Tuesday, 17 January 2012

বাংলাদেশ সরকারের কাছে জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের চিঠি ও যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রসঙ্গে/ রোকেয়া কবীর



গত ১৫ জানুয়ারি ২০১১ দৈনিক আমাদের সময়ে প্রকাশিত নিজামীদের অবস্থা জানতে চেয়ে সরকারকে জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের চিঠি শীর্ষক সংবাদটিতে এই নিবন্ধকারের দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়েছে। সংবাদটিতে বলা হয়েছে, জাতিসংঘ মানবাধিকার হাইকমিশনারের কার্যালয় থেকে ‘ওয়ার্কিং গ্রুপ অন আরবিট্রেরি ডিটেনশন’-এর নামে গত ১২ সেপ্টেম্বর জেনেভাস্থ বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনপ্রধানের মাধ্যমে ৬০ দিনের মধ্যে ৩৫ দফার সুস্পষ্ট জবাব চেয়ে সরকারের কাছে চিঠি পাঠিয়েছে কমিশন। চিঠিটি বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হাত হয়ে বর্তমানে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ও বাংলাদেশ পুলিশের কাছে রয়েছে। প্রয়োজনে ওয়ার্কিং গ্র“পকে জানিয়ে এক মাস সময় বাড়িয়ে নেওয়া যাবে বলে চিঠিতে একটি শর্ত যুক্ত ছিল। ওই শর্তের বলে ৬০ দিনেরও অতিরিক্ত সময়ের সুবিধা নিয়ে বর্তমানে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট চিঠির জবাবদানের প্রস্তুতি চলছে বলে সংবাদসূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।

জাতিসংঘ মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয়ের ‘ওয়ার্কিং গ্রুপ অব আরবিট্রেরি ডিটেনেশন’-এর প্রধান রেপোরটিয়ার এল হাডযি মালিক সো জেনেভায় অবস্থিত বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনের প্রতিনিধি মো. আবদুল হান্নানের কাছে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পর্কে জানতে চেয়ে যে চিঠি দিয়েছেন তাতে উল্লিখিত ৩৫ দফার মধ্যে রয়েছে তখন পর্যন্ত আটককৃত ৬ যুদ্ধাপরাধীর আটকের কারণ, আইনের ভিত্তি, ইত্যাদি বিষয়ে প্রশ্ন।

সংবাদটি থেকে জানা গেল, আটককৃতদের নিয়োগকৃত আইনজীবীরা জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের কাছে যুদ্ধাপরাধীদের চলমান বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে বিভিন্ন অভিযোগ জানিয়ে পিটিশন জমা দেয়, যার ভিত্তিতে কমিশন এই চিঠি দিয়েছে। এটা আমরা বিভিন্ন সময়ে নানা উৎস থেকে শুনেছি ও দেখেছি যে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের চলমান উদ্যোগকে নিরুৎসাহিত করা, বিচারপ্রক্রিয়ায় বাধা দান, এমনকি বিচারের সমুদয় আয়োজন পণ্ড করার জন্য দেশের ভিতরে নানাভাবে অস্থিরতা সৃষ্টির অপচেষ্টার পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে ব্যাপক অর্থ বিনিয়োগ করে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও লবিয়িংয়ের কাজ চলছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে লবিয়িং নিয়ে এতদিন ধরে শোনা কথাগুলো যে মোটেই উড়োকথা নয়, জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের এই চিঠিটিই তার প্রমাণ। যে চিঠির ভিতর দিয়ে আটককৃত যুদ্ধাপরাধীদের প্রতি মানবাধিকার কমিশনের একটি উদ্বেগই প্রকাশিত হয়েছে।

আমরা জানি, জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশন যেকোনো মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় অভিযোগ জানাবার জন্য প্রশস্ত ক্ষেত্র, যা সবার জন্যই উন্মুক্ত। সে বিচারে যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে এরকম পিটিশন সেখানে জমা পড়তে পারে না তা নয়। কাজেই এতে বিস্ময়ের কিছু নেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের নয় মাসে  শহীদ ৩০ লক্ষ নারী-পুরুষ, হেনস্থা ও ধর্ষণের শিকার চার লক্ষ নারী, এক কোটিরও বেশি মানুষের শরণার্থী হতে হওয়ার বিপরীতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ভূমিকা পালনকারী দেশি-বিদেশি অপরাধীদের বিচার যে স্বাধীনতা-পরবর্তী ৪০ বছরেও হলো না, সে ব্যাপারে জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের কোনো উচ্চবাচ্য নেই কেন? কমিশনের কাছে কি এসব তথ্য নেই? যদি থাকে তাহলে প্রশ্ন জাগে যে, অপরাধীর মানবাধিকারের দেখভাল করার আগেই কি অপরাধের শিকার নারী-পুরুষের মানবাধিকার রক্ষার বিষয়টি কমিশনের কাছে প্রধান বিবেচ্য বিষয় হবার কথা নয়?

সম্প্রতি জাতিসংঘের হাইকমিশনার বান কি মুন সিরীয় প্রেসিডেন্ট বাসার আল আসাদের প্রতি তাঁর নিজের দেশের জনগণকে হত্যা করার তৎপরতায় উদ্বেগ প্রকাশ করে এই হত্যাকাণ্ড বন্ধের জন্য জোর দাবি জানিয়েছেন। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীও এদেশীয় দোসরদের সহযোগিতায় নিজ দেশের জনগণকেই হত্যা করেছিল। ওদিকে গত ফেব্রুয়ারিতে তাহরির স্কোয়ারে অনুষ্ঠিত বিদ্রোহী মিশরবাসীর এক জমায়েতে গুলি চালানোর নির্দেশ দেওয়ায় মিশরের স্বৈরাচারী প্রেসিডেন্টের এখন বিচারকার্য চলছে। প্রায় ৮৫০ জন মানুষকে হত্যার নির্দেশদান ও অন্যান্য অপরাধে তার ফাঁসি পর্যন্ত হতে পারে বলে আইন বিশেষজ্ঞগণ মনে করছেন। অথচ বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে এর কয়েক হাজারগুণ বেশি মানুষের মৃত্যুঘটনা এবং নানা ভোগান্তির শিকার মানুষের বিচার পাবার দাবি বছরের পর বছর উপেক্ষিত হচ্ছে দেখে জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের কোনো উদ্বেগ নেই।

এখানে হয়ত বলা হবে যে, কমিশনের উদ্বেগ নির্ভর করে অভিযোগের ভিত্তিতে। যেহেতু অপরাধীদের পক্ষ থেকেই অভিযোগ জমা পড়েছে, কাজেই তারা তাদের পক্ষেই উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। এক্ষেত্রে আমার জিজ্ঞাস্য এই যে, যেহেতু জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশন যন্ত্রচালিত নয় বরং মনুষ্যচালিত প্রতিষ্ঠান, কাজেই সংস্থাটির এ ধরনের কার্যকলাপ কি তার গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে না? সরকারের কাছে কমিশনের জানতে চাওয়ার তালিকায় এমনকি যুদ্ধাপরাধীদের ‘আটকের কারণ’ পর্যন্ত যুক্ত হওয়াকে আমার কাছে নিতান্ত উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মনে হয়। ভাবতে হয় যে, যুদ্ধাপরাধীদের আটকের কারণ হয়ত তাদের জানা নেই। কিন্তু এরকম একটা বড়ো গণহত্যার ঘটনার তথ্য তাদের কাছে না-থাকাটা রীতিমতো অবিশ্বাস্য। এই অবিশ্বাস্য ব্যাপারটাই যদি আমাদের বিশ্বাস করতে হয়, তাহলে বলতে হবে যে, জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশন কেবল নামেই জাতিসংঘ কমিশন এবং সংস্থাটির কার্যক্রম আসলে প্রো-পিপল নয়!

সবারই জানা আছে যে, দরিদ্ররাই মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার বেশি হয়। একাত্তরে হত্যা-ধর্ষণ-লুণ্ঠন ও অগ্নিকাণ্ডের শিকার এবং শরণার্থীর জীবনযাপনে বাধ্য হওয়া ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সিংহভাগই ছিল দরিদ্র। মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচারপ্রার্থী হিসেবে আন্তর্জাতিক ক্যাম্পেইন পরিচালনার সামর্থ্য ও সক্ষমতা দরিদ্রদের থাকে না। এই দরিদ্রশ্রেণির মানুষের পক্ষে যদি জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশন স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে না-দাঁড়ায়, তাহলে এই শ্রেণির মানুষের মানবাধিকারবঞ্চিত হয়েই জীবন অতিবাহন করতে হবে। সেক্ষেত্রে এসব ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে মানবাধিকার কমিশনের মহিমা রীতিমতো নিষ্প্রভ হয়ে যেতে বাধ্য, যদি তেমন কোনো মহিমা এ সংস্থার থেকে থাকে।

আমরা জানি, আমাদের দেশে সরকারি-বেসরকারি ও ছোটো-বড়ো অনেক মানবাধিকার সংগঠন কাজ করে। তার মধ্যে কয়েকটি মাত্র সংগঠন তথ্যপ্রমাণ জোগাড় করাসহ অপরাধ ট্রাইব্যুনালকে সহায়তা করছে। কিন্তু মানবাধিকার নিয়ে আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের সাথে যারা কর্মরত, তারা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কমিশনসহ আন্তর্জাতিক অপপ্রচারের বিষয়ে কী ভূমিকা পালন করছেন, তার কোনো নমুনা আমরা কোথাও দেখছি না। তারা কেন এতদিনেও দেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পক্ষে সহায়তা প্রদানের জন্য জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনে কোনো পিটিশন দাখিল করেন নি? তাদের কাজ নিশ্চয়ই কেবল প্রকল্প বাস্তবায়ন নয়। সেক্ষেত্রে যুদ্ধাপরাধীদের চলমান বিচার কার্যকর করায় তাদের ভূমিকা সম্পর্কে আমাদের জানতে ইচ্ছে করে।

বর্তমান অবস্থায় আমাদের মানবাধিকার সংগঠনগুলোর উচিত একক ও সম্মিলিতভাবে চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কার্যকর করার অনুকূলে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জনমত সংগঠিত করা। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠনসমূহের কাছে একাত্তরে এদেশে সংঘটিত ভয়াবহ অপরাধসমূহের বিবরণ তুলে ধরা, যাতে কোটি কোটি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের বিপরীতে সংঘটিত এসব অপরাধের যথাযথ বিচার নিষ্পন্ন হওয়ার মাধ্যমে দেশে একটি ন্যায়ের দৃষ্টান্ত প্রতিষ্ঠিত হয়। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সংঘটনের লক্ষ্যে পরিবেশ সৃষ্টির দায়িত্ব এককভাবে সরকারের নয়, এ দায়িত্ব সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে ব্যক্তিমানুষ পর্যন্ত। আমি আশা করব, মুক্তিযুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের বিচারপ্রাপ্তির আকাক্সক্ষাটি বাস্তবায়নের অনুকূলে তৎপর হয়ে মানবাধিকার সংগঠনগুলো যথাযথ কাজটি করবে।

আরেকটি কথা, জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশন কর্তৃক প্রেরিত চিঠিতে উল্লিখিত আছে অতিরিক্ত সময়েও চিঠির জবাব না-দিলে ওয়ার্কিং গ্রুপ তাদের কাছে থাকা তথ্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশ সরকারকে তাদের বক্তব্য বা মতামত জানিয়ে দেবে। আমার মনে হয়, কমিশনকে এরকম সুযোগ না-দিয়ে সরকারের নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে সময়ের মধ্যেই জবাব দিয়ে দেয়া উচিত, তা নইলে আন্তর্জাতিক মহলে এ নিয়ে নানা কথা উঠবে। যদিও আমি মনে করি না যে, চিহ্নিত এসব যুদ্ধাপরাধীর বিচারের ক্ষেত্রে কোনো আন্তর্জাতিক চাপের কাছে পরাভূত হবার দরকার আছে। কারণ এই বিচার নিশ্চিত হলে কোনো যুক্তিতেই মানবাধিকার লঙ্ঘিত হবে না, বরং ৪০ বছর ধরে যে কোটি কোটি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের বিচারের দাবি উপেক্ষিত হয়ে এসেছে, তাদের বিচার পাবার অধিকারের প্রতিই যথাযথ সাড়া প্রদান করা হবে। কারণ আমি মনে করি, আগে বিবেচিত হওয়া উচিত অপরাধের শিকার হওয়া ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মানবাধিকার, তারপরে অপরাধীর। আর সেটা হলে রাষ্ট্রে ও সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার একটা পাটাতন তৈরি হবে।

বর্তমানে পাকিস্তানের রাজনীতিতে সক্রিয় বিশ্বখ্যাত ক্রিকেটার ইমরান খান তাঁর দেশে পশতুনদের ওপর পরিচালিত নির্যাতনের প্রেক্ষিতে ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য কারাভানের জানুয়ারি সংখ্যায় বলেছেন যে, ১৯৭১ সালের ঘটনা থেকে পাকিস্তান কিছুই শিক্ষা নেয় নি। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় অপরাধ সংঘটনকারীরা শাস্তি পেলে পাকিস্তানের বর্তমান পরিণতিতে উপনীত হতে হতো না। তিনি যথার্থই বলেছেন। কোনো ব্যক্তিমানুষ বা সমাজ-রাষ্ট্রের কর্তৃপক্ষ কোনো অপরাধ করে আইনানুগ শাস্তির আওতায় না-এলে সেখানে অপরাধপ্রবণতা বেড়ে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। আজকের পাকিস্তানের দিকে তাকালেই সেখানকার অরাজকতা টের পাওয়া যায়। যুদ্ধাপরাধের বিচার না-হওয়ায় ভিন্নমাত্রায় একইরকম পরিস্থিতি ঘটেছে আমাদের দেশেও। ধারণা করা হয়, স্বাধীনতার সাড়ে চার বছরের মাথায় ১৯৭৫-এ সপরিবারে স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধুকে হত্যার ঘটনাটি ঘটত না, যদি এদেশে অবস্থানকারী পাকদোসরদের বিচারকার্য সম্পন্ন হতো। ৭৫-এর জঘন্য হত্যাকাণ্ডের পর পাকিস্তানি কায়দায় দেশে সামরিক শাসন শুরু হয়। তার বলে বাহাত্তরে প্রণীত সংবিধান থেকে অনেক প্রগতিশীল ও আধুনিক ধারা কর্তন, গোলাম আযমকে নাগরিকত্ব প্রদান এবং রাজনীতিতে ধর্মের উগ্র ব্যবহার যুদ্ধাপরাধের বিচার না-হওয়ারই কুফল। সর্বোপরি, এর ফলে আমাদের দেশের মানুষের ব্যক্তিগত আচার-আচরণ থেকে শুরু করে ব্যবসায় ও রাজনীতি পর্যন্ত প্রায় সব ক্ষেত্রে পাকিস্তানি সংস্কৃতি গেঁড়ে বসে। সামরিক-আমলাতান্ত্রিক পাকিস্তানি সংস্কৃতির বিকাশ রহিত করে দেশে একটি পরিপূর্ণ গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি আমরা এখনো প্রতিষ্ঠা করে উঠতে পারি নি। ১৫ বছরেরও বেশি সময়ের এই ক্ষত শুকাতে আমাদের হয়ত আরো সময় লাগবে।

বাংলাদেশকে আমরা একটি ন্যায়তৎপর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চাই। আর সেজন্যই যুদ্ধাপরাধীদের চলমান বিচার কার্যক্রম সফলতার সাথে সম্পন্ন হওয়া জরুরি; যে উদ্যোগের সাফল্যের জন্য বিচারের উদ্যোগগ্রহণকারী সরকারকে সহযোগিতা করে যেতে হবে সকল বিবেকবান মানুষের। বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক বিরোধিতা বা বিভিন্ন ক্ষেত্রে সরকারের ব্যর্থতার অজুহাত দেখিয়ে যুদ্ধাপরাধের বিচারের লক্ষ্যে সরকারের নেয়া উদ্যোগের বিরোধিতা করা কোনোভাবেই মানবাধিকারের পক্ষে যাওয়া নয়। এক্ষেত্রে যারা ‘আন্তর্জাতিক মান’-এর প্রশ্ন টেনে আনছেন, তারা এ কথায় ঠিক কী বোঝাতে চান সে ব্যাপারে তাদের আরো ঝেড়ে কাশতে হবে। ঢালাও বক্তব্য না-দিয়ে চলমান বিচারপ্রক্রিয়ায় সুনির্দিষ্ট কোনো ঘাটতি থাকলে বাস্তব পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনায় নিয়ে কীভাবে তার সমাধান করা যায়, প্রকৃতপক্ষে এখন দরকার সেরকম পরামর্শ।

Thursday, 12 January 2012

গোলাম আযমের গ্রেফতার ও বিচারের আন্তর্জাতিক মান প্রসঙ্গে/রোকেয়া কবীর

শীর্ষ যুদ্ধাপরাধী হিসেবে কুখ্যাত গোলাম আযমের গ্রেফতারে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশের নাগরিকদের ৪০ বছরের প্রত্যাশার একাংশ পূর্ণ হলো। মুষ্টিমেয় কিছু যুদ্ধাপরাধী এবং তাদের সমর্থকরা ছাড়া বাংলাদেশের আমজনতার সবাই এই কুখ্যাতদের বিচারের পক্ষে।

গ্রেফতারের দিন গত বুধবার টেলিভিশনের সন্ধ্যার খবরে শুনলাম, গোলাম আযমের আইনজীবীদের পক্ষে ব্যারিস্টার রাজ্জাক বলছেন, তাকে জামিন না-দিয়ে, তার পক্ষে আপিলের অনুমতি না-দিয়ে তার সাংবিধানিক অধিকার হরণ করা হয়েছে। তিনি বলছেন, দেশের নাগরিক হিসেবে চোর-গুন্ডা-বদমাশ সবারই সাংবিধানিক অধিকার রয়েছে। তবে, এই তালিকায় তিনি ‘কসাই’ শব্দটি বলেন নি! আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না, গোলাম আযমকে তিনি উল্লিখিতদের মধ্যকার কোন ধরনের অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করলেন?

লক্ষণীয় যে, ব্যারিস্টার রাজ্জাক তাঁর বক্তব্যের মাধ্যমে স্বীকার করেছেন যে, এদেশে একটি সংবিধান আছে, সেই সংবিধানের দৃষ্টিতে সব মানুষের সমান অধিকার আছে। গোলাম আযমকে রক্ষার জন্য হলেও তিনি সব মানুষের সাংবিধানিক অধিকারের শরণাপন্ন হয়েছেন, যেটা গোলাম আযমরা হরহামেশাই অস্বীকার করেন।

কথা হলো, যার জন্য তিনি সাংবিধানিক অধিকারের দাবি তুলছেন, তিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় পাক হানাদার বাহিনীর সমস্ত অপকর্ম সমর্থন করেছেন, তাদের সেসব কাজ সংগঠিত করার জন্য ভূমিকা রেখেছেন ও সর্বপ্রকার সহযোগিতা দিয়েছেন, নিজে তার অনুসারীদেরসহ মানবতাবিরোধী শাস্তিযোগ্য কর্মে জড়িত হয়েছেন, যার ভুরি ভুরি বাস্তব প্রমাণ আছে। তার ও তার দলের আরো অনেকের এ ধরনের অপরাধ বিষয়ে দেশের নাগরিকদের মধ্যে বিন্দুমাত্র সংশয় নেই।

গোলাম আযম যে দলের প্রাক্তন আমির, সে দল জামায়াতে ইসলামীর ঘোষিত নীতি হচ্ছে যে, তারা মানুষের প্রণীত কোনো আইনে বিশ্বাস করে না। এজন্য তারা দেশে আল্লাহর আইন তথা ইসলামি আইন চালু করতে চান। তাদের অজস্র বক্তৃতা-বিবৃতি-ক্যাসেট-সিডি থেকেই তাদের প্রত্যাশিত আল্লাহর আইনের প্রতি অনুরক্তির কথা আমরা অহরহ শুনে থাকি।

আমরা জানি, তারা তাদের রাজনৈতিক ও অন্যান্য কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সৌদি সহায়তা পান। পাশাপাশি তারা ইসলামি বা আল্লাহর আইনের নামে এদেশে সৌদি আইন চালু করতে চান। যদি তাই চান, তাহলে এখানে আরেকটা দৃশ্যের কথা মনে হয়। গোটা দেশবাসী গণমাধ্যমসূত্রে দেখেছে, গত অক্টোবরে ৮ বাংলাদেশি নাগরিককে সৌদি আইনে প্রকাশ্য রাজপথে শিরচ্ছেদের মাধ্যমে হত্যা করা হয়েছে, যাদের অপরাধ গোলাম আযমের অপরাধের তুলনায় তুচ্ছ।

সবাই জানে, সৌদি আরবে তাদের বর্ণিত কোরানিক আইন তথা ইসলামিক আইন প্রচলিত আছে, যেখানে চুরির মতো তুচ্ছ অপরাধেও হাত কেটে ফেলার বিধান আছে। গোলাম আযমের অপরাধের যে ব্যাপকতা, তাতে সেই কথিত ইসলামি আইন অনুযায়ী বহু আগেই ঢাকার রাজপথে জনসমক্ষে তার শিরচ্ছেদ হবার কথা ছিল। বিচারের আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের কথা তুলে তারা তাদের এই ইসলামি বিধান লঙ্ঘন করছেন কি না, এ প্রশ্নের তারা কী উত্তর দেবেন?

যারা সংবিধান মানে না, নারী ও ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের অধিকার স্বীকার করে না, বরং নারী ও প্রগতিশীল মানুষ এবং আইনের বিরুদ্ধে জেহাদ করে, বোমা মারে, তাদের আইনজীবীর মুখে সংবিধানকে সাক্ষী মেনে এ ধরনের কথা মানায় না। তাতে তাদের কথা ও কার্যকলাপের মধ্যকার বিস্তর ফারাকটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সংবিধানের মৌলিক নীতি যারা মানে না, তারা স্পষ্টত রাষ্ট্রদ্রোহী। তাদের আন্তর্জাতিক মানের আইনি অধিকার পাওয়ার অধিকার থাকতে পারে না। একাত্তরে হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ ও লুষ্ঠনের মাধ্যমে তারা মানবতাবিরোধী যেসব অপরাধ করেছে, এসব অপরাধের যারা ভুক্তভোগী, যারা হারিয়েছেন তাদের মা-বাবা-ভাই-বোন-আত্মীয়পরিজন, বাড়িঘর-সম্পদ-- তাদের সুবিচার পাবার অধিকার তো চল্লিশ বছর ধরেই লঙ্ঘিত হয়ে চলেছে। এখানে এসে আমার প্রশ্ন যে, কোনটা আগে বিবেচ্য হওয়া উচিত-- যুদ্ধাপরাধীর অধিকার নাকি ভুক্তভোগীদের সুবিচার পাওয়ার অধিকার?

বাংলার মানুষ যে ধরনের একটি দেশের স্বপ্ন নিয়ে এ দেশ স্বাধীন করেছিল, গোলাম আযমের নেতৃত্বে পরিচালিত এই গোষ্ঠীর তৎপরতা সেরকম দেশ ও সমাজ প্রতিষ্ঠার অন্তরায়। তারা দেশ ও মানুষের যেকোনোরকম অগ্রসরমানতাকে ঠেকিয়ে রেখে প্রকারান্তরে তাকে আরো পেছন দিকে ঠেলে দিতে চায়। অপরাধ তারা একাত্তরে করেছে, করেছে একাত্তরের পরেও এবং এখনো তারা একই ধরনের তৎপরতায় লিপ্ত। তারা ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও নারীর সমানাধিকার না-মেনে সংবিধানের মৌলনীতি লঙ্ঘন করে চলেছে। যাদের জন্য এদেশের জনগোষ্ঠীর ৫০ ভাগ নারী উত্তরাধিকার ও পারিবারিক ক্ষেত্রে সমানাধিকার থেকে এখনো বঞ্চিত, যারা এদেশে প্রগতিশীল শিক্ষানীতি প্রণয়নে বাধা সৃষ্টি করে, যারা ছায়ানটের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করতে বাধার সৃষ্টি করেছিল বিগত জোট সরকারের আমলে, যারা কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের রগকাটা, হত্যা, বোমাবাজি ইত্যাদির হোতা, তাদের জন্য বিচারের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড নিয়ে যারা অস্থির হয়ে পড়েছেন, তারা এ দেশের সাধারণ জনগণের ন্যায্য অধিকার ও সুবিচার পাওয়ার অধিকার নিয়ে কেন সোচ্চার হচ্ছেন না-- এ প্রশ্ন তাদের ভূমিকাকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে ধারণা দেয়। কাজেই যথাসম্ভব দ্রুত গোলাম আযমসহ গ্রেফতারকৃত ও গ্রেফতারের বাইরে থাকা সকল যুদ্ধাপরাধীর বিচার কার্যকর করে দেশকে রাহুমুক্ত করবার কোনো বিকল্প নেই, যদি আমরা সত্যিই এই দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই। দেশের স্বজনহারা, সম্পদহারা, শারীরিকভাবে নির্যাতিত ও শরণার্থীর জীবনযাপনে বাধ্য হওয়া মানুষ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে মানবতাবিরোধী এই অপরাধীদের বিচারদৃশ্য দেখবার জন্য। ক্ষতিগ্রস্ত এসব মানুষের বিচার পাবার অধিকারকে নিশ্চয়ই আমরা লঙ্ঘন করতে পারি না।

Monday, 28 November 2011

বিশ্ব এইডস দিবস ২০১১-এ বিএনপিএস-এর লিফলেট


এইডস প্রতিরোধে তৎপর হোন
এইচআইভি সংক্রমণ, সংক্রমিত ব্যক্তির প্রতি বৈষম্য এবং
এইডসসংক্রান্ত মৃত্যু শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনুন
এ বছরের বিশ্ব এইডস দিবসের (পহেলা ডিসেম্বর ২০১১) আহ্বান : ‘এইচআইভি সংক্রমণ, সংক্রমিত ব্যক্তির প্রতি বৈষম্য এবং এইডসসংক্রান্ত মৃত্যু শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা’ (Getting to Zero - Zero New HIV Infections. Zero Discrimination and Zero AIDS-Related Deaths)। এসব ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের মধ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানানোই এই স্লোগানের উদ্দেশ্য। এইডস সম্পর্কে বিশ্ববাসীকে সচেতন করা, এইডসআক্রান্তদের জন্য স্বাস্থ্যসেবা বাড়ানো এবং বিশ্ব পর্যায়ে এইডসসংক্রান্ত সামাজিক ও স্বাস্থ্য সংকট মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় তহবিল সংগ্রহ করার জন্য ১৯৮৮ সাল থেকে পৃথিবীব্যাপী বিশ্ব এইডস দিবস পালিত হয়ে আসছে। সকলের জন্য চিকিৎসার সম-সুযোগ নিশ্চিত করার মাধ্যমে সকল দেশকে এইডস রোগ প্রতিরোধে অঙ্গীকারাবদ্ধ করে তোলার মধ্যেই এই দিবসের তাৎপর্য নিহিত। 
প্রতিদিন বিশ্বের প্রায় ৭১০০ মানুষ এইচআইভি-সংক্রমিত হয় এবং ৪৯০০ মানুষ এইচআইভি/এইডস-এ আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। বর্তমানে বিশ্বে তিন কোটি মানুষ এইডস-সংক্রমণ নিয়ে বেঁচে আছে। এইডসআক্রান্ত অধিকাংশ মানুষই নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশগুলোতে বসবাস করে। বিশেষ করে, আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে এইডস মহামারি আকারে দেখা দিয়েছে, যেখানে ১৫-২৪ বছর বয়সী নারীরা ভয়াবহভাবে এইচআইভি-সংক্রমণের শিকার হয়েছে।
এইডসআক্রান্ত ব্যক্তিদের সুচিকিৎসা এখনো সোনার হরিণ। এক্ষেত্রে প্রথম বাধা রোগ চিহ্নিত হওয়া এবং সামাজিক সংস্কার দূর করে চিকিৎসা নিতে এগিয়ে আসা। এরপর রয়েছে চিকিৎসার ব্যয়বহুলতার বিষয়টি, যা দরিদ্র দেশের আক্রান্তব্যক্তিদের একটা বড়ো অংশকেই চিকিৎসা থেকে দূরে রাখে। উন্নত বিশ্বে চিকিৎসার সহজলভ্য সুবিধা থাকলেও দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এটি এখনো একটি বড়ো চ্যালেঞ্জ।
এইডসআক্রান্ত মানুষের প্রতি সমাজে একটি মর্যাদাপূর্ণ ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি থাকা প্রয়োজন। কিন্তু বিশ্বের ৮৪টি দেশে রোগটির প্রতিরোধ এবং আক্রান্তদের চিকিৎসা, সেবা ও সহায়তা দানের ক্ষেত্রে বৈরী অবস্থা বিরাজ করছে। ৫৯টি দেশে চিকিৎসাপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে বাধা রয়েছে। তাছাড়া এইডসআক্রান্ত ব্যক্তিরা চলাচল ও জীবিকা নির্বাহের ক্ষেত্রে বৈষম্য ও প্রতিবন্ধকতার শিকার হন।
বাংলাদেশে এইচআইভি/এইডস সংক্রমণের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম হলেও আমরা ঝুঁকিমুক্ত নই। সর্বশেষ সরকারি হিসেব অনুযায়ী ১৯৮৯ সালে প্রথম এইডস রোগী শনাক্ত হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত এইচআইভি পজিটিভের সংখ্যা ২০৮৮ জন, এইডসআক্রান্তের সংখ্যা ৮৫০ জন, যার মধ্যে মারা গেছেন ২৪১ জন। আমরা সচেতন না-হলে ভবিষ্যতে আমাদের দেশেও এইডসের বিস্তার ভয়াবহতার মাত্রায় পৌঁছে যেতে পারে।
আমাদের দেশে এইডস রোগী শনাক্ত করা বেশ কঠিন। কেননা এইচআইভি ভাইরাসের উপস্থিতি প্রমাণের জন্য এখানে রক্ত পরীক্ষার সুযোগ যথেষ্ট নয়। সরকারি হিসেব মতে, দেশে এইচআইভি পরীক্ষার জন্য ৯৬টি ভলান্টারি কাউন্সেলিং অ্যান্ড টেস্টিং কেন্দ্র রয়েছে। এসব কেন্দ্রে  রক্তে এইচআইভি ভাইরাস আছে কি না তা বিনামূল্যে পরীক্ষা করা হয়। কেন্দ্রসমূহ পরিচালনা করে থাকে কয়েকটি বেসরকারি সংস্থা। এসব কেন্দ্র মূলত নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর প্রতি মনোযোগী; যেমন কিছু কেন্দ্রে যৌনকর্মী ও কিছু কেন্দ্রে হিজড়াদের রক্ত পরীক্ষা করা হয়। সাধারণ মানুষের জন্য এরকম কেন্দ্রের সংখ্যা খুব কম। তাছাড়া এই কেন্দ্রগুলো ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটের মতো বিশেষ কয়েকটি অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ।
এইডসআক্রান্তদের চিকিৎসা দেওয়ার ক্ষেত্রেও আমরা পিছিয়ে আছি। রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে এইচআইভি-সংক্রমণ চিহ্নিত হলে রোগীকে নিয়মিত এআরভি (এন্টিরেট্রোভাইরাল) ওষুধ দিতে হয়। এই ওষুধ খুবই ব্যয়বহুল, যেজন্য বিশেষায়িত গ্র“প হিসেবে সুবিধাপ্রাপ্তদের বাইরে চিকিৎসা পাওয়ার ক্ষেত্রে এইডসআক্রান্ত সাধারণ দরিদ্ররা বৈষম্যের শিকার হন। আমরা মনে করি, এইডসআক্রান্তদের চিকিৎসার দায়িত্বটি সরকার গ্রহণ করলে এসব সমস্যা থেকে সহজেই উত্তীর্ণ হওয়া সম্ভব।
এইচআইভি/এইডস সংক্রমণের বাস্তবতাগুলো আমাদের সমাজেও বিরাজমান। মাদকসেবন, যৌনব্যবসায়, সাময়িকভাবে বিদেশে অবস্থান, অনিরাপদ রক্ত সঞ্চালন, দারিদ্র্য, পর্যাপ্ত শিক্ষা ও চিকিৎসা সেবার অভাব ছাড়াও আরো অনেক মৌলিক বিষয় রয়েছে, যা এ ধরনের রোগের বিস্তারে সহায়তা করে ও প্রতিরোধে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
এইডসআক্রান্ত হবার সম্ভাবনা রয়েছে নারী-পুরুষ উভয়েরই। দেশে প্রকট জেন্ডার বৈষম্য বিদ্যমান থাকায় নারীরা আক্রান্ত হবার আশঙ্কায় পুরুষের তুলনায় বেশি ভুগছে। আক্রান্ত নারী পরিবারে, সমাজে সর্বত্র সন্দেহের শিকারে পরিণত হন। পরম আপনজনও তাদের দূরে ঠেলে দেয়। এছাড়া অতি দরিদ্র, ক্ষমতাহীন, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাহীন, নারীদের এইডসে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা অনেক বেশি এবং তাদের পরিণতি হয় আরো ভয়াবহ। সমাজে নারীদের অধস্তন অবস্থান, নারীসহ অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ক্ষমতাহীনতা ও মানবাধিকারবঞ্চনা এইচআইভি/এইডস প্রতিরোধে যেকোনো জাতীয় উদ্যোগের সফলতার পথে বড়ো প্রতিবন্ধক।
এই পরিস্থিতি ২০১৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশে এইচআইভি/এইডসের সংক্রমণ, রোগীদের প্রতি বৈষম্য এবং আক্রান্ত ব্যক্তিদের মৃত্যু শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার জন্য জরুরি করণীয়সমূহ হতে পারে নিম্নরূপ :
-                     প্রতিরোধই হচ্ছে এইডস থেকে রক্ষা পাবার সর্বোত্তম উপায়। এইচআইভি ভাইরাস যাতে আক্রমণ করতে না-পারে, সেজন্য নিরাপদ ও বিশ্বস্ত যৌনসম্পর্ক বজায় রাখতে হবে।
-                     জরুরি মুহূর্তে শরীরে রক্ত গ্রহণের আগে স্ক্রিনিং টেস্টের মাধ্যমে দানকৃত রক্তে এইচআইভি ভাইরাস আছে কি না তা পরীক্ষা করে নেওয়া প্রয়োজন। এক্ষেত্রে সকল সরকারি হাসপাতালে এইচআইভি/এইডস শনাক্তকরণ সুবিধাসহ চিকিৎসাসেবা সহজলভ্য করতে হবে।
-                     মাদক গ্রহণকারীদের ক্ষেত্রে সিরিঞ্জ দিয়ে মাদক গ্রহণ পরিহার করতে হবে। যারা এখনো পরিহার করতে পারছেন না তাদের একাধিকজনের একই সিরিঞ্জ ব্যবহার করার প্রবণতা রোধ করতে হবে। 
-                     এইডস প্রতিরোধে সচেতনতাই সবচেয়ে বড়ো অস্ত্র। স্কুল পর্যায় থেকে জাতীয় কারিকুলামের আওতায় এইচআইভি/এইডস, প্রজননস্বাস্থ্য ও যৌনস্বাস্থ্যসংক্রান্ত শিক্ষা ও সচেতনতা প্রদান করতে হবে। উন্নয়নকর্মী ও স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমে কমিউনিটি পর্যায়েও সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে।
-                     আমাদের মোট জনসংখ্যার ২৫ শতাংশ কিশোর-কিশোরী। প্রজননস্বাস্থ্য বিষয়ে তাদের সচেতন করার মাধ্যমে দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে পারলে এইচআইভি/এইডসসহ বিভিন্ন যৌনরোগ প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে।

Monday, 21 November 2011

‘স্বামী’র গৃহকার্যে ব্যয়িত শ্রম বিষয়ে বেগম রোকেয়ার বিবেচনা ও বর্তমান সময় : রোকেয়া কবীর


২০ নভেম্বর ২০১১-এর দৈনিক সমকালের ‘নারীস্থান’ পড়ছিলাম। হঠাৎ চোখ পড়ল দুটি ফিচারে। ‘প্রশংসনীয় উদ্যোগ’ নামের প্রথম ফিচারটি ভারী যান চালানোর প্রশিক্ষণে নিয়োজিত নারী পুলিশদের নিয়ে। পড়ে উদ্দীপ্ত বোধ করলাম। ‘প্রথম প্রথম মনে হয়েছে--- আমরা কি বাস চালাতে পারব! ভয়ও লাগছিল অত বড় গাড়ি কীভাবে ম্যানেজ করব, এই ভেবে। কিন্তু এখন ভয় পুরোপুরি কেটে গেছে।’ এ কথা ১১ আর্মড নারী পুলিশের একজন সদস্যের, যিনি বেসিক ড্রাইভিং কোর্সে অংশ নিয়েছেন। এই ব্যাটালিয়নের অধিনায়কও একজন নারী, আবিদা সুলতানা। তিনি বলছেন : ‘আমি আমার ব্যাটালিয়নের সব সদস্যকে সব দিক থেকে পারদর্শী করে তুলতে চাই। মহিলা পুলিশ কত আর কাজ জানবে--- এমন নেতিবাচক কথা যেন কেউ বলতে না পারে সেটাই চাই। তাই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিয়ে নারী পুলিশ সদস্যদের এই প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছি।’ একই দিনে ছাপা নারীস্থানের আরেকটি ফিচার হলো ‘মহিলা ক্রিকেট বিশ্বকাপ বাছাই পর্ব : ব্যাটে-বলে দুর্দান্ত নারীরা’, যেখানে বর্তমানে বাংলাদেশের মাটিতে চলমান ২০১৩-এর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট টুর্নামেন্টের বাছাই পর্বের খেলার বর্ণনা উঠে এসেছে। আমাদের ক্রিকেটযোদ্ধা মেয়েরা এই বাছাইয়ের লড়াইয়ে প্রশংসনীয় অবদান রেখেছে। তারা জাপান ও আয়ারল্যান্ডের নারীক্রিকেটারদের পরাস্ত করে ওয়ানডে ক্রিকেটের মর্যাদা ছিনিয়ে নিয়েছে। উল্লেখ্য, এই ক্রীড়োৎসবে সমাগত পৃথিবীর দশটি দেশের ক্রিকেট টিমের কোচ, ম্যানেজার এবং ফিজিওরাও নারী। ক্রিকেটের পাশাপাশি যাঁদের কেউ কেউ চাকুরি করেন, সংসার-সন্তান সামলান ও পড়াশোনা করেন। ভাবছি, এই সংবাদ দেখলে বেগম রোকেয়া কী ভাবতেন? বলতেন কি যে, ‘আমরা সবই পারি’--- এরকম আস্থার জমিতে দাঁড়ানো এই নারীরা আমাদের আগামী সময়ের দিশা? হয়ত তিনি আশার স্বপ্ন বুনতেন আমাদের নারীদের নিয়ে। হয়ত এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে ভাবতেন, এখনকার দিনের স্ত্রীজাতির অবনতির প্রধান কারণ নারীর প্রজনন কর্মভার! এ অবস্থা থেকে এদের উত্তরণ ঘটাতে হবে। 

‘
উপার্জন করিব না কেন? আমাদের কি হাত নাই, না পা নাই, না বুদ্ধি নাই? কি নাই? যে পরিশ্রম আমরা “স্বামী”র গৃহকার্যে ব্যয় করি, সেই পরিশ্রম দ্বারা কি  স্বাধীন ব্যবসায় করিতে পারিব না?’ মতিচুর গ্রন্থভুক্ত ‘স্ত্রীজাতির অবনতি’ নামক প্রবন্ধে বেগম রোকেয়া এই প্রশ্ন তুলেছিলেন অনেক আগে, বিশ শতকের সূচনালগ্নে। তিনি লক্ষ করেছিলেন তাঁর সময়ের বঙ্গীয় নারী, বিশেষ করে সিংহভাগ মুসলিম নারী অলঙ্কারের ভারে জড়পিণ্ড হয়ে এক বিড়ম্বনাকর জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। যে জীবনে স্বামীর প্রভুত্ব সহ্য করে মুখ বুজে তার সেবা করাই একমাত্র জীবনাদর্শ। যে জীবনে স্বামীগৃহের তাবৎ গার্হস্থ্যকর্মে যন্ত্রবৎ নিমজ্জিত হয়ে থাকার অধিক নিজের হস্ত, পদ, চক্ষু, কর্ণ, মন ও চিন্তাশক্তিকে নিজেদের বিকাশে কাজে লাগানোর কোনো উদ্যোগই পরিলক্ষিত হচ্ছিল না। এই পরিপ্রেক্ষিতে পরনির্ভরশীল, অলঙ্কার-বিড়ম্বিত ও ভীরু নারীজাতির তিনি তুখোড় সমালোচনা করেন। উল্লিখিত প্রবন্ধে পরনির্ভর নারীসমাজের পশ্চাৎযাত্রার ছবি আঁকেন তিনি এভাবে : ‘আমাদের যখন স্বাধীনতা ও অধীনতাজ্ঞান বা উন্নতি ও অবনতির যে প্রভেদ তাহা বুঝিবার সামর্থ্যটুকুও থাকিল না, তখন কাজেই তাহারা ভূস্বামী, গৃহস্বামী প্রভৃতি হইতে হইতে ক্রমে আমাদের “স্বামী” হইয়া উঠিলেন। আর আমরা ক্রমশঃ তাঁহাদের গৃহপালিত পশুপক্ষীর অন্তর্গত অথবা মূল্যবান সম্পত্তি বিশেষ হইয়া পড়িয়াছি।’ অলঙ্কারে মুগ্ধ স্ত্রীলোকদের তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, ‘বাস্তবিক অলঙ্কার দাসত্বের নিদর্শন ভিন্ন আর কিছু নহে’। বাইরের বিশালতার সাথে যুক্ত না-থেকে গৃহকোণে বন্দি সুশ্রী পুতুলের মতো জীবনযাপনকারী অনেক ভীরু নারীকে তীব্র ব্যঙ্গ করে বলেছেন, ‘সামান্য হইতে সামান্যতর বিপদে পড়িলে আমরা গৃহকোণে লুকাইয়া গগনভেদী আর্তনাদে রোদন করিয়া থাকি!!... ব্যাঘ্র ভল্লুক ত দূরে থাকুক, আরসুলা, জলৌকা প্রভৃতি কীট পতঙ্গ দেখিয়া আমরা ভীতবিহ্বলা হই! এমনকি অনেকে মূর্চ্ছিতা হন।’ এই সমুদয় বৈশিষ্ট্যকে (পরনির্ভরশীলতা, অলঙ্কার-ভারাচ্ছন্নতা ও ভীরুতা) অনেক আগেই তিনি নারীর সম্মানজনক ও স্বাধীন জীবনের অন্তরায় হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। ভাগ্যিস করেছিলেন! নইলে হয়ত আমাদের দুর্দশার পথ আরো দীর্ঘায়িত হতো।

তিনি বলেছেন, ‘অনেকে মনে করেন যে, পুরুষের উপার্জিত ধন ভোগ করে বলিয়াই নারী তাহার প্রভুত্ব সহ্য করে। কথাটা অনেক পরিমাণে ঠিক।’ আমরাও মনে করি যে কথাটা অনেক পরিমাণে ঠিক, তবে সম্পূর্ণ ঠিক নয়। কারণ পুরুষ-সহায়ক সমাজধর্ম ও সমাজসদস্যদের পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার কারণে নিয়মিত উপার্জনে নিয়োজিত অনেক শিক্ষিত নারীকেও এ সমাজে পুরুষের প্রভুত্ব ও অত্যাচার সহ্য করতে হয়, ‘অকর্মণ্য’ পুরুষেরাই যখন তাদের ‘স্বামী’ থাকে। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক রোমানা মঞ্জুরের স্বামী হাসান সাইদ যেমনটি ছিলেন। অবশ্য বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ‘স্বামী’পুরুষের প্রভুত্ব ও অত্যাচার বেশি মাত্রায় সহ্য করতে হয় অর্থনৈতিক উপার্জনের সাথে যুক্ত নন এমন নারীদের। অবনত স্ত্রীজাতির এই অবস্থা পরিবর্তনের প্রয়োজনে বেগম রোকেয়া নারীদের উপার্জনশীল করে তুলবার ব্যাপারে প্রচণ্ড তাড়া বোধ করেছেন। যে কারণে কেবল পাশ-করা বিদ্যাশিক্ষা না-করে অনুশীলন দ্বারা হস্তপদ সবল করা, হস্ত দ্বারা সৎকার্য করা, চক্ষু দ্বারা মনোযোগ সহকারে দর্শন, কর্ণ দ্বারা মনোযোগপূর্বক শ্রবণ ও সূক্ষ্মভাবে চিন্তা করতে পরামর্শ দিয়েছেন এবং স্বাধীনভাবে উপার্জনে নিযুক্ত হবার উপযোগী হয়ে গড়ে উঠতে প্রণোদিত করতে চেয়েছেন ও পথ দেখিয়েছেন, যাকে বেগম রোকেয়া ‘স্বাধীন ব্যবসায়’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। বলেছেন, ‘আবশ্যক হইলে আমরা লেডী-কেরানী হইতে আরম্ভ করিয়া লেডী-ম্যাজিস্ট্রেট, লেডী-ব্যারিস্টার, লেডী-জজ সবই হইব।’ 


বেগম রোকেয়ার দেখানো পথ ধরে আজ আমাদের সমাজ অনেক বদলেছে। ‘লেডী-কেরানী’ তো এখন শত শত, এমনকি ‘লেডী-ম্যাজিস্ট্রেট’, ‘লেডী-ব্যারিস্টার’ ও ‘লেডী-জজ’ও বিরলদৃষ্ট নয়। আমাদের নারীরা আজ অনেক অপ্রচলিত পেশায়ও নিয়োজিত হয়েছেন ও হচ্ছেন। বিজ্ঞান ও কারিগরি সাধনা, বিমান ও অন্যান্য যান চালনা, যুদ্ধক্ষেত্রে সাংবাদিকতা ও ফটোগ্রাফি, সামরিকবাহিনীর কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন, জনপ্রশাসন পরিচালনা, আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার দায়িত্ব পালন, ক্রিকেট-ফুটবল-মুষ্ঠিযুদ্ধ প্রভৃতি খেলাধুলায় নিযুক্তি ইত্যাদি ক্ষেত্রে অনেক নারী আজ কৃতিত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন, যেটা তাঁর সময়ে প্রায়-অকল্পনীয় ব্যাপার ছিল।

লক্ষণীয় যে, আজ এতকিছুর পরও নারীজাতির সবিশেষ উন্নতি হয় নি ও হচ্ছে না। পরনির্ভরশীল, অলঙ্কার-বিড়ম্বিত ও ভীরু নারী আমাদের সমাজে এখনো আছেন। একশ বৎসরেরও আগের সমাজে একজন মুসলিম নারী যে ধরনের বন্দি জীবনযাপন করতেন, আজো আমাদের অনেক নারী সেভাবে জীবনযাপনে অভ্যস্ত। এখনো বিপুলসংখ্যক নারীর জীবন ফুরিয়ে যাচ্ছে মজুরিবিহীন ‘স্বামী’র গৃহকার্য, তথা প্রজনন ও গার্হস্থ্য কর্মভারে পীড়িত হয়ে। ইচ্ছার বিরুদ্ধে একের পর এক সন্তান জন্মদান ও পরিবারের সকল সদস্যের জীবনপ্রবাহ সচল রাখতে পরিবার-অভ্যন্তরস্থ যাবতীয় কাজের দায় সামলাতে গিয়ে তাদের নিজেদের জীবনের দিকে ফিরে তাকাবার কোনো অবকাশই মিলছে না। এদের জীবনে কোনো বিনোদন নেই। অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক কাজে যুক্ততা দূরে থাক, সবকিছু সামলে মেলে না প্রতিবেশীর বাড়িতে একটু বেড়াতে যাবার ফুরসৎ। পরিবারে ভিতরে সার্বক্ষণিক সক্রিয়তার পরও বৃহত্তর নাগরিক সমাজে তাদের পরিচয় ‘নিষ্ক্রিয় মানুষ’ হিসেবে। কারণ বৃহত্তর সমাজে তাদের কোনো ভূমিকা রাখবারই সুযোগ নেই। সমাজ অনেকাংশে তাকে সেই স্পেস দেয় না।

বেগম রোকেয়ার সময়ের বাংলায় জনসংখ্যা কোনো সমস্যা ছিল না। পরিবারের ভিতরের পারিশ্রমিকবিহীন শ্রমের বিনিময়মূল্যও ততদিনে হিসেব করে ওঠা যায় নি কিংবা তখন এ দাবি তোলারও দিন আসে নি যে, গার্হস্থ্যকর্মের ভার কেবল নারীর নয়, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে পরিবারের সকল সদস্যের। আজ এদেশে জনসংখ্যা এক বড়ো সমস্যা। আজ আমরা জেনে গেছি পরিবারের ভিতরে উৎপাদিত হয়ে ভিতরেই খরচ হয় এরকম উৎপাদনের পেছনে ব্যয়িত শ্রমের অর্থমূল্য কত বিপুল। কাজেই এখন বেগম রোকেয়ার থেকে এগিয়ে আমাদের ভাবতে হবে নারীর কাঁধ থেকে এই সনাতনী কর্মভার কমাবার বিষয়ে। এই ভার কমিয়ে বিপুল পরিমাণ নারীকে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হয়ে সক্রিয় নাগরিক হবার সুযোগ করে দেয়া গেলে গৎবাঁধা গ্লানিকর জীবন থেকে উত্তরিত হয়ে ব্যক্তিনারী জীবনকে আনন্দময় একটা ব্যাপার বলে আবিষ্কার করে উঠবে।

আশা করি এ কথায় কেউ ভিন্নমত প্রকাশ করবেন না যে, পরিবারের সন্তান সংখ্যা কমলে সন্তানের খাদ্য, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় অর্থ বিনিয়োগে পরিবারের সংগতি বাড়বে। কমবে নারীর প্রজননতন্ত্রসংশ্লিষ্ট অসুস্থতা এবং মা ও শিশুমৃত্যুর হার। তাছাড়া নারীর বিভিন্নমুখী উপার্জনমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ততার ভিতর দিয়ে পরিবারে ও সমাজে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির চর্চা চালু হবারও একটা অবকাশ তৈরি হবে। এর ফলে স্বাভাবিকভাবেই কমবে নারী নির্যাতন। আর এরকম পরিস্থিতিতে সচেতন নারী ক্ষমতায়নের সিঁড়ি খুঁজে পাবে।

সমাজে এরকম অবস্থা সৃষ্টি করা গেলে রাষ্ট্রের অর্থনীতিতেও অনেক বড়ো সুফল আসবে বলে আশা করা যায়। প্রথমত এতে জনসংখ্যার ভার কমবে। আর তাতে খাদ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পানীয়জল ও জ্বালানি খাতে নাগরিকদের চাহিদা মিটাতে ক্রমবর্ধমান চাপ অনেকটা হ্রাস পাবে। রাস্তা, বাসস্থান ও অবকাঠামো উন্নয়নে জমির ওপর এবং বন, জলাভূমি ও পরিবেশের ওপরে চাপ কমবে। এক্ষেত্রে দুর্যোগের পরিমাণ হ্রাস পাবে বলেও আশা করা যায়। অন্তত দুর্যোগের ঘটনা ঘটলে তা মোকাবেলায় জনসাধারণ ও রাষ্ট্র অনেক বেশি সক্ষমতার পরিচয় দিতে পারবে। সবিশেষ রাষ্ট্রের জনগণের দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে ওঠার সুযোগ ও হার বৃদ্ধি পাবে এবং সব মিলিয়ে নাগরিকদের জীবনমানে আসবে দৃশ্যমান ইতিবাচক উন্নয়নের জোয়ার।

এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই যে, বেগম রোকেয়া পরিবার ও সমাজশৃঙ্খল থেকে বঙ্গীয় নারীর নিজের ভিতরে মুক্তি চেয়েছিলেন। সে মুক্তি আজ কমবেশি আসতে লেগেছে। সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের যে একাংশ নারী শিক্ষাদীক্ষায়, জ্ঞানবিজ্ঞানে ও উৎপাদনমুখী কর্মকাণ্ডে স্বাধীনভাবে সক্রিয় ভূমিকা রেখে চলেছেন, তাদের ভূমিকাকে আরো নির্বিঘ্ন করার পাশাপাশি শিক্ষা ও উপার্জনমুখী কর্মকাণ্ড থেকে বঞ্চিত বৃহদাংশ নারীকে এই স্রোতে শামিল হবার সুযোগ করে দিতে পারলে বেগম রোকেয়ার প্রত্যাশা পরিপূর্ণতা পাবে। আমরা নিশ্চয়ই তা করতে চাই!