু করা অপরিহার্যনারীর সার্বিক স্বাস্থ্য নিশ্চিত করার জন্য প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে নারী ডাক্তারের সেবা নিশ্চিত করা ও নারীর পেশাগত স্বাস্থ্য ঝুঁকিসংক্রান্ত সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন

নারী উন্নয়ন নীতিতে নারীর ক্ষমতায়নের যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, সেখানে পৌঁছতে হলে নারীর প্রজনন কর্মভার কমিয়ে এনে সামাজিক ও উপার্জনমূলক কর্মকাণ্ডে তাদের কার্যকর অংশগ্রহণের লক্ষ্যে স্বাবলম্বী নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নিতে হবেএজন্য জরুরিভিত্তিতে জন্মনিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম জোরদার করবার ব্যবস্থা নিতে হবেপরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম পরিচালিত হয় সরকারের স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও জনসংখ্যা কার্যক্রমএর মাধ্যমেএই কার্যক্রমের আগামী ২০১১-১৬ মেয়াদের জন্য ২৩ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের কথা বলা হয়েছেযা বর্তমান মেয়াদের (২০০৫-১০) বাজেট থেকে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা কমআমরা মনে করি, জনবিস্ফোরণের সংকটকে কার্যকরভাবে মোকাবেলা করার জন্য নারীকে শিক্ষায়, কর্মদক্ষতায় ও অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয়ে ওঠবার সুযোগ বাড়াতে হবে। 

নারী কৃষিশ্রমিকদের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিতকরণে পদক্ষেপ গ্রহণ 

নারীর শ্রমকে দৃশ্যমান করার নীতি গ্রহণ নারীনীতি ২০১১র একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপএকাধিক ধারায় এই নীতির প্রতিফলন ঘটেছেযেমন, ২৩.৯ ধারায় বর্ণনা করা হয়েছে জাতীয় অর্থনীতিতে নারীর অবদান প্রতিফলনের জন্য বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোসহ সকল প্রতিষ্ঠানে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা২৩.১০ ধারায় বলা হয়েছে, সরকারের জাতীয় হিসাবসমূহে, জাতীয় উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে কৃষি ও গার্হস্থ্য শ্রমসহ সকল নারীশ্রমের সঠিক প্রতিফলন ও মূল্যায়ন নিশ্চিত করাপ্রাতিষ্ঠানিকভাবে নারীর শ্রম স্বীকৃত হলে কৃষি উপকরণ, বীজ, সার, কৃষক কার্ড, ঋণ সুবিধা প্রদানের ক্ষেত্রে নারী কৃষিশ্রমিকদের সমান সুযোগ নিশ্চিত করাও সম্ভব হবেএক্ষেত্রে লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য কৃষিক্ষেত্রে গৃহীত প্রকল্পগুলোতে নারীর জন্য কোটা রাখা, কৃষি উপকরণ প্রদানের জন্য কেবল নারীর জন্য প্রকল্প গ্রহণ করা ও কৃষিঋণ প্রদানের জন্য পৃথকভাবে নারীর জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন যারা কোনো প্রতিফলন পেশকৃত বাজেটে নেই। 

নারীউদ্যোক্তা বিকাশ

শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধিতে গত তিন দশকে নানা বাজেটীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে, যার প্রায় প্রতিটি পদক্ষেপই ছিল ক্ষুদ্রঋণভিত্তিককিন্তু ক্ষুদ্রঋণভিত্তিক কর্মের লাভজনকতা ও প্রসারের সম্ভাবনা খুব কম হওয়ায় গত কয়েক বছরে আর কর্মসম্ভাবনা বৃদ্ধি পায় নিতবে গত কয়েক দশকে ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে যে নারীউদ্যোক্তা গোষ্ঠীটি গড়ে উঠেছে, সহায়তা পেলে তারা মধ্যম বা বৃহ উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে উঠতে পারবে

সম্পদে নারীর সীমিত প্রবেশই নারীউদ্যোক্তাদের বিকাশের জন্য সবচাইতে বড়ো প্রতিবন্ধকতাসম্পদে নারীর প্রবেশ বৃদ্ধি এবং সহজ করার জন্য বাজেটে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করার কথা আমরা বলে আসছিযেমন নারীউদ্যোক্তাদের জামানতবিহীন ঋণ প্রদানে উসাহিত করার জন্য বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়াকিন্তু এবারের বাজেটেও তার প্রতিফলন হলোনানারী উদ্যোক্তাদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্যও কোনো বরাদ্দ নেই। 

নারীর দিকে সরাসরিভাবে সম্পদপ্রবাহ বৃদ্ধি করার জন্য নারীদের প্রতি কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করার দাবিও আমরা জানিয়ে আসছিযেমন নারীর উপার্জন, সম্পত্তি এবং পুঁজির ওপর কর মওকুফ করা; স্বামী-স্ত্রী উভয়ের নামে বাড়ি নথিভুক্তকরণ ও উভয়ের নামে সম্পত্তি কর প্রদান করার নিয়ম করা; নারীকে যে সম্পত্তি উপহার হিসেবে দেওয়া হয়, সে সম্পত্তি থেকে গিফট ট্যাক্স মওকুফ করা; নারীর মালিকানা ও পরিচালনাধীন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিভিন্ন ট্যাক্স ব্রেক অথবা ট্যাক্স হলিডে সুবিধা দেওয়া ও নারীউদ্যোক্তারা যাতে সহজেই গ্যাস, বিদ্যু ও টেলিফোন সংযোগ পেতে পারেন, সেজন্য রাজস্ব বাজেটে কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়াএর কোনোটিরই প্রতিফলন আমরা বাজেটে পাইনি। 

সামাজিক নিরাপত্তা

বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বিধবা ও স্বামী পরিত্যক্তা নারীর জন্য দুঃস্থ ভাতাকার্যক্রমের শিরোনাম থেকে পরিত্যক্তা শব্দটি বাদ দেয়ার কথা আমরা বলছিআমাদের কর্ম অভিজ্ঞতা থেকে আমরা জানি যে বিধাব নারীরা দুঃস্থ্ হিসেবে করুণা চাযনাতারা চায় কাজের মাধ্যমে মর্যাদাপূর্ণ জীবনতাই ভাতা না দিয়ে তাদের জন্য কর্মসৃজন প্রকল্প রাখা যেতে পারে। 

বাজেটে মাতৃত্বকালীন ভাতার সুবিধাভোগীর সংখ্যা ৮০ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৯২ হাজার করার কথা বলা হয়েছেঅথচ তার জন্য বরাদ্দ গতবারের ৬৬.৪ কোটি টাকা থেকে কমিয়ে ৪২.৫ কোটি টাকা রাখা হয়েছেএতে ভাতার পরিমাণ অনেক কমে যাবে
--------------
জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি বাস্তবাযন করার প্রধান মাধ্যম হবে জাতীয বাজেটএজন্য প্রথম প্রয়োজন হলো বাজেটে নারীর জন্য বরাদ্দের গতানুগতিক পদ্ধতি ও মানসিকতার উত্তরণ ঘটানোতাই জাতীয় বাজেটে নারী নীতির বাস্তব প্রতিফলনের জন্য আমরা জোর দাবি জানাই। 

আমরা মনে করি, জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি ২০১১ বাস্তবায়নে সরকারকে অবিলম্বে সুনির্দিষ্ট সময়ভিত্তিক আশু, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ-প্রক্রিয়া শুরু করা দরকারকালবিলম্ব না করে সময়সীমা, বাস্তবায়নকারী সংস্থা/বিভাগ, বাজেট ইত্যাদি উল্লেখপূর্বক যথাসম্ভব দ্রুত বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবেতাছাড়া ঘোষিত নারীনীতি বাস্তবায়নের জন্য এর সঙ্গে যুক্ত সরকারের সকল পর্যায়ের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাকে আরো শক্তিশালী করা ছাড়াও মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে অবিলম্বে পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রণালয় হিসেবে গড়ে তোলা প্রয়োজনএ মন্ত্রণালয়ের আওতায় উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত প্রয়োজনীয় সংখ্যক নারীসহায়ক দক্ষ লোকবল নিয়োগ দেওয়ার ব্যবস্থা করা দরকার, যাঁরা নারীনীতির টার্গেট অনুযায়ী কাজ করবেনপাশাপাশি গৃহীত কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক ম্যাকানিজম পূর্ণাঙ্গভাবে প্রতিষ্ঠা করা, তার দক্ষতা ও ক্ষমতার আওতা বাড়ানো দরকারনারীনীতি বাস্তবায়নের সাথে যুক্তদের জেন্ডার সংবেদনশীলতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও করা দরকার

ফয়সাল বিন মজিদ
সমন্বয়কারী, বিএনপিএস


Wednesday, 15 June 2011

বিএনপিএস আয়োজিত নারী নির্যাতনবিরোধী মানববন্ধনের অবস্থানপত্র


পারিবারিক নির্যাতনসহ সকল প্রকার নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হোন 
নির্যাতকদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলুন

জাতীয় প্রেসক্লাব। ১৬ জুন ২০১১

আজ আমরা ভীষণভাবে ক্ষুব্ধ! নারীর প্রতি পারিবারিক নির্যাতন আর সহিংসতার ক্রমবর্ধমান ঘটনায় আজ আমরা তীব্র ঘৃণা ও ক্ষোভ প্রকাশের জন্যে রাজপথে নেমে এসেছি। আজ এখানে আমরা বিচারের দাবি নিয়ে হাজির হয়েছি। নারীর ওপর পারিবারিক নির্যাতনসহ সকল প্রকার সহিংসতার বিরুদ্ধে আমাদের প্রতিবাদ জানাতে এবং সর্বস্তরের মানুষকে এসব বর্বরতা প্রতিরোধে সাহসী, সংঘবদ্ধ আর সোচ্চার হবার আহ্বান জানাতে জমায়েত হয়েছি।
 

গত ৫ জুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রুমানা মনজুরকে তাঁর বর্বর স্বামী হাসান সাইদ সুমন যে অবর্ণনীয় নৃংশসভাবে শারীরিক নিপীড়ন করেছে, সে সংবাদ আমাদের সবার জানা আছে। আমরা অনুমান করি, আমাদের মতো পুরো দেশই আজ সে নিপীড়নের ঘটনায় হতবিহ্বল এবং ক্ষুব্ধ। আমাদের মতোই নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সমগ্র দেশবাসী রুমানা মনজুরের দৃষ্টিশক্তি ফিরে আসাসহ সার্বিক আরোগ্য কামনার পাশাপাশি এই বর্বরতার বিচার দাবি করছে।

আমরা অত্যন্ত আনন্দিত যে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গতকাল এই ঘৃণ্য অপরাধীকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে। এজন্য আমরা সংশ্লিষ্ট বাহিনী এবং সরকারকে অভিনন্দন জানাচ্ছি। আমরা আশা করি, অবিলম্বে এই ঘৃণ্য অপরাধীর বিচার শুরু হবে। কোনো ধরনের রাজনৈতিক-সামাজিক প্রভাব ছাড়া এই অপরাধীকে উপযুক্ত শাস্তি প্রদান করে দেশের জনসংখ্যার অর্ধেক নারীর জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার ব্যাপারে সরকার তার আন্তরিকতা প্রমাণ করবে।


আমাদের দাবি আজ শুধু রুমানা মনজুরকে কেন্দ্র করে নয়। কারণ, রুমানা মনজুরের ঘটনাটি বর্বর নৃশংসতায় অতুলনীয় এবং অবর্ণনীয় হলেও, আমাদের সমাজে নারীর ওপর এমন নির্যাতনের ঘটনা কোনো ব্যতিক্রম নয়। বরং, জানা ও অজানা, সংবাদমাধ্যম ও পুলিশের কাছে আসা ও না-আসা, প্রতিদিন ঘটে যাওয়া অসংখ্য ঘটনার মধ্যে এটি একটিমাত্র নেত্রীস্থানীয় ঘটনা। পরিবার, কর্মস্থল, বিদ্যাঙ্গন, রাস্তাঘাট সর্বত্র নারীর প্রতি নির্যাতন, নিপীড়ন ও হয়রানির ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটে চলেছে। স্বামীর নির্যাতনে দৃষ্টিশক্তিহীন, ক্ষতবিক্ষত শরীরে অসহায় রুমানা মনজুর যখন হাসপাতালে নিরাপত্তাহীন দিনযাপন করছিলেন; তখনই গত ১৩ মে মতিঝিলে এক স্বামী পিটিয়ে তার স্ত্রীকে হত্যা করেছেন। একই দিনে, নারায়ণগঞ্জের বন্দর থানা এলাকায় দুর্বৃত্তরা সিঙ্গাপুর প্রত্যাগত একজন প্রবাসী নারীশ্রমিককে গণধর্ষণের পর তার শরীরে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। এগুলোও কোনো বিরল বা অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। নারী নিপীড়নের এমন ঘটনা সারা দেশে প্রতি মুহূর্তেই ঘটছে, যার প্রকৃত কোনো হিসেব হয়ত কারো জানা নেই। উৎকণ্ঠার বিষয় হলো, এসব ঘটনার সুষ্ঠু বিচার করার, শাস্তি দেবার দৃষ্টান্ত এবং প্রতিরোধ করার জন্য রাষ্ট্রীয়-সামাজিক পদক্ষেপ অত্যন্ত অকিঞ্চিৎকর।


গত মে মাসে ৯ জন নারী ও ১০ জন শিশু আত্মহত্যা করেছেন ও করতে বাধ্য হয়েছেন। নারীদের যৌন নির্যাতনের শিকার হবার ৭৪টি ঘটনা শুধু সংবাদপত্রেই এসেছে। বিভিন্ন স্থানে তিনজন তরুণী আত্মহত্যা করেছেন যৌন হয়রানিতে অতিষ্ঠ হয়ে। একই সময়ে সারা দেশ থেকে ৩৫ জনের ধর্ষিত হবার সংবাদ পাওয়া গেছে, যার মধ্যে ২৪ জন শিশু রয়েছে। গণধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ১২টি এবং ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৫ জনকে। এসব নারী ও শিশু নির্যাতনের ভয়াবহতার আংশিক চিত্র মাত্র, যা কেবল সংবাদমাধ্যম বা পুলিশের হিসেবে এসেছে। আমরা জানি, সামগ্রিক অবস্থা এর চেয়ে অনেক বেশি ভয়াবহ।


আমরা নারী-পুরুষ সকলের জন্যই এই ভয়্কংর অমানবিক পরিস্থিতি থেকে মুক্তি চাই। নারীর প্রতি সহিংসতা, নির্যাতন, নিপীড়ন, যৌন হয়রানি, ধর্ষণ, অ্যাসিড নিক্ষেপ, মৌখিক হয়রানি, মানসিক নির্যাতন চূড়ান্ত বিচারে সমাজের সকল নারী-পুরুষ-শিশুকে সমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এ অবস্থা কোনো সুস্থ সমাজের জন্য কাম্য নয়। আমরা দৃঢ়ভাবে এমন অবস্থার অবসান চাই। এই অনাকাক্সিক্ষত অবস্থার পরিবর্তনের জন্য আমরা নিচের দাবি ও আহ্বান সবার সামনে তুলে ধরছি :

  • অধ্যাপক রুমানা মনজুরের নিপীড়ক বর্বর স্বামীকে অবিলম্বে বিচার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। এছাড়া, এই অপরাধীকে সহায়তাদানকারীদেরও বিচারের আওতায় এনে ‘অপরাধীর সহায়কদেরও সহ্য না-করা’র দৃষ্টিভঙ্গির দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে।
  • অধ্যাপক রুমানা মনজুরের কন্যাসহ তাঁর পুরো পরিবারের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
  • বিশ্ববিদ্যালয়সহ সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরকারি দফতর ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত নারীকর্মীদের পারিবারিক নির্যাতনসহ যেকোনো ধরনের হয়রানি, নিপীড়নমূলক প্রকৃত বা সম্ভাব্য ঘটনায় তাদেরকে সহায়তা ও পরামর্শ দেবার মতো প্রাতিষ্ঠানিক পেশাদারি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
  • আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীবাহিনীসহ বিচারব্যবস্থাকে সত্যিকার অর্থে নারীসংবেদী করে গড়ে তুলতে হবে।
  • আক্রান্ত নারী ও শিশুদের সুরক্ষা প্রদান নিশ্চিত করতে সরকারিভাবে হয়রানিবিহীন আইনি সহায়তা দেবার জন্য পর্যাপ্ত সরকারি তহবিল বরাদ্দ করতে হবে।
  • নারী নির্যাতন প্রতিরোধে আইনি উদ্যোগ ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম হাতে নেবার জন্য দেশে প্রতিষ্ঠিত আইনি সহায়তাদানকারী সংস্থা ও নারী সংগঠনগুলোকে সরকারি কোষাগার থেকে আর্থিক সহায়তা দেবার ব্যবস্থা করতে হবে।
  • নিপীড়নের শিকার ও তার পরিবারের জন্য মনস্তাস্তি¡ক সহায়তা পরিষেবার ব্যবস্থা চালু করতে হবে।
  • নারীর প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির প্রসার ঘটায় এমন ধরনের নাটক-গান-বিজ্ঞাপন-বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান প্রচার থেকে গণমাধ্যমকে (রেডিও-টিভি-সংবাদপত্র) বিরত রাখতে কঠোর সম্প্রচার নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে।
  • সরকারি-বেসরকারি মালিকানাধীন সকল রেডিও-টিভি চ্যানেল ও সংবাদপত্রের জন্য নারী নির্যাতন প্রতিরোধের লক্ষ্যে নির্দিষ্ট পরিমাণ জনসচেতনতামূলক সরকারি বা বেসরকারি বিজ্ঞাপন প্রচার করা বাধ্যতামূলক করতে হবে।
  • নারী নির্যাতনের সকল ঘটনাকে শহর-গ্রাম-ধনী-গরিব-পেশা ও সামাজিক অবস্থা নির্বিশেষে সমভাবে, সমগুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে।
সবশেষে, আমরা মনে করি যে, নারী নির্যাতন প্রতিরোধে আমরা সবাই ব্যক্তিগতভাবে, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারি। নারীর প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির ইতিবাচক পরিবর্তন আনার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে এক্ষেত্রে। নারীর ওপর নির্যাতন আসলে চূড়ান্ত বিচারে আমাদের সবার ওপর নির্যাতন। রুমানা মনজুরের ঘটনা এই সত্যকে আমাদের সামনে স্বচ্ছ করে তুলে ধরেছে। এই অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে দরকার সনাতনী ‘সম্মান’, ‘পারিবারিক মর্যাদা’, ‘দুর্নাম’ ইত্যাদি চিন্তার বাইরে বেরিয়ে নির্যাতন প্রতিরোধে সরব হওয়া, এর প্রতিবাদে মুখ খোলা, সংগঠিত হওয়া এবং অবিলম্বে নিকটজনের সহায়তা চাওয়া। আমাদের নীরবতা নির্যাতক-নিপীড়কদের বল্গাহীন বেড়ে ওঠাকে উৎসাহিত করে। আসুন, আমরা সবাই নীরবতার এই জালকে ছিন্ন করি। কেননা, এক্ষেত্রে সোচ্চার হওয়াই আমাদের অন্যতম রক্ষাকবচ।

Thursday, 26 May 2011

‘জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি ২০১১’ বাস্তবায়নে জাতীয় বাজেটে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ বিষয়ে বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘ-এর বক্তব্য

আগামী জুন মাসেই ২০১১-’১২ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট ঘোষিত হবে। সে বিবেচনা থেকে আমরা নারীসমাজের উন্নয়নে বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে বাজেটে বরাদ্দ নির্ধারণ এবং সরকার-ঘোষিত ‘জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি ২০১১’ বাস্তবায়নের দাবি বিষয়ে আমাদের বক্তব্য তুলে ধরছি।

গত ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবসে বর্তমান সরকার ১৯৯৭-এ প্রণীত নীতি কিছুটা পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করে প্রণীত ‘জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি ২০১১’ চূড়ান্তভাবে ঘোষণা করেছেন। ঘোষিত নারীনীতির প্রধান একটি দুর্বলতা হলো নারীকে উত্তরাধিকারে সমান অধিকার না দেওয়া। এ সত্ত্বেও আমরা মনে করি, ঘোষিত এই নীতিটির বাস্তবায়নই এখন সরকারের অন্যতম লক্ষ্য হওয়া উচিত, কারণ এমডিজি দলিলের জেন্ডার সমতা সম্পর্কিত লক্ষ্যসমূহের সাথেও এটি সঙ্গতিপূর্ণ। বাস্তবায়নের পাশাপাশি আমরা উত্তরাধিকারে সমতা প্রতিষ্ঠার দাবিও পুনর্ব্যক্ত করছি।

সকলের একমত হবেন যে, নারীনীতি বাস্তবায়নের জন্য দরকার হবে জাতীয় বাজেটে সুনির্দিষ্ট ও পর্যাপ্ত বরাদ্দ রাখা। নারীসমাজের সামগ্রিক উন্নয়ন এবং ঘোষিত নারীনীতি বাস্তবায়নে সরকারের কী কৌশল হওয়া উচিত এবং বাজেটে কোন কোন খাতে রাজস্ব ও উন্নয়ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি, সংক্ষেপে সেসব সুপারিশ আমরা তুলে ধরছি। 
সংবাদকর্মীদের প্রশ্নের জবাব দিচ্ছেন বিএনপিএস নির্বাহী পরিচালক রোকেয়া কবীর। তাঁর পাশে উপবিষ্ট কাজী মদিনা ও ওমর তারেক চৌধুরী (ডানে) এবং প্রতিমা পাল-মজুমদার ও সাফিনা লোহানি (বামে)
 ৫০ শতাংশ বঞ্চিতের প্রতি মনোযোগ

আমরা জানি, দেশের ৫০ শতাংশ জনগোষ্ঠীই নারী, যাদের সিংহভাগই সম্পদহীন, ক্ষমতাহীন এবং উপার্জনের সুযোগবঞ্চিত ও পরাধীন। নাগরিকদের এই অর্ধাংশকে পিছনে ফেলে রেখে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব নয়, সম্ভব নয় প্রকৃত গণতন্ত্রের চর্চাও। এজন্য জাতীয় বাজেটের অন্যতম লক্ষ্য হওয়া উচিত সম্পদ ও ক্ষমতাহীন উল্লিখিত ৫০ শতাংশ নারীর দিকে সম্পদপ্রবাহ বৃদ্ধি করা।

সুনির্দিষ্টভাবে আশু, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ

আমরা মনে করি, ‘জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি ২০১১’ বাস্তবায়নে সরকারের পক্ষ থেকে অবিলম্বে সুনির্দিষ্টভাবে আশু, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা দরকার। এজন্য কালবিলম্ব না করে সময়সীমা, বাস্তবায়নকারী সংস্থা/বিভাগ, বাজেট ইত্যাদি উল্লেখপূর্বক যথাসম্ভব দ্রুত বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। তাছাড়া ঘোষিত নারীনীতি বাস্তবায়নের জন্য এর সঙ্গে যুক্ত সরকারের সকল পর্যায়ের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাকে আরো শক্তিশালী করা ছাড়াও মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে অবিলম্বে পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রণালয় হিসেবে গড়ে তোলা প্রয়োজন। এ মন্ত্রণালয়ের আওতায় উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত প্রয়োজনীয় সংখ্যক নারীসহায়ক দক্ষ লোকবল নিয়োগ দেওয়ার ব্যবস্থা করা দরকার, যাঁরা নারীনীতির টার্গেট অনুযায়ী কাজ করবেন। পাশাপাশি গৃহীত কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক ম্যাকানিজম পূর্ণাঙ্গভাবে প্রতিষ্ঠা করা, তার দক্ষতা ও ক্ষমতার আওতাও বাড়ানো দরকার। নারীনীতি বাস্তবায়নের সাথে যুক্তদের জেন্ডার সংবেদনশীলতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করাও এক্ষেত্রে জরুরি।

জেন্ডার-বিভাজিত তথ্যউপাত্ত

রাষ্ট্রীয় নীতিসমূহের বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা প্রণয়ন, নীতিসমূহের সুষম বাস্তবায়ন ও সুযোগসুবিধা বণ্টনে বৈষম্য নিরোধের জন্য সকল মন্ত্রণালয়ের জেন্ডার-বিভাজিত তথ্যউপাত্ত প্রস্তুত করবার উদ্যোগ নেওয়া দরকার। আমরা জানি, ২০১০-’১১ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় মাননীয় অর্থমন্ত্রী জাতীয় সংসদে ১০টি মন্ত্রণালয়ের জেন্ডার বিভাজিত উপাত্ত উপস্থাপন করেছিলেন। এবার এই সংখ্যা আরো বাড়াবার জোর দাবি জানাচ্ছি।

জেন্ডার ফোকাল পয়েন্ট

বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের জেন্ডার ফোকাল পয়েন্টগুলোকে কার্যকর করা এবং প্রত্যেকটি মন্ত্রণালয়ের প্রতিটি প্রকল্পে নারীর জন্য সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ ও তা বাস্তবায়নের জন্য মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করবার উদ্যোগ নেওয়া দরকার।

এছাড়া নারীর জন্য সুনির্দিষ্টভাবে যে প্রকল্প বরাদ্দ দেওয়া হয় তার অধিকাংশেরই সদ্ব্যবহার হয় না। এসব কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের জন্য মনিটরিং ব্যবস্থা শক্তিশালী করা দরকার।

নারীর প্রজনন ভার লাঘবে ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ

নারী উন্নয়ন নীতিতে নারীর ক্ষমতায়নের যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, সেখানে পৌঁছতে হলে নারীর প্রজননভার কমিয়ে এনে সামাজিক ও উপার্জনমূলক কর্মকাণ্ডে তাদের কার্যকর অংশগ্রহণের লক্ষ্যে স্বাবলম্বী নাগরিক হিসেবে বিকাশে নারীর জন্য সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। এজন্য জরুরিভিত্তিতে নারীবান্ধব জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ও সেবা, স্বাস্থ্যসেবা এবং শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্রের মতো কার্যক্রম প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সর্বত্র যাতে মানসম্পন্ন ও নিরাপদ জন্মনিয়ন্ত্রণ সেবা সহজলভ্য হয় সে ব্যাপারেও কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের সময়ের মাত্র সাড়ে সাত কোটি জনগোষ্ঠী ৪০ বছরে ব্যবধানে দ্বিগুণেরও বেশিতে পরিণত হয়েছে। গত দশ বছরে জনসংখ্যার যে বৃদ্ধি ঘটেছে তার ৮৭ শতাংশই দরিদ্র। এর ফলে পরিবেশ, অর্থনীতি, কৃষিজমি, রাস্তাঘাট, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্য, পানীয় জল, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, সরকারি সুযোগসুবিধা প্রাপ্তিসহ সর্বক্ষেত্রেই প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। নারীর জন্য শিক্ষায়, কর্মদক্ষতায় ও অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয়ে ওঠবার সুযোগ সৃষ্টি করার মাধ্যমে জনবিস্ফোরণের সংকটকে কার্যকরভাবে মোকাবেলা করা যাবে।

সাধারণ স্বাস্থ্যসেবা এবং মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুর হার হ্রাসকরণ

এমডিজি দলিলে ২০১৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশে মাতৃমৃত্যুর হার প্রতি লক্ষে ১৪৪ জনে নামিয়ে আনবার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ এই লক্ষ্য অর্জনে অনেকটা পিছিয়ে আছে। ‘নারীনীতি ২০১১’ মাতৃমৃত্যু হার হ্রাসের ওপর যথাযথ গুরুত্ব দিয়েছে। ২০১৫’র মধ্যে মাতৃমৃত্যুর হার হ্রাসের লক্ষ্য অর্জন করতে হলে নারীনীতি ২০১১’র ৩৪.৩ উপধারাটি অতি জরুরি ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করতে হবে। এজন্য নিম্নোক্ত ক্ষেত্রে বাজেট বরাদ্দ রাখতে হবে :
  • কমিউনিটি ক্লিনিক ব্যবস্থার পুনরুদ্ধারের ঘোষণাটি অতি দ্রুত কার্যকর করার ব্যবস্থা নেয়া।
  • দরিদ্র প্রসূতি মায়েদের জন্য মাতৃস্বাস্থ্য ভাউচার স্কিমের আওতা বৃদ্ধি করা।
  • ধাত্রী প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালু করে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ধাত্রীর সংখ্যা বৃদ্ধি করা। সরকারি-বেসরকারি যৌথউদ্যোগে ধাত্রী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাটি নতুনভাবে চালু ও আধুনিকীকরণ করা এবং ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ের সকল হাসপাতালে জরুরি ধাত্রীসেবা কার্যক্রম চালু করা।
  • গ্রামে গ্রামে ভ্রাম্যমাণ ক্লিনিক ব্যবস্থা চালু করা।
  • নারীর জন্য সাধারণ, প্রজনন ও যৌনস্বাস্থ্য সেবা এবং নারীর শরীরের জন্য নিরাপদ জন্মনিয়ন্ত্রণ সেবা প্রদানের জন্য সুনির্দিষ্ট প্রকল্প গ্রহণ করা। একই সাথে পুরুষদের উপযোগী জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী সহজলভ্য ও তা ব্যবহারের প্রসার ঘটানের ব্যবস্থা নেয়া।
  • সুবিধাবঞ্চিত অঞ্চলে যথাযথভাবে মাতৃস্বাস্থ্য ও প্রসূতি সেবা এবং মানম্পন্ন জন্মনিয়ন্ত্রণ সেবা পৌঁছানোর জন্য জেন্ডার পোভার্টি ম্যাপিংয়ের উদ্যোগ নেওয়া।
  • প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে নারী ডাক্তারের সেবা নিশ্চিত করতে তাঁদের বেতন বৃদ্ধি, বাসস্থান এবং চলাফেরার নিরাপত্তা বিধান করা।
  • নারীর পেশাগত স্বাস্থ্য ঝুঁকিসংক্রান্ত সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া।
কর্মসংস্থান ও কর্মস্থলে সমসুযোগ, অংশীদারিত্ব, সমমজুরি এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা

এই বিষয়গুলো এমডিজিরও অন্তর্ভুক্ত। কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজন নারীর দক্ষতা বৃদ্ধি। দক্ষতা এবং সক্ষমতা না থাকলে শ্রমবাজারে সুযোগ দিলেও নারীরা তা গ্রহণ করতে পারবেন না। দক্ষতা এবং সক্ষমতার প্রশ্নে সরকারি চাকুরির ১৫ শতাংশ পদ, যা নারীর জন্য কোটা করে দেওয়া হয়েছিল তা এখনো পূরণ হয় নি। তাই নারীনীতি ২০১১-এর উল্লিখিত ধারাগুলো কার্যকর করার জন্য বাজেটে নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করতে হবে :
  • নারীকে উচ্চ প্রযুক্তির প্রশিক্ষণ প্রদানের জন্য উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা এবং বেসরকারি খাতকে এই ধরনের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনে প্রণোদিত করা। গ্রামাঞ্চলেও এসব সুযোগ প্রসারিত করা।
  • মধ্যপ্রাচ্য ছাড়াও অন্যান্য দেশে নারীকর্মীর যে চাহিদা রয়েছে সে চাহিদা পূরণ করতে অদক্ষ নারীদের প্রেরণ না করে ধাত্রী, নার্স ও অন্যান্য ক্ষেত্রের দক্ষকর্মী প্রেরণের ব্যবস্থা নেওয়া এবং বিদেশে নারীকর্মীদের নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষায় সংশ্লিষ্ট দূতাবাসসমূহে নারীসংবেদী জনবল বৃদ্ধি করা ও কনস্যুলার সার্ভিসকে শক্তিশালী করা।
  • দেশি ও বিদেশি কর্মক্ষেত্রে সুফল দেয়, এমন বিভিন্ন ভাষা শিক্ষার জন্য নারীদের জন্য জেলা পর্যায় পর্যন্ত ভাষা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা। 
  • ‘১০০ দিনের নিশ্চিত কর্মসূচি’র আদলে ‘১০০ দিনের নিশ্চিত প্রশিক্ষণ কর্মসূচি’ গ্রহণ করা। 
  • নারীদের মধ্যে যারা অতিশয় দরিদ্র, তাদের জন্য সেফটি নেট কর্মসূচিগুলোর পরিমাণ ও আওতা বৃদ্ধি করা এবং সকল বার্ধক্যপীড়িত নারীর জন্য বিমার ব্যবস্থা করা দরকার, যাতে সন্তান বা অন্য কারো ওপর তাঁদের নির্ভরশীল থাকতে না হয়।
নারীকর্মীদের জন্য যাতায়াত ব্যবস্থা, বাসস্থান, বিশ্রামাগার, পৃথক টয়লেট স্থাপনসহ বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ

কর্মস্থলের সাথে প্রত্যক্ষভাবে সম্পর্কিত কতগুলো মৌলিক ও অবকাঠামোগত অসুবিধা দূর করা না গেলে কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি সম্ভব হবে না। এসব সমস্যা দূরীকরণে আগামী বাজেটে নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করতে হবে :

  • প্রতিটি কর্মক্ষেত্রে শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র স্থাপনের জন্য প্রকল্প গ্রহণ করা।
  • কর্মক্ষেত্রে যাতায়াতকালে নারী কর্মজীবীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগে থাকেন। তাঁদের নিরাপত্তা বিধানে প্রশাসনকে শক্তিশালী ও কার্যকর করতে উদ্যোগ গ্রহণ করা।
  • পরিবহণ সুবিধা প্রদানের জন্য বিআরটিসি কর্তৃক সরবরাহকৃত বাসে নারী কর্মজীবীদের জন্য হ্রাসকৃত মূল্যে টিকেটের ব্যবস্থা করা।
  • নারী কর্মজীবীদের অগ্রাধিকারভিত্তিতে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের জন্য সরকারি উদ্যোগে বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্র স্থাপন করা।
  • নারীর উপস্থিতি বেশি এরকম কর্মস্থলে নারী কর্মজীবীদের জন্য পৃথক টয়লেটের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে উদ্যোগ গ্রহণ করা।
নারীদের জন্য শিক্ষা ও শিক্ষাক্ষেত্রে নারী-পুরুষ বৈষম্য দূর করা

গত কয়েক বছর ধরে প্রাথমিক স্তরে নারীর জন্য বাজেটে বরাদ্দ থাকার ফলে ছেলে ও মেয়ে শিক্ষার্থীর মধ্যে সংখ্যাগত বৈষম্য দূর হয়েছে। যার ফলে প্রাথমিক শিক্ষাস্তরে এমডিজির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনেও বাংলাদেশ সফল হয়েছে নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যেই। কিন্তু ঝরে পড়ার হার এখনো অগ্রহণযোগ্য পর্যায়ে থেকে যাওয়ায় মাধ্যমিক ও উচ্চতর শিক্ষায় এখনো ব্যাপক জেন্ডার বৈষম্য রয়েছে। গত ১০ বছরে এই বৈষম্য কমেছে অতি সামান্যই। তাই এমডিজির লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ২০১৫ সালের মধ্যে উচ্চতর শিক্ষাস্তরে জেন্ডার সমতা অর্জন করার জন্য নারীনীতির ২১.১ উপধারাটি বাস্তবায়নের জন্য আসন্ন বাজেটে নিম্নোক্ত খাতে বরাদ্দ রাখতে হবে :
  • উচ্চতর শিক্ষা নারীর জন্য অবৈতনিক করা। স্নাতক পর্যন্ত শিক্ষা অবৈতনিক করার সরকারি ঘোষণাটি দ্রুত কার্যকর করা।
  • শিক্ষার উচ্চস্তরে, বিশেষ করে কারিগরি ও প্রকৌশল শিক্ষায় নারীর প্রবেশের পথ সুগম করার জন্য বৃত্তি দেওয়ার ব্যবস্থা করা।
  • শিক্ষাব্যবস্থাকে জেন্ডার সংবেদনশীল করবার জন্য বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ।
  • উচ্চস্তরে শিক্ষারত নারীশিক্ষার্থীর জন্য নিরাপদ আবাসনের ব্যবস্থা করা।
  • কারিগরি শিক্ষায় নারীর প্রবেশ সুগম করতে সব জেলা এবং উপজেলা স্তরে পাবলিক-প্রাইভেট যৌথউদ্যোগে কেবল নারীদের জন্য কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা। 
  • তথ্যপ্রযুক্তি খাতে নারীর প্রবেশ সুগম করতে নারীর জন্য কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও ইংরেজি ভাষা শিক্ষা ইনস্টিটিউট স্থাপনকে উৎসাহিত করা।
  • কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় ও কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি, নারী নির্যাতন, পারিবারিক নির্যাতন ও পাচার রোধে যে আইনগুলো রয়েছে, সেগুলোর যথাযথ বাস্তবায়নে উদ্যোগ গ্রহণ করা।
নারী কৃষিশ্রমিকদের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিতকরণে পদক্ষেপ গ্রহণ

নারীর শ্রমকে দৃশ্যমান করার নীতি গ্রহণ নারীনীতি ২০১১’র একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। একাধিক ধারায় এই নীতির প্রতিফলন ঘটেছে। যেমন, ২৩.৯ ধারায় বর্ণনা করা হয়েছে জাতীয় অর্থনীতিতে নারীর অবদান প্রতিফলনের জন্য বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোসহ সকল প্রতিষ্ঠানে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা। ২৩.১০ ধারায় বলা হয়েছে, সরকারের জাতীয় হিসাবসমূহে, জাতীয় উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে কৃষি ও গার্হস্থ্য শ্রমসহ সকল নারীশ্রমের সঠিক প্রতিফলন ও মূল্যায়ন নিশ্চিত করা। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নারীর শ্রম স্বীকৃত হলে কৃষি উপকরণ, বীজ, সার, কৃষক কার্ড, ঋণ সুবিধা প্রদানের ক্ষেত্রে নারী কৃষিশ্রমিকদের সমান সুযোগ নিশ্চিত করাও সম্ভব হবে। এক্ষেত্রে লক্ষ্যে পৌঁছতে হলে আগামী বাজেটে নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করতে হবে :

  • কৃষিক্ষেত্রে গৃহীত প্রকল্পগুলোতে নারীর জন্য কোটা রাখা।
  • কৃষি উপকরণ, সার, বীজ, কৃষক কার্ড, ইত্যাদি প্রদানের জন্য নারীর জন্য পৃথক প্রকল্প গ্রহণ করা।
  • কৃষির যেসব ক্ষেত্রে নারী ৬০-৮০ শতাংশ শ্রম দান করে, সেসব ক্ষেত্রে গৃহীত বাজেটারি প্রণোদনার সিংহভাগ নারীর জন্য বরাদ্দ করা;
  • গার্হস্থ্য উদ্যান বিকাশের জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
  • কৃষিঋণ প্রদানের জন্য পৃথকভাবে নারীর জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
এই পদক্ষেপগুলো কার্যকর হলে কৃষিক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের মধ্যে সমতা আনয়নে অবদান রাখবে। আর এই অবদানের কারণে সর্বক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের মধ্যে সমতা আনার জন্য এমডিজির লক্ষ্যসমূহও অদূর ভবিষ্যতে অর্জিত হবে।

নারীউদ্যোক্তাদের বিকাশ নিশ্চিত করতে সহায়তা প্রদান

নারীনীতির এই ধারাটি এমডিজির লক্ষ্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এমডিজির লক্ষ্য ছিল ২০১৫ সালের মধ্যে অকৃষিখাতে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করা। শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধিতে গত তিন দশকে নানা বাজেটীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে, যার প্রায় প্রতিটি পদক্ষেপই ছিল ক্ষুদ্রঋণভিত্তিক। কিন্তু ক্ষুদ্রঋণভিত্তিক কর্মের লাভজনকতা ও প্রসারের সম্ভাবনা খুব কম হওয়ায় গত কয়েক বছরে আর কর্মসম্ভাবনা বৃদ্ধি পায় নি। তবে গত কয়েক দশকে ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে যে নারীউদ্যোক্তা গোষ্ঠীটি গড়ে উঠেছে, সহায়তা পেলে তারা মধ্যম বা বৃহৎ উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে উঠতে পারবে।

নারীউদ্যোক্তাদের বিকাশ হলে নারীর কর্মসংস্থান বৃদ্ধির সম্ভাবনাও তুলনামূলকভাবে বেশি হবার সম্ভাবনা আছে। নারীর কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করাও নারীনীতি ২০১১-র আরেকটি লক্ষ্য। অর্থাৎ নারীউদ্যোক্তাদের বিকাশ নিশ্চিত করা গেলে একের অধিক লক্ষ্য অর্জিত হবে। এজন্য আমরা নিম্নলিখিত বাজেটারি পদক্ষেপ গ্রহণের প্রস্তাব করছি।
  • সম্পদে নারীর সীমিত অভিগম্যতাই নারীউদ্যোক্তাদের বিকাশের জন্য সবচাইতে বড়ো প্রতিবন্ধকতা। সম্পদে নারীর অভিগম্যতা বৃদ্ধি এবং সহজ করার জন্য বাজেটে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। যেমন নারীউদ্যোক্তাদের জামানতবিহীন ঋণ প্রদানে উৎসাহিত করার জন্য বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া।
  • নারীর মালিকানা ও পরিচালনাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো যদি নারীবান্ধব সুবিধাদিসহ (টয়লেট, শিশু দিবাযত্ন ব্যবস্থা, যাতায়াত প্রভৃতি) একটি বিশেষ সংখ্যায় নারীকর্মী নিয়োগ দেয়, তবে সে প্রতিষ্ঠানকে নির্দিষ্টমাত্রায় কর রেয়াত দেওয়া।
  • নারী পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে যেগুলোতে শতভাগ কর্মী নারী, সেসব প্রতিষ্ঠানে ব্যবহৃত কাঁচামালের আমদানির ওপর শুল্ক রেয়াত দেওয়া। 
  • নারীউদ্যোক্তাদের দ্বারা উৎপাদিত পণ্য লাভজনকভাবে বাজারজাত করার সুযোগ সৃষ্টিতে নারীদের সমবায়ী উদ্যোগে স্থায়ী বিপণন ব্যবস্থা প্রবর্তন করার জন্য করউৎসাহ প্রদান করা।
  • প্রকৃত নারীউদ্যোক্তারা যাতে সহজেই গ্যাস, বিদ্যুৎ ও টেলিফোন সংযোগ পেতে পারেন, সেজন্য রাজস্ব বাজেটে কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়া। এক্ষেত্রে নারীকে ব্যবহার করে জালিয়াতি যাতে না হয় তেমন পদক্ষেপও রাখতে হবে।
  • সর্বোপরি, সর্বক্ষেত্রে নারীউদ্যোক্তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য প্রশাসন ক্ষেত্রে অতিরিক্ত রাজস্ব বরাদ্দ রাখা।
আমরা মনে করি, দ্রুত নারীনীতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে ২০১৫ সালের মধ্যে এমডিজির নারীবিষয়ক ক্ষেত্রগুলোতে সাফল্য অর্জনে আমাদের প্রস্তাবিত সুপারিশগুলো আগামী বাজেটে বিবেচনায় নেওয়া হলে বিশেষভাবে সুফলপ্রসূ হবে।

[গত ১৮ মে ২০১১ সাংবাদিক সম্মেলনে (ভিআইপি লাউঞ্জ, জাতীয় প্রেসক্লাব) নিম্নোক্ত বক্তব্য উপস্থাপন করা হয়]
সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠানের একটি দৃশ্য
সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠানের খবর