Thursday, 13 October 2011

গ্রামীণ নারীদের জীবনমান উন্নয়নে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ দরকার : রোকেয়া কবীর

শত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও গ্রামীণ নারীরা যেসব কর্মকাণ্ডে অংশ নেয়, ১৫ অক্টোবর বিশ্ব গ্রামীণ নারী দিবস সেদিকে আমাদের মনোযোগ আকর্ষণ করে২০০৭-এর ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের একটি সাধারণ অধিবেশনে দিবসটি আন্তর্জাতিকভাবে পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় এবং কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতির অগ্রগতি, খাদ্য নিরাপত্তার উন্নতি সাধন ও দারিদ্র্য দূরীকরণে আদিবাসীসহ গ্রামীণ নারীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ও অবদানের কথা তুলে ধরা হয়যদিও ১৯৯৫ সালেই বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত নারীবিষয়ক চতুর্থ আন্তর্জাতিক সম্মেলনে খাদ্য উপাদন ও খাদ্য নিরাপত্তায় গ্রামীণ নারীদের অবদানকে গুরুত্ব দিয়ে বিশ্ব খাদ্য দিবসের প্রাক্কালে এরকম একটি দিবস পালনের প্রস্তাব আনা হয়২০০৮-এর ১৫ অক্টোবর নিউইয়র্কে দিবসটি প্রথমবারের মতো উদযাপিত হয়তার পর থেকে বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের নাগরিক সমাজ দিবসটি বিশেষ গুরুত্বের সাথে উদযাপন করে আসছে

বলাবাহুল্য যে, কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের সমুদয় খাদ্যই উপাদিত হয় গ্রামাঞ্চলেএই উপাদনপ্রক্রিয়ায় গ্রামীণ নারীসমাজ যে বিপুল পরিমাণ প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ শ্রমে অংশ নিয়ে থাকে, আমাদের দেশে তার কার্যকর স্বীকৃতি এখনো অনুপস্থিতআমরা জানি, গ্রামীণ কি শহুরে, শিক্ষিত কি নিরক্ষর, পেশাজীবী কি গার্হস্থ্যকর্মী সকল পর্যায়ের নারীদেরই কমবেশি পুনরুপাদনমূলক কাজে সময় ব্যয় করতে হয়, যে কাজ সর্বাংশে মজুরিহীনআর মজুরিহীন বলে এ কাজ সাধারণত কাজ বলেই স্বীকৃত হয় নাসমাজ কাজ বলে স্বীকৃতি দেয় কেবল উপাদনমূলক প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়ে অর্থ উপার্জন করাকেখুব বেশি দিনের ঐতিহ্য না-থাকলেও বর্তমান বাংলাদেশের শহর পর্যায়ে একটা উল্লেখযোগ্য পরিমাণ শিক্ষিত-অল্পশিক্ষিত নারী অফিস-আদালত, স্কুল-কলেজ ও কল-কারখানায় কাজ করে নগদ অর্থ উপার্জন করছেনকিন্তু গ্রামাঞ্চলের নারীরা পুনরুপাদনমূলক কাজে বাধ্যতামূলকভাবে অংশ নেয়ার পাশাপাশি উপাদনমূলক কাজ, বিশেষ করে কৃষিকাজে ব্যাপকভাবে অংশ নিলেও তারা এ কাজে কোনো অর্থ পান নাঅবশ্য দিনমজুর হিসেবে যেসব নারী অন্যের কৃষিজমিতে কাজ করেন, তারা পুরুষ শ্রমিকের চাইতে কম হলেও কিছু মজুরি পেয়ে থাকেন

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার হিসেব মতে, কৃষিকাজে বাংলাদেশের একজন পুরুষ যেখানে শ্রম দেন বছরে ১৮শ ঘণ্টা, একজন নারী সেখানে দেন ২৬শ ঘণ্টাঅর্থা কৃষক পরিবারের একজন নারী কৃষিকাজে দৈনিক সাত ঘণ্টারও বেশি সময় ব্যয় করে থাকেনএ হিসেব অনেকের কাছে অবিশ্বাস্য লাগতে পারে, বিশেষত যারা কৃষিকাজ বলতে কেবল মাঠের কাজকেই বুঝে থাকেনবাংলাদেশের কোনো কোনো অঞ্চলে, বিশেষ করে আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় নারীরা মাঠের কাজে অধিক পরিমাণে অংশ নিলেও সারাদেশের বাস্তবতা একইরকম নয়কোনো কোনো এলাকায় মাঠের কাজে নারী উপস্থিতি কম দেখা যায়কিন্তু এর মানে এ নয় যে ওই এলাকার নারীরাও কৃষিকাজে ব্যাপকভাবে অংশ নেন নাবস্তুতপক্ষে কৃষিকাজের আওতা অনেক ব্যাপ্তবীজ প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণ, ফসল মাড়াই, ফসল প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণ, পুকুরে মাছ চাষ, বাড়িতে হাঁসমুরগি ও গবাদি পশুপালন, খোঁয়াড় ও গোয়ালঘর পরিষ্কার করা, নানারকম কৃষি সরঞ্জাম তৈরি, আঙিনা ও বাড়ির পাশে শাকসবজি চাষ ও নিয়মিত সেচকাজ, বাড়ির আশেপাশে ফুল, ফল ও ভেষজ গাছ লাগানো ও পরিচর্যা, ইত্যাদি কাজও কৃষিকাজেরই আওতাভুক্ত; যার সিংহভাগই সম্পাদন করেন গ্রামীণ নারীরাকাজেই ফসলের মাঠে নারীদের শারীরিক উপস্থিতি পুরুষের তুলনায় কম দৃষ্ট হলেও কৃষিকাজের সামগ্রিক বৈশিষ্ট্যানুযায়ী এক্ষেত্রে নারীরাই যে অংশগ্রহণ ও শ্রমদানের ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে থাকেন, এ ব্যাপারে সন্দেহের অবকাশ নেইএক গবেষণায় দেখা গেছে, কৃষিকাজের ১৩টি ধাপের মধ্যে নারীরা ৯টি ধাপের কাজে সরাসরি সম্পন্ন করে থাকেন

পুনরুপাদনমূলক কাজে নারী যেমন মজুরিবিহীন শ্রম দিয়ে থাকেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রে কৃষিক্ষেত্রে নারীর শ্রমটাকেও মজুরিবিহীন শ্রম বলেই ধরে নেয়া হয়নিজের পরিবারের জন্য কাজ করে তার বিপরীতে নগদ পারিশ্রমিক নেয়া বা নেয়ার প্রস্তাব ওঠানোটা আমাদের সংস্কৃতিতে এখনো গ্রহণযোগ্য নয়কিন্তু পরিবারের উপার্জনে তার অংশগ্রহণের স্বীকৃতিটা প্রতিষ্ঠিত হওয়া দরকারতাছাড়া কৃষিকাজের মাধ্যমে পরিবারের যে মোটমাট উপার্জন, যে উপার্জনের পেছনে নারীর শ্রম পুরুষের চেয়ে বেশি, সে উপার্জন পরিবারের নারী-পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রে সমানভাবে ব্যয়িত হবার সংস্কৃতিটাও চালু হওয়া জরুরিদুঃখজনক যে, সে সংস্কৃতি আমাদের দেশে ভয়াবহভাবে অনুপস্থিত

দেখা যায়, যে কাজে অর্থ নেই, অর্থাগমের সম্ভাবনা নেই, সে কাজগুলোর ক্ষেত্রে সমাজ সহজেই নারীনেতৃত্ব মেনে নেয়কিন্তু যখনই কাজটা নগদ অর্থের সম্ভাবনা দেখায় বা অর্থাগম হতে শুরু করে, তখনই সেটার নেতৃত্ব চলে যায় পুরুষের হাতে, তা সে যে কর্মই হোকএক্ষেত্রেও তাই ঘটেকৃষি উপাদনপ্রক্রিয়ায় নারীর অংশগ্রহণ খুবই ঘনিষ্ঠ হলেও যখন কৃষিপণ্য বিক্রির প্রসঙ্গ আসে, তখন তা পরিবারের পুরুষরাই নিয়ন্ত্রণ করে থাকেনঅর্থা কৃষিপণ্যের বিক্রয়লব্ধ সমুদয় অর্থ পরিবারকর্তা পুরুষের হাতে চলে যায়এটাই পুরুষতান্ত্রিক সংস্কৃতির নিয়মআর এ নিয়মে প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে তারাই একক সিদ্ধান্তে সেই অর্থ খরচের পরিকল্পনা করেন ও খরচ করেনমুশকিল হলো, একজন গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে এ পরিকল্পনায় পরিবারের নারীসদস্যদের প্রয়োজন ও চাহিদা সমান গুরুত্ব পাবার কথা থাকলেও, কার্যত কোনোই গুরুত্ব পায় না

গ্রামীণ নারীর সাধারণ ও প্রজননস্বাস্থ্যজনিত জটিলতা, পুষ্টিহীনতা, বিনোদনহীনতা, পরিবারের জন্য প্রয়োজনীয় খাবার পানি ও জ্বালানির অপ্রতুলতা, স্বাস্থ্যসম্মত ও নিরাপদ স্যানিটেশন সুবিধার অনুপস্থিতি ইত্যাদি প্রয়োজনকে অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনই মনে করা হয় নানানা অপ্রাপ্তি ও সমস্যা-সীমাবদ্ধতার মধ্যে হাবুডুবু খেয়েও তাদের একের পর এক সন্তান জন্ম দিয়ে যেতে হয়, যেখানে তাদের ইচ্ছা-অনিচ্ছা, শারীরিক সুস্থতা-অসুস্থতাকে মোটেই পাত্তা দেয়া হয় নাতাছাড়া গর্ভে সন্তান ধারণ ও সন্তান জন্মদান করেই তাদের দায় ফুরায় নানবজাত শিশুর লালনপালনের পুরো ভারও তাদের কাঁধেই বর্তায়এ এক ভয়াবহ অবিচার, যার শিকার হয়ে চলেছে আমাদের কোটি কোটি সর্বংসহা গ্রামীণ নারীগোদের ওপর বিষফোঁড়ার মতো আছে নানারকম পারিবারিক-সামাজিক হয়রানি ও নির্যাতনের ধকলগ্রামীণ নারীরা শহরের নারীদের তুলনায় অনেক রেশি নির্যাতনের শিকার হনযৌন হয়রানি, ধর্ষণ, অ্যাসিড নিক্ষেপ, ফতোয়া, পাচার ইত্যাদি নির্যাতনের একটা বেড়াজালের মধ্যে নিরাপত্তাহীন জীবনযাপন করতে তারা বাধ্য হনপ্রায়ই এসব সমস্যার প্রতিকার পান না দরিদ্র গ্রামীণ নারীরা

সহজেই বোধগম্য যে, গ্রামীণ কৃষিপরিবারে বেড়ে ওঠা মেয়েশিশুদের অবস্থাও হয় অতিশয় করুণসাধারণত এদের স্কুলে পাঠাতেই চাওয়া হয় নাপাঠালেও প্রাথমিক পর্যায়ের পর তাদের শিক্ষা চালিয়ে যাওয়ায় পরিবারগুলো খুব একটা উসাহ দেখায় নাএখনো পরিবারগুলোর এই নিরুসাহের পেছনে কাজ করে প্রধানত মেয়েদের অত শিক্ষার দরকার নেইধরনের রক্ষণশীল ও পশ্চাপদ ধারণাযৌন হয়রানির শিকার হওয়া বা শিকারের আশঙ্কা, কাছাকাছি বিদ্যালয় না-থাকা, যাতায়াত সমস্যা ইত্যাদিও এক্ষেত্রে কমবেশি ভূমিকা রাখেসব মিলিয়ে পরিবারগুলো চায়, মেয়েরা অনর্থক স্কুলে না-গিয়ে বাড়িতে থেকে পরিবারের নৈমিত্তিক কাজে হাত লাগাক ও বিয়ের পাত্রী হিসেবে শারীরিক-মানসিকভাবে তৈরি হোকএর পর দেখতে-না-দেখতে তাদের শৈশব-কৈশোর ছিনতাই হয়ে যায় বিয়ে নামক প্রায়-অনিবার্য সনাতনী বাস্তবতার হাতে

ইউএনডিপির ২০০৯ সালের এমডিজি রিপোর্ট অনুযায়ী, বাংলাদেশের ঝরে পড়া কিশোরীদের ৪১ ভাগকে স্কুল ত্যাগ করতে হয় বাল্যবিবাহের কারণেস্বামীর বাড়ি গিয়ে এই কিশোরীদের অবিশ্রান্তভাবে নতুন সংসারের ঘাঁনি টানার দায়িত্ব নিতে হয়এদের একাংশ নিজে শিশু অবস্থায়ই আরেক শিশুর মা হয় বা মা হতে গিয়ে নিজেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েসন্তান ও সংসারের ভারে কাবু হতে হতে যারা বেঁচে যায়, তাদের জীবনেও আর কোনো রং থাকে না, সুযোগ থাকে না জীবনের ভালোমন্দ নিয়ে ভাববারওএ যেন এক বিশাল চক্রের মধ্যে নিক্ষিপ্ত হওয়া, যেখানে নিজে নিজে থামবার আর কোনো সুযোগ নেইবিয়ের আগে যে কিশোরী তার মায়ের সারাদিনের মাত্রাতিরিক্ত কর্মভার কমাতে মাকে কিছু সহায়তা দিত, নতুন সংসারে এসে তার কাঁধেও চেপে বসে মায়ের সমান কর্মভার, যদিও তার পাশে কেউ থাকে না তাকে সহায়তা দেবার জন্য

আমরা জানি, একাংশ গ্রামীণ নারী, যাদের নিজেদের চাষ জমি নেই, দারিদ্র্যপীড়িত ও অনিরাপদ গ্রামীণ জীবনের নিগড় থেকে মুক্তি পেতে অপেক্ষাকৃত ভালো একটি স্বাধীন ও স্বপ্নময় জীবনের আশায় গ্রাম ছেড়ে শহরে পদার্পণ করেছেন ও করছেনগ্রামীণ নারীদের এই অংশই বর্তমান বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত গার্মেন্টসের প্রধান শ্রমশক্তিগবেষণাতথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের গার্মেন্টস কারখানায় কর্মরত শ্রমিকদের ৮০ শতাংশই নারী, যাদের সিংহভাগই গ্রাম থেকে শহরে অভিবাসিতগার্মেন্টস মালিকরা কারখানার শ্রমিক হিসেবে এসব অল্পশিক্ষিত বা নিরক্ষর ও অদক্ষ গ্রামীণ নারীদের ব্যাপারেই বেশি আগ্রহ দেখান, কারণ এদের শ্রম খুব কম মজুরির বিনিময়ে কেনা যায়এখানেও যে তারা খুব ভালো থাকেন, তা বলা যায় নামজুরি ও বোনাসসহ অন্যান্য সুবিধা পাবার ক্ষেত্রে গার্মেন্টস কারখানাগুলোতে নারীশ্রমিকরা বৈষম্যের শিকার হনতাদের কাজ করতে হয় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশেতার ওপরে রয়েছে জীবন ও শরীরের নিরাপত্তাহীনতাএত কিছুর পরও এরা নিজেরা কষ্টে থেকে কিছু টাকা বাঁচিয়ে নিয়মিত গ্রামে বসবাস তাদের স্বজনদের কাছে পাঠানএই টাকা তাদের পরিবারে যেমন বিশেষ আনন্দের সঞ্চার ঘটায়, তেমনি গ্রামীণ অর্থনীতিতেও রাখে কমবেশি ইতিবাচক প্রভাব

অনিশ্চিত জীবন থেকে উদ্ধার পেতে ও একটি ভালো জীবনের আশায় শহরে এসে একাংশ গ্রামীণ নারী প্রতারণারও শিকার হনবিদেশে কাজে পাঠাবার নামে কার্যত তাদের যৌনকর্মী হিসেবে পাচার করে দেয়া হয়প্রতিনিয়ত এরকম খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত-প্রচারিত হলেও পাচারের ঘটনা এখনো বন্ধ হয় নিকষ্টেসৃষ্টে যোগাড় করা টাকার বিনিময়ে কিছু মেয়ে বিদেশে কাজে যাবার সুযোগ পেলেও, ভাষা ও কাজ বিষয়ে প্রশিক্ষণ না-থাকায় তারা ভালো কাজ যেমন যোগাড় করতে পারেন না, তেমনি তাদের নানা সমস্যায়ও পড়তে হয়    

গ্রামের নিস্তরঙ্গ অর্থনীতির পরিসর ছেড়ে গ্রামীণ নারীদের শহরে কাজের আশায় অভিবাসনের প্রবণতা এখনো চলমানমাসে মাসে নগদ অর্থ হাতে পাবার মতো অভিজ্ঞতা সিংহভাগ গ্রামীণ নারীর জীবনে কখনোই ঘটে নাশহরে এলে সেটা ঘটতে পারে এই সম্ভাবনাটি গ্রামীণ কিশোরী-যুবতী ও তাদের অভিভাবকদের প্রলুব্ধ করে শহরে অভিবাসনেঅথচ গ্রামাঞ্চলে বিকল্প কর্মসংস্থানের সৃষ্টি করা গেলে শহরমুখী না-হয়েও গ্রামীণ নারীরা বর্তমান অবস্থার চাইতে অপেক্ষাকৃত ভালো জীবনের নিশ্চয়তা পেতে পারেন
বলা যায়, গ্রামীণ নারীদের বিদ্যমান অবস্থাটা প্রত্যাশিত নয়, কাজেই এতে গুণগত পরিবর্তন আনার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করা আবশ্যকরাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে কঠোর পরিশ্রমী ও উপাদনসক্ষম গ্রামীণ নারীদের জীবনমানে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারলেই কেবল আমরা বিশ্ব গ্রামীণ নারী দিবসের চেতনার প্রতি সম্মান দেখাতে পারবসেজন্য সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে সুনির্দিষ্ট কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করার সুযোগ আছেএখানে প্রাসঙ্গিক কিছু সুপারিশ যুক্ত হলো, যেসব সুপারিশ উদ্যোগে রূপান্তরিত হলে ইতিবাচক অগ্রগতি হবে বলে আশা করা যায় :
  1. কৃষিকাজের সনাতনী যে পদ্ধতি, তাতে পরিবর্তন আনার জন্য কৃষকদের আধুনিক প্রযুক্তিতে উসাহিত করা ও রাষ্ট্রীয়ভাবে সহায়তা দেয়া দরকারএতে করে কৃষি উপাদনের পরিমাণ যেমন বাড়বে, তেমনি কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত নারী-পুরুষের শারীরিক পরিশ্রমও অনেকখানি লাঘব হবে
  2. গ্রামাঞ্চলে বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগ নিতে হবে, যাতে উন্নত জীবনের আশায় নারী-পুরুষের বর্তমান শহরমুখী স্রোতটিকে নিরুসাহিত করা যায়উদ্যোগ গ্রহণের ক্ষেত্রে ক্ষুদ্রঋণভিত্তিক সনাতনী হাঁসমুরগি পালন ও শবজিচাষের মতো প্রকল্পের বাইরে বেরোতে হবে, স্থাপন করতে হবে কারিগরিভিত্তিক আধুনিক সুযোগসুবিধা সম্পন্ন নিরাপদ কর্মক্ষেত্র
  3. কম সন্তান নেবার ব্যাপারে প্রচারণায় বর্তমানে যে ভাটা পড়েছে, তাতে নতুন করে জোয়ার আনতে হবেগ্রামীণ নারী-পুরুষকে বোঝাতে হবে যে, ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের ওপরে কম সদস্যের পরিবারের সুদূরপ্রসারী ইতিবাচক প্রভাব আছেএ ধরনের প্রচারণার পাশাপাশি জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী গ্রামীণ নারী-পুরুষের জন্য সহজলভ্য ও সুলভ করতে হবে
  4. পুনরুপাদনমূলক কাজ পরিবারের সকল সদস্যের মধ্যে ভাগাভাগি করে করবার সামাজিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে হবেঅত্যন্ত গুরুত্বের সাথে এ প্রচারণা চালাতে হবে যে, পারিবারিক ও সামাজিক কাজ কেবল নারীর নয়, নারী-পুরুষ সকলের
  5. গ্রামীণ মেয়েশিশুদের স্কুল থেকে ঝরে পড়ার হার কমানো ও বাল্যবিবাহ রোধে বিদ্যমান উদ্যোগকে আরো জোরদার ও কার্যকর করতে হবে 
  6. পুকুর ও নদীর পানি দূষণ রোধ করতে হবে ও নিরাপদ পানীয়জলের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে পরিবারের খাবার পানি সংগ্রহের জন্য নারীদের দুর্ভোগ পোহাতে না-হয়
  7. একদিকে বনজঙ্গল ধ্বংস করা, অন্যদিকে পরিবারের দৈনন্দিন জ্বালানি ও শাকপাতা সংগ্রহের দায় কেবল নারীদের ওপর চাপিয়ে রাখার যে সংস্কৃতি সেটা বদলাবার উদ্যোগ নিতে হবেএছাড়া গ্রামাঞ্চলে ভরতুকি দিয়ে হলেও সস্তায় গ্যাস পাবার বন্দোবস্ত করতে হবে
  8. ইউনিয়ন পর্যায়ে স্থাপিত পারিবারিক স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রগুলোকে সার্বক্ষণিক চিকিসক, প্রয়োজনীয় চিকিসা সরঞ্জাম ও ওষুধপত্রসহ সক্রিয় করতে হবে এবং ক্লিনিকগুলোতে ঝামেলামুক্তভাবে দরিদ্র নারীদের চিকিসা নেবার মতো পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবেযেখানে এ ধরনের ক্লিনিক নেই, সেখানে তা স্থাপন করবার ব্যবস্থা করতে হবে      
  9. যৌন হয়রানিসহ সব ধরনের নারী নির্যাতনকে কঠোরহস্তে দমন করবার ব্যাপারে বিদ্যমান আইনের আওতায়ই কার্যকর ও সক্রিয় উদ্যোগ নিতে হবেনারী ও মেয়েশিশু পাচার রোধে বহুপাক্ষিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে 
  10. গ্রামীণ নারীদের মধ্যে যারা দেশের অভ্যন্তরে শহরে ও বিদেশে কাজ করতে যেতে আগ্রহী, তাদের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে; যাতে তারা অজ্ঞতার কারণে প্রতারণার শিকার না-হন এবং ভালো মানের নিরাপদ কাজে যুক্ত হতে পারেনএক্ষেত্রে মেয়েদের শরীর ও জীবনের নিরাপত্তা বিধানেও যত্নবান হতে হবে

আমরা দেখেছি, অপর্যাপ্ত হলেও উল্লিখিত কোনো কোনো খাতে রাষ্ট্রীয়ভাবে নানা উদ্যোগ নানা সময়ে নেয়া হয়েছে, কিন্তু তার কার্যকর বাস্তবায়ন, নিবিড় মনিটরিং ও ফলোআপের জন্য প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা এবং সুনির্দিষ্ট ও পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ না-থাকায় প্রত্যাশিত সুফল আসে নিবিশ্ব গ্রামীণ নারী দিবস ২০১১ উদযাপনের প্রাক্কালে আমরা আশা করি, আগামী বার্ষিক পরিকল্পনায় দেশের মোট খাদ্য উপাদনে বিনিয়োজিত অর্ধেক শ্রম প্রদানকারী গ্রামীণ নারীদের অবস্থার পরিবর্তনে প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দসহ বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণে সরকার বিশেষভাবে উদোগী হবে

Sunday, 25 September 2011

দুটো খণ্ড দৃশ্য : রোকেয়া কবীর


হরতালের পক্ষে বা বিপক্ষে কিছু বলবার জন্য এই লেখা নয়, কথার সূত্রপাত যদিও হরতাল থেকেই
হরতালে অফিসে না-গিয়ে কাজ বন্ধ করে আমি ঘরে বসে থাকতে পারি নাতবে হরতালে গাড়ি নিয়ে পথে বেরোনো ঝুঁকিপূর্ণ বলে এ দিনগুলোতে আমি সাধারণত সিএনজি অটোরিক্সার সেবা নিয়ে থাকি২২ সেপ্টেম্বরের হরতালের দিনও তাই করতে হলোঅটোরিক্সা মিটারে চলবে এরকম আশা এখন সম্পূর্ণই দুরাশাএজন্য জিজ্ঞেস করতে হলো ভাড়ার কথা
ড্রাইভার ১২০ টাকা হাঁকলোবনানী থেকে মোহাম্মদপুর যেতে এই ভাড়া হয়ত খুব বেশি না, যদিও মিটারে গেলে এর চেয়ে কমই লাগবার কথাতবু উঠে বসলাম, যেতে তো হবে
বললাম, ‘আজকে তো রাস্তা ফাঁকা, জ্যাম নেই, সেক্ষেত্রে ভাড়া তো আরো কম হওয়া উচিত
ড্রাইভার বলল, ‘আপা, হরতালের কথা বলে ভাড়া কম দিতে চাইতেছেনকিন্তু আপনি হয়ত জানেন না যে, এই গাড়িটা রাস্তায় নামাইতে সাড়ে নয় লাখ টাকা লাগছেমাত্র চাইর দিন হইল গাড়ির বয়সএত টাকা দিয়া গাড়ি কিনতে হয় বইল্যাই মালিক আমদানিও বেশি নেয়সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টার জন্য আমদানি সাতশ টাকা, রাতের জন্য সাড়ে তিনশ থেকে চারশএর কম ভাড়ায় আমগোর পুষাবো কেমনে?’ অকাট্য যুক্তি তার
কৌতূহল জাগল অটোরিক্সার দাম নিয়েবললাম, ‘এত ছোটো গাড়ি রাস্তায় নামাতে সাড়ে নয় লাখ টাকা লাগবার তো কথা না!
ড্রাইভার জানাল ঘুষের কথাবলল, ‘আপনি তো জানেন, বর্তমানে সিএনজির লাইসেন্স দেওয়া বন্ধসেইজন্য এই লাইসেন্সটা পাইতে অনেক টাকা লাগছেগাড়ির ইঞ্জিন-বড়ি-নেট এইসব লাগাইতে সোয়া পাঁচ লাখের মতো লাগলেও বাকি টাকা গেছে নানা ঘাটে ঘুষ দিতে দিতেএই টাকাটা তো তার উঠানো লাগবোএই জন্যই মালিকরা আমদানি বেশি ধরে
তার কথাবার্তা ঘুরে ফিরে আবার হরতালের দিকে এলে বললাম, ‘হরতালটা কেন হচ্ছে?’
সরাসরি জবাবে না-গিয়ে সে বলল, ‘পথঘাট স্বাভাবিক, গাড়ি-ঘোড়া কম, গণ্ডগোল দেখলাম না কোনোখানেতবে ওইদিন জামাত যে কাজটা করল, সেইটা একদম ঠিক করে নাইপুলিশ চাইলে আগেই ঠেকাইতে পারতকিন্তু তারা সেইটা করে নাইআগে মাইর খাইছে, পরে মাইর দিছেএতে অনেক ক্ষতি হইছেএত গাড়ি পোড়াইলো, কিন্তু এইটা নিয়া মানুষ কথা কয় নাঅবশ্য পুলিশ আগে মারলে বলত, পুলিশই উসকানি দিছে
বললাম, ‘জামায়াত যে ইসলামের কথা বলে, এই ব্যাপারে আপনার মত কী?’
প্রশ্ন শুনে উসকে উঠল সে, ‘আরে রাখেন জামাতএরা সব শয়তানের চ্যালাআমার এলাকার মসজিদের এক জামাতি ইমাম, মুখে মিষ্টি মিষ্টি কথা কয়, মনে হয় ফেরেশতা, কিন্তু মসজিদের লাইট-ফ্যান সব বিক্রি কইরা খাইয়া ফেলেগত আওয়ামী লীগ সরকার মসজিদে কিছু টিন দিছিলোসে ওই টিন বাড়িতে খাটাইয়া মসজিদে লাগাইছে খারাপ টিনএলাকার টাকাপয়সাওয়ালা লোকজন শখ কইরা মানত কইরা মুসল্লিদের সুবিধার জন্য লাইট-ফ্যান-মাইক দেয়, কিন্তু সে বিক্রি কইরা দেয়মাঝে মাঝে লোকজন নামাজের শেষে মসজিদের ব্যাপারে প্রশ্ন তুলবার চেষ্টা করলে ইমাম সাব লাঠিয়াল সাঙ্গপাঙ্গ ডাকেসে আরো যোগ করে, জামাত নামাজ পড়া, ধর্মপালন করা নিয়া বড়ো বড়ো কথা কয়, কিন্তু এরা শয়তানের হাড্ডিঘুষ, চুরি, মেয়েমানুষ খাওয়া থেকে শুরু করে সবটাই করে 
জানতে চাইলাম, ‘বাড়ি কোথায় আপনার?’
ফরিদপুরতারপর সে হেসে ফেলে এবং বলে, ‘ফরিদপুর হইলে কী হইবো, আমার এলাকা কিন্তু বিএনপির ঘাঁটিকামাল সাব খুব ভালা মানুষকিন্তু তার পার্টি বিএনপি ভালা নাসে গরিব লোকদের সাহায্য-সহযোগিতা করে, বর্ষায় জনসাধারণের চলাচলের জন্য ট্রলার দেয়
এ কথায় তার রাজনীতি সম্পর্কে একটু সংশয়ে পড়ে গেলামআরেকটু খোলাসা হতে ইচ্ছে হলোজিজ্ঞেস করলাম, ‘আওয়ামী লীগ দেশ চালাচ্ছে কেমন?’
না, চালাইতে পারতেছে না’, সে বললবিশেষ কইরা পুলিশ প্রশাসন একদমই চালাইতে পারতেছে নাএই মতের সঙ্গে সে ব্যাখ্যাও যুক্ত করলবলল, ‘কেমনে পারবো, সরকার আওয়ামী লীগ হইলেও পুলিশ, সরকারি অফিসার অনেকেই বিএনপি-জামাতেরআমার এলাকার থানায় যত পুলিশ অফিসার একের পর এক বদলি হইয়া আইছে, তারা সবাই বিএনপিরএরা সরকারের কথা মানে নাতার চাইতে সরকারকে ডোবানোর জন্য কাজ করেসে আরো বলল, ‘বিএনপির হাতে অনেক টাকাধরেন আমার এই গাড়ির মালিকের কথাইসে বিএনপির ৩০ জনরে চাকরি দিছেপ্রত্যেকের কাছ থেইকা নিছে ২ লাখ টাকাআওয়ামী লীগ দেশ চালাবো কেমনে? পারবো না
র‌্যাব বিষয়ে আপনার কী মত? সাধারণ মানুষ কি র‌্যাব চায়?’ আমি জানতে চাইলাম
তার স্পষ্ট মত হলো, ‘র‌্যাব দরকার আছের‌্যাব আছে বইলাই চাঁদাবাজগোর উৎপাত কমএখন কম চাঁদা দিতে অয়তবে মুশকিল হইল নকল র‌্যাবএরা ঘুষ নিয়া মানুষ মাইরা দেয়এরাই সরকাররে ডুবাইতাছে
জ্যাম-জটহীন রাস্তায় আলাপে আলাপে অল্পক্ষণেই আমার গন্তব্য বাবর রোডে পৌঁছে গেছি আমরানামবার আগে তার প্রতি আমার সর্বশেষ প্রশ্ন করলাম, ‘আগামীবার কারা নির্বাচিত হবে?’
এইটা আল্লায় জানে’, সে বলল
২.
গত সপ্তাহে একটা অফিসিয়াল ট্যুরে একদিনের জন্য চট্টগ্রাম যেতে হয়েছিলএকটা ভাড়া গাড়িতে করে এয়ারপোর্ট থেকে শহরের দিকে যাচ্ছিসিগন্যালে গাড়ি থেমেছেহঠাৎ চোখ গেল সড়কদ্বীপের দিকেদুটি শিশুবালককে দেখা গেল পালা করে একটা পলিথিনের প্যাকেট ফুলাচ্ছে
কী করে ওরা! খেলছে নাকি!ওদের দিকে তাকিয়ে আমি আনমনেই উচ্চারণ করে ফেললাম
গাড়িতে থাকা কলিগ ফেরদৌস বলল, ‘ওরা ড্রাগ নিচ্ছে
আমি বিস্ময় নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘এরা ড্রাগ নেবার পয়সা পায় কোত্থেকে?’
ফেরদৌস জানায়, ‘এটা করতে খুবই কম পয়সা লাগে আপাজুতার সোল লাগাতে যে সলিউশন ব্যবহার করে, ওটা পুড়ালে যে ধোঁয়া তৈরি হয়, এরা ওটাই ইনহেল করছে
কথায় কথায় জানা গেল, কাঠমিস্ত্রিরা তাদের কাজে যে সস্তা স্পিরিট ব্যবহার করে ওটাও নাকি নেশাদ্রব্য হিসেবে ব্যবহার করা হয় আজকালওই স্পিরিটটা ঝাঁকালে যে গন্ধ বেরোয়, সেটাই নাকি নেশার কাজ করে
আমি ভাবলাম, অন্য কথাআমাদের পত্রপত্রিকাগুলোকে প্রায়ই মাদকবিরোধী ভূমিকায় সক্রিয় দেখিকিন্তু ওরা তো এসব নিয়ে কখনোই প্রায় কিছু লিখে নাওরা বেশি তৎপর ট্রানজিট দেয়া না-দেয়া, দেশ বিক্রি করা না-করা, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হওয়া না-হওয়া ইত্যাদি নিয়েকিংবা বিদেশি হুইস্কি, ভোদকা, ওয়াইন ইত্যাদি নিয়েকার বাসায় কত বোতল বিদেশি মদ পাওয়া গেল সে নিয়ে তাদের প্রচুর কৌতূহলএ অভিযোগে মন্ত্রী, নেতা, ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে আমরা এমনকি মামলা হতেও দেখেছি
হুইস্কি, ভোদকা, ওয়াইন কতটা ক্ষতিকর কতটা নয় সে ব্যাপারে বিতর্ক আছেকিন্তু দরিদ্র জনগোষ্ঠী স্বাস্থ্যের পক্ষে হানিকর দ্রব্য নেশা হিসেবে গ্রহণ করে যেভাবে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, সেসব নিয়ে আমাদের বেশি করে কথা বলা দরকারকিন্তু এ ব্যাপারে মিডিয়াকে প্রায়ই নীরব থাকতে দেখি  
এমন কেন হয়? মিডিয়া কি কেবল বড়োলোকদের স্বাস্থ্যভাবনায় মগ্ন থাকবে? নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করলামদরিদ্র শ্রমজীবী মানুষ বা যারা আগামী সময়ে শ্রম দেবে তারা ক্ষতিকর নেশায় আচ্ছন্ন হয়ে গেলে অর্থনীতির চাকাটাই তো অচল হয়ে যাবেএদের রক্ষার জন্য কার্যকর উদ্যোগ কই?
জবাবটাও নিজেই খুঁজতে চাইলামএদের এই নেশার জগতে আসার বড়ো একটা কারণ বিনোদনহীনতা ও খেলাধুলার সুযোগ না-থাকাএকে তো দারিদ্র্যজনিত হতাশা, তার ওপরে হতাশা কাটাবার জন্য দরকারি বিনোদন ও খেলাধুলার সুযোগের সঙ্কট কাটানো না-গেলে এ অবস্থা পরিবর্তন করা যাবে না
আমরা আমাদের শৈশব-কৈশোরে খেলাধুলায় মগ্ন থাকবার অনেক সুযোগ পেয়েছিকী গ্রাম কী শহর উভয় ক্ষেত্রেই এখন খেলাধুলার সুযোগ অনেক কমে গেছেগ্রামে যেমন এখন আর গোল্লাছুট, দাড়িয়াবান্দা, হাডুডু, বৌচি, ডাংগুলি, কেরামবোর্ড, লুডু, জাম্বুরা দিয়ে ফুটবল খেলা নেই, নেই শহরেওশহরের পাশাপাশি কয়েকটা মহল্লাজুড়ে একটিও খেলার মাঠ নেইযেখানে আছে, তারও নেই ব্যবহারোপযোগিতাএরকম অবস্থায় আমাদের ছেলেমেয়েরা স্কুল থেকে ফিরে করবেটা কী? বাধ্য হয়ে ওরা হয় কম্পিউটার গেমে ডুবে থাকে, নয় বাইরে গিয়ে গাঁজা-ফেনসিডিলের আড্ডায় মেশে
এদের বাইরে শহরে যারা ঘরহীন ছিন্নমূল, তাদের ক্ষেত্রে বিনোদন বা খেলাধুলার সুযোগ প্রায় অসম্ভবখেলার মাঠ থাকলেও ওদের সেখানে কমই প্রবেশাধিকার থাকেএরা প্রায়ই মা-বাবার সন্ধান জানে না, অথবা জানলেও তাদের থেকে আলাদা থাকে বা থাকতে বাধ্য হয়এদের যে ধরনের হতাশাজনক অবস্থার ভিতর দিয়ে যেতে হয়, সেখানে জুতার আঠা দিয়ে ইনহেল করাকে খুব স্বাভাবিকই মনে হয়
ভাবি, এদের রক্ষায় সরকার ও আমাদের অনেক কিছুই করবার আছে 

Monday, 25 July 2011

জনসংখ্যা বনাম জনসম্পদ : প্রেক্ষিত নারীর সনাতনী প্রজনন কর্মভার/ রোকেয়া কবীর

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোকৃত আদমশুমারি ও গৃহগণনা ২০১১-এর প্রাথমিক ফলাফল থেকে জানা যাচ্ছে, বাংলাদেশের বর্তমান জনসংখ্যা ১৪ কোটি ২৩ লাখ ১৯ হাজার। এ বিষয়ক বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত ও আলোচনার সূত্রে ধারণা করা যায়, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান কর্তৃক শুমারি-পরবর্তী যাচাই-বাছাইয়ের পর প্রকৃত গণনায় এ সংখ্যা কিছুটা বেড়ে ১৫ কোটির কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়াতে পারে। যদিও জাতিসংঘভুক্ত সংস্থা ইউএনএফপিএ ২০০৮ সালেই জানিয়েছিল বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৬ কোটি ১৩ লাখ, সে হিসেবে ২০১১-এ মোট জনসংখ্যা ১৭ কোটিকেও ছাড়িয়ে যাবার কথা। যে কারণে দেশের প্রকৃত জনসংখ্যা কত তা নিয়ে নানা তর্কবিতর্কের সূত্রপাত ঘটেছে। এটা ঘটতেই পারে, কারণ প্রকৃত সংখ্যা ১৪ কোটি, ১৬ কোটি বা ১৭ কোটি যাই হোক, এই সংখ্যাটা কেবল একটা জড়সংখ্যাই নয়, এর আড়ালে রয়েছে মানুষ ও তার জীবন, যাদের রয়েছে নানা চাহিদা। জনসংখ্যার ওপরে ভিত্তি করেই দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা করা হয়, হিসেব করা হয় মাথাপিছু আয়ের। আবার এই জনসংখ্যাকে জনসম্পদে রূপান্তরিত করতে হলেও জনসংখ্যার একটা বাস্তব চিত্র জানা থাকা দরকার।

ক্ষুদ্রায়তনের এই দেশে বিদ্যমান সম্পদের তুলনায় উল্লিখিত পরিমাণ জনসংখ্যা বড়ো একটা চাপ সৃষ্টি করছে এতে কোনো সন্দেহ নেই। যে দেশের একটা উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নারী-পুরুষ প্রতিনিয়ত ক্ষুধা, দারিদ্র্য, অপুষ্টি ও রোগব্যাধিতে ভোগে, যার বড়ো অংশই নারী ও শিশু, সে দেশের বিপুল জনসংখ্যা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ মনোযোগ দাবি করে। এই বিপুল পরিমাণ জনসংখ্যার জীবনের ন্যূনতম মান বজায় রেখে জনসংখ্যা সমস্যাকে সম্ভাবনাময় জনশক্তিতে রূপায়িত করে দেশটাকে আরো অগ্রসর করে নিয়ে যেতে হলে খাদ্য ও পানীয় জল, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসার মতো মৌলিক চাহিদাসমূহ মেটানোর পাশপাশি ক্রমবর্ধমান চাহিদার প্রেক্ষিতে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, প্রয়োজনীয় জ্বালানির যোগান, কর্মসংস্থান ইত্যাদি খাতে ব্যাপকায়তন উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন, যা আমাদের সামনে একটা বড়ো চ্যালেঞ্জ।

দেশের সিংহভাগ মানুষ কৃষিনির্ভর হলেও দ্রুত নগরায়ণ, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, বাড়তি জনগোষ্ঠীর বাসস্থানের চাহিদা ইত্যাদি মেটাতে প্রতিবছরই আবাদি জমির পরিমাণ কমে যাচ্ছে, যা দেশের ক্রমবর্ধমান খাদ্য নিরাপত্তাকে বিরাট হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। এই হুমকির সমীকরণটা খুব স্বচ্ছ : জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে বাড়ছে খাদ্যের চাহিদা, আর বিপরীতে আবাদি জমির পরিমাণ কমে যাওয়ায় কমছে খাদ্য উৎপাদন। এই বিপরীতমুখী প্রলম্বন আমাদের এই ইঙ্গিতই দিচ্ছে যে, এক্ষুনি সতর্ক উদ্যোগ গ্রহণ না করলে আমরা ভয়াবহরকম এক সংকটজনক পরিস্থিতির মুখে পড়তে যাচ্ছি। এই বিপুল জনসংখ্যার জন্য খাদ্য ছাড়াও অন্য প্রয়োজনীয় চাহিদা যথা শিক্ষা, স্বাস্থ্য, রাস্তাঘাট ও যানবাহন এবং জ্বালানির যোগান দেওয়া, কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা ইত্যাদির জন্য রাষ্ট্রের ওপরে যে বাড়তি চাপ পড়ছে, সে চাপ মোকাবেলা করবার মতো যথেষ্ট প্রস্তুতি আমাদের এখনো নেই। তাছাড়া অধিক জনসংখ্যা পরিবেশের ওপরেও নানা ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে। ক্রমাগত বনভূমি উজাড়, নদীনালা-জলাশয় ভরাট, পাহাড় কর্তন ইত্যাদির ফলে প্রাকৃতিক ভারসাম্য যেভাবে বিনষ্ট হচ্ছে তা জনজীবনের জন্য হয়ে উঠছে মারাত্মক আরেক হুমকি। এসব বিবেচনায় জনসংখ্যা বৃদ্ধির এই হারকে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আনা খুবই দরকার।

নবপ্রকাশিত পরিসংখ্যান বলছে, দেশে বর্তমানে নারীর সংখ্যা ৭ কোটি ১০ লাখ ৬৪ হাজার, অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫০ ভাগই নারী। এই সংখ্যার গরিষ্ঠভাগ নারীই সনাতনী পরিবার ব্যবস্থা ও প্রজনন কর্মভার, পুরুষতান্ত্রিক সমাজদর্শন ও নানা নির্যাতন-নিষ্পেষণে কাবু। তথ্য-উপাত্ত বলছে, শিক্ষা, প্রশাসন, রাজনীতি ও সংসদ থেকে শুরু করে স্থানীয় সরকার এবং বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠান থেকে নেয়া ক্ষুদ্রঋণ ব্যবহার করে অপ্রাতিষ্ঠানিক অর্থ উপার্জনকারী কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ ক্রমাগত বাড়ছে, যা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও স্বীকৃত। আমরা যখন আমাদের নারীদের প্রচলিত-অপ্রচলিত বিভিন্ন নীতিনির্ধারণমূলক ও উপার্জনমূলক কাজে সাফল্যের সাথে বিচরণ করতে দেখছি, তখনও নারীর প্রতি সমাজের সনাতনী দৃষ্টিভঙ্গির কারণে তাদের প্রতি একের পর এক বিভিন্নমুখী নির্যাতনের ঘটনা ঘটে চলেছে। কী ভয়াবহ মাত্রায় দেশে নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে তা বুঝতে বেশিদূরে যাবার দরকার নেই। গত এক মাসে সংবাদমাধ্যমে যে পরিমাণ নারী নির্যাতনের ঘটনা উঠে এসেছে তা দিয়েই এ কথার সত্যতা উপলব্ধি করা যায়, যদিও যত নির্যাতনের ঘটনা দেশে ঘটে, প্রকাশিত ঘটনাগুলো তার একটি ক্ষুদ্র অংশ মাত্র।

নারীর প্রতি সমাজে বিরাজমান সনাতনী দৃষ্টিভঙ্গি নারীকে দেখতে চায় একজন ভালো মা, ভালো স্ত্রী, ভালো গৃহিণী হিসেবে। নারী যত শিক্ষিতই হোক, যত উপার্জনকারীই হোক, রাজনীতির মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ করুক; আমরা তাকে নারী হিসেবেই দেখি। এমনকি সরকার পরিচালনা, মন্ত্রণালয় পরিচালনা, অফিস পরিচালনার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজে নারী যুক্ত থাকলেও তাকে আমরা সক্রিয় একজন নাগরিক হিসেবে না দেখে নারী হিসেবেই দেখতে চাই। এতকিছুর পরেও আমাদের মনোযোগ থাকে এটা দেখায় যে, তিনি কতটা ভালো মা, কতটা ভালো স্ত্রী, কতটা ভালো গৃহিণী। আমরা দেখতে চাই তারা সন্তান ধারণ, জন্মদান, লালনপালন, পারিবারিক আতিথেয়তা ও ঘরের কাজ করায় কতটা পারদর্শী। অর্থাৎ নারীর প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি আজো সনাতনী প্রজনন কার্যক্রমেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিনিয়ত বদলাচ্ছে, কিন্তু নারীর প্রতি সমাজের এই দৃষ্টিভঙ্গি একই জায়গায় থেকে গেছে। আমাদের চারপাশের সমাজ থেকে এ কথার স্বপক্ষে অজস্র উদাহরণ হাজির করা যায়। সম্প্রতি সংঘটিত রুমানা মনজুরের নির্যাতনের ঘটনা যার একটি হতে পারে। তিনি লেখাপড়া করে বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার মতো কাজে যুক্ত ছিলেন, উপার্জন করতেন, প্রচলিত সংজ্ঞায় তিনি তাঁর সমাজে ক্ষমতায়িত ছিলেন; কিন্তু তাঁর স্বামী ও পরিবারের সনাতনী দৃষ্টিভঙ্গির কারণে তাঁকেও নির্যাতিত হতে হয়েছে, চোখ হারাতে হয়েছে। এতকিছু অর্জন করেও তাঁর অপরাধ ছিল এই যে, স্বামীর দৃষ্টিতে তিনি ভালো স্ত্রী ও তার সন্তানের ভালো মা হতে পারেন নি। যেন ভালো স্ত্রী, ভালো মা হওয়াই নারী জীবনের একমাত্র সাধনা হওয়া উচিত!

নারীর প্রতি সমাজের এই সনাতনী দৃষ্টিভঙ্গির কারণে কেবল শিক্ষিত হওয়া, উপার্জন করা, অংশগ্রহণ করতে পারাকেই আমরা ক্ষমতায়নের উপাদান হিসেবে দেখছি, ফলে নারী আজ দ্বিগুণ-ত্রিগুণ কর্মভারে পীড়িত হচ্ছে। উপার্জনমূলক কাজে পুরোমাত্রায় যুক্ত থাকার পরও তাকে পারিবারিক, সামাজিক ও শারীরিক নানা ঝক্কির মোকাবেলা করতে হচ্ছে। তাতে তার শারীরিক-মানসিক নানারকম চাপ নিতে হচ্ছে। নিতে হচ্ছে সময়ের চাপ। কিন্তু এই অবস্থা অমানবিক। এই অমানবিক অবস্থার পরিবর্তন চাইলে আমাদের অতি অবশ্যই বিদ্যমান সনাতনী দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে, নারীকে মানুষ এবং সক্রিয় নাগরিক হিসেবে দেখায় অভ্যস্ত হতে হবে। সমান মর্যাদা ও অধিকার ভোগের অধিকারী হিসেবে তাকে দেখতে হবে, যে অধিকার নারীকে আমাদের সংবিধানই দিয়েছে।

দেশের একজন নাগরিক হিসেবে তার যা যা প্রাপ্য তা তাকে দিতে হবে। বিপরীতে নাগরিক হিসেবে নারীর যা করণীয় তা তাদের করতে হবে, সক্রিয় নাগরিক হিসেবে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে। আর এটা করতে হলে নারীর ওপর থেকে একের পর এক সন্তান ধারণ ও তার লালনপালনের ভার কমাতে হবে, গার্হস্থ্য কাজের ভার কমাতে হবে। এসব ভার কমলেই তারা রাষ্ট্রের সক্রিয় নাগরিক হিসেবে সামাজিক-রাজনৈতিক দায়িত্ব পালন করবার সুযোগ এবং সময় পাবে। নিজেরা উপার্জনমূলক কাজে যুক্ত হতে পারবে।

একটা ছেলের ক্ষেত্রে আমরা বলি আগে মানুষ হও, নিজের পায়ে দাঁড়াও, তারপরে বিয়ে-সংসার করো ইত্যাদি। একইভাবে একটি মেয়েকেও আগে মানুষ হওয়া ও নিজের পায়ে দাঁড়াবার অবকাশ দিতে হবে। সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি বদলিয়ে এরকম ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে ছোটোবেলা থেকেই একটা মেয়ে মানুষ হিসেবে সমান স্বীকৃতি ও মর্যাদা পায় এবং শিক্ষাগ্রহণ, পেশা নির্বাচন ও নিজের ভালোমন্দ নিজেই ঠিক করবার সুযোগ পায়। একজন মানুষের জীবনে ১৫ থেকে ৫০ বৎসর বয়সসীমা হচ্ছে সবচেয়ে উৎপাদনক্ষম সময়। অথচ সনাতনী চিন্তাভাবনার কারণে আমাদের সমাজের প্রায় প্রতিটি নারীর এ সময়টা সন্তান জন্মদান ও তার লালনপালনে ব্যয় হয়ে যায়। এই সনাতনী দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই সমাজ থেকে আইন করেও বাল্যবিয়ে দূর করা যাচ্ছে না, কমানো যাচ্ছে না মাতৃমৃত্যুর উচ্চহারও। আইনানুযায়ী যেখানে একটি মেয়ের বিয়ের ন্যূনতম বয়স ১৮, সেখানে আমাদের দেশে মেয়েদের গড় বিয়ের বয়স ১৫। এই গড় আমাদের এই ধারণা দেয় যে, দেশে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিয়ে হয় ১২ বছর বয়সের মধ্যে। আর এর ফলে অল্প বয়সেই এই মেয়েদের গর্ভধারণ করে নিজেদের জীবনটা বিপন্ন করবার ঝুঁকি নিতে হয়। এদের একটা অংশের সন্তান জন্মদানের সময় মৃত্যুর আশঙ্কা থাকে, অনেকে মৃত্যুবরণ করে। এই মৃত্যহার এখনো অগ্রহণীয় পর্যায়ে রয়ে গেছে। ২০১০-এ প্রকাশিত হিসেবে এখনো দেশে প্রতি লাখে ১৯৪ জন মা প্রসবকালে মৃত্যুর শিকার হয়। যারা বেঁচে থাকে তাদেরও সন্তান ও সংসারের ঘাঁনি টানা এবং স্বামী-শ্বশুর-শাশুড়ির সেবা করা ছাড়া জীবনে আর কিছুই করা হয়ে ওঠে না। নারীসমাজকে সন্তান ও সংসারের ভারে এভাবে জর্জরিত হওয়ার অবস্থা থেকে মুক্তি দিতে হবে। তাতে মেয়েরা পড়াশোনা করে নিজে উপার্জনক্ষম হতে পারবে, মা ও শিশুমৃত্যুর হার কমবে, পরিবারব্যবস্থাপনা করা হবে অনেক সহজ। সন্তানকে ঠিকমতো লেখাপড়া করানো, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া ও মানুষ করে তুলবার মতো অর্থনৈতিক সামর্থ্যও তাদের করায়ত্ত হবে। পরিবার ছোটো হলে জনব্যবস্থাপনায় সুবিধা হবে রাষ্ট্রেরও। বিপুল পরিমাণ মানুষের জীবনমান নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রের কোষাগারের ওপর চাপ কমবে। অর্থাৎ সকল মানুষের জীবনের মানগত উন্নয়ন ঘটবে, বিদ্যমান দারিদ্র্যাবস্থার বদল ঘটবে।

নারীর ব্যাপারে সমাজের মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গিটা বদলালে নারী নির্যাতনের হার কমবে। মেয়েকে কোনো পরিবারেই ভার হিসেবে দেখা হবে না। আর এরকম অনুকূল অবস্থা তৈরি হলে নারীও মুখ বুজে পড়ে থাকবে না, নিজের জীবন গড়ার পাশাপাশি পরিবার ও সমাজের জন্য, দেশের জন্য নিজে ভূমিকা রাখতে উদ্যোগী হবার অবকাশ পাবে। তারা যদি সামাজিক-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় থাকবার সুযোগ পায়, তাহলে নিশ্চিতভাবে বাল্যবিয়ের হার কমবে, শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার কমবে, উন্নতি হবে প্রজননস্বাস্থ্যের। তার অন্যতম প্রধান ফল হবে ক্রমহ্রাসমান জনসংখ্যার হার।

কাজেই যত দ্রুত সম্ভব নারীর প্রজনন কর্মভার কমানো ও নারীর প্রতি সমাজের সনাতনী দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর জন্য সরকারি ও বেসরকারিভাবে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। সম্ভাব্য উদ্যোগগুলোর মধ্যে একটি হতে পারে, বিভিন্ন নাগরিক সুবিধা গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় মানদণ্ড স্থাপন। তাতে যেসব পরিবার ও সমাজে নারীর প্রতি সনাতনী দৃষ্টিভঙ্গি আছে, রাষ্ট্রীয় ও অন্যান্য সুযোগসুবিধা প্রাপ্তির আগ্রহে ওই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তারা বেরিয়ে আসবে। যেমন যদি বিভিন্ন সরকারি, বেসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে চাকুরি প্রাপ্তি ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে এরকম নিয়ম বেঁধে দেওয়া হয় যে, বাল্যবিয়ে হয় নি বা পরিবারের কারো সন্তানসংখ্যা একটি বা দুটির বেশি নয় এমন পরিবারের সদস্যদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে; তাহলে নিশ্চিতভাবে সমাজে এর একটা ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। এটি একটি উদাহরণমাত্র। এই আলোকে চাকুরি ও পদোন্নতি প্রাপ্তি, ব্যাংক ঋণ প্রাপ্তি, স্বাস্থ্য সেবা প্রাপ্তি, বিনামূল্যে শিক্ষা সুবিধা প্রাপ্তি ইত্যাদি ক্ষেত্রে বিভিন্ন মানদণ্ড স্থাপন (ইনডিকেটর সেট) করার কথা ভাবা যেতে পারে। তাছাড়া স্কুল-কলেজের পাঠ কার্যক্রম ও প্রচার মাধ্যমে এ বিষয়ে ব্যাপক আলোচনা, বিতর্ক ইত্যাদির মাধ্যমে সামগ্রিক সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগও গ্রহণ করা যেতে পারে।

সর্বোপরি বলা যায়, নারীর প্রতি বিদ্যমান সনাতনী সমাজ ব্যবস্থায় নারীসমাজকে যে পরিমাণ অমানবিক অবস্থার ভিতর দিয়ে জীবনধারণ করতে হয়, সে অবস্থার পরিবর্তন করা না গেলে সমাজের বর্তমান অসম ও নির্যাতন-নিষ্পেষণমূলক অবস্থায় কোনো স্থায়ী পরিবর্তন আসবে না। এ অবস্থায় কোনো উন্নয়ন উদ্যোগই পুরোপুরি কার্যকর হবে না, বরং তা হবে মূল কারণ টিকিয়ে রেখে পার্শ্ব কারণসমূহ দূরীভূত করবার জন্য শ্রম ও অর্থ বিনিয়োগ।

Thursday, 14 July 2011

ভিকারুননিসা নূন স্কুলের ধর্ষক-শিক্ষক পরিমল জয়ধর এবং বদরগঞ্জের নির্যাতক সালিশকার ইউপি চেয়ারম্যানসহ সম্প্রতি সংঘটিত সকল নারী নির্যাতন ঘটনার অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনের অবস্থানপত্র

ভিআইপি হল, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি, ঢাকা। ১৪ জুলাই ২০১১

প্রিয় সাংবাদিক বোন ও ভাইয়েরা,
বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘ (বিএনপিএস)-এর পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা জানবেন।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি, সালিশের নামে নির্যাতন, যৌতুকের নামে হত্যা এবং পারিবারিক নির্যাতনসহ নারীর প্রতি সকল প্রকার সহিংসতার বিরুদ্ধে আমাদের প্রতিবাদ জানাতে এবং এ বিষয়ে করণীয় সম্পর্কে আমাদের বক্তব্য ও দাবিসমূহ তুলে ধরার জন্য আজকের এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে।
সংবাদকর্মীদের প্রশ্নের জবাব দিচ্ছেন বিএনপিএস নির্বাহী পরিচালক নারীনেত্রী রোকেয়া কবীর। পাশে উপবিষ্ট (ডানে) বিএনপিএস কার্যনির্বাহী পরিষদ সদস্য বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী কনকচাঁপা চাকমা ও বিএনপিএস পরিচালক ওমর তারেক চৌধুরী এবং (বামে) বিএনপিএস উপপরিচালক শাহনাজ সুমী ও অ্যাডভোকেসি সমন্বয়কারী দিলারা রেখা

প্রিয় বন্ধুগণ,
ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের বসুন্ধরা শাখার শিক্ষক পরিমল জয়ধর কর্তৃক শিক্ষার্থীকে ধর্ষণ ও নিপীড়ন এবং নিপীড়নের ছবি ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেয়ার হুমকি দেয়ার ঘটনায় বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘ তীব্র নিন্দা, ক্ষোভ ও ঘৃণা প্রকাশ করছে। আমরা গভীর উদ্বেগের সাথে লক্ষ করেছি যে, এ ঘটনায় স্কুল কর্তৃপক্ষ নিপীড়িত ছাত্রীকে উপযুক্ত সহায়তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। গণমাধ্যমসূত্রে আমরা আরো অবগত হয়েছি, পরিমল ছাড়াও একই শাখার আরো চার শিক্ষকের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থী নিপীড়নের অভিযোগ রয়েছে। আমরা ধর্ষক পরিমল, এ কাজে প্রশ্রয়দানকারী কর্তৃপক্ষ এবং অভিযুক্ত অন্য চার শিক্ষকসহ সকল অপরাধীকে আইনানুগ বিচারের আওতায় আনার জোর দাবি জানাচ্ছি।

সম্প্রতি ব্রাক্ষণবাড়িয়ার আখাউড়ায় শিক্ষক দ্বারা শিক্ষার্থী নিপীড়নের আরেকটি ঘটনার খবর কাগজে প্রকাশিত হয়েছে। স্কুলের শ্রেণিকক্ষে ঢুকে যৌন নিপীড়নকারী ওই শিক্ষক ইতোমধ্যে গ্রেপ্তারও হয়েছেন। আমরা শিক্ষকের বেশধারী এই নিপীড়কেরও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।

প্রিয় ভাই ও বোনেরা,
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানির ঘটনা নতুন কিছু নয়। ঠিকমতো অনুসন্ধান করলে দেখা যাবে, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অহরহই নানামাত্রায় যৌন নিপীড়নের ঘটনা ঘটে চলেছে। মেয়েশিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্য করে আপত্তিকর ইঙ্গিতপূর্ণ কথা বলা থেকে শুরু করে নানা ছলে তাদের শরীরে হাত দেওয়া পর্যন্ত ঘটনা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে হামেশাই ঘটে বলে অভিযোগ রয়েছে। ছেলেশিক্ষার্থীরাও যৌন নিপীড়নের শিকার হচ্ছে বিভিন্ন মাদ্রাসা ও স্কুলে। নির্যাতন সম্পর্কিত স্পষ্ট ধারণা না-থাকা, নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতনতার অভাব, যুক্তিসংগত অভিযোগ জানাবার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অনুপস্থিতি, অভিযোগ জানাবার পর অভিযোগকারীর নিরাপত্তার অভাব, শিক্ষকগণ কর্তৃক নানামাত্রিক হুমকি, শিক্ষার্থীদের সাথে অভিভাবকদের সহজ সম্পর্ক না-থাকা, সমাজ ও অভিভাবকগণ কর্তৃক মেয়েদের ওপরে দোষ চাপানোর পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা, সমাজে প্রচলিত সনাতনী এবং পুরুষতান্ত্রিক চেতনা উদ্ভূত লজ্জাবোধ, ইত্যাদি কারণে এসব ঘটনা প্রায়ই প্রকাশিত হয় না। আমরা ধারণা করি, প্রাইভেট, কোচিংক্লাস ও বিশেষ তত্ত্বাবধানের নামে শিক্ষার্থীদের একা পাবার সুযোগ নিয়ে সারাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে রক্ষক হয়ে ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ এক শ্রেণির শিক্ষকদের দ্বারা যে পরিমাণ ধর্ষণ/বলাৎকারের ঘটনা ঘটে থাকে, তার বেশিরভাগই অপ্রকাশিত থেকে যায়।

স্থানীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সকল ক্ষেত্রে নারীর ক্ষমতায়ন ও সমানাধিকার কায়েমের লক্ষ্যে মেয়েরা যখন শিক্ষায় ব্যাপকভাবে অগ্রসর হয়ে এসেছে, যখন তারা একের পর এক সাফল্যের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে চলেছে, তখন এই ধরনের ঘটনা আমাদের এই অর্থেও উদ্বিগ্ন করে তুলে যে, এতে অনেক অভিভাবক তাদের মেয়েদের স্কুলে পাঠানো বন্ধ করে দিয়ে বাল্যবিয়েতে আগ্রহী হয়ে উঠতে পারেন। এতে যে শুধু ওই মেয়েদেরই ক্ষতি হবে তা নয়, বরং ক্ষতিগ্রস্ত হবে নারীসমাজসহ গোটা জাতি। এই পরিপ্রেক্ষিতে আমরা মনে করি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি ও নিপীড়ন প্রতিরোধে মহামান্য হাইকোর্ট প্রদত্ত নির্দেশনামূলক নীতিমালা অনুসরণ বাধ্যতামূলক করার ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। এজন্য একইসঙ্গে শিক্ষা, আইন এবং নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে এ বিষয়ে বিশেষ নির্দেশনা জারি করাসহ জারিকৃত আইন ও নির্দেশনা কার্যকর করারও দাবি জানাচ্ছি। আমরা মনে করি, সকল স্তরের শিক্ষালয়ে যৌন হয়রানি বন্ধ করার পরিবেশ তৈরির জন্য অনতিবিলম্বে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জরুরিভাবে পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন।

প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুরা,
আশা করি আপনারা জানেন যে, গত ২৬ জুন ২০১১ রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার রাজারামপুর কাশীগঞ্জে দুই গৃহবধূ সাইদা ও হ্যাপীকে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের নবনির্বাচিত চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে তথাকথিত সালিশের নামে পাশবিক কায়দায় অবর্ণনীয় নির্যাতন করা হয়েছে। দুটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলে নির্যাতনের দৃশ্য সম্বলিত খবর প্রচারের পর চেয়ারম্যানের লোকজন প্রভাব খাটিয়ে একজন নির্যাতিতের মুখ থেকে তার ওপরে কোনো নির্যাতন করা হয় নি বলিয়ে নিয়ে তাদের দুজনকেই গ্রামছাড়া করে দিয়েছে, যারা এখন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। শুধু তাই নয়, ‘একুশের চোখ’-এর অনুসন্ধানী দল এ ঘটনার ফলোআপ খবর সংগ্রহে গেলে চেয়ারম্যানের লোকজন পুরো দলটির ওপর হামলা চালিয়ে চারজনকে মারাত্মকভাবে আহত করে। খবরে প্রকাশ, স্থানীয় পুলিশ তিনজনকে গ্রেফতার করলেও ঘটনার মূল হোতা ইউপি চেয়ারম্যানকে এখনো গ্রেফতার করতে সক্ষম হয় নি।

ঘটনার এই গতিপ্রকৃতিতে নারীসমাজ বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন। নারীনীতিবিরোধী যে অপশক্তিকে আমরা রাজপথে বুকে পবিত্র কোরানশরিফ বেঁধে মিছিল করতে দেখেছি, ওই গোষ্ঠীটি নারীর বিরুদ্ধে যে ধরনের নির্যাতনের সংস্কৃতি দেশে চালু রাখতে চায়, এ ঘটনায় যেন আমরা তারই
বাস্তবায়ন দেখলাম। কিন্তু আমরা ভেবে পাই না, স্থানীয় প্রশাসনের নাকের ডগায় সালিশের নামে নারীর বিরুদ্ধে জঘন্য ফতোয়া কার্যকর করেও ফতোয়াবাজরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে একটি গ্রামে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে চলে কীভাবে? এ ধরনের ঘটনা যেন দেশে আর একটিও না-ঘটে সে ব্যবস্থা করবার জন্য আমরা বিশেষভাবে মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।   

প্রিয় বন্ধুরা,
আমরা আজ শুধু ঢাকার ভিকারুননিসা নূন স্কুল বা রংপুরের বদরগঞ্জের ঘটনার কথাই এখানে বলতে আসি নি। আমরা সামগ্রিকভাবে পরিবার, কর্মস্থল, শিক্ষাঙ্গন, রাস্তাঘাটসহ সর্বত্র নারীর প্রতি সংঘটিত নির্যাতন, নিপীড়ন ও হয়রানির ঘটনার যে বিস্তৃতি, তার প্রশমনে সমাজ ও সরকারের প্রতি কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের কথাই মূলত বলতে এসেছি। আমরা এখানে রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার সিমলা দীঘিপাড়া গ্রামের আদিবাসী নারী মরিয়ম মুর্মুর ধর্ষণ ও হত্যার কথা বলতে পারি, মতিঝিলে স্বামীর পিটুনিতে নিহত স্ত্রীর কথা বলতে পারি, নারায়ণগঞ্জে সিঙ্গাপুর প্রত্যাগত প্রবাসী নারীশ্রমিককে গণধর্ষণের পর আগুন দিয়ে পোড়ানোর কথা বলতে পারি; কিন্তু এরকম পাঁচ-দশটি ঘটনার কথা বলে এই অব্যাহত নির্যাতন ও মৃত্যুমিছিলের পুরো বর্ণনা দেওয়া সম্ভব নয়। এরকম নিপীড়নঘটনা সারাদেশে প্রতি মুহূর্তেই ঘটছে, যার প্রকৃত কোনো হিসেব কারো কাছেই নেই। অথচ এসব নির্যাতন ঘটনার সুষ্ঠু বিচার ও শাস্তি প্রদান কিংবা এ ধরনের সম্ভাব্য ঘটনা প্রতিরোধে রাষ্ট্রীয়-সামাজিক পদক্ষেপ গ্রহণের দৃষ্টান্ত আমরা খুব কমই স্থাপন করতে পেরেছি ও পারছি।

বন্ধুগণ,
সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখানো হয়েছে, নারী নির্যাতনের কারণে প্রতিবছর দেশের জিডিপির ২.০৫ শতাংশ অর্থ অপচয় হয়, যা জাতীয় বাজেটের স্বাস্থ্য ও পুষ্টি খাতের মোট বরাদ্দের সমান। এ পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয় নির্যাতন-সংশ্লিষ্টদের চিকিৎসা, মামলা-মোকদ্দমা, সালিশ, সামাজিকতা রক্ষা এবং সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে নারী নির্যাতনবিরোধী সচেতনতা কর্মসূচি চালাতে। তার মানে হলো, নারীর প্রতি সহিংসতা, নির্যাতন, নিপীড়ন, হয়রানি, ধর্ষণ, অ্যাসিড নিক্ষেপ, ফতোয়া, মৌখিক হয়রানি, মানসিক নির্যাতন চূড়ান্ত বিচারে শুধু নির্যাতন-সংশ্লিষ্টদেরই ক্ষতি করে না, বরং সমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে সমাজের সকল নারী-পুরুষ ও শিশুকে। আমরা নারী-পুরুষ সকলের জন্যই এই ভয়ংকর অমানবিক পরিস্থিতি ও অর্থনৈতিক অপচয় থেকে দেশ ও দেশের মানুষের মুক্তি চাই। এ অবস্থা কোনো সুস্থ সমাজের জন্যই কাম্য হতে পারে না। আমরা দৃঢ়ভাবে এমন অবস্থার অবসান চাই। এই অনাকাক্সিক্ষত অবস্থার পরিবর্তনের জন্য আমরা নিচের দাবি ও আহ্বান আপনাদের মাধ্যমে সরকার ও দেশবাসীর সামনে তুলে ধরছি :

  • ভিকারুননিসা নূন স্কুলের ধর্ষক-শিক্ষক পরিমল জয়ধর এবং তার সহযোগী ও প্রশ্রয়দানকারী, রংপুরের দুই গৃহবধূর ওপর নির্যাতনকারী ইউপি চেয়ারম্যানসহ সকল সালিশকার, ব্রাক্ষণবাড়িয়ার আখাউড়ার যৌন নিপীড়নকারী শিক্ষক, গোদাগাড়ী উপজেলার আদিবাসী নারী মরিয়ম মুর্মুর ধর্ষক ও হত্যাকারী, অধ্যাপক রুমানা মনজুরের নিপীড়ক স্বামীসহ সম্প্রতি ও অদূর অতীতে সংঘটিত সকল নারী নির্যাতন ঘটনার অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
  • সকল স্তরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অনতিবিলম্বে যৌন নিপীড়ন বিরোধী পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা চালু করতে হবে।
  • যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে দেওয়া হাইকোর্টের নির্দেশনা বাস্তবায়ন করবার কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। কর্মস্থল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জেন্ডার-সংবেদনশীল চাকুরিবিধি, আচরণবিধি বা কোড অব কন্ডাক্ট প্রণয়ন করতে হবে, যাতে এসব প্রতিষ্ঠান থেকেই অপরাধীর শাস্তির ব্যবস্থা করা যায়।
  • শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের মধ্যে জরিপ পরিচালনা করে শিক্ষার্থীদের সাথে আপত্তিকর আচরণকারী শিক্ষক-কর্মচারীদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
  • বিশ্ববিদ্যালয়সহ সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি দপ্তর ও নির্দিষ্ট সংখ্যক নারীকর্মী সম্বলিত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত নারীকর্মীদের পারিবারিক নির্যাতনসহ যেকোনো ধরনের হয়রানি, নিপীড়নমূলক সংঘটিত ও সম্ভাব্য ঘটনায় তাদেরকে সহায়তা ও পরামর্শ দেবার মতো প্রাতিষ্ঠানিক পেশাদারি ব্যবস্থা সারাদেশেই প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
  • দেশে প্রচলিত নারী নির্যাতনবিরোধী আইনসমূহ কেন কার্যকর করা যাচ্ছে না তার কারণ চিহ্নিত করার জন্য মনিটরিং করা ও সে অনুযায়ী আইনগুলো কার্যকর করার জন্য বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
  • স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক ও শিক্ষা প্রশাসন এবং বিচারব্যবস্থাকে নারীসংবেদী করে গড়ে তুলতে প্রশিক্ষণের আয়োজন করে সংবিধানোক্ত নারী অধিকার, নারী-পুরুষ সমতা, নারী নির্যাতনবিরোধী আইন ও আন্তর্জাতিক সনদ সম্পর্কে প্রায়োগিক ধারণা দেওয়া ও প্রয়োগে ব্যর্থ হলে তাদের বিচারের আওতায় আনার ব্যবস্থা করতে হবে।
  • সকল নারী নির্যাতন ঘটনার শিকার ও তাদের প্রত্যেকের পরিবারের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
  • নিপীড়নের শিকার নারী ও তার পরিবারের জন্য মনস্তাত্ত্বিক সহায়তা পরিষেবার ব্যবস্থা চালু করতে হবে।
  • নারীর প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির প্রসার ঘটায় এমন ধরনের নাটক-গান-বিজ্ঞাপন-বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান প্রচার থেকে গণমাধ্যমকে (রেডিও-টিভি-সংবাদপত্র) বিরত রাখতে কার্যকর সম্প্রচার নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে।
  • সরকারি-বেসরকারি মালিকানাধীন সকল রেডিও-টিভি চ্যানেল ও সংবাদপত্রের জন্য নারী নির্যাতন প্রতিরোধের লক্ষ্যে নির্দিষ্ট পরিমাণ জনসচেতনতামূলক (নারী-পুরুষ সমতা সম্পর্কিত সাংবিধানিক ধারা, নারী নির্যাতন প্রতিরোধের উপায়, প্রচলিত আইন, আইনে কথিত শাস্তি ইত্যাদি) সরকারি ও বেসরকারি বিজ্ঞাপন বিনা খরচে প্রচার করা বাধ্যতামূলক করতে হবে। আইনি বাধ্যবাধকতা ছাড়াও সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে এ বিষয়ে সহযোগিতা করার জন্য আমরা সংবাদমাধ্যকে স্বতঃপ্রণোদিতভাবে এগিয়ে আসার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করছি।
  • নারী নির্যাতনের সকল ঘটনাকে শহর-গ্রাম-ধনী-গরিব-পেশা ও সামাজিক অবস্থা নির্বিশেষে সমভাবে, সমগুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে।
বন্ধুরা,
আমরা মনে করি, নারী নির্যাতন প্রতিরোধে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে আমরা সবাই ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারি। নারীর প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির ইতিবাচক পরিবর্তন আনার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে এক্ষেত্রে। নারীর ওপর নির্যাতন আসলে চূড়ান্ত বিচারে আমাদের সবার ওপর নির্যাতন। এ অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে দরকার সনাতনী ‘সামাজিক সম্মান’, ‘পারিবারিক মর্যাদা’, ‘দুর্নাম’ ইত্যাদি চিন্তার বাইরে বেরিয়ে নির্যাতন প্রতিরোধে সরব হওয়া, এর প্রতিবাদে মুখ খোলা, সংগঠিত হওয়া এবং অবিলম্বে সরকারি ব্যবস্থাদি ও নিকটজনের সহায়তা চাওয়া। নারীর উপর নিপীড়ন প্রতিরোধে পর্যাপ্ত রাষ্ট্রীয় সহায়তার অভাব এবং নাগরিকদের নিষ্ক্রিয়তা নির্যাতক-নিপীড়কদের বল্গাহীন বেড়ে ওঠাকে উৎসাহিত করে।

শিক্ষার্থী ও নারীর উপর নিপীড়নকারীদের প্রতিহত করার প্রধানতম দায়িত্ব সরকারের। আমরা আশা করি সরকার কার্যকর ব্যবস্থাদি নিশ্চিত করে সর্বস্তরের মানুষকে সকল ধরনের নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলে সরকারি ব্যবস্থাকে স্থায়িত্ব প্রদানের সহায়ক শক্তিতে পরিণত করার ইতিবাচক পরিবেশ রচনা করবে। সাধারণ নাগরিক এবং সরকারের মিলিত শক্তিই কেবল পারে নারীর জন্য একটি গণতান্ত্রিক ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে। নারীর জন্য সেই পরিবেশই আমাদের কাম্য।

আপনাদের সবাইকে ধন্যবাদ।

নারীসমাজের পক্ষে

রোকেয়া কবীর
নির্বাহী পরিচালক
বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘ

এই ইভেন্টের ফটো অ্যালবাম ফেসবুকে