Thursday, 22 March 2012

জাতীয় সংসদে অসংসদীয় আচরণ ও সংরক্ষিত আসনে সদস্য মনোনয়নের পদ্ধতি প্রসঙ্গে : রোকেয়া কবীর


দেশের রাজনীতি সচেতন মানুষ বরাবরই চাচ্ছিলেন বিরোধী দল সংসদে যাক, জনগণের পক্ষে থেকে সরকার ও তার কৃতকর্মের সমালোচনা করুক। কিন্তু সংসদে তাঁদের অনুপস্থিতি দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছিল। আশার কথা, দীর্ঘ অনুপস্থিতির পর জাতীয় সংসদের চলতি অধিবেশনে বিরোধী দল অংশ নিয়েছে। কিন্তু সংসদ সদস্যগণ তাঁদের বিতর্কে অসংসদীয় ও আপত্তিকর শব্দ প্রয়োগ করে দেশবাসীকে হতাশ করে চলেছেন। জনগণের পক্ষে আইন প্রণয়নে জনপ্রতিনিধিদের জন্য আনুষ্ঠানিক বিতর্কস্থল জাতীয় সংসদকে তাঁরা পরিণত করেছেন হৈ-হট্টগোলের কেন্দ্রে, যা কোনো অবস্থাতেই প্রত্যাশিত হতে পারে না। সংগত কারণেই বিভিন্ন মহলে এ নিয়ে হাসাহাসি হচ্ছে, আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। বিভিন্ন স্তরে ও মিডিয়ায় এসব আলোচনায় অংশ নিচ্ছেন রাজনীতি সচেতন সাধারণ মানুষের পাশাপাশি সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ, নারী আন্দোলনকর্মী, এমনকি রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দও। কিন্তু দুঃখজনকভাবে দেখা যাচ্ছে যে, পুরো সমালোচনাটাই ঘুরেফিরে চলে যাচ্ছে নারীর বিরুদ্ধে।

কথা হলো, যাঁরা দলের মনোনয়ন নিয়ে সংসদে যাবার সুযোগ পেয়েছেন, সংসদ অধিবেশনে বিতর্কে অংশ নিতে পারছেন, তাঁরা সবাই সংসদ সদস্য, তা নির্বাচিত কি মনোনীত হয়ে যেভাবেই তাঁরা সংসদে আসুন না কেন। সংসদ অধিবেশনের নির্দিষ্ট কার্যপ্রণালিবিধি আছে, সদস্যদেরও আছে নির্দিষ্ট দায়িত্ব ও কর্তব্য। সংসদের কার্যপ্রণালিবিধি ও সদস্য হিসেবে নিজেদের দায়িত্ব কর্তব্য সম্পর্কে একজন কতটা সচেতন এবং নিজ নিজ দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে কতটা যত্নবান থাকেন, তার ওপরে নির্ভর করে নির্দিষ্ট সদস্যের ভালোমন্দ, তিনি নারী নাকি পুরুষ তার ওপরে নয়। কিন্তু আলোচনাগুলো এমনভাবে হচ্ছে, যেন নারী বলেই তাঁরা এরকমটা করছেন, যা সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত ও মনোনীত হবার ক্ষেত্রে নারীর অধিকারকে হাস্যাস্পদ ব্যাপারে পরিণত করে। 

আমরা দেখেছি, সরাসরি নির্বাচনে বিপুল ভোটে পুরুষপ্রার্থীদের পরাজিত করেও অনেক নারী সংসদে এসেছেন, ঠিকভাবে নিজেদের দায়িত্ব কর্তব্য পালন করেছেন ও করছেন। ফলে ঢালাওভাবে নারী সংসদ সদস্য মাত্রই সংসদে বসবার অযোগ্য, এরকম মতামত গ্রহণযোগ্য নয়। মোটকথা নারী কি পুরুষ সদস্য যিনিই অসংসদীয় ও নেতিবাচক আচরণ করেন, তা ব্যক্তিগতভাবে কেবল তিনিই করেন, এর দায়দায়িত্বও কাজেই তাঁর নিজের, নারী বা পুরুষ সমাজের নয়। সুতরাং নারী সংসদ সদস্যদের মধ্যে যিনি/যাঁরা সংসদে অশ্লীল শব্দপ্রয়োগ করেছেন ও করছেন, নেতিবাচক ভূমিকা রেখেছেন ও রাখছেন, তাঁদের আচরণের জন্য সংসদের ভিতরের ও বাইরের অন্য নারীদের মাথা হেঁট হয়ে যাবার কিছু নেই। অথচ নারী আন্দোলনেরও অনেকে এরকম অভিমত ব্যক্ত করছেন। আমরা মনে করি, একজন বা কয়েকজন নারীর কৃতকর্মের দায়িত্ব গোটা নারীসমাজের ওপরে বর্তাবার কোনো সংগত যুক্তি নেই; যেমন একজন বা কয়েকজন পুরুষের ব্যর্থতার দায়ও গোটা পুরুষ সমাজের ওপরে বর্তায় না। ব্যক্তির স্খলনকে ব্যক্তির স্খলন হিসেবেই দেখে আমাদের উচিত এই অকার্যকর ব্যবস্থার পেছনে নিহিত মূল সমস্যাটা খুঁজে বের করবার চেষ্টা করা ও তা নিয়ে কথা বলা। 
 
যাঁরা জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনে দুই প্রধান দল ও অন্য দল থেকে মনোনীত হয়ে সংসদে আসেন তাঁদের রাজনৈতিক জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও অভিজ্ঞতা খতিয়ে দেখবার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলসমূহের। কারণ এঁরা জনগণের দ্বারা নির্বাচিত হয়ে আসেন না। এঁদের মনোনীত করেন দলগুলোর শীর্ষস্থানীয় নেতৃবর্গ, যাঁরা নিজেদের দাবি করেন জনস্বার্থে জীবন উৎসর্গকারী হিসেবে। অথচ আজ তাঁদের ভুল মনোনয়নের দায় বহন করতে হচ্ছে দেশের জনগণকে। আমরা কিছুতেই বিশ্বাস করতে চাই না যে, দেশের বড় দুই দলের কর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে জানাশোনাসম্পন্ন, রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাঋদ্ধ ও নারীর সমানাধিকারে বিজ্ঞ নারী ছিলেন না। কাজেই দলসমূহের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিবর্গসহ সংশ্লিষ্ট দলের সংসদ সদস্যগণ, যাঁরা এই নারীদের সদস্য হিসেবে মনোনীত করেছেন তাঁদের মনোনয়নের যোগ্যতা, অনুসৃত পদ্ধতি, জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা প্রভৃতি আজ প্রশ্নবিদ্ধ। কোন ভিত্তিতে রাজনীতিতে অভিজ্ঞ শিক্ষিত নারীরা সংরক্ষিত আসনের সদস্য হিসেবে মনোনয়ন পেলেন না অথচ অযোগ্য ও অদক্ষরা মনোনীত হয়ে নারীসমাজ ও জনগণের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের সুযোগকে কাজে না লাগিয়ে এ ধরনের শিষ্টাচার-বহির্ভূত আচরণ করবার সুযোগ পাচ্ছেন, তা জানতে চাইবার অধিকার নারীসমাজসহ সকলেরই আছে। মনোনয়নপদ্ধতির এই ঘাপলা নিয়ে কথা না বলে নারীদের ব্যক্তিপটভূমি নিয়ে কথা বলে, নারীরা এলেই এমন হয় জাতীয় দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্য করে রাজনৈতিক দলগুলো তাদের ব্যর্থতার এই দায় থেকে পার পেতে পারে না।

আমরা উদ্বেগের সাথে দেখছি, বাংলাদেশে ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নারী আন্দোলনের ফলে নারীর জন্য যে সুযোগগুলো বিভিন্ন সময়ে সৃষ্টি হয়েছে ও হচ্ছে, প্রায়ই তাকে ঠিকভাবে কাজে না লাগিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো তাদের সংকীর্ণ স্বার্থে অপব্যবহার করছে। আর এ ধরনের অপব্যবহারে নারীসমাজকে কেবল নির্দিষ্ট সুযোগের সুফল ভোগ করা থেকে বঞ্চিতই করা হয় না, বরং নারীর প্রতি জনমত নষ্ট করার সুদূরপ্রসারী অপচেষ্টাও করা হয়, যার সঙ্গে পুরুষতান্ত্রিক সংকীর্ণতারও যোগ আছে বলে আমরা মনে করি। সুতরাং আমরা বলতে চাই, যে রাজনৈতিক দল এ ধরনের নারীদের সংসদ সদস্য হিসেবে মনোনীত করেছে, এ ঘটনার সম্পূর্ণ দায়দায়িত্ব তাদের, যা এড়াবার কোনো সুযোগ তাদের নেই। পাশাপাশি আমরা মনে করি, এজন্য দায়ী সংসদের হুইপিং সিস্টেমও। জাতীয় সংসদে কার্যকর কোনো হুইপিং সিস্টেম আদৌ আছে কি না, থাকলে হুইপগণ কী দায়িত্ব পালন করছেন, সে প্রশ্নও এখানে উঠিয়ে রাখা দরকার। আমরা মনে করি, দল থেকে পিঠ চাপড়ানো না হলে, হুইপিং সিস্টেম সহায়তা না করলে এঁরা জাতীয় সংসদে অসংসদীয় কার্যকলাপের সুযোগ ও সাহস পেতেন না। 

যাঁরা সংসদে অশ্লীল ও অসংসদীয় কথা বলেছেন, নেতিবাচক আচরণ করেছেন, তাঁদের সংসদ থেকে প্রত্যাহার করার জন্য সংশ্লিষ্ট দলগুলোর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার। এ করা না হলে আমাদের সন্দেহ থেকে যাবে যে, দল থেকে গ্রিন সিগন্যাল পেয়েই কয়েকজন সংসদ সদস্য জাতীয় সংসদের ব্যয়বহুল ও গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশনকে অযাচিত বিতর্কের দিকে ঠেলে দিয়ে ব্যর্থ করে দিচ্ছেন।   

আমরা আমাদের অভিজ্ঞতা থেকে দেখছি, সংরক্ষিত আসনে মনোনীত সদস্যদের সিংহভাগই নারীর সমানাধিকার, নারীর ক্ষমতায়ন, নারী-পুরুষ সমতা প্রতিষ্ঠা কিংবা বৃহত্তর জনস্বার্থে সংসদে বা সংসদের বাইরে কোথাওই কোনো উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করতে পারছেন না। এ ধরনের বিবেচনা থেকেই নারী আন্দোলনের দীর্ঘদিনের একটি চাওয়া হলো সংরক্ষিত আসনে সরাসরি নির্বাচন। সরাসরি নির্বাচন হলে জনগণ দলগুলোর নির্বাচকমণ্ডলির অপরিণামদর্শিতার কুফল ভোগ করতে বাধ্য না থেকে দেখেশুনে যোগ্য নারীদেরই তাদের প্রতিনিধি হিসেবে সংসদে পাঠাতে পারবে। সেরকম ক্ষেত্রে আশা করা যায়, সংসদে এ ধরনের আপত্তিকর পরিস্থিতিরও সৃষ্টি হবে না। তবে যতদিন আমরা সরাসরি নির্বাচনের দিকে যেতে না পারছি ততদিন সংরক্ষিত আসনের সদস্য মনোনয়নে প্রার্থীদের যোগ্যতা ও দক্ষতাকেই যাতে সবচেয়ে গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় নেয়া হয়, সে ব্যবস্থা করতে হবে। তা না হলে আমরা আশঙ্কা করি, নারীর ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে অ্যাফারম্যাটিভ অ্যাকশন বা ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে সংরক্ষিত আসন পদ্ধতি প্রবর্তন ও চালু রাখার কার্যকর কোনো মানেই থাকবে না।  

আমরা আশা করব, মনোনয়ক দলের ‘পোষা লাঠিয়াল’ হিসেবে টেবিল চাপড়ানো ও অনাবশ্যক গলা চড়ানো বন্ধ করে সংরক্ষিত আসনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য জেনে মনোনীত সংসদ সদস্যগণ নারীর ক্ষমতায়ন, নারীর সমানাধিকার, নারী-পুরুষ সমতা, সর্বোপরি গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি বিকাশের প্রয়োজনে বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে উদ্যোগী হবেন এবং নারী আন্দোলনের দীর্ঘদিনের অর্জনকে সমুন্নত রাখতে সচেষ্ট থাকবেন।    

Tuesday, 28 February 2012

সর্বস্তরে নারীর অংশগ্রহণ, প্রত্যাশা ও বাস্তবতা : রোকেয়া কবীর

নারীকে অংশগ্রহণের বাইরে রেখে পারিবারিক, সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রসহ সকল পর্যায়ে সিদ্ধান্তগ্রহণের যে সংস্কৃতি দেশে ক্রিয়াশীল আছে, তার বয়স অনেক হলো। এই সংস্কৃতিটিই এখানকার সর্বত্র ব্যাপকভাবে চর্চিত। এটি যে অগণতান্ত্রিক, এটি যে নারীর প্রতি বৈষম্যের বীজ বুনে যাচ্ছে হাজার বছর ধরে--এ ধারণাটিই আমাদের সামনে এসেছে অনেক দেরিতে। এখন জনগণের একাংশ এটা বোঝে ও মানে যে জনগণের অর্ধাংশ নারীর অংশগ্রহণ-ব্যতিরেকে গৃহীত সমস্ত সিদ্ধান্ত অগণতান্ত্রিক, কিন্তু জনগণের একাংশ সেটা এখনো স্বীকারই করে না। যারা বোঝে ও স্বীকার করে তাদের একাংশ জানা-বোঝা পর্যন্তই থেমে থাকে, এক্ষেত্রে পরিবর্তন আনবার জন্য কোনো উদ্যোগ নেয় না। বাকি একাংশ নারী-পুরুষ জানা-বোঝা ও স্বীকার করার পাশাপাশি এ সংস্কৃতি পরিবর্তনে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে সচেষ্ট। আশার কথা এই সচেতন অংশে জনমত ক্রমশ বাড়ছে, বাড়ার গতিটা যদিও এখনো আশানুরূপ নয়।

যারা সর্বস্তরে নারীর অংশগ্রহণের দাবির পক্ষশক্তি তাদের নিয়ে দুশ্চিন্তা নেই। কিন্তু যে বৃহদাংশ মানুষ আজো আগের ধাঁচেই চিন্তা করে, যারা নারীকে আজো ঊনমানুষ বলেই ভাবে, তাদের মানসিকতা পরিবর্তনের কাজটি ব্যাপকভাবে শুরু করা না-গেলে সর্বস্তরে নারীর অংশগ্রহণের দাবিটি দাবি হয়েই থেকে যাবে আরো দীর্ঘকাল। এ অবস্থা আমাদের আশান্বিত করে না।

বর্তমান বাংলাদেশের সামাজিক-অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক ক্ষেত্রে নারীকে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে অধিষ্ঠিত দেখতে পাওয়া যায়, তা সংখ্যাটা যত ক্ষুদ্রই হোক। অর্থাৎ আমাদের একাংশ নারী আজ কেবল প্রজনন ও গার্হস্থ্যকর্মে নিয়োজিত থেকেই জীবন পার করছেন না। তাঁরা সমাজ-রাষ্ট্রের জন্য উল্লেখযোগ্য ও তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন। চিরাচরিত কাজের বাইরে অপ্রথাগত কাজে নিজেদের দক্ষতা প্রমাণ করছেন। এ অংশের অপ্রথাগত কাজে যুক্ততা সমাজচক্ষুর কাছে ক্রমশ সয়েও আসছে। নারীসমাজের এ অংশ আমাদের অগ্রবর্তিকা। তাদের দেখে অন্য নারীরা যেমন নিজেদের ওই অবস্থানে বা তার চেয়েও উচ্চস্তরের অবস্থানে অধিষ্ঠিত করার স্বপ্ন দেখতে পারছে; তেমনি নারীবিরোধী গোষ্ঠীর মধ্যেও একটা সহনশীলতা তৈরি হচ্ছে। এই অবস্থাটিকে কাজে লাগাতে পারলে হয়ত আমরা নারীবিরোধী শক্তির জারিজুরিকে ক্রমশ দুর্বল করে দিতে পারব। 

বর্তমানে আমাদের একটা বড়ো অগ্রগতি হলো সমাজে নারীর কীর্তির উদাহরণ স্থাপিত হওয়া, যেটা আগে বিদ্যমান ছিল না। ভারতবর্ষের অবরোধবাসিনী নারীদের মুক্তির জন্য আমাদের এখানে প্রাতঃস্মরণীয় যেসব নারী-পুরুষ কাজ করেছেন, তাঁদের চাইতে আমাদের সময়ে এসে নারীর পক্ষে কাজ করা অনেক সহজ হয়েছে। আমরা এখন যুক্তির পাশাপাশি সামনে উদাহরণ নিয়ে কথা বলতে পারি। তাঁদের সময়ে ভরসা ছিল কেবল যুক্তি। কিন্তু অপেক্ষাকৃত অনুকূল পরিস্থিতিতে আমাদের অর্জন, তাঁদের অর্জনের চেয়ে বেশি কি না, সে নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে।

এটা অনস্বীকার্য যে, সব কাজে নারীকে যুক্ত করার দৃশ্য-অদৃশ্য সমস্ত বাধা অপসারণ, নারীর অগ্রগতির পথের প্রতিবন্ধকতাসমূহকে নিষ্ক্রিয় করে দেয়া, সমুদয় সম্ভাবনা নিয়ে নারীর বিকশিত হবার সুযোগ উন্মোচিত করার প্রয়োজন আছে এবং এটা করার দায়িত্ব রাষ্ট্র, সরকার ও তার নাগরিকগণসহ সবার। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা, সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন অ্যাকাডেমি, রাজনৈতিক দল, নাগরিক সংগঠন ও একক ব্যক্তির কেউই এ দায়িত্ব এড়াতে পারে না। কিন্তু আমাদের প্রবণতার মধ্যে কমবেশি এই বোধবুদ্ধির অনুপস্থিতি আছে। আমরা যতটা অন্যের দায়দায়িত্ব পালন করা না-করার সমালোচনায় আগ্রহী, নিজ দায়িত্ব পালনে ততটা আগ্রহী নই। সমস্ত কাজই সরকার করবে বলে যারা আশা করে, তারা নিজেদের দায়দায়িত্ব সম্পর্কে অন্ধকারে আছে বলে মনে হয়। বস্তুত তারা এটা বলতে পেরেই খুশি যে সরকার তার দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে ও হচ্ছে। এটা বলার সময় তারা একেবারেই মনে রাখে না যে, তার/তাদের নিজেদেরও এক্ষেত্রে দায়িত্ব আছে, যা তারা পালন করবার কথা ভাবে না পর্যন্ত। এ অবস্থাটিও আমাদের জন্য বিশেষভাবে সুখকর নয়।

সচেতনভাবে ভাবলেই এটা বোধগম্য হয় যে, প্রজনন ও গার্হস্থ্য কাজের ভার চাপিয়ে আমাদের পুরুষকুল তাদের নিকট-সম্বন্ধীয় নারীদের সবকিছু থেকে দূরে রাখতে দিনের পর দিন কীভাবে নেতিবাচক ভূমিকা পালন করে চলেছে। নিজেরা করতে পারে এমন কাজেও যখন তারা স্নেহের দাবিতে তাদের মাকে ব্যস্ত রাখে, ভালোবাসার দাবিতে বউ ও বোনকে ব্যস্ত রাখে, তখন যে তার/তাদের সুখের জন্য তারা মা-বউ-বোনের কতকটা অ-সুখেরও কারণ হয়, সেটা ভাববার মতো দৃষ্টিভঙ্গি প্রায় ক্ষেত্রে অনেক সচেতন মানুষের মধ্যেও অনুপস্থিত দেখা যায়। আমরা মনে রাখি না যে, কাজের পাশে বিশ্রাম আমাদের মা-বউ-বোনেরও দরকার, সংসারের বাইরের বিষয়-আশয় নিয়ে ভাববার ও সেসবে যুক্ত হবার অধিকার তাদেরও আছে। গান শোনা বা করা, শিল্প-সাহিত্যকর্মের সাথে যুক্ত হওয়া, নাটক-সিনেমা দেখা ও করার মতো সুকুমারবৃত্তি বা খেলাধুলা দেখা ও করা কিংবা বেড়াতে যাওয়ার মতো বিষয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট হওয়া তাদের জন্যও দরকারি। নারী হয়ে জন্ম নিলে বাড়িঘরের কাজে জীবন দিয়ে দিতে হবে; সন্তানধারণ, জন্মদান ও লালনপালন করেই সব পেয়েছির তৃপ্তি পেতে হবে--এরকম চাওয়াটাই অগণতান্ত্রিক। এই অগণতান্ত্রিক অবস্থাটার চর্চা আমরা জেনে-না-জেনে, ভেবে-না-ভেবে নিতান্ত অভ্যস্ততা থেকে করি। এই অভ্যস্ততা থেকে আমাদের সবারই বের হয়ে আসতে হবে। তা নইলে বিশ্রামের সুযোগ না-দিয়ে আমাদের ভাইয়েরা তাদের মায়েদের সংসারের ঘাঁনির নিচে আত্মোৎসর্গ করতে বরাবরই ইন্ধন দিয়ে যেতে থাকবে, সামাজিক-অর্থনৈতিক কাজে যুক্ত হবার সুযোগ না-দিয়ে তাদের স্ত্রীদের একের পর এক সন্তান জন্মদান ও তার লালনপালনের কাজে মহিমা আরোপ করে যেতে থাকবে, পড়াশোনা করে বড়ো হবার পথ করে না-দিয়ে তাদের বোনেদের তারা পরিবারের সবার ফুটফরমাশ খেটে তৃপ্ত থাকতে বলবে। সচেতনভাবে ও অসচেতনভাবে, যেকোনো অবস্থা থেকেই হোক আমাদের এরকম ভাবনা ও কাজই নারীদের রাষ্ট্রের যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে এবং সমাজ-রাষ্ট্রের জন্য দৃশ্যমান ও তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রাখতে দিচ্ছে না; বরং বড়ো ধরনের প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করছে। এই প্রথার খড়্গেই যুগ যুগ ধরে বলি হয়ে আসছে আমাদের অর্ধাংশ নারী। আজ এ প্রথাকে চ্যালেঞ্জ করতে হবে, তা নইলে আমাদের দিন বদলের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে না--না ব্যক্তির, না সমাজের, না রাষ্ট্রের।

নারীদের একের পর এক সন্তান জন্মদানে বাধ্য করে আমাদের সমাজ কেবল যে নারীদের বিকাশকেই রহিত করে চলেছে তা নয়, বরং এর মাধ্যমে একইসঙ্গে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রেরও ক্ষতি করে চলেছে। সন্তানধারণ, সন্তান জন্মদান ও লালনপালনের ভার কম থাকলে যেকোনো নারী প্রজননকর্মের বাইরে অন্য কাজে বেশি সময় দিতে পারে। পরিবারের অর্থনীতির ওপরে যার ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। তাছাড়া তাদের শরীর-স্বাস্থ্য ভালো থাকায় তারা কম অসুস্থ হয়। পরিবারে সন্তানসংখ্যা কম থাকলে তাদের শিক্ষা-স্বাস্থ্যখাতে ব্যয় কম হয়, সবিশেষ এদের ঠিকভাবে মানুষ করে তোলারও অবকাশ তৈরি হয়। আর এ ধরনের পরিবার যে সমাজে বেশি, সে সমাজ হয় তত উন্নত, তত অনুসরণীয়। এর সুফল রাষ্ট্রের ভাগেও বর্তায়। অতিরিক্ত জনসংখ্যার ভারে রাষ্ট্রকে কাবু হতে হয় না। জনগণের অতিরিক্ত চাপ রাষ্ট্রের জল-জমি-পরিবেশের ওপর যে চাপ ফেলে, জনসংখ্যা পরিমিত হলে সে চাপ সংগত কারণেই কম হয়। রাষ্ট্র মনোযোগী হতে পারে জনগণকে জনসম্পদে উন্নীত করায়। 

এটা নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে, পরিবারে যদি গণতন্ত্র চর্চার পরিবেশ তৈরি করা যায়, তাহলে পরিবারপিছু সন্তানসংখ্যা অনেক কমে যাবে। কারণ কোনো মা-ই চায় না তার প্রজননসক্ষমকালের পুরোটা জুড়ে কেবল একের পর এক সন্তান জন্ম দিয়ে যেতে। এর ফলে তাদের শরীর, মন ও পরিবারের সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর কীরকম কুপ্রভাব পড়ে তা তারা জানে। তাছাড়া তাদের জীবনটা যে এতে রান্নাঘর, শোবার ঘর আর বাড়ির আঙিনার মধ্যেই নিঃশেষিত হয়ে যায়, তা-ও তারা জানে।

স্বামী-স্ত্রী ও অন্য সদস্যের মধ্যে পরিবারে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির চর্চা হলে তা সন্তানসংখ্যার ওপরে প্রভাব রাখা ছাড়াও ওই পরিবারের সকল শিশু ও কিশোর-কিশোরীর মধ্যেও এর ইতিবাচক ছাপ পড়ে। আজকে যারা শিশু ও কিশোর-কিশোরী এরাই আগামী দিনে দেশের সকল ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিবে। পরিবার থেকে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি সম্পর্কের ধারণা পেলে পরবর্তী জীবনেও তারা এর চর্চা করবে। তাতে সর্বত্র গণতন্ত্রের চর্চা হবার সম্ভাবনা তৈরি হবে। গণতন্ত্রচর্চার দায় কেবল রাজনৈতিক দল ও রাজনৈতিক নেতাদের নয়, এ দায় সবারই।      

এই দর্শন থেকেই আমাদের চাওয়া এরকম যে, আমাদের পরিবারের পুরুষকর্তারা সচেতনভাবে প্রজনন ও গার্হস্থ্য কর্মভারে পীড়িত তাদের মা-বউ-বোনেদের ওপরে পরিবারের গার্হস্থ্যকর্মের সমুদয় ভার না-চাপিয়ে গণতান্ত্রিকভাবে নিজেরাও ভাগ করে নেবে। যতদিন সেটা না-হচ্ছে ততদিন অনেক দূরে ও উচ্চে লক্ষ্য স্থির রেখে সেই লক্ষ্যে নিজেকে এগিয়ে নিতে পরিবার থেকে চাপিয়ে দেয়া অনাবশ্যক ভারকে যেন মেয়েরা ‘না’ বলতে শেখে। ঝামেলা এড়িয়ে এই ‘না’টা যেন যুক্তির সাথে বলা যায়, তার জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে। এ ধরনের প্রস্তুতি নিতে মেয়েদের সহায়তা করতে পারে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি-বেসরকারি সংস্থা।

সমাজের যে রক্ষণশীল অংশ নারীর সমানাধিকারে বিশ্বাস না-করে নারীকে পুরুষের মনোরঞ্জনের উপকরণ মনে করে, তারা এই প্রত্যাশিত সংস্কৃতির বিরোধিতা করবে তাতে সন্দেহ নেই। তাদের এই বিরোধিতাকে প্রতিহত করতে প্রাতিষ্ঠানিক-সামাজিক-রাষ্ট্রীয় প্রণোদনা অব্যাহত রাখতে হবে। তারা না-চাইলেও সমাজ যে বদলাচ্ছে ও বদলাবে, এই অনিবার্যতাকে বুঝতে সহায়তা করতে হবে। সে লক্ষ্যে কোথাও আমাদের পর্যাপ্ত উদ্যোগ নেই। তদুপরি কিছু কিছু ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রয়োজনে এই শ্রেণির অযৌক্তিক চাওয়ার প্রতি সাড়াপ্রদান এদের শিকড়কে হয়ত আরো ভিত্তি দিচ্ছে, যা আশঙ্কাজনক। আমাদের এ ব্যাপারে সতর্ক থাকা জরুরি।   

আমাদের লক্ষ্য একটা অর্থবহ গণতান্ত্রিক সমাজ বিনির্মাণ, যেখানে সব কাজে নারী-পুরুষের সমান অংশগ্রহণ থাকবে। যেখানে লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য বিলুপ্ত হবে, কারো সুখ যেখানে অন্য কারো অ-সুখের কারণ হবে না। এই অবস্থায় উপনীত হবার জন্য আমাদের খোলামনে ভাবতে ও কাজ করতে হবে। তাহলেই হয়ত আমাদের সামনে অপেক্ষা করবে এমন একটা আলোকিত ভবিষ্যৎ, যা হয়ত আন্তর্জাতিক নারীদিবসের জন্য ২০১২ সালের স্লোগান হিসেবে ‘কানেকটিং গার্লস, ইন্সপায়ারিং ফিউচার : কিশোরী সব মিলাও হাত, ভবিষ্যতের ঘোচাও রাত’কে নির্ধারণ করে জাতিসংঘ যে ধরনের ভবিষ্যতের কথা বলতে চেয়েছে, তাতে পৌঁছুতে আমাদের সহায়তা করবে।

Tuesday, 17 January 2012

বাংলাদেশ সরকারের কাছে জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের চিঠি ও যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রসঙ্গে/ রোকেয়া কবীর



গত ১৫ জানুয়ারি ২০১১ দৈনিক আমাদের সময়ে প্রকাশিত নিজামীদের অবস্থা জানতে চেয়ে সরকারকে জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের চিঠি শীর্ষক সংবাদটিতে এই নিবন্ধকারের দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়েছে। সংবাদটিতে বলা হয়েছে, জাতিসংঘ মানবাধিকার হাইকমিশনারের কার্যালয় থেকে ‘ওয়ার্কিং গ্রুপ অন আরবিট্রেরি ডিটেনশন’-এর নামে গত ১২ সেপ্টেম্বর জেনেভাস্থ বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনপ্রধানের মাধ্যমে ৬০ দিনের মধ্যে ৩৫ দফার সুস্পষ্ট জবাব চেয়ে সরকারের কাছে চিঠি পাঠিয়েছে কমিশন। চিঠিটি বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হাত হয়ে বর্তমানে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ও বাংলাদেশ পুলিশের কাছে রয়েছে। প্রয়োজনে ওয়ার্কিং গ্র“পকে জানিয়ে এক মাস সময় বাড়িয়ে নেওয়া যাবে বলে চিঠিতে একটি শর্ত যুক্ত ছিল। ওই শর্তের বলে ৬০ দিনেরও অতিরিক্ত সময়ের সুবিধা নিয়ে বর্তমানে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট চিঠির জবাবদানের প্রস্তুতি চলছে বলে সংবাদসূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।

জাতিসংঘ মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয়ের ‘ওয়ার্কিং গ্রুপ অব আরবিট্রেরি ডিটেনেশন’-এর প্রধান রেপোরটিয়ার এল হাডযি মালিক সো জেনেভায় অবস্থিত বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনের প্রতিনিধি মো. আবদুল হান্নানের কাছে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পর্কে জানতে চেয়ে যে চিঠি দিয়েছেন তাতে উল্লিখিত ৩৫ দফার মধ্যে রয়েছে তখন পর্যন্ত আটককৃত ৬ যুদ্ধাপরাধীর আটকের কারণ, আইনের ভিত্তি, ইত্যাদি বিষয়ে প্রশ্ন।

সংবাদটি থেকে জানা গেল, আটককৃতদের নিয়োগকৃত আইনজীবীরা জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের কাছে যুদ্ধাপরাধীদের চলমান বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে বিভিন্ন অভিযোগ জানিয়ে পিটিশন জমা দেয়, যার ভিত্তিতে কমিশন এই চিঠি দিয়েছে। এটা আমরা বিভিন্ন সময়ে নানা উৎস থেকে শুনেছি ও দেখেছি যে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের চলমান উদ্যোগকে নিরুৎসাহিত করা, বিচারপ্রক্রিয়ায় বাধা দান, এমনকি বিচারের সমুদয় আয়োজন পণ্ড করার জন্য দেশের ভিতরে নানাভাবে অস্থিরতা সৃষ্টির অপচেষ্টার পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে ব্যাপক অর্থ বিনিয়োগ করে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও লবিয়িংয়ের কাজ চলছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে লবিয়িং নিয়ে এতদিন ধরে শোনা কথাগুলো যে মোটেই উড়োকথা নয়, জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের এই চিঠিটিই তার প্রমাণ। যে চিঠির ভিতর দিয়ে আটককৃত যুদ্ধাপরাধীদের প্রতি মানবাধিকার কমিশনের একটি উদ্বেগই প্রকাশিত হয়েছে।

আমরা জানি, জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশন যেকোনো মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় অভিযোগ জানাবার জন্য প্রশস্ত ক্ষেত্র, যা সবার জন্যই উন্মুক্ত। সে বিচারে যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে এরকম পিটিশন সেখানে জমা পড়তে পারে না তা নয়। কাজেই এতে বিস্ময়ের কিছু নেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের নয় মাসে  শহীদ ৩০ লক্ষ নারী-পুরুষ, হেনস্থা ও ধর্ষণের শিকার চার লক্ষ নারী, এক কোটিরও বেশি মানুষের শরণার্থী হতে হওয়ার বিপরীতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ভূমিকা পালনকারী দেশি-বিদেশি অপরাধীদের বিচার যে স্বাধীনতা-পরবর্তী ৪০ বছরেও হলো না, সে ব্যাপারে জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের কোনো উচ্চবাচ্য নেই কেন? কমিশনের কাছে কি এসব তথ্য নেই? যদি থাকে তাহলে প্রশ্ন জাগে যে, অপরাধীর মানবাধিকারের দেখভাল করার আগেই কি অপরাধের শিকার নারী-পুরুষের মানবাধিকার রক্ষার বিষয়টি কমিশনের কাছে প্রধান বিবেচ্য বিষয় হবার কথা নয়?

সম্প্রতি জাতিসংঘের হাইকমিশনার বান কি মুন সিরীয় প্রেসিডেন্ট বাসার আল আসাদের প্রতি তাঁর নিজের দেশের জনগণকে হত্যা করার তৎপরতায় উদ্বেগ প্রকাশ করে এই হত্যাকাণ্ড বন্ধের জন্য জোর দাবি জানিয়েছেন। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীও এদেশীয় দোসরদের সহযোগিতায় নিজ দেশের জনগণকেই হত্যা করেছিল। ওদিকে গত ফেব্রুয়ারিতে তাহরির স্কোয়ারে অনুষ্ঠিত বিদ্রোহী মিশরবাসীর এক জমায়েতে গুলি চালানোর নির্দেশ দেওয়ায় মিশরের স্বৈরাচারী প্রেসিডেন্টের এখন বিচারকার্য চলছে। প্রায় ৮৫০ জন মানুষকে হত্যার নির্দেশদান ও অন্যান্য অপরাধে তার ফাঁসি পর্যন্ত হতে পারে বলে আইন বিশেষজ্ঞগণ মনে করছেন। অথচ বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে এর কয়েক হাজারগুণ বেশি মানুষের মৃত্যুঘটনা এবং নানা ভোগান্তির শিকার মানুষের বিচার পাবার দাবি বছরের পর বছর উপেক্ষিত হচ্ছে দেখে জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের কোনো উদ্বেগ নেই।

এখানে হয়ত বলা হবে যে, কমিশনের উদ্বেগ নির্ভর করে অভিযোগের ভিত্তিতে। যেহেতু অপরাধীদের পক্ষ থেকেই অভিযোগ জমা পড়েছে, কাজেই তারা তাদের পক্ষেই উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। এক্ষেত্রে আমার জিজ্ঞাস্য এই যে, যেহেতু জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশন যন্ত্রচালিত নয় বরং মনুষ্যচালিত প্রতিষ্ঠান, কাজেই সংস্থাটির এ ধরনের কার্যকলাপ কি তার গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে না? সরকারের কাছে কমিশনের জানতে চাওয়ার তালিকায় এমনকি যুদ্ধাপরাধীদের ‘আটকের কারণ’ পর্যন্ত যুক্ত হওয়াকে আমার কাছে নিতান্ত উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মনে হয়। ভাবতে হয় যে, যুদ্ধাপরাধীদের আটকের কারণ হয়ত তাদের জানা নেই। কিন্তু এরকম একটা বড়ো গণহত্যার ঘটনার তথ্য তাদের কাছে না-থাকাটা রীতিমতো অবিশ্বাস্য। এই অবিশ্বাস্য ব্যাপারটাই যদি আমাদের বিশ্বাস করতে হয়, তাহলে বলতে হবে যে, জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশন কেবল নামেই জাতিসংঘ কমিশন এবং সংস্থাটির কার্যক্রম আসলে প্রো-পিপল নয়!

সবারই জানা আছে যে, দরিদ্ররাই মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার বেশি হয়। একাত্তরে হত্যা-ধর্ষণ-লুণ্ঠন ও অগ্নিকাণ্ডের শিকার এবং শরণার্থীর জীবনযাপনে বাধ্য হওয়া ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সিংহভাগই ছিল দরিদ্র। মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচারপ্রার্থী হিসেবে আন্তর্জাতিক ক্যাম্পেইন পরিচালনার সামর্থ্য ও সক্ষমতা দরিদ্রদের থাকে না। এই দরিদ্রশ্রেণির মানুষের পক্ষে যদি জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশন স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে না-দাঁড়ায়, তাহলে এই শ্রেণির মানুষের মানবাধিকারবঞ্চিত হয়েই জীবন অতিবাহন করতে হবে। সেক্ষেত্রে এসব ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে মানবাধিকার কমিশনের মহিমা রীতিমতো নিষ্প্রভ হয়ে যেতে বাধ্য, যদি তেমন কোনো মহিমা এ সংস্থার থেকে থাকে।

আমরা জানি, আমাদের দেশে সরকারি-বেসরকারি ও ছোটো-বড়ো অনেক মানবাধিকার সংগঠন কাজ করে। তার মধ্যে কয়েকটি মাত্র সংগঠন তথ্যপ্রমাণ জোগাড় করাসহ অপরাধ ট্রাইব্যুনালকে সহায়তা করছে। কিন্তু মানবাধিকার নিয়ে আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের সাথে যারা কর্মরত, তারা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কমিশনসহ আন্তর্জাতিক অপপ্রচারের বিষয়ে কী ভূমিকা পালন করছেন, তার কোনো নমুনা আমরা কোথাও দেখছি না। তারা কেন এতদিনেও দেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পক্ষে সহায়তা প্রদানের জন্য জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনে কোনো পিটিশন দাখিল করেন নি? তাদের কাজ নিশ্চয়ই কেবল প্রকল্প বাস্তবায়ন নয়। সেক্ষেত্রে যুদ্ধাপরাধীদের চলমান বিচার কার্যকর করায় তাদের ভূমিকা সম্পর্কে আমাদের জানতে ইচ্ছে করে।

বর্তমান অবস্থায় আমাদের মানবাধিকার সংগঠনগুলোর উচিত একক ও সম্মিলিতভাবে চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কার্যকর করার অনুকূলে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জনমত সংগঠিত করা। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠনসমূহের কাছে একাত্তরে এদেশে সংঘটিত ভয়াবহ অপরাধসমূহের বিবরণ তুলে ধরা, যাতে কোটি কোটি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের বিপরীতে সংঘটিত এসব অপরাধের যথাযথ বিচার নিষ্পন্ন হওয়ার মাধ্যমে দেশে একটি ন্যায়ের দৃষ্টান্ত প্রতিষ্ঠিত হয়। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সংঘটনের লক্ষ্যে পরিবেশ সৃষ্টির দায়িত্ব এককভাবে সরকারের নয়, এ দায়িত্ব সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে ব্যক্তিমানুষ পর্যন্ত। আমি আশা করব, মুক্তিযুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের বিচারপ্রাপ্তির আকাক্সক্ষাটি বাস্তবায়নের অনুকূলে তৎপর হয়ে মানবাধিকার সংগঠনগুলো যথাযথ কাজটি করবে।

আরেকটি কথা, জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশন কর্তৃক প্রেরিত চিঠিতে উল্লিখিত আছে অতিরিক্ত সময়েও চিঠির জবাব না-দিলে ওয়ার্কিং গ্রুপ তাদের কাছে থাকা তথ্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশ সরকারকে তাদের বক্তব্য বা মতামত জানিয়ে দেবে। আমার মনে হয়, কমিশনকে এরকম সুযোগ না-দিয়ে সরকারের নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে সময়ের মধ্যেই জবাব দিয়ে দেয়া উচিত, তা নইলে আন্তর্জাতিক মহলে এ নিয়ে নানা কথা উঠবে। যদিও আমি মনে করি না যে, চিহ্নিত এসব যুদ্ধাপরাধীর বিচারের ক্ষেত্রে কোনো আন্তর্জাতিক চাপের কাছে পরাভূত হবার দরকার আছে। কারণ এই বিচার নিশ্চিত হলে কোনো যুক্তিতেই মানবাধিকার লঙ্ঘিত হবে না, বরং ৪০ বছর ধরে যে কোটি কোটি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের বিচারের দাবি উপেক্ষিত হয়ে এসেছে, তাদের বিচার পাবার অধিকারের প্রতিই যথাযথ সাড়া প্রদান করা হবে। কারণ আমি মনে করি, আগে বিবেচিত হওয়া উচিত অপরাধের শিকার হওয়া ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মানবাধিকার, তারপরে অপরাধীর। আর সেটা হলে রাষ্ট্রে ও সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার একটা পাটাতন তৈরি হবে।

বর্তমানে পাকিস্তানের রাজনীতিতে সক্রিয় বিশ্বখ্যাত ক্রিকেটার ইমরান খান তাঁর দেশে পশতুনদের ওপর পরিচালিত নির্যাতনের প্রেক্ষিতে ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য কারাভানের জানুয়ারি সংখ্যায় বলেছেন যে, ১৯৭১ সালের ঘটনা থেকে পাকিস্তান কিছুই শিক্ষা নেয় নি। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় অপরাধ সংঘটনকারীরা শাস্তি পেলে পাকিস্তানের বর্তমান পরিণতিতে উপনীত হতে হতো না। তিনি যথার্থই বলেছেন। কোনো ব্যক্তিমানুষ বা সমাজ-রাষ্ট্রের কর্তৃপক্ষ কোনো অপরাধ করে আইনানুগ শাস্তির আওতায় না-এলে সেখানে অপরাধপ্রবণতা বেড়ে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। আজকের পাকিস্তানের দিকে তাকালেই সেখানকার অরাজকতা টের পাওয়া যায়। যুদ্ধাপরাধের বিচার না-হওয়ায় ভিন্নমাত্রায় একইরকম পরিস্থিতি ঘটেছে আমাদের দেশেও। ধারণা করা হয়, স্বাধীনতার সাড়ে চার বছরের মাথায় ১৯৭৫-এ সপরিবারে স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধুকে হত্যার ঘটনাটি ঘটত না, যদি এদেশে অবস্থানকারী পাকদোসরদের বিচারকার্য সম্পন্ন হতো। ৭৫-এর জঘন্য হত্যাকাণ্ডের পর পাকিস্তানি কায়দায় দেশে সামরিক শাসন শুরু হয়। তার বলে বাহাত্তরে প্রণীত সংবিধান থেকে অনেক প্রগতিশীল ও আধুনিক ধারা কর্তন, গোলাম আযমকে নাগরিকত্ব প্রদান এবং রাজনীতিতে ধর্মের উগ্র ব্যবহার যুদ্ধাপরাধের বিচার না-হওয়ারই কুফল। সর্বোপরি, এর ফলে আমাদের দেশের মানুষের ব্যক্তিগত আচার-আচরণ থেকে শুরু করে ব্যবসায় ও রাজনীতি পর্যন্ত প্রায় সব ক্ষেত্রে পাকিস্তানি সংস্কৃতি গেঁড়ে বসে। সামরিক-আমলাতান্ত্রিক পাকিস্তানি সংস্কৃতির বিকাশ রহিত করে দেশে একটি পরিপূর্ণ গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি আমরা এখনো প্রতিষ্ঠা করে উঠতে পারি নি। ১৫ বছরেরও বেশি সময়ের এই ক্ষত শুকাতে আমাদের হয়ত আরো সময় লাগবে।

বাংলাদেশকে আমরা একটি ন্যায়তৎপর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চাই। আর সেজন্যই যুদ্ধাপরাধীদের চলমান বিচার কার্যক্রম সফলতার সাথে সম্পন্ন হওয়া জরুরি; যে উদ্যোগের সাফল্যের জন্য বিচারের উদ্যোগগ্রহণকারী সরকারকে সহযোগিতা করে যেতে হবে সকল বিবেকবান মানুষের। বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক বিরোধিতা বা বিভিন্ন ক্ষেত্রে সরকারের ব্যর্থতার অজুহাত দেখিয়ে যুদ্ধাপরাধের বিচারের লক্ষ্যে সরকারের নেয়া উদ্যোগের বিরোধিতা করা কোনোভাবেই মানবাধিকারের পক্ষে যাওয়া নয়। এক্ষেত্রে যারা ‘আন্তর্জাতিক মান’-এর প্রশ্ন টেনে আনছেন, তারা এ কথায় ঠিক কী বোঝাতে চান সে ব্যাপারে তাদের আরো ঝেড়ে কাশতে হবে। ঢালাও বক্তব্য না-দিয়ে চলমান বিচারপ্রক্রিয়ায় সুনির্দিষ্ট কোনো ঘাটতি থাকলে বাস্তব পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনায় নিয়ে কীভাবে তার সমাধান করা যায়, প্রকৃতপক্ষে এখন দরকার সেরকম পরামর্শ।

Thursday, 12 January 2012

গোলাম আযমের গ্রেফতার ও বিচারের আন্তর্জাতিক মান প্রসঙ্গে/রোকেয়া কবীর

শীর্ষ যুদ্ধাপরাধী হিসেবে কুখ্যাত গোলাম আযমের গ্রেফতারে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশের নাগরিকদের ৪০ বছরের প্রত্যাশার একাংশ পূর্ণ হলো। মুষ্টিমেয় কিছু যুদ্ধাপরাধী এবং তাদের সমর্থকরা ছাড়া বাংলাদেশের আমজনতার সবাই এই কুখ্যাতদের বিচারের পক্ষে।

গ্রেফতারের দিন গত বুধবার টেলিভিশনের সন্ধ্যার খবরে শুনলাম, গোলাম আযমের আইনজীবীদের পক্ষে ব্যারিস্টার রাজ্জাক বলছেন, তাকে জামিন না-দিয়ে, তার পক্ষে আপিলের অনুমতি না-দিয়ে তার সাংবিধানিক অধিকার হরণ করা হয়েছে। তিনি বলছেন, দেশের নাগরিক হিসেবে চোর-গুন্ডা-বদমাশ সবারই সাংবিধানিক অধিকার রয়েছে। তবে, এই তালিকায় তিনি ‘কসাই’ শব্দটি বলেন নি! আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না, গোলাম আযমকে তিনি উল্লিখিতদের মধ্যকার কোন ধরনের অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করলেন?

লক্ষণীয় যে, ব্যারিস্টার রাজ্জাক তাঁর বক্তব্যের মাধ্যমে স্বীকার করেছেন যে, এদেশে একটি সংবিধান আছে, সেই সংবিধানের দৃষ্টিতে সব মানুষের সমান অধিকার আছে। গোলাম আযমকে রক্ষার জন্য হলেও তিনি সব মানুষের সাংবিধানিক অধিকারের শরণাপন্ন হয়েছেন, যেটা গোলাম আযমরা হরহামেশাই অস্বীকার করেন।

কথা হলো, যার জন্য তিনি সাংবিধানিক অধিকারের দাবি তুলছেন, তিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় পাক হানাদার বাহিনীর সমস্ত অপকর্ম সমর্থন করেছেন, তাদের সেসব কাজ সংগঠিত করার জন্য ভূমিকা রেখেছেন ও সর্বপ্রকার সহযোগিতা দিয়েছেন, নিজে তার অনুসারীদেরসহ মানবতাবিরোধী শাস্তিযোগ্য কর্মে জড়িত হয়েছেন, যার ভুরি ভুরি বাস্তব প্রমাণ আছে। তার ও তার দলের আরো অনেকের এ ধরনের অপরাধ বিষয়ে দেশের নাগরিকদের মধ্যে বিন্দুমাত্র সংশয় নেই।

গোলাম আযম যে দলের প্রাক্তন আমির, সে দল জামায়াতে ইসলামীর ঘোষিত নীতি হচ্ছে যে, তারা মানুষের প্রণীত কোনো আইনে বিশ্বাস করে না। এজন্য তারা দেশে আল্লাহর আইন তথা ইসলামি আইন চালু করতে চান। তাদের অজস্র বক্তৃতা-বিবৃতি-ক্যাসেট-সিডি থেকেই তাদের প্রত্যাশিত আল্লাহর আইনের প্রতি অনুরক্তির কথা আমরা অহরহ শুনে থাকি।

আমরা জানি, তারা তাদের রাজনৈতিক ও অন্যান্য কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সৌদি সহায়তা পান। পাশাপাশি তারা ইসলামি বা আল্লাহর আইনের নামে এদেশে সৌদি আইন চালু করতে চান। যদি তাই চান, তাহলে এখানে আরেকটা দৃশ্যের কথা মনে হয়। গোটা দেশবাসী গণমাধ্যমসূত্রে দেখেছে, গত অক্টোবরে ৮ বাংলাদেশি নাগরিককে সৌদি আইনে প্রকাশ্য রাজপথে শিরচ্ছেদের মাধ্যমে হত্যা করা হয়েছে, যাদের অপরাধ গোলাম আযমের অপরাধের তুলনায় তুচ্ছ।

সবাই জানে, সৌদি আরবে তাদের বর্ণিত কোরানিক আইন তথা ইসলামিক আইন প্রচলিত আছে, যেখানে চুরির মতো তুচ্ছ অপরাধেও হাত কেটে ফেলার বিধান আছে। গোলাম আযমের অপরাধের যে ব্যাপকতা, তাতে সেই কথিত ইসলামি আইন অনুযায়ী বহু আগেই ঢাকার রাজপথে জনসমক্ষে তার শিরচ্ছেদ হবার কথা ছিল। বিচারের আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের কথা তুলে তারা তাদের এই ইসলামি বিধান লঙ্ঘন করছেন কি না, এ প্রশ্নের তারা কী উত্তর দেবেন?

যারা সংবিধান মানে না, নারী ও ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের অধিকার স্বীকার করে না, বরং নারী ও প্রগতিশীল মানুষ এবং আইনের বিরুদ্ধে জেহাদ করে, বোমা মারে, তাদের আইনজীবীর মুখে সংবিধানকে সাক্ষী মেনে এ ধরনের কথা মানায় না। তাতে তাদের কথা ও কার্যকলাপের মধ্যকার বিস্তর ফারাকটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সংবিধানের মৌলিক নীতি যারা মানে না, তারা স্পষ্টত রাষ্ট্রদ্রোহী। তাদের আন্তর্জাতিক মানের আইনি অধিকার পাওয়ার অধিকার থাকতে পারে না। একাত্তরে হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ ও লুষ্ঠনের মাধ্যমে তারা মানবতাবিরোধী যেসব অপরাধ করেছে, এসব অপরাধের যারা ভুক্তভোগী, যারা হারিয়েছেন তাদের মা-বাবা-ভাই-বোন-আত্মীয়পরিজন, বাড়িঘর-সম্পদ-- তাদের সুবিচার পাবার অধিকার তো চল্লিশ বছর ধরেই লঙ্ঘিত হয়ে চলেছে। এখানে এসে আমার প্রশ্ন যে, কোনটা আগে বিবেচ্য হওয়া উচিত-- যুদ্ধাপরাধীর অধিকার নাকি ভুক্তভোগীদের সুবিচার পাওয়ার অধিকার?

বাংলার মানুষ যে ধরনের একটি দেশের স্বপ্ন নিয়ে এ দেশ স্বাধীন করেছিল, গোলাম আযমের নেতৃত্বে পরিচালিত এই গোষ্ঠীর তৎপরতা সেরকম দেশ ও সমাজ প্রতিষ্ঠার অন্তরায়। তারা দেশ ও মানুষের যেকোনোরকম অগ্রসরমানতাকে ঠেকিয়ে রেখে প্রকারান্তরে তাকে আরো পেছন দিকে ঠেলে দিতে চায়। অপরাধ তারা একাত্তরে করেছে, করেছে একাত্তরের পরেও এবং এখনো তারা একই ধরনের তৎপরতায় লিপ্ত। তারা ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও নারীর সমানাধিকার না-মেনে সংবিধানের মৌলনীতি লঙ্ঘন করে চলেছে। যাদের জন্য এদেশের জনগোষ্ঠীর ৫০ ভাগ নারী উত্তরাধিকার ও পারিবারিক ক্ষেত্রে সমানাধিকার থেকে এখনো বঞ্চিত, যারা এদেশে প্রগতিশীল শিক্ষানীতি প্রণয়নে বাধা সৃষ্টি করে, যারা ছায়ানটের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করতে বাধার সৃষ্টি করেছিল বিগত জোট সরকারের আমলে, যারা কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের রগকাটা, হত্যা, বোমাবাজি ইত্যাদির হোতা, তাদের জন্য বিচারের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড নিয়ে যারা অস্থির হয়ে পড়েছেন, তারা এ দেশের সাধারণ জনগণের ন্যায্য অধিকার ও সুবিচার পাওয়ার অধিকার নিয়ে কেন সোচ্চার হচ্ছেন না-- এ প্রশ্ন তাদের ভূমিকাকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে ধারণা দেয়। কাজেই যথাসম্ভব দ্রুত গোলাম আযমসহ গ্রেফতারকৃত ও গ্রেফতারের বাইরে থাকা সকল যুদ্ধাপরাধীর বিচার কার্যকর করে দেশকে রাহুমুক্ত করবার কোনো বিকল্প নেই, যদি আমরা সত্যিই এই দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই। দেশের স্বজনহারা, সম্পদহারা, শারীরিকভাবে নির্যাতিত ও শরণার্থীর জীবনযাপনে বাধ্য হওয়া মানুষ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে মানবতাবিরোধী এই অপরাধীদের বিচারদৃশ্য দেখবার জন্য। ক্ষতিগ্রস্ত এসব মানুষের বিচার পাবার অধিকারকে নিশ্চয়ই আমরা লঙ্ঘন করতে পারি না।

Monday, 28 November 2011

বিশ্ব এইডস দিবস ২০১১-এ বিএনপিএস-এর লিফলেট


এইডস প্রতিরোধে তৎপর হোন
এইচআইভি সংক্রমণ, সংক্রমিত ব্যক্তির প্রতি বৈষম্য এবং
এইডসসংক্রান্ত মৃত্যু শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনুন
এ বছরের বিশ্ব এইডস দিবসের (পহেলা ডিসেম্বর ২০১১) আহ্বান : ‘এইচআইভি সংক্রমণ, সংক্রমিত ব্যক্তির প্রতি বৈষম্য এবং এইডসসংক্রান্ত মৃত্যু শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা’ (Getting to Zero - Zero New HIV Infections. Zero Discrimination and Zero AIDS-Related Deaths)। এসব ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের মধ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানানোই এই স্লোগানের উদ্দেশ্য। এইডস সম্পর্কে বিশ্ববাসীকে সচেতন করা, এইডসআক্রান্তদের জন্য স্বাস্থ্যসেবা বাড়ানো এবং বিশ্ব পর্যায়ে এইডসসংক্রান্ত সামাজিক ও স্বাস্থ্য সংকট মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় তহবিল সংগ্রহ করার জন্য ১৯৮৮ সাল থেকে পৃথিবীব্যাপী বিশ্ব এইডস দিবস পালিত হয়ে আসছে। সকলের জন্য চিকিৎসার সম-সুযোগ নিশ্চিত করার মাধ্যমে সকল দেশকে এইডস রোগ প্রতিরোধে অঙ্গীকারাবদ্ধ করে তোলার মধ্যেই এই দিবসের তাৎপর্য নিহিত। 
প্রতিদিন বিশ্বের প্রায় ৭১০০ মানুষ এইচআইভি-সংক্রমিত হয় এবং ৪৯০০ মানুষ এইচআইভি/এইডস-এ আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। বর্তমানে বিশ্বে তিন কোটি মানুষ এইডস-সংক্রমণ নিয়ে বেঁচে আছে। এইডসআক্রান্ত অধিকাংশ মানুষই নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশগুলোতে বসবাস করে। বিশেষ করে, আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে এইডস মহামারি আকারে দেখা দিয়েছে, যেখানে ১৫-২৪ বছর বয়সী নারীরা ভয়াবহভাবে এইচআইভি-সংক্রমণের শিকার হয়েছে।
এইডসআক্রান্ত ব্যক্তিদের সুচিকিৎসা এখনো সোনার হরিণ। এক্ষেত্রে প্রথম বাধা রোগ চিহ্নিত হওয়া এবং সামাজিক সংস্কার দূর করে চিকিৎসা নিতে এগিয়ে আসা। এরপর রয়েছে চিকিৎসার ব্যয়বহুলতার বিষয়টি, যা দরিদ্র দেশের আক্রান্তব্যক্তিদের একটা বড়ো অংশকেই চিকিৎসা থেকে দূরে রাখে। উন্নত বিশ্বে চিকিৎসার সহজলভ্য সুবিধা থাকলেও দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এটি এখনো একটি বড়ো চ্যালেঞ্জ।
এইডসআক্রান্ত মানুষের প্রতি সমাজে একটি মর্যাদাপূর্ণ ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি থাকা প্রয়োজন। কিন্তু বিশ্বের ৮৪টি দেশে রোগটির প্রতিরোধ এবং আক্রান্তদের চিকিৎসা, সেবা ও সহায়তা দানের ক্ষেত্রে বৈরী অবস্থা বিরাজ করছে। ৫৯টি দেশে চিকিৎসাপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে বাধা রয়েছে। তাছাড়া এইডসআক্রান্ত ব্যক্তিরা চলাচল ও জীবিকা নির্বাহের ক্ষেত্রে বৈষম্য ও প্রতিবন্ধকতার শিকার হন।
বাংলাদেশে এইচআইভি/এইডস সংক্রমণের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম হলেও আমরা ঝুঁকিমুক্ত নই। সর্বশেষ সরকারি হিসেব অনুযায়ী ১৯৮৯ সালে প্রথম এইডস রোগী শনাক্ত হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত এইচআইভি পজিটিভের সংখ্যা ২০৮৮ জন, এইডসআক্রান্তের সংখ্যা ৮৫০ জন, যার মধ্যে মারা গেছেন ২৪১ জন। আমরা সচেতন না-হলে ভবিষ্যতে আমাদের দেশেও এইডসের বিস্তার ভয়াবহতার মাত্রায় পৌঁছে যেতে পারে।
আমাদের দেশে এইডস রোগী শনাক্ত করা বেশ কঠিন। কেননা এইচআইভি ভাইরাসের উপস্থিতি প্রমাণের জন্য এখানে রক্ত পরীক্ষার সুযোগ যথেষ্ট নয়। সরকারি হিসেব মতে, দেশে এইচআইভি পরীক্ষার জন্য ৯৬টি ভলান্টারি কাউন্সেলিং অ্যান্ড টেস্টিং কেন্দ্র রয়েছে। এসব কেন্দ্রে  রক্তে এইচআইভি ভাইরাস আছে কি না তা বিনামূল্যে পরীক্ষা করা হয়। কেন্দ্রসমূহ পরিচালনা করে থাকে কয়েকটি বেসরকারি সংস্থা। এসব কেন্দ্র মূলত নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর প্রতি মনোযোগী; যেমন কিছু কেন্দ্রে যৌনকর্মী ও কিছু কেন্দ্রে হিজড়াদের রক্ত পরীক্ষা করা হয়। সাধারণ মানুষের জন্য এরকম কেন্দ্রের সংখ্যা খুব কম। তাছাড়া এই কেন্দ্রগুলো ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটের মতো বিশেষ কয়েকটি অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ।
এইডসআক্রান্তদের চিকিৎসা দেওয়ার ক্ষেত্রেও আমরা পিছিয়ে আছি। রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে এইচআইভি-সংক্রমণ চিহ্নিত হলে রোগীকে নিয়মিত এআরভি (এন্টিরেট্রোভাইরাল) ওষুধ দিতে হয়। এই ওষুধ খুবই ব্যয়বহুল, যেজন্য বিশেষায়িত গ্র“প হিসেবে সুবিধাপ্রাপ্তদের বাইরে চিকিৎসা পাওয়ার ক্ষেত্রে এইডসআক্রান্ত সাধারণ দরিদ্ররা বৈষম্যের শিকার হন। আমরা মনে করি, এইডসআক্রান্তদের চিকিৎসার দায়িত্বটি সরকার গ্রহণ করলে এসব সমস্যা থেকে সহজেই উত্তীর্ণ হওয়া সম্ভব।
এইচআইভি/এইডস সংক্রমণের বাস্তবতাগুলো আমাদের সমাজেও বিরাজমান। মাদকসেবন, যৌনব্যবসায়, সাময়িকভাবে বিদেশে অবস্থান, অনিরাপদ রক্ত সঞ্চালন, দারিদ্র্য, পর্যাপ্ত শিক্ষা ও চিকিৎসা সেবার অভাব ছাড়াও আরো অনেক মৌলিক বিষয় রয়েছে, যা এ ধরনের রোগের বিস্তারে সহায়তা করে ও প্রতিরোধে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
এইডসআক্রান্ত হবার সম্ভাবনা রয়েছে নারী-পুরুষ উভয়েরই। দেশে প্রকট জেন্ডার বৈষম্য বিদ্যমান থাকায় নারীরা আক্রান্ত হবার আশঙ্কায় পুরুষের তুলনায় বেশি ভুগছে। আক্রান্ত নারী পরিবারে, সমাজে সর্বত্র সন্দেহের শিকারে পরিণত হন। পরম আপনজনও তাদের দূরে ঠেলে দেয়। এছাড়া অতি দরিদ্র, ক্ষমতাহীন, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাহীন, নারীদের এইডসে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা অনেক বেশি এবং তাদের পরিণতি হয় আরো ভয়াবহ। সমাজে নারীদের অধস্তন অবস্থান, নারীসহ অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ক্ষমতাহীনতা ও মানবাধিকারবঞ্চনা এইচআইভি/এইডস প্রতিরোধে যেকোনো জাতীয় উদ্যোগের সফলতার পথে বড়ো প্রতিবন্ধক।
এই পরিস্থিতি ২০১৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশে এইচআইভি/এইডসের সংক্রমণ, রোগীদের প্রতি বৈষম্য এবং আক্রান্ত ব্যক্তিদের মৃত্যু শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার জন্য জরুরি করণীয়সমূহ হতে পারে নিম্নরূপ :
-                     প্রতিরোধই হচ্ছে এইডস থেকে রক্ষা পাবার সর্বোত্তম উপায়। এইচআইভি ভাইরাস যাতে আক্রমণ করতে না-পারে, সেজন্য নিরাপদ ও বিশ্বস্ত যৌনসম্পর্ক বজায় রাখতে হবে।
-                     জরুরি মুহূর্তে শরীরে রক্ত গ্রহণের আগে স্ক্রিনিং টেস্টের মাধ্যমে দানকৃত রক্তে এইচআইভি ভাইরাস আছে কি না তা পরীক্ষা করে নেওয়া প্রয়োজন। এক্ষেত্রে সকল সরকারি হাসপাতালে এইচআইভি/এইডস শনাক্তকরণ সুবিধাসহ চিকিৎসাসেবা সহজলভ্য করতে হবে।
-                     মাদক গ্রহণকারীদের ক্ষেত্রে সিরিঞ্জ দিয়ে মাদক গ্রহণ পরিহার করতে হবে। যারা এখনো পরিহার করতে পারছেন না তাদের একাধিকজনের একই সিরিঞ্জ ব্যবহার করার প্রবণতা রোধ করতে হবে। 
-                     এইডস প্রতিরোধে সচেতনতাই সবচেয়ে বড়ো অস্ত্র। স্কুল পর্যায় থেকে জাতীয় কারিকুলামের আওতায় এইচআইভি/এইডস, প্রজননস্বাস্থ্য ও যৌনস্বাস্থ্যসংক্রান্ত শিক্ষা ও সচেতনতা প্রদান করতে হবে। উন্নয়নকর্মী ও স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমে কমিউনিটি পর্যায়েও সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে।
-                     আমাদের মোট জনসংখ্যার ২৫ শতাংশ কিশোর-কিশোরী। প্রজননস্বাস্থ্য বিষয়ে তাদের সচেতন করার মাধ্যমে দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে পারলে এইচআইভি/এইডসসহ বিভিন্ন যৌনরোগ প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে।