Wednesday, 23 May 2012

জেন্ডারসংবেদী বাজেট বিষয়ে বিএনপিএস-এর সংবাদ সম্মেলন


বিজ্ঞান, তথ্য ও তথ্যপ্রযুক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধির লক্ষ্যে বাজেটে উপযোগী বরাদ্দ চাই : নারীকে দক্ষ মানবসম্পদে উন্নীত করার জন্য ১৯টি সুপারিশ

২১ মে ২০১২, ভিআইপি লাউঞ্জ, জাতীয় প্রেসক্লাব, ঢাকা


প্রিয় সাংবাদিক বোন ও ভাইয়েরা,

আপনারা অবগত আছেন, বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘ (বিএনপিএস) ১৯৯৯ সাল থেকে জাতীয় বাজেটের জেন্ডারভিত্তিক বিশ্লেষণ শুরু করেছে এবং ২০০০ সালে প্রথম জাতীয় বাজেটে নারীর ন্যায্য হিস্যার দাবি উত্থাপন করেছে। এর পর থেকে চলতি বছর পর্যন্ত আমরা এই কাজটি অব্যাহত রেখেছি। পরবর্তী সময়ে এদেশের অন্য অনেক সংস্থাও জাতীয় বাজেটে নারীর জন্য বরাদ্দ বৃদ্ধির দাবিটি সামনে তুলে এনেছে। এসব দাবির প্রেক্ষিতে জাতীয় বাজেটেকে নারীসংবেদী করার একটি প্রচেষ্টা ক্রমশ দৃশ্যমান হচ্ছে। আমাদের এক যুগের অভিজ্ঞতা বলছে, বাজেটে কেবল বরাদ্দ বাড়ানোই শেষ কথা নয়। নির্দিষ্ট বরাদ্দের ব্যয় নিশ্চিত করা, ব্যয়ের যথাযথ পরিবীক্ষণ করা এবং যে উদ্দেশ্যে ব্যয় করা হয়েছে সে উদ্দেশ্য অর্জিত হয়েছে কি না তা খতিয়ে দেখার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা না-থাকলে বাজেটে নারীর জন্য বরাদ্দ থাকলেও তা নারীর উন্নয়নে যথাযথ ফল প্রদান করে না।

বন্ধুগণ,

আপনারা জানেন, বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারভুক্ত ‘রূপকল্প ২১’-এর আওতায় বাংলাদেশ সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়নে অঙ্গীকারাবদ্ধ, যে স্বপ্নের বাস্তবায়নে তথ্য ও তথ্যপ্রযুক্তিই প্রধান হাতিয়ার। এর আওতায় সরকার প্রতিনিয়ত কাজ করে যাচ্ছে। মাত্র গতকালই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশের ৫০০ মাধ্যমিক ও ৫০০ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মাল্টিমিডিয়া শ্রেণিকক্ষ উদ্বোধন করেছেন এবং সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়সমূহের শিক্ষকদের ইতোমধ্যে প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হয়েছে। এছাড়া নারী উন্নয়নের জন্য সরকারের আরো সুনির্দিষ্ট ও প্রশংসনীয় উদ্যোগ ও অঙ্গীকার রয়েছে; যার মধ্যে  উল্লেখ করতে হয় ‘জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি ২০১১’ ও ২০১১ সালের আন্তর্জাতিক নারী দিবসের আহ্বানের কথা-- ‘শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তিতে নারীর সমান অভিগম্যতা চাই’। আন্তর্জাতিক নারী দিবসের এ আহ্বানকে সরকারসহ আমরা সবাই গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করেছিলাম। এসব অঙ্গীকার পূরণের লক্ষ্যে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগও গ্রহণ করেছে। গৃহীত উদ্যোগসমূহ কতটা নারীসহায়ক হয়েছে, না-হলে তার সীমাবদ্ধতাগুলো কোথায় তা খতিয়ে দেখতে এবার আমরা বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয় এবং বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের গত তিন বছরের (২০০৯-’১০ থেকে ২০১১-’১২) বাজেট বিশ্লেষণ করেছি এবং এই খাতের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সম্ভাব্য উপকারীভোগীদের সাথে কথা বলেছি। এ বিষয়ে যে প্রতিবেদনটি প্রণীত হতে যাচ্ছে, তা প্রধানত তৃণমূল পর্যায়ের নারী-পুরুষ, সমাজকর্মী, নাগরিকসমাজ, সংবাদজনদের সচেতন ও তথ্যসমৃদ্ধ করার জন্য; যাতে সকল মহলের সক্রিয় প্রচেষ্টা ও উদ্যোগী ভূমিকায় নীতিনির্ধারক মহল তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তিতে পিছিয়ে থাকা নারীর ক্ষমতায়নে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে আগ্রহী হয়।

প্রিয় সংবাদকর্মী বন্ধুগণ,

আমরা জানি যে, তথ্য মানুষের ক্ষমতায়ন ঘটায়। যার কাছে যত তথ্য, সে তত ক্ষমতাবান। এ উপলব্ধি থেকে সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়ও কাজ করছে। তথ্য মন্ত্রণালয়ের সকল কার্যক্রমের লক্ষ্য হলো বিভিন্ন গণমাধ্যমের সহায়তায় সরকারের উন্নয়ন কর্মকা-, জাতীয় ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি এবং জনকল্যাণমূলক তথ্যাদি সম্পর্কে জনগণকে অবহিত করা, সচেতন করা, সম্পৃক্ত করা এবং উদ্বুদ্ধ করা। তাছাড়া, জনগণের তথ্য প্রাপ্তির অধিকার নিশ্চিত করাও এই মন্ত্রণালয়ের একটি বিশেষ লক্ষ্য। এই লক্ষ্য পূরণের জন্য ইতোমধ্যে তথ্য অধিকার আইনও প্রণয়ন করা হয়েছে। এই আইন সম্বন্ধে প্রয়োজনীয় তথ্য জনগণকে জানানো এবং তার মাধ্যমে সচেতন করাও এই মন্ত্রণালয়ের একটি লক্ষ্য।

পুরুষের তুলনায় বাংলাদেশের বেশির ভাগ নারী নিরক্ষর এবং অল্পশিক্ষিত হওয়ার কারণে তথ্যসংযোগের মাধ্যমেই বিভিন্ন বিষয়ে তাদের সচেতন করে তোলা যায়। বাংলাদেশ বেতার এবং টেলিভিশন এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। আমরা দেখেছি, স্বাস্থ্যরক্ষা এবং পুষ্টি বিষয়ে প্রতিষ্ঠান দুটি বিভিন্ন শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান প্রচার করে থাকে, যদিও তা পর্যাপ্ত নয়। বাংলাদেশ বেতারের বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে প্রতিদিন দেড় ঘণ্টাব্যাপী সরাসরি নারী উন্নয়নের সাথে সম্পৃক্ত অনুষ্ঠান প্রচার করা হয়। বাংলাদেশ টেলিভিশনও প্রতিদিন ৫০ মিনিট স্থায়ী এবং পাক্ষিক অতিরিক্ত ৫০ মিনিট স্থায়ী অনুষ্ঠান প্রচার করে থাকে। গণযোগাযোগ অধিদপ্তর নারী উন্নয়নের ওপর বছরে ১,৬০০টিরও অধিক চলচ্চিত্র প্রদর্শন করে এবং চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তর থেকে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৫০টি নারীবিষয়ক প্রবন্ধ এবং ৪টি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করা হয়। তথ্য অধিদপ্তর গড়ে প্রতি বছর নারী উন্নয়ন সম্পর্কিত ২৬০টি, প্রেস ইনস্টিটিউট ২০০টি এবং বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা ১০০টি ফিচার প্রচার ও প্রকাশ করে থাকে। এসব কার্যক্রম নারীর আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন এবং নারী-পুরুষের বৈষম্য নিরসনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে সন্দেহ নেই। কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় বাস্তবায়িত এ কার্যক্রম যথেষ্ট নয়। সর্বোপরি এসব কর্মকা- নির্মাণে নারীর সক্রিয় অংশগ্রহণ একেবারেই নগণ্য। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নারী এসব উদ্যোগের নিষ্ক্রিয় গ্রহীতা এবং পুরুষরাই সক্রিয় প্রদায়কের ভূমিকায় থাকেন। সরকারিভাবে নির্মাতা, গবেষক, লেখক, সম্পাদক, ভিডিওগ্রাফার, প্রচারক বা প্রযোজকের পদে বা দায়িত্বে নারীকে খুব কমই দেখা যায়।

আমরা মনে করি, সমাজে নারীর ক্ষমতায়ন ও অধিকারবিরোধী যে মতাদর্শ বিরাজ করছে, নারীকে ছোটো করে দেখার যে মানসিকতা এখনো অনেক মানুষ ধারণ করে আছে, এসব দূর করবার জন্য সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যভুক্ত পর্যাপ্ত উদ্যোগ গ্রহণ না-করলে কেবল নারীকে সচেতন করে নারীর ক্ষমতায়নে বড়ো কোনো সুফল আনা যাবে না। এজন্য বিভিন্ন তথ্য উপকরণে নারীর সনাতনী ভাবমূর্তি তুলে না-ধরে সমাজের কাছে তাদের কর্মজীবী, সমাজসেবী, রাজনীতিক ভাবমূর্তি তুলে ধরার ব্যাপারে বেশি যত্নবান হতে হবে।
 
মন্ত্রণালয়ের নীতি রয়েছে বাংলাদেশ টেলিভিশনের উন্নয়ন চ্যানেল স্থাপন, বেতারের এফএম সম্প্রসারণ এবং কমিউনিটি রেডিওর কার্যক্রম বৃদ্ধি করে ধর্মীয় কুসংস্কার, নারীর সম্পত্তির অধিকার, বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহ, জনসংখ্যা বৃদ্ধির কুফল, দুর্যোগ সম্পর্কে আগাম সতর্কতা, নারীকে উত্যক্তকরণ রোধ, নারী ও শিশু অধিকার ইত্যাদি বিষয়ে ব্যাপক প্রচারণা চালানোর। কিন্তু এসব কাজ যে প্রয়োজনীয় পরিমাণে বাস্তবায়িত হচ্ছে, তা বলার কোনো সুযোগ নেই। বিভিন্ন পেশায় যোগ্যতাসম্পন্ন সচেতন নারীর উপস্থিতি সত্ত্বেও তথ্য ও গণমাধ্যমে নারীকে সক্রিয় ভূমিকায় এনে নারীর নিজস্ব সচেতন ভাবনা তুলে ধরার উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ নেই।

আমাদের গবেষণার জন্য নেত্রকোনা জেলার মোহনগঞ্জ ও বারহাট্টার তৃণমূল নারী-পুরুষদের সাথে আলোচনায় আমরা দেখতে পেয়েছি, তাঁরা বিভিন্ন উৎস (রেডিও-টিভি, মাইকিং, ব্লক সুপারভাইজার, স্বাস্থ্যকর্মী, এনজিওকর্মী, মোবাইল ফোন) থেকে শিশুদের টিকাদান, জন্মনিবন্ধন, কৃষি, স্যানিটেশন ইত্যাদি বিষয়ে তথ্য পেয়ে থাকেন। তবে তাঁরা তথ্য অধিকার আইন, কিংবা বাড়ির কাছে তথ্যকেন্দ্র আছে কি না সে সম্পর্কে কোনো ধারণাই রাখেন না। তৃণমূল নারীদের মধ্যে চাহিদা রয়েছে কর্মসংস্থান, আইনি সেবা, প্রশিক্ষণ ইত্যাদি সংক্রান্ত তথ্যের।

প্রিয় বন্ধুগণ, 

আমরা দেখেছি গত ৩ বছরে (২০০৯-’১০ থেকে ২০১১-’১২) তথ্য মন্ত্রণালয়ের জন্য বাজেটে বরাদ্দ ছিল যথাক্রমে মোট বাজেটের .৩২ শতাংশ, .৩৭ শতাংশ ও .৩৭ শতাংশ। মন্ত্রণালয়ের জেন্ডার বাজেট প্রতিবেদন (জিবিআর) অনুযায়ী জানানো হয়েছে, ২০১১-’১২ অর্থবছরে মোট বাজেটের মাত্র ১০ শতাংশের উপকার পাবে নারী। একই হিসাব মতে, এই মন্ত্রণালয়ের বার্ষিক উন্নয়ন বরাদ্দের মাত্র ১৯ শতাংশ ব্যয় হবে নারীর কল্যাণে। জেন্ডার বাজেট প্রতিবেদনে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় নারী-পুরুষের অংশগ্রহণের একটি হিসাব তুলে ধরেছে তথ্য মন্ত্রণালয়। এই হিসাব অনুযায়ী দেখা যায়, ২০১০-’১১ অর্থবছরে তথ্য মন্ত্রণালয় ও এর অধীনস্থ বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠনে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের মধ্যে নারীর সংখ্যা মাত্র ১৪.৬১ শতাংশ। ২০১১-’১২ অর্থবছরে নারীর অংশ সামান্য বৃদ্ধি পেয়ে ১৫.৬৭ শতাংশ হয়েছে। এই মন্ত্রণালয় এবং মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠনে নিয়োজিত মোট কর্মচারীর মধ্যে মাত্র ১১.৮৩ শতাংশ নারী, যা ২০১০-’১১ অর্থবছরে ছিল ৭.৪৫ শতাংশ।
 
প্রিয় সাংবাদিক ভাই ও বোনেরা,

উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে তথ্যপ্রযুক্তির প্রতি সরকারের বিশেষ গুরুত্ব প্রদানের কথা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন (এ টু আই) প্রোগ্রামের মাধ্যমে চলছে ব্যাপক কর্মযজ্ঞ, যার মাধ্যমে জনগণের তথ্য পাবার সুযোগ বেড়েছে। এছাড়াও এক্ষেত্রে কাজ করছে সরকারের বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়। তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তিসহ বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তি-বিষয়ক গবেষণা, উন্নয়ন, প্রসার এবং এসবের সফল প্রয়োগের মাধ্যমে দেশের সার্বিক আর্থ-সামাজিক সমৃদ্ধি অর্জনই হচ্ছে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের প্রধান লক্ষ্য।
 
এই মন্ত্রণালয়ের জাতীয় তথ্য ও তথ্যপ্রযুক্তি নীতিমালার একটি ধারা হলো-- বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তি-বিষয়ক সকল কার্যক্রমে নারীর পূর্ণ এবং সমঅংশগ্রহণের মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়ন ত্বরান্বিত করা। কিন্তু তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারে অদক্ষ হবার কারণে গ্রামীণ নারীরা, যারা বাংলাদেশের নারী জনসংখ্যার প্রায় ৮০ শতাংশ, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি কেন্দ্রে (আইসিটি সেন্টার) গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে পারেন না। এক্ষেত্রে নিয়ামক বা পরিচালকের ভূমিকায় তাদের উপস্থিতি অস্তিত্বহীন বললে অত্যুক্তি হবে না। তাছাড়াও রয়েছে নারীদের অবাধ চলাচলে সামাজিক প্রতিবন্ধকতা। তবে মোবাইল ফোন প্রযুক্তি গ্রামীণ নারীকেও আজ তথ্যজগতে প্রবেশের বিরাট সুযোগ দিয়েছে। এর মাধ্যমে তাঁরা সামাজিক যোগাযোগ রক্ষার পাশাপাশি প্রতারণাহীনভাবে বিদেশে কর্মরত আত্মীয়স্বজনের পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রা পেতে পারছেন। এছাড়া স্বাস্থ্যসেবা, কৃষিসম্বন্ধীয় তথ্যও তাঁরা এর মাধ্যমে পাচ্ছেন। কিন্তু মোবাইল সেটের ওপর উচ্চ কর বহাল থাকায় বিভিন্ন সুবিধাসম্বলিত মোবাইল ফোন সেট উচ্চমূল্যে ক্রয় করার সামর্থ্য অধিকাংশ নারীই রাখেন না।
আজকাল গ্রামগঞ্জের নারীরা ক্ষুদ্রউদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে উঠছেন, যেখানে তথ্যপ্রযুক্তি তাঁদের লাভজনক বাজারের সন্ধান দিতে পারত, বেকার নারীকে লাভজনক শ্রমবাজারের সন্ধান দিতে পারত; কিন্তু তথ্যকেন্দ্রের অপ্রতুলতা, ব্যবহারদক্ষতা না-থাকা, ভাষাজ্ঞানে ঘাটতি থাকা, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎপ্রবাহ না-থাকা, ইত্যাদি কারণে তাঁরা এর সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।  

বন্ধুগণ,

আমরা সবাই জানি, তথ্যপ্রযুক্তির সহজলভ্যতা মেয়েদের উচ্চশিক্ষা গ্রহণকেও দারুণভাবে সহায়তা করতে পারে। নানা সামাজিক প্রতিবন্ধকতার কারণে তাঁদের যাতায়াত অবাধ না-হওয়ায় বিভিন্ন লাইব্রেরিতে ঘুরে ঘুরে প্রয়োজনীয় তথ্যাদি জোগাড় করতে না-পারলেও উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের পর্যাপ্ত সুবিধা থাকলে তাঁরা সে সুযোগটি কাজে লাগাতে পারত। কিন্তু এখনো আমরা সব উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের পর্যাপ্ত সুবিধা উন্মুক্ত করতে পারি নি। ২০০৯-’১০ অর্থবছরের বাজেটে ৭টি বিভাগে উপজেলা পর্যায়ের বিদ্যালয়গুলোতে কম্পিউটার ল্যাব স্থাপনের জন্য একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছিল। প্রকল্পটি নারীবান্ধব হলেও বরাদ্দ ছিল অত্যন্ত কম। তাছাড়া কয়টি বালিকা বিদ্যালয়ে ল্যাব স্থাপন করা হবে তার কোনো লক্ষ্যও স্থির করা ছিল না। ফলে অনেক বালিকা বিদ্যালয়ই এই প্রকল্প থেকে কোনো উপকার পায় নি। অনেক বালিকা বিদ্যালয়ে যে বিজ্ঞান বিষয়টি পড়ানোই হয় না, তার একটি প্রধান কারণ এটিই। অথচ গত তিন বছরের প্রবণতা লক্ষ করে ১২ এপ্রিল ২০১২ দৈনিক প্রথম আলোর একটি প্রতিবেদনে জানানো হয় যে, ‘বিজ্ঞানে মেয়েদের অংশগ্রহণ কম, কিন্তু সাফল্য বেশি’। এই সাফল্যের সূত্র ধরে আমাদের উচিত মেয়েদের বিজ্ঞান শিক্ষার পর্যাপ্ত সুযোগ তৈরি করে দেয়া। উপযুক্ত বিজ্ঞান শিক্ষার মাধ্যমেই যোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে মেয়েরা দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে উঠে নারী উন্নয়নের ক্ষেত্রে বড়ো পরিবর্তন সাধন করতে পারে। আমরা সেদিকে সরকারের জোরালো পদক্ষেপ প্রত্যাশা করি।
চলতি বাজেটে গৃহীত ‘বেসিক আইটি স্কিলস ট্রান্সফার আপটু উপজেলা লেভেল’ শীর্ষক উন্নয়ন প্রকল্পটিও জেন্ডার সংবেদনশীল। কিন্তু এখানেও নারীর জন্য সচেতনভাবে কোনো কোটা গ্রহণ করা হয় নি। চলতি বাজেটে গৃহীত ‘বঙ্গবন্ধু ফেলোশিপ অন এসআইসিটি’ শীর্ষক প্রকল্পটির ক্ষেত্রেও নারীর জন্য কোনো নির্দিষ্ট কোটা না-থাকায় এই ফেলোশিপের সুবিধাও পুরুষই বেশি পাচ্ছে।

ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে ১৬০টিরও অধিক কমিউনিটি ই-সেন্টার স্থাপন করা হয়েছে এবং প্রতিটি সেন্টারে একজন পুরুষ ও একজন নারী অপারেটর বাধ্যতামূলকভাবে নিয়োগদানের নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে (নেত্রকোনা জেলার মোহনগঞ্জ ও বারহাট্টা) তৃণমূল নারী-পুরুষদের সাথে মতবিনিময়ে জানা গেছে, ৬২.৫ শতাংশ তৃণমূল নারীর এসব তথ্যকেন্দ্র সম্পর্কে কোনোই ধারণা নেই। কমিউনিটি পর্যায়ের নারী-পুরুষরা জানিয়েছেন, অধিকাংশ সময় এই কেন্দ্রগুলো তালাবন্ধ থাকে। ফলে প্রয়োজনের তুলনায় কম হলেও যে পরিমাণ আইসিটি সেন্টার স্থাপন করা হয়েছে, সেগুলোর সুবিধাও নারীদের কাছে ঠিকমতো পৌঁছাচ্ছে না। দেখা গেছে, বিসিসির বিভাগীয় কেন্দ্র এবং স্থাপিত ল্যাবসমূহে ১১০০ জনেরও অধিক শিক্ষককে আইসিটি প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। এই প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের মাত্র ১৮ শতাংশ ছিল নারী, যদিও নীতি ছিল সমানসংখ্যক নারী-পুরুষ এই প্রশিক্ষণ গ্রহণ করবেন।
 
সরকারি ভোকেশনাল ইনস্টিটিউটগুলোতে ভর্তিকৃত শিক্ষার্থীদের মধ্যে মাত্র ১৩ শতাংশ হচ্ছেন নারী। ডিরেক্টরেট অব টেকনিক্যাল এডুকেশন মাধ্যমিক এবং উচ্চ-মাধ্যমিক স্তরের স্কুলগুলোতে ভোকেশনাল কোর্স এবং কম্পিউটার কোর্স চালু করেছে। কিন্তু দেখা গেছে, এই কোর্স ঢাকা শহরের কয়েকটি বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজ ছাড়া আর কোথাও চালু করা হয় নি। এই অবস্থা প্রথমত নারীর এবং দ্বিতীয়ত বড়ো শহর এবং ছোটো শহর বা গ্রামাঞ্চলের মধ্যে বিরাজমান বৈষম্যকেই তুলে ধরে।

২০০৯-’১০ থেকে ২০১১-’১২ তিন বছরে বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের জন্য বাজেট বরাদ্দ ছিল যথাক্রমে মোট বাজেটের .৩৭ শতাংশ, .৩৮ শতাংশ ও .৩৭ শতাংশ। জেন্ডার বাজেট প্রতিবেদন (জিবিআর) অনুযায়ী বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের ২০১১-’১২ অর্থবছরের সর্বমোট বাজেট বরাদ্দের মাত্র ২০ শতাংশের উপকার নারী পাবে বলে ধারণা করা হয়েছে। একই হিসাব মতে, এই মন্ত্রণালয়ের রাজস্ব ব্যয়ের মাত্র প্রায় ২১ শতাংশ এবং বার্ষিক উন্নয়ন ব্যয়ের মাত্র ১৯ শতাংশ নারীগোষ্ঠীর কল্যাণে ব্যয় করা হবে বলে মনে করা হয়েছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে উপকারভোগীদের হিসাব নিয়ে দেখা গেছে, জেন্ডার সংবেদনশীল প্রকল্পগুলো থেকে নারী যে অংশ পাবে বলে ধারণা করা হয়েছিল, বাস্তবক্ষেত্রে নারী তা পায় না।
 
এই পরিস্থিতিতে আমরা আসন্ন ২০১২-’১৩ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণার প্রাক্কালে বিজ্ঞান, তথ্য ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে নারীর প্রতি ন্যায্য সুবিধা নিশ্চিত করতে নিম্নোক্ত সুপারিশমালা পেশ করছি :

বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সুপারিশ 
  1. তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি খাতে দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে নারী অংশগ্রহণ বৃদ্ধির উদ্যোগ নিতে জাতীয় বাজেটে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়সহ শিক্ষা, কর্মসংস্থান, কারিগরি দক্ষতা উন্নয়ন, যুব উন্নয়ন খাতে নারীদের জন্য সুনির্দিষ্ট উপযুক্ত বরাদ্দ বৃদ্ধি ও সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
  2. তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রের বাজেটীয় সুবিধাগুলো যথাযথভাবে গ্রহণের জন্য নারীর জন্য শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের সুযোগ প্রসারিত করতে হবে।
  3. ইউনিয়ন স্তরে কেবল নারীর জন্য তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনের জন্য একটি উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে এবং এই লক্ষ্যে ‘ক্যাশ ফর এডুকেশন’ শীর্ষক নিরাপত্তা বেষ্টনীমূলক প্রকল্পটির আদলে ‘ক্যাশ ফর ট্রেনিং অন আইসিটি’ শীর্ষক একটি নিরাপত্তা বেষ্টনীমূলক প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে।
  4. গ্রামগঞ্জের মেয়েশিক্ষার্থীদের কম্পিউটার সাক্ষরতা ও দক্ষতা প্রদান করতে সেখানকার বালিকা বিদ্যালয়গুলোতে কম্পিউটার ল্যাব স্থাপন এবং কম্পিউটার শিক্ষক নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। এই ব্যবস্থা নারী-পুরুষ বৈষম্য দূর করার পাশাপাশি নগর ও গ্রামের মধ্যকার শিক্ষা-আয়-ডিজিটাল বৈষম্য হ্রাস করবে।
  5. কম্পিউটার শিক্ষাকে সহায়তা প্রদানের জন্য গ্রামগঞ্জ স্তরের বালিকা বিদ্যালয়গুলোতে ইংরেজি শিক্ষক নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। কারণ কম্পিউটার শিক্ষা গ্রহণের এবং তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের একটি পূর্বশর্ত হলো ইংরেজি ভাষা জানা।
  6. উচ্চতর শিক্ষা, বিশেষ করে কারিগরি এবং প্রকৌশল শিক্ষায় নারীর প্রবেশের পথ সুগম করার জন্য কেবল নারীর জন্য প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে।
  7. তথ্যপ্রযুক্তি কেন্দ্রগুলো স্থাপনের সময় নারীর চলাচলের প্রতিবন্ধকতাকে বিবেচনায় গ্রহণ করতে হবে। একই সাথে কেন্দ্রগুলোতে নারীদের আগমন উৎসাহিত করতে এলাকার নারীদের সাথে আলোচনাসাপেক্ষে তাঁদের জন্য সুবিধাজনক সময় নির্ধারণসহ আনুষঙ্গিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
  8. ‘বেসিক আইটি ট্রান্সফার আপটু উপজেলা লেভেল’ শীর্ষক উন্নয়ন প্রকল্পটিতে বরাদ্দ বৃদ্ধি করতে হবে এবং এই প্রকল্পে নারীর অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে হবে।
  9. চলতি বাজেটে গৃহীত ‘বঙ্গবন্ধু ফেলোশিপ অন এসআইসিটি’ শীর্ষক প্রকল্পটিতে নারীর জন্য কোটা নির্দিষ্ট করতে হবে।
  10. বিসিসির প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে ইন্ট্রুডাকশন টু অফিস অ্যাপ্লিকেশন আন্ডার ওমেন ইন ডেভেলপমেন্ট শীর্ষক প্রশিক্ষণ কোর্সে সমানসংখ্যক নারী ও পুরুষকে প্রশিক্ষণ দিতে হবে।
  11. প্রতিটি কমিউনিটি ই-সেন্টারে একজন পুরুষ ও একজন নারী অপারেটর বাধ্যতামূলকভাবে নিয়োগদানের যে নীতি গ্রহণ করা হয়েছে, তার যথাযথ বাস্তবায়ন করতে হবে।
  12. বিটিসিএল, টেলিটক, টেলিফোন শিল্প সংস্থা, বিসিএসআইআর-এর মতো রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন যোগাযোগপ্রযুক্তি, বৈজ্ঞানিক ও কারিগরি প্রতিষ্ঠানে যোগ্যতা অনুযায়ী বিভিন্ন স্তরে নারীদের জন্য শিক্ষানবিশ এবং ইন্টার্ন হিসেবে হাতেকলমে কাজ করার সুযোগ তৈরির মাধ্যমে নারীকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সাথে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নিতে হবে।
তথ্য মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সুপারিশ
  1. তথ্য ও গণযোগাযোগ ক্ষেত্রে নারীর সক্রিয় অংশগ্রহণ বৃদ্ধি ও দক্ষতা উন্নয়নের জন্য ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ মাস কমিউনিকেশন, প্রেস ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ, ফিল্ম ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা, বাংলাদেশ বেতার ও টেলিভিশনের মতো রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে নারীদের জন্য সুনির্দিষ্ট ও কোটাভিত্তিক শিক্ষানবিশ এবং ইন্টার্ন হিসেবে হাতেকলমে কাজ করার সুযোগ তৈরির মাধ্যমে তাদের এই কর্মক্ষেত্রে প্রবেশে উৎসাহিত করতে সুনির্দিষ্ট উদ্যোগ নিতে হবে।
  2. একই উদ্দেশ্যে সাংবাদিকতা, গণযোগাযোগ, চলচিত্র-টেলিভিশন-রেডিও বিষয়ক অধ্যয়নে নারীদের উৎসাহিত করতে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক শিক্ষালয়ে যাবার জন্য মেয়েশিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ সুবিধা প্রদানের জন্য বৃত্তির ব্যবস্থা করা দরকার।
  3. রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সম্প্রচার মাধ্যমে সাংবাদিক, সম্পাদক, অনুষ্ঠান পরিকল্পনাকারী ও নির্মাতা, প্রযোজক, গবেষক, আলোকচিত্রী, ভিডিও চিত্রগ্রাহক প্রভৃতি পদে নারীদের কোটা ও অ্যাফারমেটিভ অ্যাকশনের ভিত্তিতে নিয়োগ দান করা দরকার। 
  4. তথ্য সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে তৃণমূল নারীর তথ্য প্রয়োজনগুলো বিবেচনায় গ্রহণ করে নতুন নতুন তথ্য প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে; যেমন রেডিও-টিভিতে কৃষি ও কৃষিপণ্য সম্পর্কিত, হাঁসমুরগি পালন সম্পর্কিত, স্বাস্থ্যসেবার প্রাপ্তিস্থান সম্পর্কিত, দেশ-বিদেশের কর্মসংস্থান সম্পর্কিত, নারীর অধিকার এবং মানবাধিকার সম্পর্কিত অনুষ্ঠান এবং ‘মীনা’ প্রোগ্রামটি আরো ব্যাপকভাবে সম্প্রচার করা।
  5. নারী উন্নয়ন ও নারীর সমানাধিকার প্রসারে নারীদের দ্বারা পরিচালিত কমিউনিটি রেডিও প্রতিষ্ঠায় পৃষ্ঠপোষকতা প্রদানের জন্য মন্ত্রণালয়ের বাজেট ব্যবস্থা রাখা দরকার।
  6. ব্যক্তিমালিকানায় নতুন রেডিও স্টেশন ও টিভি চ্যানেলের অনুমোদন দেওয়ার সময় নারীর ক্ষমতায়ন এবং নারীর প্রতি সহিংসতা এবং যৌন হয়রানি বন্ধ বিষয়ক অনুষ্ঠান সম্প্রচার করার শর্ত জুড়ে দিয়ে তা পূরণের জন্য রাজস্ব প্রণোদনা দিতে হবে।
  7. দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত ‘নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে যৌথ কর্মসূচি’ শীর্ষক প্রকল্পটি পৌঁছে দিতে বরাদ্দ বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।
বন্ধুগণ

আমাদের ডাকে সাড়া দিয়ে এই সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেয়ার জন্য বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘ ও ইউ এন ওমেনের পক্ষ থেকে অভিনন্দন। আশা করি, নারীর সার্বিক ক্ষমতায়নের কথা চিন্তা করে এদেশের নারীসমাজকে বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তিতে পারদর্শী দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তুলতে প্রয়োজনীয় সুপারিশসমূহ গণমাধ্যমে তুলে ধরা ছাড়াও আপনারা আপনাদের নিজস্ব ক্ষেত্র থেকে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখবেন।
সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ।

Thursday, 22 March 2012

জাতীয় সংসদে অসংসদীয় আচরণ ও সংরক্ষিত আসনে সদস্য মনোনয়নের পদ্ধতি প্রসঙ্গে : রোকেয়া কবীর


দেশের রাজনীতি সচেতন মানুষ বরাবরই চাচ্ছিলেন বিরোধী দল সংসদে যাক, জনগণের পক্ষে থেকে সরকার ও তার কৃতকর্মের সমালোচনা করুক। কিন্তু সংসদে তাঁদের অনুপস্থিতি দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছিল। আশার কথা, দীর্ঘ অনুপস্থিতির পর জাতীয় সংসদের চলতি অধিবেশনে বিরোধী দল অংশ নিয়েছে। কিন্তু সংসদ সদস্যগণ তাঁদের বিতর্কে অসংসদীয় ও আপত্তিকর শব্দ প্রয়োগ করে দেশবাসীকে হতাশ করে চলেছেন। জনগণের পক্ষে আইন প্রণয়নে জনপ্রতিনিধিদের জন্য আনুষ্ঠানিক বিতর্কস্থল জাতীয় সংসদকে তাঁরা পরিণত করেছেন হৈ-হট্টগোলের কেন্দ্রে, যা কোনো অবস্থাতেই প্রত্যাশিত হতে পারে না। সংগত কারণেই বিভিন্ন মহলে এ নিয়ে হাসাহাসি হচ্ছে, আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। বিভিন্ন স্তরে ও মিডিয়ায় এসব আলোচনায় অংশ নিচ্ছেন রাজনীতি সচেতন সাধারণ মানুষের পাশাপাশি সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ, নারী আন্দোলনকর্মী, এমনকি রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দও। কিন্তু দুঃখজনকভাবে দেখা যাচ্ছে যে, পুরো সমালোচনাটাই ঘুরেফিরে চলে যাচ্ছে নারীর বিরুদ্ধে।

কথা হলো, যাঁরা দলের মনোনয়ন নিয়ে সংসদে যাবার সুযোগ পেয়েছেন, সংসদ অধিবেশনে বিতর্কে অংশ নিতে পারছেন, তাঁরা সবাই সংসদ সদস্য, তা নির্বাচিত কি মনোনীত হয়ে যেভাবেই তাঁরা সংসদে আসুন না কেন। সংসদ অধিবেশনের নির্দিষ্ট কার্যপ্রণালিবিধি আছে, সদস্যদেরও আছে নির্দিষ্ট দায়িত্ব ও কর্তব্য। সংসদের কার্যপ্রণালিবিধি ও সদস্য হিসেবে নিজেদের দায়িত্ব কর্তব্য সম্পর্কে একজন কতটা সচেতন এবং নিজ নিজ দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে কতটা যত্নবান থাকেন, তার ওপরে নির্ভর করে নির্দিষ্ট সদস্যের ভালোমন্দ, তিনি নারী নাকি পুরুষ তার ওপরে নয়। কিন্তু আলোচনাগুলো এমনভাবে হচ্ছে, যেন নারী বলেই তাঁরা এরকমটা করছেন, যা সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত ও মনোনীত হবার ক্ষেত্রে নারীর অধিকারকে হাস্যাস্পদ ব্যাপারে পরিণত করে। 

আমরা দেখেছি, সরাসরি নির্বাচনে বিপুল ভোটে পুরুষপ্রার্থীদের পরাজিত করেও অনেক নারী সংসদে এসেছেন, ঠিকভাবে নিজেদের দায়িত্ব কর্তব্য পালন করেছেন ও করছেন। ফলে ঢালাওভাবে নারী সংসদ সদস্য মাত্রই সংসদে বসবার অযোগ্য, এরকম মতামত গ্রহণযোগ্য নয়। মোটকথা নারী কি পুরুষ সদস্য যিনিই অসংসদীয় ও নেতিবাচক আচরণ করেন, তা ব্যক্তিগতভাবে কেবল তিনিই করেন, এর দায়দায়িত্বও কাজেই তাঁর নিজের, নারী বা পুরুষ সমাজের নয়। সুতরাং নারী সংসদ সদস্যদের মধ্যে যিনি/যাঁরা সংসদে অশ্লীল শব্দপ্রয়োগ করেছেন ও করছেন, নেতিবাচক ভূমিকা রেখেছেন ও রাখছেন, তাঁদের আচরণের জন্য সংসদের ভিতরের ও বাইরের অন্য নারীদের মাথা হেঁট হয়ে যাবার কিছু নেই। অথচ নারী আন্দোলনেরও অনেকে এরকম অভিমত ব্যক্ত করছেন। আমরা মনে করি, একজন বা কয়েকজন নারীর কৃতকর্মের দায়িত্ব গোটা নারীসমাজের ওপরে বর্তাবার কোনো সংগত যুক্তি নেই; যেমন একজন বা কয়েকজন পুরুষের ব্যর্থতার দায়ও গোটা পুরুষ সমাজের ওপরে বর্তায় না। ব্যক্তির স্খলনকে ব্যক্তির স্খলন হিসেবেই দেখে আমাদের উচিত এই অকার্যকর ব্যবস্থার পেছনে নিহিত মূল সমস্যাটা খুঁজে বের করবার চেষ্টা করা ও তা নিয়ে কথা বলা। 
 
যাঁরা জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনে দুই প্রধান দল ও অন্য দল থেকে মনোনীত হয়ে সংসদে আসেন তাঁদের রাজনৈতিক জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও অভিজ্ঞতা খতিয়ে দেখবার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলসমূহের। কারণ এঁরা জনগণের দ্বারা নির্বাচিত হয়ে আসেন না। এঁদের মনোনীত করেন দলগুলোর শীর্ষস্থানীয় নেতৃবর্গ, যাঁরা নিজেদের দাবি করেন জনস্বার্থে জীবন উৎসর্গকারী হিসেবে। অথচ আজ তাঁদের ভুল মনোনয়নের দায় বহন করতে হচ্ছে দেশের জনগণকে। আমরা কিছুতেই বিশ্বাস করতে চাই না যে, দেশের বড় দুই দলের কর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে জানাশোনাসম্পন্ন, রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাঋদ্ধ ও নারীর সমানাধিকারে বিজ্ঞ নারী ছিলেন না। কাজেই দলসমূহের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিবর্গসহ সংশ্লিষ্ট দলের সংসদ সদস্যগণ, যাঁরা এই নারীদের সদস্য হিসেবে মনোনীত করেছেন তাঁদের মনোনয়নের যোগ্যতা, অনুসৃত পদ্ধতি, জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা প্রভৃতি আজ প্রশ্নবিদ্ধ। কোন ভিত্তিতে রাজনীতিতে অভিজ্ঞ শিক্ষিত নারীরা সংরক্ষিত আসনের সদস্য হিসেবে মনোনয়ন পেলেন না অথচ অযোগ্য ও অদক্ষরা মনোনীত হয়ে নারীসমাজ ও জনগণের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের সুযোগকে কাজে না লাগিয়ে এ ধরনের শিষ্টাচার-বহির্ভূত আচরণ করবার সুযোগ পাচ্ছেন, তা জানতে চাইবার অধিকার নারীসমাজসহ সকলেরই আছে। মনোনয়নপদ্ধতির এই ঘাপলা নিয়ে কথা না বলে নারীদের ব্যক্তিপটভূমি নিয়ে কথা বলে, নারীরা এলেই এমন হয় জাতীয় দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্য করে রাজনৈতিক দলগুলো তাদের ব্যর্থতার এই দায় থেকে পার পেতে পারে না।

আমরা উদ্বেগের সাথে দেখছি, বাংলাদেশে ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নারী আন্দোলনের ফলে নারীর জন্য যে সুযোগগুলো বিভিন্ন সময়ে সৃষ্টি হয়েছে ও হচ্ছে, প্রায়ই তাকে ঠিকভাবে কাজে না লাগিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো তাদের সংকীর্ণ স্বার্থে অপব্যবহার করছে। আর এ ধরনের অপব্যবহারে নারীসমাজকে কেবল নির্দিষ্ট সুযোগের সুফল ভোগ করা থেকে বঞ্চিতই করা হয় না, বরং নারীর প্রতি জনমত নষ্ট করার সুদূরপ্রসারী অপচেষ্টাও করা হয়, যার সঙ্গে পুরুষতান্ত্রিক সংকীর্ণতারও যোগ আছে বলে আমরা মনে করি। সুতরাং আমরা বলতে চাই, যে রাজনৈতিক দল এ ধরনের নারীদের সংসদ সদস্য হিসেবে মনোনীত করেছে, এ ঘটনার সম্পূর্ণ দায়দায়িত্ব তাদের, যা এড়াবার কোনো সুযোগ তাদের নেই। পাশাপাশি আমরা মনে করি, এজন্য দায়ী সংসদের হুইপিং সিস্টেমও। জাতীয় সংসদে কার্যকর কোনো হুইপিং সিস্টেম আদৌ আছে কি না, থাকলে হুইপগণ কী দায়িত্ব পালন করছেন, সে প্রশ্নও এখানে উঠিয়ে রাখা দরকার। আমরা মনে করি, দল থেকে পিঠ চাপড়ানো না হলে, হুইপিং সিস্টেম সহায়তা না করলে এঁরা জাতীয় সংসদে অসংসদীয় কার্যকলাপের সুযোগ ও সাহস পেতেন না। 

যাঁরা সংসদে অশ্লীল ও অসংসদীয় কথা বলেছেন, নেতিবাচক আচরণ করেছেন, তাঁদের সংসদ থেকে প্রত্যাহার করার জন্য সংশ্লিষ্ট দলগুলোর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার। এ করা না হলে আমাদের সন্দেহ থেকে যাবে যে, দল থেকে গ্রিন সিগন্যাল পেয়েই কয়েকজন সংসদ সদস্য জাতীয় সংসদের ব্যয়বহুল ও গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশনকে অযাচিত বিতর্কের দিকে ঠেলে দিয়ে ব্যর্থ করে দিচ্ছেন।   

আমরা আমাদের অভিজ্ঞতা থেকে দেখছি, সংরক্ষিত আসনে মনোনীত সদস্যদের সিংহভাগই নারীর সমানাধিকার, নারীর ক্ষমতায়ন, নারী-পুরুষ সমতা প্রতিষ্ঠা কিংবা বৃহত্তর জনস্বার্থে সংসদে বা সংসদের বাইরে কোথাওই কোনো উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করতে পারছেন না। এ ধরনের বিবেচনা থেকেই নারী আন্দোলনের দীর্ঘদিনের একটি চাওয়া হলো সংরক্ষিত আসনে সরাসরি নির্বাচন। সরাসরি নির্বাচন হলে জনগণ দলগুলোর নির্বাচকমণ্ডলির অপরিণামদর্শিতার কুফল ভোগ করতে বাধ্য না থেকে দেখেশুনে যোগ্য নারীদেরই তাদের প্রতিনিধি হিসেবে সংসদে পাঠাতে পারবে। সেরকম ক্ষেত্রে আশা করা যায়, সংসদে এ ধরনের আপত্তিকর পরিস্থিতিরও সৃষ্টি হবে না। তবে যতদিন আমরা সরাসরি নির্বাচনের দিকে যেতে না পারছি ততদিন সংরক্ষিত আসনের সদস্য মনোনয়নে প্রার্থীদের যোগ্যতা ও দক্ষতাকেই যাতে সবচেয়ে গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় নেয়া হয়, সে ব্যবস্থা করতে হবে। তা না হলে আমরা আশঙ্কা করি, নারীর ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে অ্যাফারম্যাটিভ অ্যাকশন বা ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে সংরক্ষিত আসন পদ্ধতি প্রবর্তন ও চালু রাখার কার্যকর কোনো মানেই থাকবে না।  

আমরা আশা করব, মনোনয়ক দলের ‘পোষা লাঠিয়াল’ হিসেবে টেবিল চাপড়ানো ও অনাবশ্যক গলা চড়ানো বন্ধ করে সংরক্ষিত আসনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য জেনে মনোনীত সংসদ সদস্যগণ নারীর ক্ষমতায়ন, নারীর সমানাধিকার, নারী-পুরুষ সমতা, সর্বোপরি গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি বিকাশের প্রয়োজনে বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে উদ্যোগী হবেন এবং নারী আন্দোলনের দীর্ঘদিনের অর্জনকে সমুন্নত রাখতে সচেষ্ট থাকবেন।    

Tuesday, 28 February 2012

সর্বস্তরে নারীর অংশগ্রহণ, প্রত্যাশা ও বাস্তবতা : রোকেয়া কবীর

নারীকে অংশগ্রহণের বাইরে রেখে পারিবারিক, সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রসহ সকল পর্যায়ে সিদ্ধান্তগ্রহণের যে সংস্কৃতি দেশে ক্রিয়াশীল আছে, তার বয়স অনেক হলো। এই সংস্কৃতিটিই এখানকার সর্বত্র ব্যাপকভাবে চর্চিত। এটি যে অগণতান্ত্রিক, এটি যে নারীর প্রতি বৈষম্যের বীজ বুনে যাচ্ছে হাজার বছর ধরে--এ ধারণাটিই আমাদের সামনে এসেছে অনেক দেরিতে। এখন জনগণের একাংশ এটা বোঝে ও মানে যে জনগণের অর্ধাংশ নারীর অংশগ্রহণ-ব্যতিরেকে গৃহীত সমস্ত সিদ্ধান্ত অগণতান্ত্রিক, কিন্তু জনগণের একাংশ সেটা এখনো স্বীকারই করে না। যারা বোঝে ও স্বীকার করে তাদের একাংশ জানা-বোঝা পর্যন্তই থেমে থাকে, এক্ষেত্রে পরিবর্তন আনবার জন্য কোনো উদ্যোগ নেয় না। বাকি একাংশ নারী-পুরুষ জানা-বোঝা ও স্বীকার করার পাশাপাশি এ সংস্কৃতি পরিবর্তনে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে সচেষ্ট। আশার কথা এই সচেতন অংশে জনমত ক্রমশ বাড়ছে, বাড়ার গতিটা যদিও এখনো আশানুরূপ নয়।

যারা সর্বস্তরে নারীর অংশগ্রহণের দাবির পক্ষশক্তি তাদের নিয়ে দুশ্চিন্তা নেই। কিন্তু যে বৃহদাংশ মানুষ আজো আগের ধাঁচেই চিন্তা করে, যারা নারীকে আজো ঊনমানুষ বলেই ভাবে, তাদের মানসিকতা পরিবর্তনের কাজটি ব্যাপকভাবে শুরু করা না-গেলে সর্বস্তরে নারীর অংশগ্রহণের দাবিটি দাবি হয়েই থেকে যাবে আরো দীর্ঘকাল। এ অবস্থা আমাদের আশান্বিত করে না।

বর্তমান বাংলাদেশের সামাজিক-অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক ক্ষেত্রে নারীকে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে অধিষ্ঠিত দেখতে পাওয়া যায়, তা সংখ্যাটা যত ক্ষুদ্রই হোক। অর্থাৎ আমাদের একাংশ নারী আজ কেবল প্রজনন ও গার্হস্থ্যকর্মে নিয়োজিত থেকেই জীবন পার করছেন না। তাঁরা সমাজ-রাষ্ট্রের জন্য উল্লেখযোগ্য ও তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন। চিরাচরিত কাজের বাইরে অপ্রথাগত কাজে নিজেদের দক্ষতা প্রমাণ করছেন। এ অংশের অপ্রথাগত কাজে যুক্ততা সমাজচক্ষুর কাছে ক্রমশ সয়েও আসছে। নারীসমাজের এ অংশ আমাদের অগ্রবর্তিকা। তাদের দেখে অন্য নারীরা যেমন নিজেদের ওই অবস্থানে বা তার চেয়েও উচ্চস্তরের অবস্থানে অধিষ্ঠিত করার স্বপ্ন দেখতে পারছে; তেমনি নারীবিরোধী গোষ্ঠীর মধ্যেও একটা সহনশীলতা তৈরি হচ্ছে। এই অবস্থাটিকে কাজে লাগাতে পারলে হয়ত আমরা নারীবিরোধী শক্তির জারিজুরিকে ক্রমশ দুর্বল করে দিতে পারব। 

বর্তমানে আমাদের একটা বড়ো অগ্রগতি হলো সমাজে নারীর কীর্তির উদাহরণ স্থাপিত হওয়া, যেটা আগে বিদ্যমান ছিল না। ভারতবর্ষের অবরোধবাসিনী নারীদের মুক্তির জন্য আমাদের এখানে প্রাতঃস্মরণীয় যেসব নারী-পুরুষ কাজ করেছেন, তাঁদের চাইতে আমাদের সময়ে এসে নারীর পক্ষে কাজ করা অনেক সহজ হয়েছে। আমরা এখন যুক্তির পাশাপাশি সামনে উদাহরণ নিয়ে কথা বলতে পারি। তাঁদের সময়ে ভরসা ছিল কেবল যুক্তি। কিন্তু অপেক্ষাকৃত অনুকূল পরিস্থিতিতে আমাদের অর্জন, তাঁদের অর্জনের চেয়ে বেশি কি না, সে নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে।

এটা অনস্বীকার্য যে, সব কাজে নারীকে যুক্ত করার দৃশ্য-অদৃশ্য সমস্ত বাধা অপসারণ, নারীর অগ্রগতির পথের প্রতিবন্ধকতাসমূহকে নিষ্ক্রিয় করে দেয়া, সমুদয় সম্ভাবনা নিয়ে নারীর বিকশিত হবার সুযোগ উন্মোচিত করার প্রয়োজন আছে এবং এটা করার দায়িত্ব রাষ্ট্র, সরকার ও তার নাগরিকগণসহ সবার। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা, সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন অ্যাকাডেমি, রাজনৈতিক দল, নাগরিক সংগঠন ও একক ব্যক্তির কেউই এ দায়িত্ব এড়াতে পারে না। কিন্তু আমাদের প্রবণতার মধ্যে কমবেশি এই বোধবুদ্ধির অনুপস্থিতি আছে। আমরা যতটা অন্যের দায়দায়িত্ব পালন করা না-করার সমালোচনায় আগ্রহী, নিজ দায়িত্ব পালনে ততটা আগ্রহী নই। সমস্ত কাজই সরকার করবে বলে যারা আশা করে, তারা নিজেদের দায়দায়িত্ব সম্পর্কে অন্ধকারে আছে বলে মনে হয়। বস্তুত তারা এটা বলতে পেরেই খুশি যে সরকার তার দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে ও হচ্ছে। এটা বলার সময় তারা একেবারেই মনে রাখে না যে, তার/তাদের নিজেদেরও এক্ষেত্রে দায়িত্ব আছে, যা তারা পালন করবার কথা ভাবে না পর্যন্ত। এ অবস্থাটিও আমাদের জন্য বিশেষভাবে সুখকর নয়।

সচেতনভাবে ভাবলেই এটা বোধগম্য হয় যে, প্রজনন ও গার্হস্থ্য কাজের ভার চাপিয়ে আমাদের পুরুষকুল তাদের নিকট-সম্বন্ধীয় নারীদের সবকিছু থেকে দূরে রাখতে দিনের পর দিন কীভাবে নেতিবাচক ভূমিকা পালন করে চলেছে। নিজেরা করতে পারে এমন কাজেও যখন তারা স্নেহের দাবিতে তাদের মাকে ব্যস্ত রাখে, ভালোবাসার দাবিতে বউ ও বোনকে ব্যস্ত রাখে, তখন যে তার/তাদের সুখের জন্য তারা মা-বউ-বোনের কতকটা অ-সুখেরও কারণ হয়, সেটা ভাববার মতো দৃষ্টিভঙ্গি প্রায় ক্ষেত্রে অনেক সচেতন মানুষের মধ্যেও অনুপস্থিত দেখা যায়। আমরা মনে রাখি না যে, কাজের পাশে বিশ্রাম আমাদের মা-বউ-বোনেরও দরকার, সংসারের বাইরের বিষয়-আশয় নিয়ে ভাববার ও সেসবে যুক্ত হবার অধিকার তাদেরও আছে। গান শোনা বা করা, শিল্প-সাহিত্যকর্মের সাথে যুক্ত হওয়া, নাটক-সিনেমা দেখা ও করার মতো সুকুমারবৃত্তি বা খেলাধুলা দেখা ও করা কিংবা বেড়াতে যাওয়ার মতো বিষয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট হওয়া তাদের জন্যও দরকারি। নারী হয়ে জন্ম নিলে বাড়িঘরের কাজে জীবন দিয়ে দিতে হবে; সন্তানধারণ, জন্মদান ও লালনপালন করেই সব পেয়েছির তৃপ্তি পেতে হবে--এরকম চাওয়াটাই অগণতান্ত্রিক। এই অগণতান্ত্রিক অবস্থাটার চর্চা আমরা জেনে-না-জেনে, ভেবে-না-ভেবে নিতান্ত অভ্যস্ততা থেকে করি। এই অভ্যস্ততা থেকে আমাদের সবারই বের হয়ে আসতে হবে। তা নইলে বিশ্রামের সুযোগ না-দিয়ে আমাদের ভাইয়েরা তাদের মায়েদের সংসারের ঘাঁনির নিচে আত্মোৎসর্গ করতে বরাবরই ইন্ধন দিয়ে যেতে থাকবে, সামাজিক-অর্থনৈতিক কাজে যুক্ত হবার সুযোগ না-দিয়ে তাদের স্ত্রীদের একের পর এক সন্তান জন্মদান ও তার লালনপালনের কাজে মহিমা আরোপ করে যেতে থাকবে, পড়াশোনা করে বড়ো হবার পথ করে না-দিয়ে তাদের বোনেদের তারা পরিবারের সবার ফুটফরমাশ খেটে তৃপ্ত থাকতে বলবে। সচেতনভাবে ও অসচেতনভাবে, যেকোনো অবস্থা থেকেই হোক আমাদের এরকম ভাবনা ও কাজই নারীদের রাষ্ট্রের যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে এবং সমাজ-রাষ্ট্রের জন্য দৃশ্যমান ও তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রাখতে দিচ্ছে না; বরং বড়ো ধরনের প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করছে। এই প্রথার খড়্গেই যুগ যুগ ধরে বলি হয়ে আসছে আমাদের অর্ধাংশ নারী। আজ এ প্রথাকে চ্যালেঞ্জ করতে হবে, তা নইলে আমাদের দিন বদলের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে না--না ব্যক্তির, না সমাজের, না রাষ্ট্রের।

নারীদের একের পর এক সন্তান জন্মদানে বাধ্য করে আমাদের সমাজ কেবল যে নারীদের বিকাশকেই রহিত করে চলেছে তা নয়, বরং এর মাধ্যমে একইসঙ্গে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রেরও ক্ষতি করে চলেছে। সন্তানধারণ, সন্তান জন্মদান ও লালনপালনের ভার কম থাকলে যেকোনো নারী প্রজননকর্মের বাইরে অন্য কাজে বেশি সময় দিতে পারে। পরিবারের অর্থনীতির ওপরে যার ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। তাছাড়া তাদের শরীর-স্বাস্থ্য ভালো থাকায় তারা কম অসুস্থ হয়। পরিবারে সন্তানসংখ্যা কম থাকলে তাদের শিক্ষা-স্বাস্থ্যখাতে ব্যয় কম হয়, সবিশেষ এদের ঠিকভাবে মানুষ করে তোলারও অবকাশ তৈরি হয়। আর এ ধরনের পরিবার যে সমাজে বেশি, সে সমাজ হয় তত উন্নত, তত অনুসরণীয়। এর সুফল রাষ্ট্রের ভাগেও বর্তায়। অতিরিক্ত জনসংখ্যার ভারে রাষ্ট্রকে কাবু হতে হয় না। জনগণের অতিরিক্ত চাপ রাষ্ট্রের জল-জমি-পরিবেশের ওপর যে চাপ ফেলে, জনসংখ্যা পরিমিত হলে সে চাপ সংগত কারণেই কম হয়। রাষ্ট্র মনোযোগী হতে পারে জনগণকে জনসম্পদে উন্নীত করায়। 

এটা নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে, পরিবারে যদি গণতন্ত্র চর্চার পরিবেশ তৈরি করা যায়, তাহলে পরিবারপিছু সন্তানসংখ্যা অনেক কমে যাবে। কারণ কোনো মা-ই চায় না তার প্রজননসক্ষমকালের পুরোটা জুড়ে কেবল একের পর এক সন্তান জন্ম দিয়ে যেতে। এর ফলে তাদের শরীর, মন ও পরিবারের সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর কীরকম কুপ্রভাব পড়ে তা তারা জানে। তাছাড়া তাদের জীবনটা যে এতে রান্নাঘর, শোবার ঘর আর বাড়ির আঙিনার মধ্যেই নিঃশেষিত হয়ে যায়, তা-ও তারা জানে।

স্বামী-স্ত্রী ও অন্য সদস্যের মধ্যে পরিবারে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির চর্চা হলে তা সন্তানসংখ্যার ওপরে প্রভাব রাখা ছাড়াও ওই পরিবারের সকল শিশু ও কিশোর-কিশোরীর মধ্যেও এর ইতিবাচক ছাপ পড়ে। আজকে যারা শিশু ও কিশোর-কিশোরী এরাই আগামী দিনে দেশের সকল ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিবে। পরিবার থেকে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি সম্পর্কের ধারণা পেলে পরবর্তী জীবনেও তারা এর চর্চা করবে। তাতে সর্বত্র গণতন্ত্রের চর্চা হবার সম্ভাবনা তৈরি হবে। গণতন্ত্রচর্চার দায় কেবল রাজনৈতিক দল ও রাজনৈতিক নেতাদের নয়, এ দায় সবারই।      

এই দর্শন থেকেই আমাদের চাওয়া এরকম যে, আমাদের পরিবারের পুরুষকর্তারা সচেতনভাবে প্রজনন ও গার্হস্থ্য কর্মভারে পীড়িত তাদের মা-বউ-বোনেদের ওপরে পরিবারের গার্হস্থ্যকর্মের সমুদয় ভার না-চাপিয়ে গণতান্ত্রিকভাবে নিজেরাও ভাগ করে নেবে। যতদিন সেটা না-হচ্ছে ততদিন অনেক দূরে ও উচ্চে লক্ষ্য স্থির রেখে সেই লক্ষ্যে নিজেকে এগিয়ে নিতে পরিবার থেকে চাপিয়ে দেয়া অনাবশ্যক ভারকে যেন মেয়েরা ‘না’ বলতে শেখে। ঝামেলা এড়িয়ে এই ‘না’টা যেন যুক্তির সাথে বলা যায়, তার জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে। এ ধরনের প্রস্তুতি নিতে মেয়েদের সহায়তা করতে পারে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি-বেসরকারি সংস্থা।

সমাজের যে রক্ষণশীল অংশ নারীর সমানাধিকারে বিশ্বাস না-করে নারীকে পুরুষের মনোরঞ্জনের উপকরণ মনে করে, তারা এই প্রত্যাশিত সংস্কৃতির বিরোধিতা করবে তাতে সন্দেহ নেই। তাদের এই বিরোধিতাকে প্রতিহত করতে প্রাতিষ্ঠানিক-সামাজিক-রাষ্ট্রীয় প্রণোদনা অব্যাহত রাখতে হবে। তারা না-চাইলেও সমাজ যে বদলাচ্ছে ও বদলাবে, এই অনিবার্যতাকে বুঝতে সহায়তা করতে হবে। সে লক্ষ্যে কোথাও আমাদের পর্যাপ্ত উদ্যোগ নেই। তদুপরি কিছু কিছু ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রয়োজনে এই শ্রেণির অযৌক্তিক চাওয়ার প্রতি সাড়াপ্রদান এদের শিকড়কে হয়ত আরো ভিত্তি দিচ্ছে, যা আশঙ্কাজনক। আমাদের এ ব্যাপারে সতর্ক থাকা জরুরি।   

আমাদের লক্ষ্য একটা অর্থবহ গণতান্ত্রিক সমাজ বিনির্মাণ, যেখানে সব কাজে নারী-পুরুষের সমান অংশগ্রহণ থাকবে। যেখানে লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য বিলুপ্ত হবে, কারো সুখ যেখানে অন্য কারো অ-সুখের কারণ হবে না। এই অবস্থায় উপনীত হবার জন্য আমাদের খোলামনে ভাবতে ও কাজ করতে হবে। তাহলেই হয়ত আমাদের সামনে অপেক্ষা করবে এমন একটা আলোকিত ভবিষ্যৎ, যা হয়ত আন্তর্জাতিক নারীদিবসের জন্য ২০১২ সালের স্লোগান হিসেবে ‘কানেকটিং গার্লস, ইন্সপায়ারিং ফিউচার : কিশোরী সব মিলাও হাত, ভবিষ্যতের ঘোচাও রাত’কে নির্ধারণ করে জাতিসংঘ যে ধরনের ভবিষ্যতের কথা বলতে চেয়েছে, তাতে পৌঁছুতে আমাদের সহায়তা করবে।

Tuesday, 17 January 2012

বাংলাদেশ সরকারের কাছে জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের চিঠি ও যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রসঙ্গে/ রোকেয়া কবীর



গত ১৫ জানুয়ারি ২০১১ দৈনিক আমাদের সময়ে প্রকাশিত নিজামীদের অবস্থা জানতে চেয়ে সরকারকে জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের চিঠি শীর্ষক সংবাদটিতে এই নিবন্ধকারের দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়েছে। সংবাদটিতে বলা হয়েছে, জাতিসংঘ মানবাধিকার হাইকমিশনারের কার্যালয় থেকে ‘ওয়ার্কিং গ্রুপ অন আরবিট্রেরি ডিটেনশন’-এর নামে গত ১২ সেপ্টেম্বর জেনেভাস্থ বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনপ্রধানের মাধ্যমে ৬০ দিনের মধ্যে ৩৫ দফার সুস্পষ্ট জবাব চেয়ে সরকারের কাছে চিঠি পাঠিয়েছে কমিশন। চিঠিটি বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হাত হয়ে বর্তমানে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ও বাংলাদেশ পুলিশের কাছে রয়েছে। প্রয়োজনে ওয়ার্কিং গ্র“পকে জানিয়ে এক মাস সময় বাড়িয়ে নেওয়া যাবে বলে চিঠিতে একটি শর্ত যুক্ত ছিল। ওই শর্তের বলে ৬০ দিনেরও অতিরিক্ত সময়ের সুবিধা নিয়ে বর্তমানে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট চিঠির জবাবদানের প্রস্তুতি চলছে বলে সংবাদসূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।

জাতিসংঘ মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয়ের ‘ওয়ার্কিং গ্রুপ অব আরবিট্রেরি ডিটেনেশন’-এর প্রধান রেপোরটিয়ার এল হাডযি মালিক সো জেনেভায় অবস্থিত বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনের প্রতিনিধি মো. আবদুল হান্নানের কাছে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পর্কে জানতে চেয়ে যে চিঠি দিয়েছেন তাতে উল্লিখিত ৩৫ দফার মধ্যে রয়েছে তখন পর্যন্ত আটককৃত ৬ যুদ্ধাপরাধীর আটকের কারণ, আইনের ভিত্তি, ইত্যাদি বিষয়ে প্রশ্ন।

সংবাদটি থেকে জানা গেল, আটককৃতদের নিয়োগকৃত আইনজীবীরা জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের কাছে যুদ্ধাপরাধীদের চলমান বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে বিভিন্ন অভিযোগ জানিয়ে পিটিশন জমা দেয়, যার ভিত্তিতে কমিশন এই চিঠি দিয়েছে। এটা আমরা বিভিন্ন সময়ে নানা উৎস থেকে শুনেছি ও দেখেছি যে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের চলমান উদ্যোগকে নিরুৎসাহিত করা, বিচারপ্রক্রিয়ায় বাধা দান, এমনকি বিচারের সমুদয় আয়োজন পণ্ড করার জন্য দেশের ভিতরে নানাভাবে অস্থিরতা সৃষ্টির অপচেষ্টার পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে ব্যাপক অর্থ বিনিয়োগ করে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও লবিয়িংয়ের কাজ চলছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে লবিয়িং নিয়ে এতদিন ধরে শোনা কথাগুলো যে মোটেই উড়োকথা নয়, জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের এই চিঠিটিই তার প্রমাণ। যে চিঠির ভিতর দিয়ে আটককৃত যুদ্ধাপরাধীদের প্রতি মানবাধিকার কমিশনের একটি উদ্বেগই প্রকাশিত হয়েছে।

আমরা জানি, জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশন যেকোনো মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় অভিযোগ জানাবার জন্য প্রশস্ত ক্ষেত্র, যা সবার জন্যই উন্মুক্ত। সে বিচারে যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে এরকম পিটিশন সেখানে জমা পড়তে পারে না তা নয়। কাজেই এতে বিস্ময়ের কিছু নেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের নয় মাসে  শহীদ ৩০ লক্ষ নারী-পুরুষ, হেনস্থা ও ধর্ষণের শিকার চার লক্ষ নারী, এক কোটিরও বেশি মানুষের শরণার্থী হতে হওয়ার বিপরীতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ভূমিকা পালনকারী দেশি-বিদেশি অপরাধীদের বিচার যে স্বাধীনতা-পরবর্তী ৪০ বছরেও হলো না, সে ব্যাপারে জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের কোনো উচ্চবাচ্য নেই কেন? কমিশনের কাছে কি এসব তথ্য নেই? যদি থাকে তাহলে প্রশ্ন জাগে যে, অপরাধীর মানবাধিকারের দেখভাল করার আগেই কি অপরাধের শিকার নারী-পুরুষের মানবাধিকার রক্ষার বিষয়টি কমিশনের কাছে প্রধান বিবেচ্য বিষয় হবার কথা নয়?

সম্প্রতি জাতিসংঘের হাইকমিশনার বান কি মুন সিরীয় প্রেসিডেন্ট বাসার আল আসাদের প্রতি তাঁর নিজের দেশের জনগণকে হত্যা করার তৎপরতায় উদ্বেগ প্রকাশ করে এই হত্যাকাণ্ড বন্ধের জন্য জোর দাবি জানিয়েছেন। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীও এদেশীয় দোসরদের সহযোগিতায় নিজ দেশের জনগণকেই হত্যা করেছিল। ওদিকে গত ফেব্রুয়ারিতে তাহরির স্কোয়ারে অনুষ্ঠিত বিদ্রোহী মিশরবাসীর এক জমায়েতে গুলি চালানোর নির্দেশ দেওয়ায় মিশরের স্বৈরাচারী প্রেসিডেন্টের এখন বিচারকার্য চলছে। প্রায় ৮৫০ জন মানুষকে হত্যার নির্দেশদান ও অন্যান্য অপরাধে তার ফাঁসি পর্যন্ত হতে পারে বলে আইন বিশেষজ্ঞগণ মনে করছেন। অথচ বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে এর কয়েক হাজারগুণ বেশি মানুষের মৃত্যুঘটনা এবং নানা ভোগান্তির শিকার মানুষের বিচার পাবার দাবি বছরের পর বছর উপেক্ষিত হচ্ছে দেখে জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের কোনো উদ্বেগ নেই।

এখানে হয়ত বলা হবে যে, কমিশনের উদ্বেগ নির্ভর করে অভিযোগের ভিত্তিতে। যেহেতু অপরাধীদের পক্ষ থেকেই অভিযোগ জমা পড়েছে, কাজেই তারা তাদের পক্ষেই উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। এক্ষেত্রে আমার জিজ্ঞাস্য এই যে, যেহেতু জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশন যন্ত্রচালিত নয় বরং মনুষ্যচালিত প্রতিষ্ঠান, কাজেই সংস্থাটির এ ধরনের কার্যকলাপ কি তার গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে না? সরকারের কাছে কমিশনের জানতে চাওয়ার তালিকায় এমনকি যুদ্ধাপরাধীদের ‘আটকের কারণ’ পর্যন্ত যুক্ত হওয়াকে আমার কাছে নিতান্ত উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মনে হয়। ভাবতে হয় যে, যুদ্ধাপরাধীদের আটকের কারণ হয়ত তাদের জানা নেই। কিন্তু এরকম একটা বড়ো গণহত্যার ঘটনার তথ্য তাদের কাছে না-থাকাটা রীতিমতো অবিশ্বাস্য। এই অবিশ্বাস্য ব্যাপারটাই যদি আমাদের বিশ্বাস করতে হয়, তাহলে বলতে হবে যে, জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশন কেবল নামেই জাতিসংঘ কমিশন এবং সংস্থাটির কার্যক্রম আসলে প্রো-পিপল নয়!

সবারই জানা আছে যে, দরিদ্ররাই মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার বেশি হয়। একাত্তরে হত্যা-ধর্ষণ-লুণ্ঠন ও অগ্নিকাণ্ডের শিকার এবং শরণার্থীর জীবনযাপনে বাধ্য হওয়া ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সিংহভাগই ছিল দরিদ্র। মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচারপ্রার্থী হিসেবে আন্তর্জাতিক ক্যাম্পেইন পরিচালনার সামর্থ্য ও সক্ষমতা দরিদ্রদের থাকে না। এই দরিদ্রশ্রেণির মানুষের পক্ষে যদি জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশন স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে না-দাঁড়ায়, তাহলে এই শ্রেণির মানুষের মানবাধিকারবঞ্চিত হয়েই জীবন অতিবাহন করতে হবে। সেক্ষেত্রে এসব ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে মানবাধিকার কমিশনের মহিমা রীতিমতো নিষ্প্রভ হয়ে যেতে বাধ্য, যদি তেমন কোনো মহিমা এ সংস্থার থেকে থাকে।

আমরা জানি, আমাদের দেশে সরকারি-বেসরকারি ও ছোটো-বড়ো অনেক মানবাধিকার সংগঠন কাজ করে। তার মধ্যে কয়েকটি মাত্র সংগঠন তথ্যপ্রমাণ জোগাড় করাসহ অপরাধ ট্রাইব্যুনালকে সহায়তা করছে। কিন্তু মানবাধিকার নিয়ে আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের সাথে যারা কর্মরত, তারা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কমিশনসহ আন্তর্জাতিক অপপ্রচারের বিষয়ে কী ভূমিকা পালন করছেন, তার কোনো নমুনা আমরা কোথাও দেখছি না। তারা কেন এতদিনেও দেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পক্ষে সহায়তা প্রদানের জন্য জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনে কোনো পিটিশন দাখিল করেন নি? তাদের কাজ নিশ্চয়ই কেবল প্রকল্প বাস্তবায়ন নয়। সেক্ষেত্রে যুদ্ধাপরাধীদের চলমান বিচার কার্যকর করায় তাদের ভূমিকা সম্পর্কে আমাদের জানতে ইচ্ছে করে।

বর্তমান অবস্থায় আমাদের মানবাধিকার সংগঠনগুলোর উচিত একক ও সম্মিলিতভাবে চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কার্যকর করার অনুকূলে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জনমত সংগঠিত করা। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠনসমূহের কাছে একাত্তরে এদেশে সংঘটিত ভয়াবহ অপরাধসমূহের বিবরণ তুলে ধরা, যাতে কোটি কোটি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের বিপরীতে সংঘটিত এসব অপরাধের যথাযথ বিচার নিষ্পন্ন হওয়ার মাধ্যমে দেশে একটি ন্যায়ের দৃষ্টান্ত প্রতিষ্ঠিত হয়। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সংঘটনের লক্ষ্যে পরিবেশ সৃষ্টির দায়িত্ব এককভাবে সরকারের নয়, এ দায়িত্ব সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে ব্যক্তিমানুষ পর্যন্ত। আমি আশা করব, মুক্তিযুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের বিচারপ্রাপ্তির আকাক্সক্ষাটি বাস্তবায়নের অনুকূলে তৎপর হয়ে মানবাধিকার সংগঠনগুলো যথাযথ কাজটি করবে।

আরেকটি কথা, জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশন কর্তৃক প্রেরিত চিঠিতে উল্লিখিত আছে অতিরিক্ত সময়েও চিঠির জবাব না-দিলে ওয়ার্কিং গ্রুপ তাদের কাছে থাকা তথ্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশ সরকারকে তাদের বক্তব্য বা মতামত জানিয়ে দেবে। আমার মনে হয়, কমিশনকে এরকম সুযোগ না-দিয়ে সরকারের নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে সময়ের মধ্যেই জবাব দিয়ে দেয়া উচিত, তা নইলে আন্তর্জাতিক মহলে এ নিয়ে নানা কথা উঠবে। যদিও আমি মনে করি না যে, চিহ্নিত এসব যুদ্ধাপরাধীর বিচারের ক্ষেত্রে কোনো আন্তর্জাতিক চাপের কাছে পরাভূত হবার দরকার আছে। কারণ এই বিচার নিশ্চিত হলে কোনো যুক্তিতেই মানবাধিকার লঙ্ঘিত হবে না, বরং ৪০ বছর ধরে যে কোটি কোটি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের বিচারের দাবি উপেক্ষিত হয়ে এসেছে, তাদের বিচার পাবার অধিকারের প্রতিই যথাযথ সাড়া প্রদান করা হবে। কারণ আমি মনে করি, আগে বিবেচিত হওয়া উচিত অপরাধের শিকার হওয়া ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মানবাধিকার, তারপরে অপরাধীর। আর সেটা হলে রাষ্ট্রে ও সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার একটা পাটাতন তৈরি হবে।

বর্তমানে পাকিস্তানের রাজনীতিতে সক্রিয় বিশ্বখ্যাত ক্রিকেটার ইমরান খান তাঁর দেশে পশতুনদের ওপর পরিচালিত নির্যাতনের প্রেক্ষিতে ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য কারাভানের জানুয়ারি সংখ্যায় বলেছেন যে, ১৯৭১ সালের ঘটনা থেকে পাকিস্তান কিছুই শিক্ষা নেয় নি। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় অপরাধ সংঘটনকারীরা শাস্তি পেলে পাকিস্তানের বর্তমান পরিণতিতে উপনীত হতে হতো না। তিনি যথার্থই বলেছেন। কোনো ব্যক্তিমানুষ বা সমাজ-রাষ্ট্রের কর্তৃপক্ষ কোনো অপরাধ করে আইনানুগ শাস্তির আওতায় না-এলে সেখানে অপরাধপ্রবণতা বেড়ে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। আজকের পাকিস্তানের দিকে তাকালেই সেখানকার অরাজকতা টের পাওয়া যায়। যুদ্ধাপরাধের বিচার না-হওয়ায় ভিন্নমাত্রায় একইরকম পরিস্থিতি ঘটেছে আমাদের দেশেও। ধারণা করা হয়, স্বাধীনতার সাড়ে চার বছরের মাথায় ১৯৭৫-এ সপরিবারে স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধুকে হত্যার ঘটনাটি ঘটত না, যদি এদেশে অবস্থানকারী পাকদোসরদের বিচারকার্য সম্পন্ন হতো। ৭৫-এর জঘন্য হত্যাকাণ্ডের পর পাকিস্তানি কায়দায় দেশে সামরিক শাসন শুরু হয়। তার বলে বাহাত্তরে প্রণীত সংবিধান থেকে অনেক প্রগতিশীল ও আধুনিক ধারা কর্তন, গোলাম আযমকে নাগরিকত্ব প্রদান এবং রাজনীতিতে ধর্মের উগ্র ব্যবহার যুদ্ধাপরাধের বিচার না-হওয়ারই কুফল। সর্বোপরি, এর ফলে আমাদের দেশের মানুষের ব্যক্তিগত আচার-আচরণ থেকে শুরু করে ব্যবসায় ও রাজনীতি পর্যন্ত প্রায় সব ক্ষেত্রে পাকিস্তানি সংস্কৃতি গেঁড়ে বসে। সামরিক-আমলাতান্ত্রিক পাকিস্তানি সংস্কৃতির বিকাশ রহিত করে দেশে একটি পরিপূর্ণ গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি আমরা এখনো প্রতিষ্ঠা করে উঠতে পারি নি। ১৫ বছরেরও বেশি সময়ের এই ক্ষত শুকাতে আমাদের হয়ত আরো সময় লাগবে।

বাংলাদেশকে আমরা একটি ন্যায়তৎপর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চাই। আর সেজন্যই যুদ্ধাপরাধীদের চলমান বিচার কার্যক্রম সফলতার সাথে সম্পন্ন হওয়া জরুরি; যে উদ্যোগের সাফল্যের জন্য বিচারের উদ্যোগগ্রহণকারী সরকারকে সহযোগিতা করে যেতে হবে সকল বিবেকবান মানুষের। বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক বিরোধিতা বা বিভিন্ন ক্ষেত্রে সরকারের ব্যর্থতার অজুহাত দেখিয়ে যুদ্ধাপরাধের বিচারের লক্ষ্যে সরকারের নেয়া উদ্যোগের বিরোধিতা করা কোনোভাবেই মানবাধিকারের পক্ষে যাওয়া নয়। এক্ষেত্রে যারা ‘আন্তর্জাতিক মান’-এর প্রশ্ন টেনে আনছেন, তারা এ কথায় ঠিক কী বোঝাতে চান সে ব্যাপারে তাদের আরো ঝেড়ে কাশতে হবে। ঢালাও বক্তব্য না-দিয়ে চলমান বিচারপ্রক্রিয়ায় সুনির্দিষ্ট কোনো ঘাটতি থাকলে বাস্তব পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনায় নিয়ে কীভাবে তার সমাধান করা যায়, প্রকৃতপক্ষে এখন দরকার সেরকম পরামর্শ।