Monday, 21 November 2011

‘স্বামী’র গৃহকার্যে ব্যয়িত শ্রম বিষয়ে বেগম রোকেয়ার বিবেচনা ও বর্তমান সময় : রোকেয়া কবীর


২০ নভেম্বর ২০১১-এর দৈনিক সমকালের নারীস্থানপড়ছিলামহঠা চোখ পড়ল দুটি ফিচারেপ্রশংসনীয় উদ্যোগনামের প্রথম ফিচারটি ভারী যান চালানোর প্রশিক্ষণে নিয়োজিত নারী পুলিশদের নিয়েপড়ে উদ্দীপ্ত বোধ করলামপ্রথম প্রথম মনে হয়েছে--- আমরা কি বাস চালাতে পারব! ভয়ও লাগছিল অত বড় গাড়ি কীভাবে ম্যানেজ করব, এই ভেবেকিন্তু এখন ভয় পুরোপুরি কেটে গেছেএ কথা ১১ আর্মড নারী পুলিশের একজন সদস্যের, যিনি বেসিক ড্রাইভিং কোর্সে অংশ নিয়েছেনএই ব্যাটালিয়নের অধিনায়কও একজন নারী, আবিদা সুলতানাতিনি বলছেন : আমি আমার ব্যাটালিয়নের সব সদস্যকে সব দিক থেকে পারদর্শী করে তুলতে চাইমহিলা পুলিশ কত আর কাজ জানবে--- এমন নেতিবাচক কথা যেন কেউ বলতে না পারে সেটাই চাইতাই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিয়ে নারী পুলিশ সদস্যদের এই প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছিএকই দিনে ছাপা নারীস্থানের আরেকটি ফিচার হলো মহিলা ক্রিকেট বিশ্বকাপ বাছাই পর্ব : ব্যাটে-বলে দুর্দান্ত নারীরা’, যেখানে বর্তমানে বাংলাদেশের মাটিতে চলমান ২০১৩-এর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট টুর্নামেন্টের বাছাই পর্বের খেলার বর্ণনা উঠে এসেছেআমাদের ক্রিকেটযোদ্ধা মেয়েরা এই বাছাইয়ের লড়াইয়ে প্রশংসনীয় অবদান রেখেছেতারা জাপান ও আয়ারল্যান্ডের নারীক্রিকেটারদের পরাস্ত করে ওয়ানডে ক্রিকেটের মর্যাদা ছিনিয়ে নিয়েছেউল্লেখ্য, এই ক্রীড়োসবে সমাগত পৃথিবীর দশটি দেশের ক্রিকেট টিমের কোচ, ম্যানেজার এবং ফিজিওরাও নারীক্রিকেটের পাশাপাশি যাঁদের কেউ কেউ চাকুরি করেন, সংসার-সন্তান সামলান ও পড়াশোনা করেনভাবছি, এই সংবাদ দেখলে বেগম রোকেয়া কী ভাবতেন? বলতেন কি যে, ‘আমরা সবই পারি’--- এরকম আস্থার জমিতে দাঁড়ানো এই নারীরা আমাদের আগামী সময়ের দিশা? হয়ত তিনি আশার স্বপ্ন বুনতেন আমাদের নারীদের নিয়েহয়ত এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে ভাবতেন, এখনকার দিনের স্ত্রীজাতির অবনতির প্রধান কারণ নারীর প্রজনন কর্মভার! এ অবস্থা থেকে এদের উত্তরণ ঘটাতে হবে 

উপার্জন করিব না কেন? আমাদের কি হাত নাই, না পা নাই, না বুদ্ধি নাই? কি নাই? যে পরিশ্রম আমরা স্বামীর গৃহকার্যে ব্যয় করি, সেই পরিশ্রম দ্বারা কি  স্বাধীন ব্যবসায় করিতে পারিব না?’ মতিচুর গ্রন্থভুক্ত স্ত্রীজাতির অবনতিনামক প্রবন্ধে বেগম রোকেয়া এই প্রশ্ন তুলেছিলেন অনেক আগে, বিশ শতকের সূচনালগ্নেতিনি লক্ষ করেছিলেন তাঁর সময়ের বঙ্গীয় নারী, বিশেষ করে সিংহভাগ মুসলিম নারী অলঙ্কারের ভারে জড়পিণ্ড হয়ে এক বিড়ম্বনাকর জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেযে জীবনে স্বামীর প্রভুত্ব সহ্য করে মুখ বুজে তার সেবা করাই একমাত্র জীবনাদর্শযে জীবনে স্বামীগৃহের তাব গার্হস্থ্যকর্মে যন্ত্রব নিমজ্জিত হয়ে থাকার অধিক নিজের হস্ত, পদ, চক্ষু, কর্ণ, মন ও চিন্তাশক্তিকে নিজেদের বিকাশে কাজে লাগানোর কোনো উদ্যোগই পরিলক্ষিত হচ্ছিল নাএই পরিপ্রেক্ষিতে পরনির্ভরশীল, অলঙ্কার-বিড়ম্বিত ও ভীরু নারীজাতির তিনি তুখোড় সমালোচনা করেনউল্লিখিত প্রবন্ধে পরনির্ভর নারীসমাজের পশ্চাযাত্রার ছবি আঁকেন তিনি এভাবে : আমাদের যখন স্বাধীনতা ও অধীনতাজ্ঞান বা উন্নতি ও অবনতির যে প্রভেদ তাহা বুঝিবার সামর্থ্যটুকুও থাকিল না, তখন কাজেই তাহারা ভূস্বামী, গৃহস্বামী প্রভৃতি হইতে হইতে ক্রমে আমাদের স্বামীহইয়া উঠিলেনআর আমরা ক্রমশঃ তাঁহাদের গৃহপালিত পশুপক্ষীর অন্তর্গত অথবা মূল্যবান সম্পত্তি বিশেষ হইয়া পড়িয়াছিঅলঙ্কারে মুগ্ধ স্ত্রীলোকদের তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, ‘বাস্তবিক অলঙ্কার দাসত্বের নিদর্শন ভিন্ন আর কিছু নহে বাইরের বিশালতার সাথে যুক্ত না-থেকে গৃহকোণে বন্দি সুশ্রী পুতুলের মতো জীবনযাপনকারী অনেক ভীরু নারীকে তীব্র ব্যঙ্গ করে বলেছেন, ‘সামান্য হইতে সামান্যতর বিপদে পড়িলে আমরা গৃহকোণে লুকাইয়া গগনভেদী আর্তনাদে রোদন করিয়া থাকি!!... ব্যাঘ্র ভল্লুক ত দূরে থাকুক, আরসুলা, জলৌকা প্রভৃতি কীট পতঙ্গ দেখিয়া আমরা ভীতবিহ্বলা হই! এমনকি অনেকে মূর্চ্ছিতা হনএই সমুদয় বৈশিষ্ট্যকে (পরনির্ভরশীলতা, অলঙ্কার-ভারাচ্ছন্নতা ও ভীরুতা) অনেক আগেই তিনি নারীর সম্মানজনক ও স্বাধীন জীবনের অন্তরায় হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন ভাগ্যিস করেছিলেন! নইলে হয়ত আমাদের দুর্দশার পথ আরো দীর্ঘায়িত হতো

তিনি বলেছেন, ‘অনেকে মনে করেন যে, পুরুষের উপার্জিত ধন ভোগ করে বলিয়াই নারী তাহার প্রভুত্ব সহ্য করেকথাটা অনেক পরিমাণে ঠিকআমরাও মনে করি যে কথাটা অনেক পরিমাণে ঠিক, তবে সম্পূর্ণ ঠিক নয়কারণ পুরুষ-সহায়ক সমাজধর্ম ও সমাজসদস্যদের পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার কারণে নিয়মিত উপার্জনে নিয়োজিত অনেক শিক্ষিত নারীকেও এ সমাজে পুরুষের প্রভুত্ব ও অত্যাচার সহ্য করতে হয়, ‘অকর্মণ্যপুরুষেরাই যখন তাদের স্বামীথাকেবিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক রোমানা মঞ্জুরের স্বামী হাসান সাইদ যেমনটি ছিলেনঅবশ্য বেশির ভাগ ক্ষেত্রেস্বামীপুরুষের প্রভুত্ব ও অত্যাচার বেশি মাত্রায় সহ্য করতে হয় অর্থনৈতিক উপার্জনের সাথে যুক্ত নন এমন নারীদেরঅবনত স্ত্রীজাতির এই অবস্থা পরিবর্তনের প্রয়োজনে বেগম রোকেয়া নারীদের উপার্জনশীল করে তুলবার ব্যাপারে প্রচণ্ড তাড়া বোধ করেছেনযে কারণে কেবল পাশ-করা বিদ্যাশিক্ষা না-করে অনুশীলন দ্বারা হস্তপদ সবল করা, হস্ত দ্বারা সকার্য করা, চক্ষু দ্বারা মনোযোগ সহকারে দর্শন, কর্ণ দ্বারা মনোযোগপূর্বক শ্রবণ ও সূক্ষ্মভাবে চিন্তা করতে পরামর্শ দিয়েছেন এবং স্বাধীনভাবে উপার্জনে নিযুক্ত হবার উপযোগী হয়ে গড়ে উঠতে প্রণোদিত করতে চেয়েছেন ও পথ দেখিয়েছেন, যাকে বেগম রোকেয়া স্বাধীন ব্যবসায়বলে আখ্যায়িত করেছেনবলেছেন, ‘আবশ্যক হইলে আমরা লেডী-কেরানী হইতে আরম্ভ করিয়া লেডী-ম্যাজিস্ট্রেট, লেডী-ব্যারিস্টার, লেডী-জজ সবই হইব’ 


বেগম রোকেয়ার দেখানো পথ ধরে আজ আমাদের সমাজ অনেক বদলেছেলেডী-কেরানীতো এখন শত শত, এমনকি লেডী-ম্যাজিস্ট্রেট’, ‘লেডী-ব্যারিস্টারলেডী-জজও বিরলদৃষ্ট নয়আমাদের নারীরা আজ অনেক অপ্রচলিত পেশায়ও নিয়োজিত হয়েছেন ও হচ্ছেনবিজ্ঞান ও কারিগরি সাধনা, বিমান ও অন্যান্য যান চালনা, যুদ্ধক্ষেত্রে সাংবাদিকতা ও ফটোগ্রাফি, সামরিকবাহিনীর কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন, জনপ্রশাসন পরিচালনা, আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার দায়িত্ব পালন, ক্রিকেট-ফুটবল-মুষ্ঠিযুদ্ধ প্রভৃতি খেলাধুলায় নিযুক্তি ইত্যাদি ক্ষেত্রে অনেক নারী আজ কৃতিত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন, যেটা তাঁর সময়ে প্রায়-অকল্পনীয় ব্যাপার ছিল

লক্ষণীয় যে, আজ এতকিছুর পরও নারীজাতির সবিশেষ উন্নতি হয় নি ও হচ্ছে নাপরনির্ভরশীল, অলঙ্কার-বিড়ম্বিত ও ভীরু নারী আমাদের সমাজে এখনো আছেনএকশ বসরেরও আগের সমাজে একজন মুসলিম নারী যে ধরনের বন্দি জীবনযাপন করতেন, আজো আমাদের অনেক নারী সেভাবে জীবনযাপনে অভ্যস্তএখনো বিপুলসংখ্যক নারীর জীবন ফুরিয়ে যাচ্ছে মজুরিবিহীন স্বামীর গৃহকার্য, তথা প্রজনন ও গার্হস্থ্য কর্মভারে পীড়িত হয়েইচ্ছার বিরুদ্ধে একের পর এক সন্তান জন্মদান ও পরিবারের সকল সদস্যের জীবনপ্রবাহ সচল রাখতে পরিবার-অভ্যন্তরস্থ যাবতীয় কাজের দায় সামলাতে গিয়ে তাদের নিজেদের জীবনের দিকে ফিরে তাকাবার কোনো অবকাশই মিলছে নাএদের জীবনে কোনো বিনোদন নেইঅর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক কাজে যুক্ততা দূরে থাক, সবকিছু সামলে মেলে না প্রতিবেশীর বাড়িতে একটু বেড়াতে যাবার ফুরসপরিবারে ভিতরে সার্বক্ষণিক সক্রিয়তার পরও বৃহত্তর নাগরিক সমাজে তাদের পরিচয় নিষ্ক্রিয় মানুষহিসেবেকারণ বৃহত্তর সমাজে তাদের কোনো ভূমিকা রাখবারই সুযোগ নেইসমাজ অনেকাংশে তাকে সেই স্পেস দেয় না

বেগম রোকেয়ার সময়ের বাংলায় জনসংখ্যা কোনো সমস্যা ছিল নাপরিবারের ভিতরের পারিশ্রমিকবিহীন শ্রমের বিনিময়মূল্যও ততদিনে হিসেব করে ওঠা যায় নি কিংবা তখন এ দাবি তোলারও দিন আসে নি যে, গার্হস্থ্যকর্মের ভার কেবল নারীর নয়, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে পরিবারের সকল সদস্যেরআজ এদেশে জনসংখ্যা এক বড়ো সমস্যাআজ আমরা জেনে গেছি পরিবারের ভিতরে উপাদিত হয়ে ভিতরেই খরচ হয় এরকম উপাদনের পেছনে ব্যয়িত শ্রমের অর্থমূল্য কত বিপুলকাজেই এখন বেগম রোকেয়ার থেকে এগিয়ে আমাদের ভাবতে হবে নারীর কাঁধ থেকে এই সনাতনী কর্মভার কমাবার বিষয়েএই ভার কমিয়ে বিপুল পরিমাণ নারীকে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হয়ে সক্রিয় নাগরিক হবার সুযোগ করে দেয়া গেলে গবাঁধা গ্লানিকর জীবন থেকে উত্তরিত হয়ে ব্যক্তিনারী জীবনকে আনন্দময় একটা ব্যাপার বলে আবিষ্কার করে উঠবে

আশা করি এ কথায় কেউ ভিন্নমত প্রকাশ করবেন না যে, পরিবারের সন্তান সংখ্যা কমলে সন্তানের খাদ্য, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় অর্থ বিনিয়োগে পরিবারের সংগতি বাড়বেকমবে নারীর প্রজননতন্ত্রসংশ্লিষ্ট অসুস্থতা এবং মা ও শিশুমৃত্যুর হারতাছাড়া নারীর বিভিন্নমুখী উপার্জনমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ততার ভিতর দিয়ে পরিবারে ও সমাজে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির চর্চা চালু হবারও একটা অবকাশ তৈরি হবেএর ফলে স্বাভাবিকভাবেই কমবে নারী নির্যাতনআর এরকম পরিস্থিতিতে সচেতন নারী ক্ষমতায়নের সিঁড়ি খুঁজে পাবে

সমাজে এরকম অবস্থা সৃষ্টি করা গেলে রাষ্ট্রের অর্থনীতিতেও অনেক বড়ো সুফল আসবে বলে আশা করা যায়প্রথমত এতে জনসংখ্যার ভার কমবেআর তাতে খাদ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পানীয়জল ও জ্বালানি খাতে নাগরিকদের চাহিদা মিটাতে ক্রমবর্ধমান চাপ অনেকটা হ্রাস পাবেরাস্তা, বাসস্থান ও অবকাঠামো উন্নয়নে জমির ওপর এবং বন, জলাভূমি ও পরিবেশের ওপরে চাপ কমবেএক্ষেত্রে দুর্যোগের পরিমাণ হ্রাস পাবে বলেও আশা করা যায়অন্তত দুর্যোগের ঘটনা ঘটলে তা মোকাবেলায় জনসাধারণ ও রাষ্ট্র অনেক বেশি সক্ষমতার পরিচয় দিতে পারবেসবিশেষ রাষ্ট্রের জনগণের দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে ওঠার সুযোগ ও হার বৃদ্ধি পাবে এবং সব মিলিয়ে নাগরিকদের জীবনমানে আসবে দৃশ্যমান ইতিবাচক উন্নয়নের জোয়ার

এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই যে, বেগম রোকেয়া পরিবার ও সমাজশৃঙ্খল থেকে বঙ্গীয় নারীর নিজের ভিতরে মুক্তি চেয়েছিলেনসে মুক্তি আজ কমবেশি আসতে লেগেছেসাম্প্রতিক সময়ে আমাদের যে একাংশ নারী শিক্ষাদীক্ষায়, জ্ঞানবিজ্ঞানে ও উপাদনমুখী কর্মকাণ্ডে স্বাধীনভাবে সক্রিয় ভূমিকা রেখে চলেছেন, তাদের ভূমিকাকে আরো নির্বিঘ্ন করার পাশাপাশি শিক্ষা ও উপার্জনমুখী কর্মকাণ্ড থেকে বঞ্চিত বৃহদাংশ নারীকে এই স্রোতে শামিল হবার সুযোগ করে দিতে পারলে বেগম রোকেয়ার প্রত্যাশা পরিপূর্ণতা পাবেআমরা নিশ্চয়ই তা করতে চাই! 

 



Tuesday, 15 November 2011

মনের বাধা ডিঙাতে পারলে অসম্ভবকেও সম্ভব করে তোলা সম্ভব

আমাদের বর্তমান জাতীয় শিক্ষা কারিকুলামে জেন্ডার, প্রজননস্বাস্থ্য ও এইচআইভি/এইডসসম্পর্কিত বিষয়বস্তু অন্তর্ভুক্ত করে শিক্ষাব্যবস্থাকে জেন্ডার সংবেদনশীল করে গড়ে তোলা দরকারএ লক্ষ্যে ব্যবহারিক অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য বিএনপিএস-এর উদ্যোগে নেত্রকোনা জেলার সদর ও বারহাট্টা উপজেলা এবং ঢাকা মিলিয়ে মোট ৬টি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে একটি পরীক্ষামূলক কর্মসূচিতে যুক্ত হয়ে আমরা যে বিরল অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি, তা প্রণিধানযোগ্যএর মাধ্যমে বুঝেছি যে, বড়ো বড়ো কাজে নানারকম বাধা থাকলেও মানুষের মনের বাধাটিই আসলে বড়ো বাধাযেটি অতিক্রম করা গেলে সাফল্য সুনিশ্চিত হয়ে ওঠে

কর্মসূচি বাস্তবায়নের শুরুর দিকে মডিউল প্রস্তুত, কর্মীদের প্রশিক্ষণ, শিক্ষকদের টিওটি সফলভাবে সম্পন্ন করার পরও আমরা যারা মাঠ পর্যায়ে কর্মসূচি বাস্তবায়নে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলাম, তারা ভুগছিলাম এক অজানা আশঙ্কায়, যে, না জানি কী হয়! শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের সাথে বিষয়গুলো নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করবেন তো! নাকি মাঝখানে এসে বলবেন যে, আমাদের পক্ষে এই আলোচনা সম্ভব না! আবার শিক্ষকগণ আলোচনা করলেও অভিভাবক ও ম্যানেজিং কমিটির সদস্যগণ বিষয়টিকে স্বাভাবিকভাবে নিবেন তো! এ ধরনের নানা আশঙ্কা আমাদের মনের মাঝে ঘুরপাক খাচ্ছিলকিন্তু তবু নিজের মনের এই অবস্থাটি কারো কাছেই প্রকাশ করতে পারছিলাম নামনে হচ্ছিল, যদি পূর্বেই এই আশঙ্কা বা ভবিষ্যৎ ঝুঁকির কথা বলি, তবে অনেকেই হয়ত আমাদের কর্মদক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলবেন

ভাবনাচিন্তার শেষে মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়ন পর্বে গিয়ে দেখা গেল, শুরুতে আমরা যে ধরনের আশঙ্কা বা বিরূপ প্রতিক্রিয়া নিয়ে শঙ্কিত ছিলাম, বাস্তবে কোথাও তার ছিটেফোঁটাও নেইখুব আন্তরিক ও সাবলীলভাবেই শিক্ষকগণ পড়াচ্ছেন বিষয়গুলো এমনকি অভিভাবক ও ম্যানেজিং কমিটির সদস্যদের নিয়ে যে দুঃশ্চিন্তায় ছিলাম, তাদের দিক থেকেও কোনো বাধা এল নাবরং এল প্রতিক্রিয়াতাঁরা বললেন, এই কাজটি তো আমাদের সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগেই হওয়া দরকারঅথচ করছেন আপনারাতাঁরা আরো জানালেন যে, বয়ঃসন্ধিকালে এ ধরনের প্রয়োজনীয় তথ্য সকল শিক্ষার্থীকে জানানো একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ

কর্মসূচি বাস্তবায়নের শুরুর দিকে পরিকল্পিত কর্মসূচি বিষয়ক ধারণা প্রদান অনুষ্ঠানে উপস্থিত বারহাট্টা উপজেলার মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুর রশিদ বললেন, বর্তমানে শিক্ষা মন্ত্রণালয় শিক্ষকদের জেন্ডার সংবেদনশীল করে গড়ে তোলার জন্য শিক্ষক প্রশিক্ষণে বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করলেও বয়ঃসন্ধিকালীন পরিবর্তন ও প্রজননস্বাস্থ্য-বিষয়ক শিক্ষা সেইভাবে অন্তর্ভুক্ত করা যায় নি এইচআইভি/এইডস বিষয়টি পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত থাকলেও অনেক শিক্ষকই তা ক্লাসে না পড়িয়ে বাড়িতে পড়ে নিতে বলেনঅথচ বিষয়গুলো অত্যন্ত দরকারিতিনি আরো বলেন, প্রয়োজনীয় এসব বিষয় জানতে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মাঝেও যে আগ্রহ আছে তা আপনারা প্রমাণ করলেন এবং আন্তরিকতা ও সদিচ্ছা থাকলে যে অনেক কঠিন কাজও বাস্তবায়ন করা সম্ভব তা আপনারা হাতেকলমে করে দেখাচ্ছেন

আমার মনে হয়, যেকোনো কাজের মনের বাধা ডিঙানো গেলে কখনো কখনো অসম্ভবকেও সম্ভব করে তোলা যায়প্রথম ধাপে আমরা সফল হয়েছিএই সাফল্য আমাদের যে সাহস দিয়েছে, তা নিয়ে এই লক্ষ্যে আমরা আরো অনেকদূর যেতে পারব বলে বিশ্বাস করি হয়ত এ পথ বেয়ে একদিন আমরা দেখব পাবো, আমাদের জাতীয় শিক্ষা কারিকুলামটিই জেন্ডার সংবেদনশীল হয়ে উঠেছেসেই স্বপ্নেই এখন আমাদের বসবাস

সুরজিত ভৌমিক
বারহাট্টা কেন্দ্র

Thursday, 13 October 2011

গ্রামীণ নারীদের জীবনমান উন্নয়নে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ দরকার : রোকেয়া কবীর

শত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও গ্রামীণ নারীরা যেসব কর্মকাণ্ডে অংশ নেয়, ১৫ অক্টোবর বিশ্ব গ্রামীণ নারী দিবস সেদিকে আমাদের মনোযোগ আকর্ষণ করে২০০৭-এর ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের একটি সাধারণ অধিবেশনে দিবসটি আন্তর্জাতিকভাবে পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় এবং কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতির অগ্রগতি, খাদ্য নিরাপত্তার উন্নতি সাধন ও দারিদ্র্য দূরীকরণে আদিবাসীসহ গ্রামীণ নারীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ও অবদানের কথা তুলে ধরা হয়যদিও ১৯৯৫ সালেই বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত নারীবিষয়ক চতুর্থ আন্তর্জাতিক সম্মেলনে খাদ্য উপাদন ও খাদ্য নিরাপত্তায় গ্রামীণ নারীদের অবদানকে গুরুত্ব দিয়ে বিশ্ব খাদ্য দিবসের প্রাক্কালে এরকম একটি দিবস পালনের প্রস্তাব আনা হয়২০০৮-এর ১৫ অক্টোবর নিউইয়র্কে দিবসটি প্রথমবারের মতো উদযাপিত হয়তার পর থেকে বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের নাগরিক সমাজ দিবসটি বিশেষ গুরুত্বের সাথে উদযাপন করে আসছে

বলাবাহুল্য যে, কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের সমুদয় খাদ্যই উপাদিত হয় গ্রামাঞ্চলেএই উপাদনপ্রক্রিয়ায় গ্রামীণ নারীসমাজ যে বিপুল পরিমাণ প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ শ্রমে অংশ নিয়ে থাকে, আমাদের দেশে তার কার্যকর স্বীকৃতি এখনো অনুপস্থিতআমরা জানি, গ্রামীণ কি শহুরে, শিক্ষিত কি নিরক্ষর, পেশাজীবী কি গার্হস্থ্যকর্মী সকল পর্যায়ের নারীদেরই কমবেশি পুনরুপাদনমূলক কাজে সময় ব্যয় করতে হয়, যে কাজ সর্বাংশে মজুরিহীনআর মজুরিহীন বলে এ কাজ সাধারণত কাজ বলেই স্বীকৃত হয় নাসমাজ কাজ বলে স্বীকৃতি দেয় কেবল উপাদনমূলক প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়ে অর্থ উপার্জন করাকেখুব বেশি দিনের ঐতিহ্য না-থাকলেও বর্তমান বাংলাদেশের শহর পর্যায়ে একটা উল্লেখযোগ্য পরিমাণ শিক্ষিত-অল্পশিক্ষিত নারী অফিস-আদালত, স্কুল-কলেজ ও কল-কারখানায় কাজ করে নগদ অর্থ উপার্জন করছেনকিন্তু গ্রামাঞ্চলের নারীরা পুনরুপাদনমূলক কাজে বাধ্যতামূলকভাবে অংশ নেয়ার পাশাপাশি উপাদনমূলক কাজ, বিশেষ করে কৃষিকাজে ব্যাপকভাবে অংশ নিলেও তারা এ কাজে কোনো অর্থ পান নাঅবশ্য দিনমজুর হিসেবে যেসব নারী অন্যের কৃষিজমিতে কাজ করেন, তারা পুরুষ শ্রমিকের চাইতে কম হলেও কিছু মজুরি পেয়ে থাকেন

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার হিসেব মতে, কৃষিকাজে বাংলাদেশের একজন পুরুষ যেখানে শ্রম দেন বছরে ১৮শ ঘণ্টা, একজন নারী সেখানে দেন ২৬শ ঘণ্টাঅর্থা কৃষক পরিবারের একজন নারী কৃষিকাজে দৈনিক সাত ঘণ্টারও বেশি সময় ব্যয় করে থাকেনএ হিসেব অনেকের কাছে অবিশ্বাস্য লাগতে পারে, বিশেষত যারা কৃষিকাজ বলতে কেবল মাঠের কাজকেই বুঝে থাকেনবাংলাদেশের কোনো কোনো অঞ্চলে, বিশেষ করে আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় নারীরা মাঠের কাজে অধিক পরিমাণে অংশ নিলেও সারাদেশের বাস্তবতা একইরকম নয়কোনো কোনো এলাকায় মাঠের কাজে নারী উপস্থিতি কম দেখা যায়কিন্তু এর মানে এ নয় যে ওই এলাকার নারীরাও কৃষিকাজে ব্যাপকভাবে অংশ নেন নাবস্তুতপক্ষে কৃষিকাজের আওতা অনেক ব্যাপ্তবীজ প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণ, ফসল মাড়াই, ফসল প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণ, পুকুরে মাছ চাষ, বাড়িতে হাঁসমুরগি ও গবাদি পশুপালন, খোঁয়াড় ও গোয়ালঘর পরিষ্কার করা, নানারকম কৃষি সরঞ্জাম তৈরি, আঙিনা ও বাড়ির পাশে শাকসবজি চাষ ও নিয়মিত সেচকাজ, বাড়ির আশেপাশে ফুল, ফল ও ভেষজ গাছ লাগানো ও পরিচর্যা, ইত্যাদি কাজও কৃষিকাজেরই আওতাভুক্ত; যার সিংহভাগই সম্পাদন করেন গ্রামীণ নারীরাকাজেই ফসলের মাঠে নারীদের শারীরিক উপস্থিতি পুরুষের তুলনায় কম দৃষ্ট হলেও কৃষিকাজের সামগ্রিক বৈশিষ্ট্যানুযায়ী এক্ষেত্রে নারীরাই যে অংশগ্রহণ ও শ্রমদানের ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে থাকেন, এ ব্যাপারে সন্দেহের অবকাশ নেইএক গবেষণায় দেখা গেছে, কৃষিকাজের ১৩টি ধাপের মধ্যে নারীরা ৯টি ধাপের কাজে সরাসরি সম্পন্ন করে থাকেন

পুনরুপাদনমূলক কাজে নারী যেমন মজুরিবিহীন শ্রম দিয়ে থাকেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রে কৃষিক্ষেত্রে নারীর শ্রমটাকেও মজুরিবিহীন শ্রম বলেই ধরে নেয়া হয়নিজের পরিবারের জন্য কাজ করে তার বিপরীতে নগদ পারিশ্রমিক নেয়া বা নেয়ার প্রস্তাব ওঠানোটা আমাদের সংস্কৃতিতে এখনো গ্রহণযোগ্য নয়কিন্তু পরিবারের উপার্জনে তার অংশগ্রহণের স্বীকৃতিটা প্রতিষ্ঠিত হওয়া দরকারতাছাড়া কৃষিকাজের মাধ্যমে পরিবারের যে মোটমাট উপার্জন, যে উপার্জনের পেছনে নারীর শ্রম পুরুষের চেয়ে বেশি, সে উপার্জন পরিবারের নারী-পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রে সমানভাবে ব্যয়িত হবার সংস্কৃতিটাও চালু হওয়া জরুরিদুঃখজনক যে, সে সংস্কৃতি আমাদের দেশে ভয়াবহভাবে অনুপস্থিত

দেখা যায়, যে কাজে অর্থ নেই, অর্থাগমের সম্ভাবনা নেই, সে কাজগুলোর ক্ষেত্রে সমাজ সহজেই নারীনেতৃত্ব মেনে নেয়কিন্তু যখনই কাজটা নগদ অর্থের সম্ভাবনা দেখায় বা অর্থাগম হতে শুরু করে, তখনই সেটার নেতৃত্ব চলে যায় পুরুষের হাতে, তা সে যে কর্মই হোকএক্ষেত্রেও তাই ঘটেকৃষি উপাদনপ্রক্রিয়ায় নারীর অংশগ্রহণ খুবই ঘনিষ্ঠ হলেও যখন কৃষিপণ্য বিক্রির প্রসঙ্গ আসে, তখন তা পরিবারের পুরুষরাই নিয়ন্ত্রণ করে থাকেনঅর্থা কৃষিপণ্যের বিক্রয়লব্ধ সমুদয় অর্থ পরিবারকর্তা পুরুষের হাতে চলে যায়এটাই পুরুষতান্ত্রিক সংস্কৃতির নিয়মআর এ নিয়মে প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে তারাই একক সিদ্ধান্তে সেই অর্থ খরচের পরিকল্পনা করেন ও খরচ করেনমুশকিল হলো, একজন গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে এ পরিকল্পনায় পরিবারের নারীসদস্যদের প্রয়োজন ও চাহিদা সমান গুরুত্ব পাবার কথা থাকলেও, কার্যত কোনোই গুরুত্ব পায় না

গ্রামীণ নারীর সাধারণ ও প্রজননস্বাস্থ্যজনিত জটিলতা, পুষ্টিহীনতা, বিনোদনহীনতা, পরিবারের জন্য প্রয়োজনীয় খাবার পানি ও জ্বালানির অপ্রতুলতা, স্বাস্থ্যসম্মত ও নিরাপদ স্যানিটেশন সুবিধার অনুপস্থিতি ইত্যাদি প্রয়োজনকে অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনই মনে করা হয় নানানা অপ্রাপ্তি ও সমস্যা-সীমাবদ্ধতার মধ্যে হাবুডুবু খেয়েও তাদের একের পর এক সন্তান জন্ম দিয়ে যেতে হয়, যেখানে তাদের ইচ্ছা-অনিচ্ছা, শারীরিক সুস্থতা-অসুস্থতাকে মোটেই পাত্তা দেয়া হয় নাতাছাড়া গর্ভে সন্তান ধারণ ও সন্তান জন্মদান করেই তাদের দায় ফুরায় নানবজাত শিশুর লালনপালনের পুরো ভারও তাদের কাঁধেই বর্তায়এ এক ভয়াবহ অবিচার, যার শিকার হয়ে চলেছে আমাদের কোটি কোটি সর্বংসহা গ্রামীণ নারীগোদের ওপর বিষফোঁড়ার মতো আছে নানারকম পারিবারিক-সামাজিক হয়রানি ও নির্যাতনের ধকলগ্রামীণ নারীরা শহরের নারীদের তুলনায় অনেক রেশি নির্যাতনের শিকার হনযৌন হয়রানি, ধর্ষণ, অ্যাসিড নিক্ষেপ, ফতোয়া, পাচার ইত্যাদি নির্যাতনের একটা বেড়াজালের মধ্যে নিরাপত্তাহীন জীবনযাপন করতে তারা বাধ্য হনপ্রায়ই এসব সমস্যার প্রতিকার পান না দরিদ্র গ্রামীণ নারীরা

সহজেই বোধগম্য যে, গ্রামীণ কৃষিপরিবারে বেড়ে ওঠা মেয়েশিশুদের অবস্থাও হয় অতিশয় করুণসাধারণত এদের স্কুলে পাঠাতেই চাওয়া হয় নাপাঠালেও প্রাথমিক পর্যায়ের পর তাদের শিক্ষা চালিয়ে যাওয়ায় পরিবারগুলো খুব একটা উসাহ দেখায় নাএখনো পরিবারগুলোর এই নিরুসাহের পেছনে কাজ করে প্রধানত মেয়েদের অত শিক্ষার দরকার নেইধরনের রক্ষণশীল ও পশ্চাপদ ধারণাযৌন হয়রানির শিকার হওয়া বা শিকারের আশঙ্কা, কাছাকাছি বিদ্যালয় না-থাকা, যাতায়াত সমস্যা ইত্যাদিও এক্ষেত্রে কমবেশি ভূমিকা রাখেসব মিলিয়ে পরিবারগুলো চায়, মেয়েরা অনর্থক স্কুলে না-গিয়ে বাড়িতে থেকে পরিবারের নৈমিত্তিক কাজে হাত লাগাক ও বিয়ের পাত্রী হিসেবে শারীরিক-মানসিকভাবে তৈরি হোকএর পর দেখতে-না-দেখতে তাদের শৈশব-কৈশোর ছিনতাই হয়ে যায় বিয়ে নামক প্রায়-অনিবার্য সনাতনী বাস্তবতার হাতে

ইউএনডিপির ২০০৯ সালের এমডিজি রিপোর্ট অনুযায়ী, বাংলাদেশের ঝরে পড়া কিশোরীদের ৪১ ভাগকে স্কুল ত্যাগ করতে হয় বাল্যবিবাহের কারণেস্বামীর বাড়ি গিয়ে এই কিশোরীদের অবিশ্রান্তভাবে নতুন সংসারের ঘাঁনি টানার দায়িত্ব নিতে হয়এদের একাংশ নিজে শিশু অবস্থায়ই আরেক শিশুর মা হয় বা মা হতে গিয়ে নিজেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েসন্তান ও সংসারের ভারে কাবু হতে হতে যারা বেঁচে যায়, তাদের জীবনেও আর কোনো রং থাকে না, সুযোগ থাকে না জীবনের ভালোমন্দ নিয়ে ভাববারওএ যেন এক বিশাল চক্রের মধ্যে নিক্ষিপ্ত হওয়া, যেখানে নিজে নিজে থামবার আর কোনো সুযোগ নেইবিয়ের আগে যে কিশোরী তার মায়ের সারাদিনের মাত্রাতিরিক্ত কর্মভার কমাতে মাকে কিছু সহায়তা দিত, নতুন সংসারে এসে তার কাঁধেও চেপে বসে মায়ের সমান কর্মভার, যদিও তার পাশে কেউ থাকে না তাকে সহায়তা দেবার জন্য

আমরা জানি, একাংশ গ্রামীণ নারী, যাদের নিজেদের চাষ জমি নেই, দারিদ্র্যপীড়িত ও অনিরাপদ গ্রামীণ জীবনের নিগড় থেকে মুক্তি পেতে অপেক্ষাকৃত ভালো একটি স্বাধীন ও স্বপ্নময় জীবনের আশায় গ্রাম ছেড়ে শহরে পদার্পণ করেছেন ও করছেনগ্রামীণ নারীদের এই অংশই বর্তমান বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত গার্মেন্টসের প্রধান শ্রমশক্তিগবেষণাতথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের গার্মেন্টস কারখানায় কর্মরত শ্রমিকদের ৮০ শতাংশই নারী, যাদের সিংহভাগই গ্রাম থেকে শহরে অভিবাসিতগার্মেন্টস মালিকরা কারখানার শ্রমিক হিসেবে এসব অল্পশিক্ষিত বা নিরক্ষর ও অদক্ষ গ্রামীণ নারীদের ব্যাপারেই বেশি আগ্রহ দেখান, কারণ এদের শ্রম খুব কম মজুরির বিনিময়ে কেনা যায়এখানেও যে তারা খুব ভালো থাকেন, তা বলা যায় নামজুরি ও বোনাসসহ অন্যান্য সুবিধা পাবার ক্ষেত্রে গার্মেন্টস কারখানাগুলোতে নারীশ্রমিকরা বৈষম্যের শিকার হনতাদের কাজ করতে হয় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশেতার ওপরে রয়েছে জীবন ও শরীরের নিরাপত্তাহীনতাএত কিছুর পরও এরা নিজেরা কষ্টে থেকে কিছু টাকা বাঁচিয়ে নিয়মিত গ্রামে বসবাস তাদের স্বজনদের কাছে পাঠানএই টাকা তাদের পরিবারে যেমন বিশেষ আনন্দের সঞ্চার ঘটায়, তেমনি গ্রামীণ অর্থনীতিতেও রাখে কমবেশি ইতিবাচক প্রভাব

অনিশ্চিত জীবন থেকে উদ্ধার পেতে ও একটি ভালো জীবনের আশায় শহরে এসে একাংশ গ্রামীণ নারী প্রতারণারও শিকার হনবিদেশে কাজে পাঠাবার নামে কার্যত তাদের যৌনকর্মী হিসেবে পাচার করে দেয়া হয়প্রতিনিয়ত এরকম খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত-প্রচারিত হলেও পাচারের ঘটনা এখনো বন্ধ হয় নিকষ্টেসৃষ্টে যোগাড় করা টাকার বিনিময়ে কিছু মেয়ে বিদেশে কাজে যাবার সুযোগ পেলেও, ভাষা ও কাজ বিষয়ে প্রশিক্ষণ না-থাকায় তারা ভালো কাজ যেমন যোগাড় করতে পারেন না, তেমনি তাদের নানা সমস্যায়ও পড়তে হয়    

গ্রামের নিস্তরঙ্গ অর্থনীতির পরিসর ছেড়ে গ্রামীণ নারীদের শহরে কাজের আশায় অভিবাসনের প্রবণতা এখনো চলমানমাসে মাসে নগদ অর্থ হাতে পাবার মতো অভিজ্ঞতা সিংহভাগ গ্রামীণ নারীর জীবনে কখনোই ঘটে নাশহরে এলে সেটা ঘটতে পারে এই সম্ভাবনাটি গ্রামীণ কিশোরী-যুবতী ও তাদের অভিভাবকদের প্রলুব্ধ করে শহরে অভিবাসনেঅথচ গ্রামাঞ্চলে বিকল্প কর্মসংস্থানের সৃষ্টি করা গেলে শহরমুখী না-হয়েও গ্রামীণ নারীরা বর্তমান অবস্থার চাইতে অপেক্ষাকৃত ভালো জীবনের নিশ্চয়তা পেতে পারেন
বলা যায়, গ্রামীণ নারীদের বিদ্যমান অবস্থাটা প্রত্যাশিত নয়, কাজেই এতে গুণগত পরিবর্তন আনার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করা আবশ্যকরাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে কঠোর পরিশ্রমী ও উপাদনসক্ষম গ্রামীণ নারীদের জীবনমানে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারলেই কেবল আমরা বিশ্ব গ্রামীণ নারী দিবসের চেতনার প্রতি সম্মান দেখাতে পারবসেজন্য সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে সুনির্দিষ্ট কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করার সুযোগ আছেএখানে প্রাসঙ্গিক কিছু সুপারিশ যুক্ত হলো, যেসব সুপারিশ উদ্যোগে রূপান্তরিত হলে ইতিবাচক অগ্রগতি হবে বলে আশা করা যায় :
  1. কৃষিকাজের সনাতনী যে পদ্ধতি, তাতে পরিবর্তন আনার জন্য কৃষকদের আধুনিক প্রযুক্তিতে উসাহিত করা ও রাষ্ট্রীয়ভাবে সহায়তা দেয়া দরকারএতে করে কৃষি উপাদনের পরিমাণ যেমন বাড়বে, তেমনি কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত নারী-পুরুষের শারীরিক পরিশ্রমও অনেকখানি লাঘব হবে
  2. গ্রামাঞ্চলে বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগ নিতে হবে, যাতে উন্নত জীবনের আশায় নারী-পুরুষের বর্তমান শহরমুখী স্রোতটিকে নিরুসাহিত করা যায়উদ্যোগ গ্রহণের ক্ষেত্রে ক্ষুদ্রঋণভিত্তিক সনাতনী হাঁসমুরগি পালন ও শবজিচাষের মতো প্রকল্পের বাইরে বেরোতে হবে, স্থাপন করতে হবে কারিগরিভিত্তিক আধুনিক সুযোগসুবিধা সম্পন্ন নিরাপদ কর্মক্ষেত্র
  3. কম সন্তান নেবার ব্যাপারে প্রচারণায় বর্তমানে যে ভাটা পড়েছে, তাতে নতুন করে জোয়ার আনতে হবেগ্রামীণ নারী-পুরুষকে বোঝাতে হবে যে, ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের ওপরে কম সদস্যের পরিবারের সুদূরপ্রসারী ইতিবাচক প্রভাব আছেএ ধরনের প্রচারণার পাশাপাশি জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী গ্রামীণ নারী-পুরুষের জন্য সহজলভ্য ও সুলভ করতে হবে
  4. পুনরুপাদনমূলক কাজ পরিবারের সকল সদস্যের মধ্যে ভাগাভাগি করে করবার সামাজিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে হবেঅত্যন্ত গুরুত্বের সাথে এ প্রচারণা চালাতে হবে যে, পারিবারিক ও সামাজিক কাজ কেবল নারীর নয়, নারী-পুরুষ সকলের
  5. গ্রামীণ মেয়েশিশুদের স্কুল থেকে ঝরে পড়ার হার কমানো ও বাল্যবিবাহ রোধে বিদ্যমান উদ্যোগকে আরো জোরদার ও কার্যকর করতে হবে 
  6. পুকুর ও নদীর পানি দূষণ রোধ করতে হবে ও নিরাপদ পানীয়জলের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে পরিবারের খাবার পানি সংগ্রহের জন্য নারীদের দুর্ভোগ পোহাতে না-হয়
  7. একদিকে বনজঙ্গল ধ্বংস করা, অন্যদিকে পরিবারের দৈনন্দিন জ্বালানি ও শাকপাতা সংগ্রহের দায় কেবল নারীদের ওপর চাপিয়ে রাখার যে সংস্কৃতি সেটা বদলাবার উদ্যোগ নিতে হবেএছাড়া গ্রামাঞ্চলে ভরতুকি দিয়ে হলেও সস্তায় গ্যাস পাবার বন্দোবস্ত করতে হবে
  8. ইউনিয়ন পর্যায়ে স্থাপিত পারিবারিক স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রগুলোকে সার্বক্ষণিক চিকিসক, প্রয়োজনীয় চিকিসা সরঞ্জাম ও ওষুধপত্রসহ সক্রিয় করতে হবে এবং ক্লিনিকগুলোতে ঝামেলামুক্তভাবে দরিদ্র নারীদের চিকিসা নেবার মতো পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবেযেখানে এ ধরনের ক্লিনিক নেই, সেখানে তা স্থাপন করবার ব্যবস্থা করতে হবে      
  9. যৌন হয়রানিসহ সব ধরনের নারী নির্যাতনকে কঠোরহস্তে দমন করবার ব্যাপারে বিদ্যমান আইনের আওতায়ই কার্যকর ও সক্রিয় উদ্যোগ নিতে হবেনারী ও মেয়েশিশু পাচার রোধে বহুপাক্ষিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে 
  10. গ্রামীণ নারীদের মধ্যে যারা দেশের অভ্যন্তরে শহরে ও বিদেশে কাজ করতে যেতে আগ্রহী, তাদের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে; যাতে তারা অজ্ঞতার কারণে প্রতারণার শিকার না-হন এবং ভালো মানের নিরাপদ কাজে যুক্ত হতে পারেনএক্ষেত্রে মেয়েদের শরীর ও জীবনের নিরাপত্তা বিধানেও যত্নবান হতে হবে

আমরা দেখেছি, অপর্যাপ্ত হলেও উল্লিখিত কোনো কোনো খাতে রাষ্ট্রীয়ভাবে নানা উদ্যোগ নানা সময়ে নেয়া হয়েছে, কিন্তু তার কার্যকর বাস্তবায়ন, নিবিড় মনিটরিং ও ফলোআপের জন্য প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা এবং সুনির্দিষ্ট ও পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ না-থাকায় প্রত্যাশিত সুফল আসে নিবিশ্ব গ্রামীণ নারী দিবস ২০১১ উদযাপনের প্রাক্কালে আমরা আশা করি, আগামী বার্ষিক পরিকল্পনায় দেশের মোট খাদ্য উপাদনে বিনিয়োজিত অর্ধেক শ্রম প্রদানকারী গ্রামীণ নারীদের অবস্থার পরিবর্তনে প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দসহ বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণে সরকার বিশেষভাবে উদোগী হবে